ভারত-চীন-পাক সঙ্ঘাত ও মধ্যপ্রাচ্য সংযোগ

দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-ভারত সীমান্ত সঙ্ঘাত এখন সবচেয়ে উত্তেজনাকর এক অবস্থা অতিক্রম করছে। দুই দেশই কৌশলগত সমরাস্ত্র সীমান্ত এলাকায় নিয়ে এসেছে, যেটি নিকট অতীতে কোনো সময় দেখা যায়নি। দুই দেশের সীমান্ত উত্তেজনা যাতে সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ না নেয় তার জন্য রাশিয়া সমঝোতার উদ্যোগ নিয়েছে। তবে উপমহাদেশে দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে উত্তেজনা বাড়তেই থাকবে। এমনকি আপাতত শান্তি বা সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হলেও সঙ্ঘাত ও উত্তেজনা বার বার ফিরে আসবে। কেন এটি হতে থাকবে সেটির মূল রহস্য অনুধাবন না করলে বিশ্ব রাজনীতি বিশেষত এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনা পরম্পরার গতিবিধি বুঝা সহজ হবে না।

চীন-মার্কিন দ্বন্দ্ব

বাহ্যিক নানা ঘটনায় যাই দেখা যাক না কেন, বৈশ্বিক নেতৃত্ব এখনো বেশ খানিকটা যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই রয়ে গেছে। জ্ঞান বিজ্ঞান, সমরাস্ত্র, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ- এমন প্রতিটি ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু বিশ্ব নেতৃত্ব বা কর্তৃত্ব গ্রহণে চীন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। দেশটি বিশ্বের সর্বাধিক জনসংখ্যা অধ্যুষিত। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের। ২০২৪ থেকে ২০৩০ এর মধ্যে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। সামরিক-বেসামরিক প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জনে দ্রুত সাফল্য পাচ্ছে বেইজিং। দশককালের মধ্যেই চীন বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর কাতারে চলে যেতে পারে। চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল অনুসারে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশটি প্রধান বৈশ্বিক শক্তি হতে চায়, যে সময় চীন হয়ে উঠবে বিশ্ব ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণকারী প্রধান পরাশক্তি।

স্বাভাবিকভাবে চীনের এই উত্থান বিদ্যমান বিশ্বশক্তি, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র্রের জন্য উদ্বেগজনক। বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় চীন যুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত দেশটির উত্থানমুখী শক্তিকে পাশ্চাত্য সেভাবে মূল্যায়ন করেনি। দেং শিয়াও পিংয়ের নেতৃত্বে চীন বিশ্ব অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে নিজেকে একাত্ম করার পর বিশ্বের শীর্ষ করপোরেট হাউজগুলো সস্তায় পণ্য উৎপাদনের জন্য তাদের শিল্পকারখানা চীনে স্থানান্তর করেছে। এতে করপোরেশনগুলো যেমন লাভবান হয় তেমনিভাবে কয়েক দশক ধরে চীনা অর্থনীতি প্রায় ডাবল ডিজিটে বিকশিত হতে থাকে। এভাবে চীন জাপানকে টপকে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। বিনিয়োগযোগ্য সবচেয়ে বেশি (জাপানের তিন গুণ) তহবিল জমা হয় চীনের হাতে।

এই অর্থনৈতিক শক্তি অর্জনের সাথে সাথে চীন তার প্রতিরক্ষা ও বেসামরিক প্রযুক্তি বিকাশে ব্যাপকভাবে মনোযোগী হয়ে ওঠে। অনেকখানি বাধাহীন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধার পথ ধরে চীন আফ্রিকা এশিয়া এমনকি ইউরোপ আমেরিকাতেও একটি বড় স্থান করে নেয়। বিশ্বের অনেক দেশই চীনা বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় বিশ্ব নিয়ন্ত্রকরা চীনকে সীমিত করার ব্যাপারে মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

শি জিন পিং চীনা প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর আস্তে আস্তে খোলস থেকে বের হয়ে আসা শুরু করে দেশটি। উচ্চাভিলাষী ‘রোড অ্যান্ড বেল্ট প্রকল্পের’ মাধ্যমে ইউরেশিয়া জুড়ে একটি বিশেষ বাণিজ্যবলয় এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচারাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তৈরির মাধ্যমে বিকল্প বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেয়। জাতিসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এ সংস্কার আনারও দাবি উঠায়। চীনের এই দ্রুত অগ্রসর হওয়াকে ঠেকাতে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প প্রশাসন চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দেয়। সভ্যতার দ্বন্দ্ব তত্ত্বের নতুন ব্যাখ্যায় চীনকে প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

করোনা-উত্তর সময়ে চীনবিরোধী এই আয়োজন সর্বাত্মকভাবে অবয়ব গ্রহণ করতে পারে। এ জন্য একটি চীনবিরোধী মহাজোট গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে আমেরিকান ‘ডিপ স্টেট’। আগামী নভেম্বরের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর সম্ভবত এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবয়ব নেবে।

চীন-ভারত দ্বন্দ্ব কি যুদ্ধের পথে?

এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তি চীন ও ভারতের সীমান্ত বিরোধ ও দ্বন্দ্ব অনেক পুরনো। কিন্তু ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর এই বিরোধ খুব একটা চাঙ্গা হয়নি। বরং বিরোধের ইস্যুগুলোকে একপাশে সরিয়ে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়ে উভয় দেশ এগিয়ে গেছে। এমনকি ব্রিকস, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং হংকং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা গঠনের মতো এশীয় কৌশলগত সহযোগিতা বিনির্মাণে উভয় দেশ অংশগ্রহণ করেছে। প্রশ্ন হলো, এসব সহযোগিতার প্রক্রিয়া হঠাৎ করে কেন থমকে গেল।

এখন নতুন করে যে দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে আসলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতের যে ‘কৌশলগত প্যারাডাইম শিফট’ সেটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে। ‘মোদি অ্যান্ড কোম্পানি’ মনে করছে, ভারতকে বিশ্বশক্তি হতে হলে পাশ্চাত্য বলয়ের সাথে একাত্ম হয়ে বৈশ্বিক মহাশক্তির কাতারে উঠতে হবে। এ জন্য কিছুটা সময় নিয়ে সোভিয়েত বলয়কেন্দ্রিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পাশ্চাত্যকেন্দ্রিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। আর এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনকে সীমিত করার যে নীতি কৌশল নিয়েছে সে প্রচেষ্টায় তার মিত্র হয়ে পাশ্চাত্যের বিনিয়োগ বাজার এবং প্রতিরক্ষা পৃষ্ঠপোষকতা গ্রহণ করতে হবে।

মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগেই এই ব্যাপারে সমঝোতা চূড়ান্ত হয়ে গেছে। আর বিপুল বিক্রমে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি সেই অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এই কৌশলের সাথে কেবল আরএসএস বা বিজেপি যুক্ত এমনটাই নয়, ভারতের শীর্ষ স্থানীয় পুঁজিপতি ও করপোরেট হাউজগুলোকেও এই সমঝোতার অংশীদার করা হয়েছে। স্থানীয় বাণিজ্যিক জায়ান্টগুলো বেসামরিক ক্ষেত্র ছাড়াও পাশ্চাত্যের সমরাস্ত্র উৎপাদকদের সাথে যৌথ সমরাস্ত্র প্রস্তুত প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলছে। নিরাপত্তা খাতের সরকারি উদ্যোগগুলোকে বেসরকারীকরণ এবং রুশপ্রধান ভারতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে পাশ্চাত্যমুখী করতে মোদি সরকারের প্রয়োজন ছিল বড় আকারের সামরিক বাজেট। এই বাজেটের জন্য বিশেষভাবে প্রয়োজন সামরিক উত্তেজনা। পাকিস্তানে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ থেকে শুরু করে কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা- সবকিছুই প্রতিরক্ষা খাতের বড় প্যারাডাইম শিফটকে কেন্দ্র করে করা হয়েছে।

আজ চীন-ভারত যে সীমান্ত উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে সেটি এই কৌশলেরই অংশ। সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, মোদি সরকার দিল্লিতে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা বলে আসছে। আর এই ৩৭০ অনুচ্ছেদ চূড়ান্তভাবে যখন বাতিল করা হয় তখন পুরো কাশ্মির উপত্যকাকে শুধু অবরুদ্ধই করা হয়নি; একই সাথে ভারতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেয়া হয় হয় যে, পাকিস্তান ও চীনা নিয়ন্ত্রিত কাশ্মির গিলগিট বাল্টিস্তান ও লাদাখ ভারতের সার্বভৌম এলাকা এবং এগুলোকে ভারত নিয়ন্ত্রণে নেবে।

লোকসভায় অমিত শাহ বা রাজনাথ সিংয়ের এই ধরনের ঘোষণা দেয়ার অর্থ হলো, কার্যত চীন-পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দিল্লির যুদ্ধের ঘোষণা দেয়া। এর আগে ভুটানের দোকলামে চীন-ভারত যে ‘স্ট্যান্ড অফ’ অবস্থা সৃষ্টি হয় সেটিরও শুরু করেছিল ভারতই। পুরো কাশ্মির উপত্যকা ভারতের দখলের হুমকি চীনকে যে বিশেষভাবে উসকে দেবে সে বিষয়ে সচেতন থেকেই এটি করা হয়েছে। কারণ গিলগিট বাল্টিস্তান দিয়েই চীনের ‘রোড অ্যান্ড বেল্ট’ রুট চলে গেছে। আর চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের এটি হলো গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

প্রশ্ন হলো, ভারত কেন তার চেয়ে চার গুণ বেশি শক্তিশালী চীনের সাথে যুদ্ধের মতো উত্তেজনা সৃষ্টি করতে যাচ্ছে? এর একটি কারণ হলো, ভারতের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়িয়ে পাশ্চাত্য ও ইসরাইলের সাথে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব জোরদার করার পরিবেশ সৃষ্টি। আর দ্বিতীয়ত, নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপি ভারতে নতুন করে ক্ষমতায় আসার জন্য উন্নয়ন কর্মসংস্থান এমনকি সর্বশেষ করোনা নিয়ন্ত্রণে যে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, তাতে উগ্র জাতীয়তাবাদী উত্তেজনা সৃষ্টি ছাড়া আবার তাদের ক্ষমতায় আসা কঠিন। তৃতীয় কারণটি হলো, ভারতের নীতি প্রণেতাদের ধারণা- যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য যেহেতু চীনবিরোধী একটি সর্বাত্মক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে তাতে চীনের জন্য পাশ্চাত্যের বিনিয়োগ ও বাজার বন্ধ হওয়ার অর্থ হলো, ভারতের সেই সুযোগ পাওয়া। আর এই সুযোগ গ্রহণ করে অর্থনৈতিকভাবে চীনের মতো শক্তিশালী হতে পারলে ভারত এক সময় মহাশক্তির কাতারে নিজেকে নিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করা হয়।

বলা হচ্ছে, করোনা-পরবর্তী সময়ে চীন থেকে পাশ্চাত্যের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে ভারত ও ভিয়েতনামসহ চীনবিরোধী দেশগুলোতে নিয়ে যাবে। পাশ্চাত্যের বাজারও এসব দেশের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। এই সুবিধা পেতে হলে চীনের বিরুদ্ধে ভারত যে যুদ্ধে নামছে, এমন একটি উত্তেজনা সৃষ্টি করতে হবে। আর সেটিই বুঝে শুনে দিল্লি করছে। এ কারণে চীন-ভারত সঙ্ঘাতের কারণগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, প্রায় সব ক্ষেত্রে ভারতই এই উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। চীনের গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তে সেটিই উল্লেখ করা হয়েছে।

অবশ্য ভারতের নীতিপ্রণেতারা জানেন যে, চীনের সাথে যুদ্ধ শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল অথবা ইউরোপ ভারতের সাথে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করতে আসবে না। তারা এর সুবাদে নিজেদের অস্ত্র বিক্রি করবে ভারতে। জেরুজালেম পোস্টের খবর অনুসারে এই কয়েক দিনের উত্তেজনায়, ইসরাইল ভারতের সাথে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের অস্ত্র কেনার ব্যাপারে একমত হয়েছে।

উত্তেজনা সৃষ্টির পাশাপাশি ভারতের নীতিপ্রণেতারা উত্তেজনা যাতে যুদ্ধ পর্যন্ত না গড়ায় সেটিও চাইবেন। এ কারণেই উত্তেজনা যখন তুঙ্গে তখন সমঝোতার পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য ভারতের সশস্ত্রবাহিনী প্রধান বিপিন রাওয়াত ও সেনাপ্রধান নারাভানে বলেছেন, চীন-পাকিস্তান এক হয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। অন্য দিকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাশিয়ার মধ্যস্থতায় চীনের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে উত্তেজনা কমানোর জন্য মস্কোতে আলোচনায় মিলিত হয়েছেন।

ভারতের যেকোনো আগ্রাসী মনোভাবের কঠোর জবাব দেয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রাখলেও চীন এই মুহূর্তে কৌশলগত কারণে যে যুদ্ধ চায় না, সেটি নয়াদিল্লি ভালোভাবেই জানে। এ কারণে চায়ের কাপে ঝড় তুলে ফায়দা হাসিলে যতটা দিল্লির কর্মকর্তারা মনোযোগী ততটা নন যুদ্ধের দিকে বাস্তবে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে। আবার উত্তেজনা সৃষ্টি করতে গিয়ে গিয়ে চীনের হাতে ভারতের প্রায় হাজার বর্গ কিলোমিটার জায়গার দখল হারানোর ক্ষতির বিষয়টিও রয়েছে।

সব মিলিয়ে, এবারো ভারত-চীন সীমান্ত উত্তেজনা বড় রকমের যুদ্ধ পর্যন্ত না গড়ানোর সম্ভাবনাই রয়েছে। তবে এর মধ্যে চীন-ভারত অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকখানি ভেঙে পড়বে। পাশ্চাত্যের করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এই জায়গাটি দখল করবে।

উপমহাদেশে মধ্যপ্রাচ্য কানেকশন

ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তেজনার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়া বা দক্ষিণ এশিয়ায় এখন যা কিছু হচ্ছে তার সবটার সাথেই মধ্যপ্রাচ্যের যোগসূত্র রয়েছে। ভারতের এখন সবচেয়ে বড় কৌশলগত মিত্র হলো ইসরাইল। ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাতের চুক্তির পর আমিরাত আর ইসরাইল একই নিরাপত্তা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। সৌদি আরব ও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো দৃশ্যত এই চুক্তিকে নানা কারণে অনুমোদন না করলেও গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের আওতায় বিশেষ সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। কাতার কুয়েত ছাড়া উপসাগরীয় দেশগুলো এবং মিসর নিজেদের কার্যত প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে গ্রহণ করেছে ইরান ও তুরস্ককে। আর এই প্রতিপক্ষের বিপরীতে ক্ষমতার ব্যাপারে ইসরাইলের নিরাপত্তা আশ্রয় পেতে চাইছে দেশগুলো। অথচ এই উপসাগরীয় দেশগুলো পাকিস্তানের অনেক দশক ধরে কৌশলগত মিত্র ছিল। সর্ব সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থার পরিবর্তন আসতে শুরু করে ইসরাইলের সাথে এসব দেশের বিশেষ সমীকরণ আর তেলআবিব-দিল্লি কৌশলগত সম্পর্কের কারণে।

যুক্তরাষ্ট্র এখন আর সৌদি তেলের প্রধান ভোক্তা দেশ নেই। এখন চীন ও ভারতই হলো সৌদি জ্বালানি আমদানিকারক প্রধান দেশ। সৌদি আরব আমেরিকান তেলের বাজার খুঁজে পেতে চাইছে ভারতে। দেশটির ভারতে শত বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা আর ২৭ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি রফতানির বিষয়টি সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের প্রায় সাত দশকের সম্পর্ককে উলটপালট করে দিয়েছে। পাকিস্তান ঐতিহ্যগতভাবে কাশ্মির ইস্যুতে ওআইসির সমর্থন পেয়ে এসেছে। এখন সেই সংস্থা তার পাশে না দাঁড়ানোর জন্য পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তার মূল কারণ সৌদি আরবের ভারতের সাথে সম্পর্কের নতুন বন্ধন। আমিরাত ভারতের সাথে কৌশলগত এই বন্ধন অনেক আগেই চূড়ান্ত করেছে। ভারত কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসনসংবলিত ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পর দিল্লিতে সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আমিরাতের রাষ্ট্রদূত। এর অব্যবহিত পরে নরেন্দ্র মোদিকে বিশেষ সংবর্ধনাও প্রদান করেছে আমিরাত। আমিরাতের সাথে পাকিস্তানের এক সময় যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল ইসরাইলের সাথে একান্ত সম্পর্ক গড়ার পর সেই সম্পর্ক এখন আর নেই। উপমহাদেশে আমিরাতের প্রধান মিত্র এখন ভারত।

অন্য দিকে সৌদি আরবের সামনে মুসলিম উম্মাহর অ্যাজেন্ডার চেয়েও টিপিক্যাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক গুরুত্ব পাওয়ার পর ইসলামাবাদ-রিয়াদ সম্পর্কও ঢিলেঢালা হয়ে গেছে। এতে ইসরাইলের ডাবল সুবিধা, একদিকে পাকিস্তানের নিরাপত্তা সহায়তা না থাকলে সৌদি আরব বেশি ইসরাইলনির্ভর হবে। অন্য দিকে সৌদি অর্থনৈতিক সহায়তা না থাকলে পাকিস্তান দুর্বল হবে এবং এর সুবিধা পাবে ভারত। কাশ্মির ইস্যুকে কেন্দ্র করে যে টানাপড়েন সম্প্রতি দেখা গেছে সেটি এ কারণেই হয়েছে। তবে পাকিস্তান-সৌদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছাড়াও যে নিরাপত্তা বন্ধন রয়েছে তা এতটা কঠিন যে, দুই দেশের কেউই রাতারাতি এই সম্পর্ক ছিন্ন করার অবস্থায় নেই। সৌদি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সাথে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বিশেষভাবে সম্পৃক্ত। আর সৌদি আরবের সাথে দৃশ্যমান অর্থনৈতিক সহায়তার বাইরে অপ্রকাশ্য অনেক নিরাপত্তাচুক্তি পাকিস্তানের রয়েছে যেখান থেকে চাইলে সাথে সাথে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

কাশ্মির ইস্যুটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও অখণ্ডতার জন্য একটি মরণপণ ইস্যু। আর এই ইস্যুতে দিল্লিকে সহায়তার সাথে সৌদি ও আমিরাতের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকখানি যুক্ত। আর সে সাথে ইসরাইলের প্রভাবতো রয়েছেই।

ভারতের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক যেভাবে তলানিতে নেমেছে এবং বেলুচিস্তান, খাইবার পাখতুনখোয়া ও কাশ্মিরে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য ভারতের গোপন তৎপরতার খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে চীনের সাথে অভিন্ন প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক বন্ধনের বিকল্প ইসলামাবাদের সামনে খুব বেশি নেই। অথচ রিয়াদ ও আবুধাবি অব্যাহতভাবে চাপ দিয়ে যাচ্ছে চীনের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি করে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য।

বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষত এশিয়ার দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশের অবস্থা বেশ জটিল রূপ নিয়েছে। প্রতিটি দিনই যেন এ সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের অক্ষ বিশ্বে একটি বড় রকমের পরিবর্তন প্রয়াসকে সামনে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। এর বিপরীতে চীন-রাশিয়া অক্ষেরও নিজস্ব হিসাব-নিকাশ রয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোর সবার স্বার্থ একই ধারায় বহমান নয়। ফিলিস্তিন ইস্যুটি এক সময় মুসলিম দেশগুলোর অভিন্ন বন্ধন ও ঐক্য সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখত। সেই বন্ধন মিসর জর্দানও আমিরাত ইসরাইলি বলয়ে প্রবেশের মাধ্যমে বেশ খানিকটা ছিন্ন করেছে। সন্ত্রাসের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার প্রলোভনে সুদানকে সেখানে ঢোকানোর প্রচেষ্টা চলছে। তবে সব দৃশ্যমান পরিকল্পনার ওপরে অদৃশ্য এক পরিকল্পনাও কাজ করে।

ফলে দুনিয়ার দৃশ্যমান অনেক হিসাব শেষ পর্যন্ত ঠিক থাকে না। করোনার দুনিয়ায় এই বিষয়টি মানুষ অনেক নিবিড়ভাবে অনুভব করতে শুরু করেছে। সূত্র: নয়াদিগন্ত

You Might Also Like