হোম » বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে অসুবিধা নিয়েই চলতে হয়

বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে অসুবিধা নিয়েই চলতে হয়

admin- Tuesday, June 16th, 2015

প্রতিবেশী দেশের মাটিতে ‘হামলা সমর্থন করি না’। বিদ্যুতের উৎপাদন ‘সিংহভাগ সরকারের হাতে’ থাকা উচিত। আমেরিকা এখন আর বাংলাদেশের জন্য ফ্যাক্টর নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০১৯ সালের আগে নতুন কিছু হবে না।– বৃহস্পতিবার দ্য রিপোর্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ সব কথা বলেন বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর শেষে সব পর্যায়ে চলছে পাওয়া-না পাওয়ার হিসাব। অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ তার ন্যায্য অধিকারই ঠিক মতো আদায় করতে পারেনি। বিপরীতে ভারত অনেক ‘লাভজনক আব্দার’ ঘরে তুলেছে।

কিন্তু এই সব সমালোচনা মানতে রাজি নন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন। সচিবালয়ে নিজের দফতরে দ্য রিপোর্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘ইন্ডিয়া হচ্ছে অনেক বড় নেইবার (প্রতিবেশী)। খুব স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে ডিজএডভানটাইজ পজিশনে থাকবে, থাকে। এটা খুব স্বাভাবিক, অস্বীকার করার কিছু নেই। কিন্তু আমাদের নিজেদেরই অসুবিধার জায়গাগুলোতে সুবিধা তৈরী করে নিতে হবে। বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে ডিজএডভানটাইজ (অসুবিধা) পজিশনেই থাকতে হয়।’

‘ভারত যা চেয়েছে তার সবই পেয়েছে। অথচ বাংলাদেশ তার অধিকার অর্জন নিয়েই ধুঁকছে। এটা কি বন্ধুত্বের সমতা হল?’— এমন প্রশ্নের জবাবে শক্তিশালী দেশের পাশে থাকা অপেক্ষাকৃত দুর্বল শক্তির প্রতিবেশীদের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কানাডা, মেক্সিকোর মতো দেশও আমেরিকার সঙ্গে ডিজএডভানটাইজ পজিশনে আছে। এ ধরনের বড় দেশের পাশে থাকলে পরে এমনটা হয়েই থাকে। বিকজ ইউ ক্যান্ট চেইঞ্জ ইউর নেইবার। বড় প্রতিবেশীদের সঙ্গে এভাবেই থাকতে হবে, এভাবেই থাকতে হয়।’

‘স্থল সীমান্ত চুক্তি, তিস্তার পানি এগুলো তো বাংলাদেশের অধিকার। ট্রানজিট ভারতের অধিকার নয়। কিন্তু মোদির সফরে তারা সেটা পেয়েছে। এগুলো কি বাংলাদেশের দুর্বলতা নয়?’— এ প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, ‘ট্রানজিট নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। এখন আর কেউ তেমন কথা বলেন না। ট্রানজিট তো কার্যত অন। এই বিষয়ে কথা বলে আর লাভ নেই। আমরাও নেপাল ভুটানে ব্যবসা করতে পারব। এটাও তো কম অর্জন নয়।’

এ সময় তিনি মোদির প্রশংসা করে বলেন, ‘মোদি খুব চালাক লোক, যেখানে যেখানে যার সংবেদনশীল জায়গা সেই জায়গাগুলোতে তিনি অত্যন্ত কৌশলে টাচ করেছেন। এ জন্যই ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মন্তব্য করেছেন, মোদি ইজ এ গ্রেট সেলসম্যান। যেটা আমি করতে পারিনি, মোদি সেটা পেরেছে।’

মোদি-বিজেপি ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি করে। বাংলাদেশের মতো একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের সঙ্গে এই সম্পর্কের রসায়ন কতদূর এগুবে?— এমন প্রশ্নের জবাবে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘এটা খুবই কঠিন একটি বিষয়। মোদি ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি করেন এটা সত্য, কিন্তু ভারতে অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র যা-ই বলেন না কেন, সরকার পরিবর্তনের পর আমাদের দেশের মতো সবকিছু পরিবর্তন হয়ে যায় না।’

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের একপাক্ষিক সম্পর্কের সমালোচনা আছে। এ সম্পর্কে পর্যটনমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখন আর বাংলাদেশের জন্য বড় কোনো ফ্যাক্টর না। তারা তো আমাদের কিছু দেয় না। তাদের ইন্টারন্যাশনাল মাতব্বরী আছে। আমরা সেদিকে যেতে চাই না। বরঞ্চ আমরা এশিয়ার দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। ইন দ্য ওয়ার্ল্ড নাউ এশিয়া ইজ কামিং নেক্সট। এই অঞ্চলে মূলত দুটি দেশ বড় ভূমিকা পালন করবে— চীন ও ভারত। চীন আমাদের বহুদিনের পরীক্ষিত বন্ধু, খুবই সহায়ক শক্তি।’

রাশেদ খান মেনন বেসরকারি খাতে বিদ্যুতের আরও চুক্তি ও ভারত নির্ভরতা বৃদ্ধি প্রসঙ্গে বলেন, ‘রিলায়েন্স আদানির চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। এখন আর দেশে জরুরী বিদ্যুৎ সমস্যা নেই। তাই দরপত্রবিহীন কাজ দেওয়া উচিত নয়।’

বিদ্যুতের বিষয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, ‘বেসকারি খাতের বিদ্যুতে তো সরকারকেই টাকা ঢালতে হচ্ছে। তাহলে হাত ঘুরিয়ে ভাত খেয়ে লাভ কী? আমি মনে করি বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ সরকারের হাতে থাকতে হবে।’

‘মন্ত্রী হওয়ার আগে এই সব বিষয়ে আপনি বেশী সোচ্চার ছিলেন। এখন সেটা দেখা যায় না…।’ এই কথার পরিপেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগ বোধ হয় ঠিক না। আমি সব জায়গাতেই এ সব বিষয়ে কথা বলি।’

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মায়ানমার অভিযান বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আমাদের দেশের অভ্যন্তরের মাটি অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেব না।’

‘ভারতের তথ্য প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজনে অন্য দেশেও অভিযানের হুমকি দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে বক্তব্য থাকা উচিত কিনা?’— প্রশ্নের জবাবে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বাংলাদেশের সমস্যা বাংলাদেশকেই সমাধান করতে হবে। অন্য কোনো দেশের উচিত হবে না পার্শ্ববর্তী দেশের মাটিতে হস্তক্ষেপ করা। তারা বড়জোর আমাদের বলতে পারে।’

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির বিষয়ে ওর্য়াকার্স পার্টি প্রধানের মন্তব্য,‘আমি তো মনে করি রাজনীতি ভালই আছে, এভাবেই চলবে। খুব বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বড় ভুল যদি সরকার না করে তাহলে ২০১৯ সালের আগে নতুন আর কি? অর্থনীতিতে ১৪ ধাপ এগিয়েছি। বাংলাদেশ তো এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলবে।’

কোনো সমস্যাই দেখছেন না? – জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘একটা শুধু ভয়ের জায়গা সেটা হল সুশাসন। মানুষ সুশাসন পেলে আরেকটু রিলিভ পেত। কিছু প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখলেই সেটা বোঝা যায়। যেমন ধরুন নির্বাচন কমিশন। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনমানুষের আস্থা তো দূরের কথা আমারই আস্থা নেই। আমরা আইন করে এত ক্ষমতা তাদের দিয়েছি তারা সেটা কাজে লাগাতে পারেনি। এটা তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা।’

‘এই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আমাকেও আশঙ্কিত করে’ এমন মন্তব্য করে এই নেতা বলেন, ‘স্বাধীনতা দিলেই হয় না। তা ব্যবহার করতে জানতে হয়। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। তারা আইন অনুযায়ী কাজ করবে। তাদের তো সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার দরকার নেই। সরকার সরকারের কাজ করবে। সরকার তো চাইবেই নিজের মতো কাজ করতে, কারণ সরকারের দল আছে।’