মধ্যরাতে চা বাগানে খেমটা নাচ, জুয়ার আসর (ভিডিও)

মধ্যরাতে শুরু হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চলে খেমটা নাচ, জুয়ার আসর। চা বাগানের শ্রমিকদের মনোরঞ্জনের নামে চলছে অশ্লীল নৃত্য, অঙ্গভঙ্গি আর উত্তেজক গান। আর জুয়ার বোর্ডে চলছে প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকার খেলা। মঙ্গলবার রাতে ফিনলে চা কোম্পানির জাগছড়া গার্ডেনে গিয়ে এমন দৃশ্যই দেখা গেলো।

চা বাগানের কিশোর-তরুণ-যুবকের পাশাপাশি বয়সী মানুষেরাও যেন হা করে গিলছে এই অশ্লীলতা। আর জুয়ার আসরে হারাচ্ছে দিনের আয় কিংবা মাসের সঞ্চয়। কেউ কেউ জিতছে।তবে অধিকাংশই হারছে। হেরে খিস্তি-খেউড় করতে করতে জুয়ার বোর্ড থেকে এগিয়ে যাচ্ছে অশ্লীল নৃত্যের দিকে।

জুয়ায় খরচ হলেও নৃত্যদর্শন ফ্রি!

জাগছড়া চা বাগানের নাটমন্দিরে চলছে এই অশ্লীল নৃত্য। নৃত্য পরিবেশন করছিলো আশালতা অপেরার কিশোরী, তরুণীরা। বাংলা- হিন্দি গান বাজিয়ে তার সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় ঠোঁট মিলিয়ে নাচের নামে একেকজন আজেবাজে সব অঙ্গভঙ্গি করছে।

মঙ্গলবার ছিলো এই আসরের ষষ্ঠ রাত। আশালতা নামের যে প্রতিষ্ঠানটি এই অশ্লীলতা ছড়াতে শ্রীমঙ্গল এসেছে সেটি গঠিত হয়েছে নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জের মেয়েদের নিয়ে।

শীতের মওসুম নামলেই বাগানে বাগানে এই অশ্লীল নৃত্য শুরু হয়। সঙ্গে চলে অনিবার্য আয়োজন জুয়া। জাগছড়া বাগান ছাড়াও এরই মধ্যে সাতগাঁও চা বাগানে ১০ দিন, সিন্দুর খান বাগানে ৫ দিন, খাড়িয়া ছড়ায় ৫ দিন এই আসর বসেছে।

‘আমি-জাম্বুরা না, কমলাও না’ কিংবা ‘ও আমার রসিয়া বন্ধুরে’ ‘ও ছেমরি তোর গাছে পাকা’ গানগুলো কথায় যেমন অশ্লীল, গাওয়ার ভঙ্গিমা তার চেয়েও অশ্লীল আর সব চেয়ে অশ্লীল এসব কথা ও গানের সঙ্গে শরীরের অঙ্গভঙ্গি। কেবলই যে দেশি গান তা নয়, ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি’র মতো হিন্দি আইটেমও বেশ চলছিলো।

তবে এই গান কিংবা নাচ আসরের মূল লক্ষ্য নয়। আয়োজকদের মূল লক্ষ্য জুয়ার আসর। চরকি, ঝান্ডামুণ্ডা, ওয়ান টেন, রিং এমন নানা ধরনের জুয়ার বোর্ড। সেসব বোর্ডে রাতভর লাখ লাখ টাকার জুয়া চলে।

জুয়ার খবর জানতেই বেরিয়ে এলো নানা তথ্য। প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এমন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানালো, প্রশাসন-রাজনীতি আর সংবাদমাধ্যমের মুখ বন্ধ রেখে এই জুয়া চলে। আর এ জন্য প্রতি রাতেই ব্যয় আছে দুই লাখ টাকার বেশি।

সূত্রটি জানায়, উপজেলায় পর্যায়ের সরকারি একজন প্রধান কর্মকর্তার বাসায় একটি ফ্রিজ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে জুয়ার আয়োজকদের পক্ষ থেকে।

আর সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ রাখা হচ্ছে দৈনিক ভাতা দিয়ে। সংবাদ মাধ্যমের একেকটি হাউজের মানে নির্ধারিত হচ্ছে তাদের ভাতা। এতে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা করে বিতরণ হচ্ছে। প্রতি সন্ধ্যায় উপজেলা গাউসিয়া হোটেলে এই টাকার ভাগ বাটোয়ারা হয়।

সাংবাদিকদের পেছনে দিনে ১৫ হাজার টাকা করে খরচ করছে জুয়ার আয়োজকরা। আর জন প্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসনিক কর্তা ব্যক্তি আর আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা দৈনিক ৫ হাজার টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন, এমন কথাও জানা গেছে নির্ভরযোগ্য সূত্রে।

এ বিষয়ে বাংলানিউজের কথা হয় জাগছড়া বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি রামদাস ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতি বছরই এভাবে যাত্রাপালার আয়োজন হয়। জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েই এগুলো চলে।

অশ্লীল নাচ ও জুয়ার আসরের বিষয়ে কোনও কথা বলেননি তিনি।

এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক কামরুল হাসান বাংলানিউজকে বলেন, চা বাগানে যাত্রা হয় কিন্তু সেখনে জুয়া বা অশ্লীলতা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। এ ধরনের অভিযোগ পেলে আমরা তা অবশ্যই বন্ধ করবো।

আর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সার্কেল)আশরাফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, জুয়ারুদের এসব আচরণ প্রশাসন কোনওভাবেই সহ্য করবে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীকেও ম্যানেজ করে এসব অসামাজিক কাজ চলছে, এমন প্রসঙ্গে আশরাফুল ইসলাম বলেন, এমনটা হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

পুলিশ বিভাগের কারো বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের প্রমাণ পেলে দ্রুত অ্যাকশন নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

You Might Also Like