হোম » ‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থি প্রবণতা বহু গুণ বেড়ে যাবে’

‘ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থি প্রবণতা বহু গুণ বেড়ে যাবে’

admin- মঙ্গলবার, জুলাই ৭, ২০১৫

শুভ কিবরিয়া ও সায়েম সাবু :

বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অভিমুখ কী? কোন পথে যাবে বাংলাদেশের রাজনীতি?

বর্তমানের নির্বাচিত গণতান্ত্রিক রাজনীতির একমুখীনতা শেষাবধি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে? মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুর ধাচের রাষ্ট্রপথে যাবার যে আকাক্সক্ষা এখন ঘন ঘন উচ্চারিত হচ্ছে, তার বাস্তবতাই বা কী?

বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির আঙ্গিকে ভবিষ্যৎকে বিশ্লেষণ করেছেন আমেরিকাপ্রবাসী সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে আসা রাজনীতি চিন্তক, বিশ্লেষক, সাংবাদিক এবং আমেরিকার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শুভ কিবরিয়া ও সায়েম সাবু

সাপ্তাহিক : রাজনীতির নানা কথন চলছে। দশ বছর পর বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ কী?

অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ : বাংলাদেশে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক ধরনের পুনর্বিন্যাস হচ্ছে এবং দশ বছর পর তা বাস্তব রূপ নেবে।

আমরা দীর্ঘদিন থেকে রাজনীতির ক্রান্তিকালের কথা বলে আসছি। এই ক্রান্তিকাল শেষ হচ্ছে না। স্বাধীনতার পর বলা হলো, আমরা ক্রান্তিকালে আছি। এরশাদের আমলেও একই কথা বলা হলো। আমরা তো ক্রান্তিকাল থেকে বের হতে পারছি না। ক্রান্তিকাল থেকে বের হওয়ার যে প্রবণতা রয়েছে, তা দেখতে পারছি না, বুঝতে পারছি না, নাকি বুঝতে চেষ্টা করছি না, তাই হচ্ছে মূল সমস্যা।

আমার ধারণা, এখন থেকে দশ বছর পরে বাংলাদেশের প্রধান বিষয় হবে রাজনীতি। অর্থনীতি প্রধান বিষয় থাকবে না, অন্তত আমি তা-ই মনে করি। একেবারে নির্ভেজালভাবে রাজনীতিই হবে মুখ্য বিষয়।

সাপ্তাহিক : এমনটি কেন মনে করছেন?

আলী রীয়াজ : অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির এই হার বজায় থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক দিক নির্দেশনার ওপর। অর্থনীতির চলমান ধারা হয়ত আমরা বজায় রাখতেই পারি। কিন্তু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বৈষম্যের প্রশ্ন আছে এবং সেই বৈষম্য মোকাবেলা করা যাবে কি না, তা রাজনীতি নির্ধারণ করবে।

দশ বছর পর বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক শক্তি নেতৃত্ব দেবে এবং রাজনীতির বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে মূল বিষয় কী হবে, তা নিয়ে ভাবনা আছে। এমন ভাবনায় রাজনীতির সত্যিকার ক্রান্তিকাল হচ্ছে বর্তমান সময়।

আপনি এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন, কিন্তু সেটা সবাইকে নিয়ে নয়। কিছু মানুষ এই অর্থনীতির সুবিধা ভোগ করতে পারে। আবার সবাইকে নিয়েও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেন, যা রাজনীতিই ঠিক করে দেয়।

নব্বইয়ের দশক থেকে লক্ষ করছি, বাংলাদেশের অর্থনীতির যে ধারা, তা ক্রমাগতভাবে স্বল্পসংখ্যক মানুষের স্বার্থ-সুবিধার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। নব্বইয়ের পর প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা পরিবর্তন হলেও তাতে ক্ষমতাবানদের ভূমিকা আছে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। কারণ, এতে রাষ্ট্রের চেয়ে সাধারণ মানুষের ভূমিকা অনেক বেশি।

দশ বছর পর যদি সাধারণ মানুষ উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ না দেখতে পায়, তাহলে প্রবৃদ্ধি কীভাবে অর্জিত হবে? যে সমস্ত খুঁটির ওপর ভর করে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, তা পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারবে? যেমন, তৈরি পোশাক খাত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু এই খাতটি এখন ভিয়েতনামসহ অন্যত্র চলে যাওয়ার পথ খুঁজছে। অর্থনীতিতে এমন কোনো ধারা তৈরি হয়নি, যা পোশাক খাতের বিকল্প হিসেবে কাজে দেবে।

এই সমস্যা যতটা না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। আপনি রাজনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে অর্থনীতির এই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবেন না। দশ বছর পরে আমার এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে খুশি হব। কিন্তু ভুল হবে বলে মনে হয় না। একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বজায় না থাকলে অর্থনীতি টিকে থাকে না।

সাপ্তাহিক : অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি বলতে কি যে ধারায় গণতন্ত্র ছিল সেটাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন?

আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, আমি তা-ই বোঝাতে চেয়েছি। আমি তো চাইছি, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও এক ধরনের গণতন্ত্র বজায় রাখতে হবে। যেখানে কথা বলার অধিকার থাকবে, মানুষ মতামত দিতে পারবে, ভিন্নমত থাকবে। এক ধরনের পদ্ধতি বের করতে হবে যেখানে সাধারণ মানুষের সুযোগ রয়েছে।

প্রচার রয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ এক দিনের রাজা। গণতন্ত্র এক দিনের জন্য। ভোটের দিন মানুষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকে। এখন সেটুকুও যদি না রাখেন, তাহলে মানুষের গণতান্ত্রিক মত প্রকাশের তো আর কিছুই থাকল না।

বাংলাদেশে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতেও মানুষ অংশ নিতে পারছে না। রাজনীতিতে মানুষের অংশগ্রহণের অন্য কোনো বিকল্প ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়নি।

সুতরাং মানুষের ভোট দেয়ার অধিকারটুকু কেড়ে নিলে দাঁড়াবার তো আর জায়গা রইলো না।

সাপ্তাহিক : যে গণতন্ত্রের কথা বলছেন, তাতে মানুষ ভরসা রাখতে পারে? আদৌ কি সেই গণতন্ত্র মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পেরেছে?

আলী রীয়াজ : আমি বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত বলছি না। কিন্তু ত্রুটিমুক্ত নয় বলে আপনি গণতন্ত্রের দ্বার চিরতরে বন্ধ করে দিতে পারেন না। ত্রুটিমুক্ত করতে হবে, শুধরাতে হবে। পরিপূর্ণ গণতন্ত্র কখনও হবে না। কিন্তু দুর্বল গণতন্ত্র ভালো করার জন্য প্রয়োজন গণতন্ত্রের আরও চর্চা করা।

সাপ্তাহিক : গণতন্ত্রের অভাব উন্নয়ন দিয়ে মোকাবেলা করা যায় কি না? মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর তো এভাবেই উন্নয়ন করেছে। সরকারের কেউ কেউ এসব উদাহরণ সামনেও আনছে। আপনার কাছে এর ব্যাখা কী?

আলী রীয়াজ : এই বিতর্ক একেবারেই ভুয়া। মিথ্যাও বলতে পারেন। দুটি কারণে আমি এই বিতর্ককে ভুয়া বলছি। গণতন্ত্র তার নিজের প্রয়োজনেই টিকে থাকার কথা। গণতন্ত্র দৃশ্যত আপনাকে কী দিল, তা বড় কথা নয়। গণতন্ত্র আপনার মৌলিক অধিকার কোনো না কোনোভাবে রক্ষা করবেই। আপনি কোন যুক্তিতে গণতন্ত্রকে বাদ দিবেন?

দ্বিতীয়ত, যে দুটি দেশের উদাহরণ দিলেন সে দুটি দেশে যে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে উন্নয়ন করেছে আজ কি সেই বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে? আপনি সফলতার কথা বলছেন, ব্যর্থতার কথা বলবেন না। নাইজেরিয়ার দিকে তাকান। গণতন্ত্রকে চাপা দিয়ে নাইজেরিয়া উন্নয়নের কথা বলেছিল। মুখ থুবড়ে পড়েছে। আপনি এক পক্ষ মানবেন আরেক পক্ষ মানবেন না, তা তো হতে পারে না।

গণতন্ত্রের কোনো বিকল্প হতে পারে না, যেমন উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। কেউ যদি বলে আমি উন্নয়ন চাই না, গণতন্ত্র চাই, আমি তাতেও একমত নই। দুটোই দরকার এবং তা পরস্পর সহায়ক। উন্নয়নের সুফল সকলের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার রাস্তাই হচ্ছে গণতন্ত্র।

মালয়েশিয়ায় আইনের শাসন ছিল, যা গণতন্ত্রের প্রধান উপাদান। বাংলাদেশে আইনের শাসন কোথায়? এখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা হোক তাহলে জোর করে বলতে হবে না, যে আমি এভাবেই উন্নয়ন করব।

প্রথমত, মালয়েশিয়ায় এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দুর্নীতি কার্যত প্রতিরোধ করা গেছে। দ্বিতীয়ত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখা হয়েছিল। পুলিশ, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করেছে। তৃতীয়ত, যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় ছিল, তা ছিল খুবই শক্তিশালী। প্রতিদিন তারা টেন্ডারবাজির জন্য মারপিট করেনি। চতুর্থ বিষয় হচ্ছে, মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে পরিবারতন্ত্র ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পরিবারতন্ত্র বিরাজ করছে। পঞ্চম বিষয় হচ্ছে, মালয়েশিয়ায় রাজনীতির ক্ষমতায়নে সহযোগিতা ছিল। মাহাথির মোহাম্মদ বিরোধী নেতা আনোয়ার ইব্রাহিমকে সঙ্গে নিয়ে উন্নয়ন করেছেন। যদিও পরে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আপনি এমন সহযোগিতা প্রত্যাশা করতে পারেন?

এই পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, উন্নয়ন, ক্ষমতা মূল্যায়ন করেন, দেখবেন সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। সব শর্ত বাদ দিয়ে শুধু বলবেন, বাংলাদেশ মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর হয়ে যাবে আর মানুষ তা বিশ্বাস করবে, সেই দিন আর নেই। এটি হচ্ছে বাস্তব দিক।

আদর্শিক দিক থেকে আমি এই শাসন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি। অমর্ত্য সেন বলেছেন, ক্ষমতায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ থাকলে কখনই দুর্ভিক্ষ হতে পারে না। ১৯৪৩ বা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের জন্য মূলত মানুষই দায়ী।

সাপ্তাহিক : আপনি রাজনীতির পুনর্বিন্যাসের কথা বলছেন। পুনর্বিন্যাসের বিষয়টি যদি খোলাসা করে বলতেন?

আলী রীয়াজ : বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব শক্তি, আদর্শ ছিল। ১৯৯০ সালের পর থেকে রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমাগতভাবে দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছে। ১৯৭২ সালের পর এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো একটি কেন্দ্রীভূত বলয় বা বাম বলয়ের দিকে ঝুঁকে ছিল। এ সময়ে ডানপন্থিরাও অতি ডানে ঝুঁকে যায়নি। ’৭২ থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো ডানপন্থি দলই ছিল না।

১৯৯০ সালের পর সব রাজনৈতিক দল ক্রমাগতভাবে ডানের দিকে সরে যাচ্ছে এবং এখনও সরছে। সরতে সরতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, সেটাই হচ্ছে ভাবনার বিষয়।

আমি মনে করি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দক্ষিণপন্থি প্রবণতা বহুগুণ বেড়ে যাবে। সকলের অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি থেকে যত দূরে সরে যাবেন, রাজনীতিতে তত বেশি দক্ষিণপন্থি শক্তি সঞ্চিত হবে।

সাপ্তাহিক : ৯/১১-এর পর তো পৃথিবীর রাজনীতির রূপ পরিবর্তিত হলো। ধর্মীয় রাজনীতি নানাভাবেই গুরুত্ব পাচ্ছে। এমনকি ভারতেও এখন ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল জনসমর্থন নিয়েই রাষ্ট্রক্ষমতায়। এই বাস্তবতায় আমাদের-ই বা কী করার আছে?

আলী রীয়াজ : এমন বাস্তবতার মধ্যেই কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বারাক ওবামাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা গেছে। এবার হিলারি ক্লিনটন প্রার্থী হচ্ছেন। আমি তাকে একেবারে বাম বলব, এতটুকু নির্বোধ নই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে ওয়াকুপাই ওয়াল স্ট্রিটের মতো মুভমেন্ট তো দেখতে পেলাম। এই শক্তিটা তো আছে।

ভারতের আজ যে দক্ষিণপন্থিদের উত্থান, তার ক্ষেত্র কংগ্রেস-ই তৈরি করেছে। কংগ্রেস ক্রমাগতভাবে দক্ষিণে সরে গেছে এবং ধর্মীয় রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি করেছে। ভারতের মানুষ মনে করছে, রাজনীতিতে যদি ধর্ম এভাবে গুরুত্ব পায়, তাহলে খাঁটি দক্ষিণপন্থি দলই ভালো। কংগ্রেসের আর দরকার নেই।

সাপ্তাহিক : তার মানে ভারতের আজকের রাজনীতির জন্য কংগ্রেসকেই দায়ী করা যায়?

আলী রীয়াজ : হ্যাঁ, কংগ্রেস তার কথাবার্তায়, আচরণে এমন এজেন্ডা তৈরি করেছিল, যা বিজেপি ভালোভাবে বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা রাখে।

সুশাসন প্রশ্নে শুধু পারফরম্যান্স ডেলিবার করার বিষয় নয়, রাজনৈতিক পদ্ধতি যদি ডেলিবার না দিতে পারেন তাহলে অন্য শক্তি বিশেষ সুবিধা নেবেই। রাজনৈতিক ডেলিবার বলতে আমি সভাসমাবেশ, মিছিল-মিটিং করার সুযোগ করে দেয়া, চাপমুক্ত রাখা, সিভিল সোসাইটিকে কথা বলার জায়গা দেয়ার কথা বলছি।

রাজনৈতিক এমন পরিবেশ যদি না থাকে তাহলে দক্ষিণপন্থি রাজনীতি আরও প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে। এই অর্থেই বাংলাদেশের এখনকার রাজনৈতিক পরিবেশকে আমি ক্রান্তিকাল বলছি। রাজনীতির চলমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দশ বছরের মধ্যে ডানপন্থি রাজনীতি অধিক শক্তিশালী হবে।

সাপ্তাহিক : বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই এই প্রবণতা চলমান। দু’জন রাষ্ট্রপতির হত্যাকা-, এরশাদের পতন তো এমন বাস্তবতার মধ্য থেকেই হয়েছে। এ তো নতুন কিছু না?

আলী রীয়াজ : এই চলমান প্রক্রিয়াকে আপনি ত্বরান্বিত করছেন। ১৯৭২ থেকে ১৯৯০ সালের রাজনীতি এক অর্থে একই রকম ছিল। অর্থাৎ তখনকার সরকারগুলোর মধ্যে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ছিল। একদলীয় সরকার, সামরিক সরকার উভয়ই এই কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা তৈরি করে।

এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল না। সেখান থেকে বেরিয়ে এসে ১৯৯০ সালে ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্রের পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করলাম। ১৯৯৬ এবং ২০০৭ সালে হোঁচট খেয়েছে ঠিক কিন্তু গণতন্ত্রের সেই প্রক্রিয়ার মধ্যে সামান্য হলেও মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। ফলে আপনি যদি ভিন্ন পথে হাঁটার চেষ্টা করেন, তাহলে মানুষ কোনো না কোনোভাবে ঠেকাবে। ক্ষমতার পালাবদলে জনগণের আকাক্সক্ষা প্রকাশ হয়েছে, যা আপনি রাজনীতির নামে বাড়াবাড়ি করতে পারেন না।

আপনি যখনই বাড়াবাড়ি করবেন, আপনার কাছ থেকে আমি ক্ষমতা নিয়ে অন্য কাউকে দিয়ে দেব। যদিও দ্বি-দলীয় কাঠামোর মধ্যেই জনগণ তার বিকল্পটা বাছাইয়ের সুযোগ পেয়েছেন। এই দুই দলের বাইরে গেলে কী হতো, তা বলা মুশকিল। কিন্তু মানুষ মন্দের ভালো হিসেবেও তো বিকল্প খুঁজে বের করার সুযোগ পেয়েছে।

সেই বিকল্প খোঁজার রাস্তাও যদি বন্ধ করে দেন তাহলে কী হতে পারে? সাংবিধানিক রাস্তা বন্ধ করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

সাপ্তাহিক : যুদ্ধাপরাধের বিচারের কাজটি অনেক বড়। এই বিচারকে কেন্দ্র করেও সামাজিক, রাজনৈতিক পোলারাইজেশন (সমবর্তন) হওয়ার কথা। এই বিষয়টি কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?

আলী রীয়াজ : যুদ্ধাপরাধের বিচারকে কেন্দ্র করে কোনো প্রকার পোলারাইজেশন হয়নি।

যুদ্ধাপরাধী ছাড়া যুদ্ধাপরাধের বিচারের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এমন মানুষকে অন্তত আমি চিনি না। যে রাষ্ট্রগুলো এই বিচার নিয়ে আলোচনা করছে, তারাও এর মৌলিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। কারণ, এই বিচারের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারে না। গোটা জাতি যুদ্ধাপরাধের ভুক্তভোগী।

তাহলে প্রশ্ন কোথায়? প্রশ্ন হচ্ছে পদ্ধতিগত। এই যে গণজাগরণ মঞ্চ দাঁড়িয়ে গেল। কেন? তারা বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। নইলে অন্যের ফাঁসি হলে কাদের মোল্লার ফাঁসি হয় না কেন? এই প্রশ্নই তো গণজাগরণ মঞ্চ তুলেছিল।

এই পদ্ধতিগত জায়গা নিয়ে আলোচনা হওয়ার থাকার কথা। নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল নিয়েও আলোচনা করার জায়গা ছিল। অনেকেই ভুল বলছেন যে, এই বিতর্ক যুদ্ধাপরাধ বিচার সম্পর্কিত বিতর্ক। আমি তা মনে করি না। এই বিচার অনেক আগেই করা উচিত ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের আমলেই তো ওই বিচার বন্ধ হয়। কেন বন্ধ হয় তার একাডেমিক আলোচনা আছে। তাই বলে এই বিচারের নৈতিক ভিত্তিকে আমি দুর্বল বলতে পারি না।

যদি আপনি এই বিচারকে সীমিত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন, তাহলে আপনিই এই বিচারের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিলেন। যারা এই বিচারের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করেন, তারা এই বিচারের যতটা না ক্ষতি করেন, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেন যারা এই বিচারকে বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন।

এই বিচারের উদ্দেশ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই বিচারের মধ্য দিয়ে জাতির প্রতি আমাদের প্রতি দায় স্বীকার করা। এই স্বীকারের মধ্য দিয়ে আমি এটুকুও বলার অধিকার রাখি যে, এই বিচার এইভাবে হতে পারত। এটি বলতে গেলেই আপনি যদি বলেন যে, আমি আসলে বিচার চাই না, তাহলে এর ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। অপরদিকে আপনি বিচার চাইছেন, অথচ রাজনীতির স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে কিংবা অন্য যেকোনো স্বার্থে এই বিচার করছেন, তাহলে বুঝতে হবে আপনি এই বিচারের ক্ষতি করছেন।

এই কারণেই বিচারের মধ্য দিয়ে কোনো পোলারাইজেশন করা সম্ভব হয়নি। দেশের অধিকাংশ মানুষ এই বিচার চায়।

সাপ্তাহিক : তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, আলোচনাটা পদ্ধতি নিয়ে হওয়া বাঞ্ছনীয়।

আলী রীয়াজ : অবশ্যই। যেকোনো পদ্ধতিতে ত্রুটি থাকবেই। তাই বলে আলোচনা-সমালোচনা হবে না, তা তো হতে পারে না।

গণতন্ত্র, পার্লামেন্ট, সংবিধান নিয়ে বিতর্ক থাকলে, আলোচনা থাকলে এমন একটি বিচার নিয়ে কেন আলোচনা হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা করছি, রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা আরও চাইছি, তাহলে এই বিচারপদ্ধতি নিয়ে কেন বিতর্ক থাকবে না? আমি মনে করি, যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন।

সাপ্তাহিক : রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সামঞ্জস্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিচার বিভাগ, সিভিল সার্ভিস বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর ক্ষমতার তুলনা করছেন অনেকেই। মনে করা হচ্ছে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়লেও সেনাবাহিনী এখন অধিক শক্তিশালী। এর ভবিষ্যৎ ফলাফল কী হতে পারে?

আলী রীয়াজ : আপনি পাকিস্তানের দিকে তাকালেই পরিষ্কার উত্তর পেয়ে যাবেন। বাংলাদেশের মূল সমস্যা হচ্ছে, এখানকার সমস্ত প্রতিষ্ঠান কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে।

নির্বাচন কমিশন পরপর তিনটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শুধু আস্থার সংকটে পড়েনি, প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচনকেই আস্থাহীন করেছে। নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থা রাখার কোনো সুযোগ নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজস্বতা হারিয়েছে অনেক আগেই। আপনি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকান। দেখবেন, সব ভেঙে পড়েছে। এই ভেঙে পড়ার মধ্যে যদি কোনো একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়, তাহলে ওই প্রতিষ্ঠানটি ভিন্নভাবে আধিপত্য বিস্তার করবে।

এই কারণে যেকোনো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সামঞ্জস্য থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেকার ক্ষমতার ভারসাম্য তদারকি বা নিয়ন্ত্রণ করবে সাধারণ জনগণ। সাধারণ জনগণের একক কোনো ক্ষমতা নেই হয়ত, কিন্তু সম্মিলিতভাবে নাগরিকরা সব প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জনগণ সেই ক্ষমতার চর্চা করার অধিকার রাখে।

আপনি যখন জনগণের ক্ষমতাকে অবমূল্যায়ন করে নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করবেন, তখন ওই প্রতিষ্ঠানটি অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক।

এক সময় বাংলাদেশে সিভিল ব্যুরোক্রেসির মধ্য অনেক ক্ষমতা ছিল। এখন হয়ত সেই ক্ষমতা অন্যদের মধ্যে দেখতে পাবেন। এতে রাষ্ট্রের মঙ্গল হয়নি।

ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করবে রাজনীতি এবং রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করবে জনগণ। ক্ষমতায়নের প্রশ্নে জনগণের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

সাপ্তাহিক : সারা পৃথিবীতেই এই ধারার রাজনীতি চলছে। গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষায় মধ্যপ্রাচ্যে আরব বসন্ত বয়ে গেল। এখন সেখানে চরম অস্থিরতা। বাংলাদেশ কি এই বাস্তবতা থেকে আলাদা থাকতে পারে?

আলী রীয়াজ : বাংলাদেশ তো মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আজকের এই পরিস্থিতি কি মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষাকে সমর্থন করে? মুক্তিযুদ্ধের পর তাহলে আমাদের অর্জন কী? মানবিকতার প্রশ্নে জাতির প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট কী?

সাপ্তাহিক : প্রধানমন্ত্রী তো বলছেন, দেশ জঙ্গিদের হাতে তুলে দিতে পারি না। এমন শক্তির কাছে ক্ষমতা যেতে পারে না, যারা যুদ্ধাপরাধের বিচার বানচাল করবে। এর তো বাস্তবতাও আছে?

আলী রীয়াজ : দেখুন, আলোচনা করতেই হবে। আপনি একটা সামাজিক চুক্তি করবেন। কেউ চায় না দেশ জঙ্গিদের হাতে তুলে দেয়া হোক। কিন্তু এর জন্যেও তো আলোচনা করতে হবে।

যুদ্ধাপরাধ প্রশ্নে দেশের অধিকাংশ মানুষের মতো আমার অবস্থানও পরিষ্কার। তাহলে এসব বিষয়ে আলোচনার দাবি আমি তুলতেই পারি এবং আলোচনা হওয়া যৌক্তিক। আলোচনা আপনি প্রকাশ্যে করেন যে, বাংলাদেশে ক্ষমতায় যে-ই আসুক এই এই কাজ করতে হবে, যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে হবে। রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব বাংলাদেশের মানুষের। মানুষ তা-ই রাখবে। আমি বাংলাদেশের মানুষের ওপর অত্যন্ত আস্থাশীল। আপনি সুযোগ দিয়ে দেখুন। কেন মানুষ জঙ্গিদের হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে? ঐকমত্য তৈরি না করে আপনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে পারবেন না।

আপনি বলতে পারেন যে, এর আগে তিন দলীয় চুক্তি করে মানা হয়নি। কিন্তু মনে রাখতে হবে এটি ২০১৫ সাল। প্রকাশ্যে মৌলিক বিষয়ে চুক্তি করে সেখান থেকে বেরিয়ে গেলে তার পরিণতি ভালো হবে না।

বাংলাদেশের মানুষ অনেক এগিয়েছে। রাজনৈতিক ধারণাতেও তারা বেশ অগ্রগামী। মানুষ সমঝোতা, আলোচনা চাইছে। ঐকমত্যের ভিত্তিতে আপনাকে তা করতে হবে। ঐকমত্যের একটি বিষয় হচ্ছে যুদ্ধাপরাধের বিচার। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। এগুলোই হচ্ছে আলোচনার বিষয়। কবে নির্বাচন হবে, তা আলোচনার বিষয় নয়।

এই আলোচনার উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে। সরকার হয়ত মনে করতে পারে বিএনপি-জামায়াত জোট এখন অনেক দুর্বল। আন্দোলন করে তারা একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছে। তাদের সঙ্গে কী আলোচনা হতে পারে? কিন্তু মনে রাখতে হবে, দেশ থাকবেই। আজকের এই পরিস্থিতি কেউ চায় না। দেশ, দেশের মানুষকে নিরাপদ রাখতে গেলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতেই হবে। কারণ অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।

সাপ্তাহিক : সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে সরকার ভিন্নমাত্রা দিতে চাইছে, যদিও এখন নানা আলোচনা উঠছে ওই সফর নিয়ে। আমেরিকা, চীনের কাছেও বাংলাদেশ নানা কারণে গুরুত্ব পাচ্ছে। ত্রিমুখীয় এই শক্তির কাছে বাংলাদেশের আসলে অবস্থান কোথায়?

আলী রীয়াজ : বাংলাদেশের স্বার্থ বাংলাদেশকেই দেখতে হবে। বাংলাদেশের স্বার্থ আমেরিকা যেমন রক্ষা করবে না, তেমনি ভারতও না। নিজেদের স্বার্থকে নিজেদেরই ঠিক করতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে বাংলাদেশ স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ কোনো প্রকার স্বাধীন ভূমিকা পালন করতে পারেনি। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখানে ফ্যাক্টর কি ফ্যাক্টর না, তার চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশ নিজে নিজের জন্য ফ্যাক্টর কি না? এশিয়ার এই অঞ্চলে সবাই তো নিজের স্বার্থ রক্ষা করে চলছে। বাংলাদেশ কি নিজের স্বার্থ বজায় রেখে কথা বলছে?

সাপ্তাহিক : সমুদ্র বিজয়, ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটি চুক্তি হলো। স্বার্থ তো রক্ষা হচ্ছেই?

আলী রীয়াজ : আপনি কী পেলেন এই চুক্তিতে? ভারত তো এখানে বিনিয়োগের সুযোগ পেল, চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেল, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে আরেকটি অংশে যাওয়ার সুযোগ পেল। কিন্তু বাংলাদেশ কী পেল?

সাপ্তাহিক : আমরা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আস্থা পেলাম, যার ভিত্তিতে ভবিষ্যতে ভালো কিছু পাব?

আলী রীয়াজ : আমরা পাব, আর ভারত পেয়ে গেল। কম পেলেও চুক্তি হতে পারে। কিন্তু ভবিষ্যতে পাব এই আশায় চুক্তি হতে পারে না। ভারত এমন আশায় চুক্তি করেনি।

সাপ্তাহিক : বলতে চাইছেন, মোদির সফরে বাংলাদেশ অনেক কম পেল?

আলী রীয়াজ : অবশ্যই কম পেয়েছে। বাংলাদেশের অনেক কিছু পাবার ছিল এবং আছে। তিস্তার কথা বলা হচ্ছে। এটা একটি বিষয় হতে পারে মাত্র। কিন্তু আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে না। মনে রাখতে হবে, ভারতকে আমাদের যেমন প্রয়োজন, তেমনি বাংলাদেশকেও ভারতের প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে যে টানাপড়েন, সেখানে বাংলাদেশকে ভারতের জন্য প্রয়োজন আছে। চীনের প্রভাব বলয় থেকে বাংলাদেশকে বাইরে রাখা তো ভারতের প্রয়োজনে। এই প্রশ্নে বাংলাদেশ অনেক পেয়েই ভারতের প্রয়োজন মেটানোর কথা। এই অঞ্চলে বৃহৎ রাজনৈতিক মেরুকরণে বাংলাদেশের যে অবস্থান দাঁড়িয়ে, তাতে বাংলাদেশ যেকোনো বিষয় নিয়েই দরকষাকষি করতে পারে। দরকষাকষির সেই আলোচনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। এমনকি সিভিল সোসাইটিও এই বিষয় নিয়ে কোনো আলোচনা করছে না। তিস্তার মধ্যেই সবাই আটকা। ৪২ বছর আগের ছিটমহল চুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে এত বড় করে বলার কী আছে, তা বুঝতে পারছি না। মূলত ৪২ বছর আগের একটি পাওনা ভারত পরিশোধ করেছে, যা আমরা ৪২ বছর আগেই বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ছিটমহল চুক্তির বিল পাস হওয়ার পর বাংলাদেশের সরকার, বুদ্ধিজীবী, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজের ভাবখানা এমন যে, চুক্তিটি মনে হয় মোদি আসার পরে হলো।

এক সময় এই মোদির বিজেপিই তো ছিটমহল চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু সাংবাদিক, সুশীল সমাজের কেউ তো জিজ্ঞেস করলেন না যে, ৪২ বছর ধরে কেন আমাদের পাওনা দেয়া হয়নি। ঘরে ডেকে মোদিকে এমন প্রশ্ন করা অসৌজন্য হতে পারে। কিন্তু এই চুক্তি নিয়ে এত উৎফুল্ল হওয়ার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি দিক হচ্ছে দ্বিপাক্ষিক, আরেকটি দিক হচ্ছে বহুপাক্ষিক। কেন দ্বিপাক্ষিক বিষয়টিকে এত বড় করে সামনে আনা হচ্ছে?

সাপ্তাহিক : আপনি ইসলামি মিলিটেন্সি নিয়ে গবেষণা করছেন। বাংলাদেশে প্রতিদিন জেএমবি, আনসারুল্লা বাংলা টিম বা আইএস সদস্যরা আটক হচ্ছে। এর ভবিষ্যৎ কী?

আলী রীয়াজ : বাংলাদেশে জঙ্গিপন্থা টিকবে না। সেটা ডানপন্থি মিলিটেন্সি বলুন আর বামপন্থি মিলিটেন্সি বলুন। কিন্তু একে মূলধারার রাজনীতি থেকে বাইরে রেখে বিবেচনা করতে পারবেন না।

আপনি যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাহলে এই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে যে, আপনি কোনো প্রকার সহিংসতা করবেন না, জঙ্গিবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারবেন না।

সাপ্তাহিক : এর জন্য তো রাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে?

আলী রীয়াজ : অবশ্যই। এই ধরনের বিষয়গুলো যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন জাতীয় নিরাপত্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে দল সাময়িক লাভবান হতে পারে বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় নিরাপত্তা বিঘিœত হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, এই শক্তিকে কীভাবে মোকাবেলা করা যাবে? সমাজে তো এই শক্তির প্রভাব আছে। আটক হচ্ছে, মামলা হচ্ছে, গণমাধ্যমে দেখানো হচ্ছে। আবার তারা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। বিনা কারণে বিরোধী রাজনীতিকদের মাসের পর মাস আটক রাখা হচ্ছে, আর জঙ্গিরা মুহূর্তেই ছাড় পেয়ে যাচ্ছে। তার মানে কোথাও না কোথাও ত্রুটি আছে। শুধু সামরিক বিষয় দিয়ে এটিকে মোকাবেলা করা যাবে না। আরও কিছু বিষয় আছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতা থাকলে জঙ্গিবাদে মানুষ আকৃষ্ট হতে পারে। জঙ্গি তো একটি আদর্শও বটে। এই আদর্শে কারা বিশ্বাসী হচ্ছে এটি আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে। সমাজে আরও স্বচ্ছতা তৈরি করতে হবে।

কারা এই জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হচ্ছে তার কোনো প্রোফাইল নেই রাষ্ট্রের কাছে। ঢালাওভাবে বলা হয়, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট হয়, যারা দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করেন। কিন্তু আটকের পর দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশরাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবশ্যই দরিদ্র পরিবারের সন্তানের পক্ষে সম্ভব নয়। তাহলে বুঝতে হবে, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ কাজে দিচ্ছে না। বুয়েটের শিক্ষার্থীরাও জড়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফলে আপনি আটক-গ্রেপ্তার করে সামরিক ব্যবস্থা জারি রাখলেই সমাধান নয়। নতুন করে ভাবতে হবে। সামরিক ব্যবস্থাই একমাত্র পথ নয়, তা ৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র প্রমাণ দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র একজন হত্যা করছে, দশ জন জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। কারা জঙ্গিবাদে যাচ্ছে, কারা তাদের রক্ষা করছে, কারা অর্থ দিচ্ছে, কারা অস্ত্র দিচ্ছে এগুলো নিয়ে না ভাবলে সমাধান মিলবে না।

সাপ্তাহিক : আপনি রাজনীতির ক্রান্তিকালের কথা বলছিলেন। এ থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী হতে পারে। কী করলে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রশ্নে টেকসই উন্নয়ন হতে পারে?

আলী রীয়াজ : রাজনীতি, অর্থনীতিতে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলেই টেকসই উন্নয়ন হবে। কাউকে বাদ দিয়ে আপনি টেকসই উন্নয়ন করতে পারবেন না। মতের বিভাজন গুরুত্বপূর্ণ নয়, এখন গুরুত্বপূর্ণ কী কী বিষয়ে আলোচনা করে ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভব। নইলে এগুনো সম্ভব নয়।

সাপ্তাহিক : অনেকেই মনে করছেন, রাজনীতির চলমান প্রক্রিয়ার মধ্যে বিএনপি বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিএনপির রাজনীতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আলী রীয়াজ : বিভিন্ন কারণে বিএনপি আজকের অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। নিজেদের চাপ এবং বাইরের চাপ মোকাবেলা করতে হচ্ছে বিএনপিকে দীর্ঘ সময় ধরে। ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার পর থেকেই অব্যাহত চাপে পড়েছে দলটি। বিএনপি এমন কোনো দল নয় যে, ক্ষমতার বাইরে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার মতো যথেষ্ট শক্তি আছে। ’৯০-এর আগে সব রাজনৈতিক দলই চাপের মধ্যে ছিল। এখন চাপটা বিএনপিকে এককভাবে নিতে হচ্ছে। জনসমর্থন থাকলেও এককভাবে রাষ্ট্রীয় চাপ মোকাবেলা করার মতো সাংগঠনিক শক্তি বিএনপির নেই।

এর কারণ নেতৃত্বের প্রশ্ন। কে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছে, তা দৃশ্যমান নয়। খালেদা জিয়া নিজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, নাকি তারেক রহমান দিচ্ছেন, তা নেতাকর্মীরা জানেন না। সাংগঠনিক এই দুর্বলতা বিএনপিকে ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপি বিলীন হলে তার জায়গা পূরণ করবে কে? আমি না চাইলেও আওয়ামী লীগের আদর্শবিরোধী একটি শক্তি রাজনীতিতে থাকবে। থাকতে হবে। বিএনপির সেই জায়গায় কে আসবে সেটাই মূল কথা?

বিএনপি যদি তার অভ্যন্তরীণ সংকট মেটাতে না পারে তাহলে রাজনীতির-ই ক্ষতি। সুতরাং যারা বিএনপির বিলীন হওয়ায় উচ্ছ্বসিত, তাদের মতো আমি নই। যদিও আমি বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক দলেই বিশ্বাস করি না।

বিএনপি বিলীন হলে বাংলাদেশের রাজনীতির কী ক্ষতে হতে পারে, তা বিএনপিকে বুঝতে হবে। বুঝতে হবে যারা বিএনপির বিলীন চাইছেন, তাদেরও। ক্ষমতাসীনরা যদি মনে করেন যে, বিএনপির শক্তিহীনতা তাদের সুখ দিচ্ছে, তাহলে সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে যেমন ইতিবাচক নয়, তেমনি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্যও মঙ্গলজনক নয়।

খেয়াল করে দেখুন, সাংগঠনিক দৈন্য শুধু বিএনপিরই নয়, আওয়ামী লীগেরও রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে আওয়ামী লীগেও সাংগঠনিক দুর্বলতা লক্ষ করা যাচ্ছে। সরকার আর আওয়ামী লীগ একাকার।

সাপ্তাহিক : কিন্তু আওয়ামী লীগ তো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে এবং তা একক নেতৃত্বেই?

আলী রীয়াজ : এ কারণেই আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত টিকে আছে। শীর্ষ পর্যায়ে দ্বন্দ্ব নেই বটে কিন্তু মাঠ পর্যায়ে কলহ তো তীব্র। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন চারটি-পাঁচটি খবর চোখে পড়ে, যা ছাত্রলীগ-যুবলীগের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিয়ে লেখা।

আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আস্থা বা সমর্থন বাড়ছে ঠিক, কিন্তু এতে করে দলের মধ্যকার গণতন্ত্র অনেক দূরে সরে গেছে। ফলে একক নেতৃত্বে আস্থা বাড়ার ইতিবাচক দিকও আছে, নেতিবাচক দিকও আছে। ২০০৭ সালের আওয়ামী লীগ থেকে এখনকার আওয়ামী লীগ অনেক দুর্বল বলে মনে করি। ক্ষমতায় থাকলেও আওয়ামী লীগ তার সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে ব্যর্থ হয়েছে।

সাপ্তাহিক : সরকার মধ্যম আয়ের দেশের কথা বলছে বেশ জোর দিয়ে। এর সম্ভবনা কতটুকু?

আলী রীয়াজ : মধ্যম আয়ের দেশ হলে বাংলাদেশের কী পরিবর্তন হবে বলুন তো? ঢাকার যানজট কমবে? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে? ব্যবসায়ীরা চিন্তামুক্ত হয়ে বিনিয়োগ করতে পারবে? মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দেখতে পাব? আমার প্রশ্ন এখানেই। মধ্যম আয়ের দেশ হবে বলে উল্লাস প্রকাশ করছি, কিন্তু এগুলো নিয়ে কি ভাবছি? মধ্যম আয়ের দেশ হবে এমন আলোচনা যতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত উল্লেখিত প্রশ্ন নিয়ে।

চলমান প্রবৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হবে কি না, হলে কবে নাগাদ হবে, তার অনেক ব্যাখ্যা আছে। ধরলাম, দশ বছর পর বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হলে, কিন্তু এমন সময়ে রাষ্ট্রের আর কী কী করণীয়, দশ বছর পর অর্থনীতি টিকে থাকবে কি না, তার উপাদানগুলো কই? মানুষ কষ্ট করে যে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, তাতে মধ্যম আয়ের দেশ হতেই পারে। কিন্তু এক জায়গায় গিয়েই তো বাংলাদেশ থেমে থাকবে না। রাষ্ট্রটিকে আরও এগুতে হবে। তার জন্য রাজনীতি প্রস্তুত কিনা? ফলে মধ্যম আয়ের দেশ করা না করা নিয়ে অন্যদের চেয়ে আমি অন্তত কম উত্তেজিত আছি।

সাপ্তাহিক