হোম » বিশ্বজুড়ে নয়া মেরুকরণ

বিশ্বজুড়ে নয়া মেরুকরণ

admin- Friday, February 17th, 2017

সোলায়মান আহসান : বিশ্বে দ্রুত ভূ-রাজনীতির নয়া মেরুকরণপ্রক্রিয়া চলছে। এই মেরুকরণে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্রমে দুর্বল হচ্ছে আর রাশিয়া-চীন ‘অক্ষশক্তি’ আরো শক্তিশালী হচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের সাম্প্রতিক ‘লজিস্টিক সাপোর্টের’ অন্তরালে প্রতিরক্ষা চুক্তির গাঁটছড়াকে এশিয়া মহাদেশেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে আরেক মেরুকরণ চলছে জোরেশোরে। এতে দৃশ্যত যুক্তরাষ্ট্র পুরনো অনেক মিত্রকে হারাতে বসেছে এবং শক্তি ভারসাম্যে ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। তেমনি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতও অর্থনৈতিক এবং সামরিক দিক দিয়ে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে নিতে সচেষ্ট ছিল তা চিহ্নিত বৈরী শক্তি পাকিস্তান ও চীনের স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক ক্রমসম্প্রসারণে অনেকটা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে রাশিয়াও সম্পর্কের চৌহদ্দি বাড়িয়ে নিতে হাত বাড়িয়েছে ‘বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার’ এমন সব ঘটনা ভারতের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়েছে বৈকি!
যুক্তরাষ্ট্রের বিগত দুই যুগের ‘পোড়ামাটি নীতি’র কারণে দেশটির অনেক মিত্র দেশ ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’ বলে ভিড় করছে রাশিয়ার ঘরে। নবনির্বাচিত রিপাবলিকান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গৃহীত কিছু নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অনেক দিনের মিত্ররাও সরে পড়তে ব্যস্ত। বিশেষ করে সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রদানে নিষেধাজ্ঞা দেশের আদালতে নির্বাহী আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রকাশ হিসেবে মুসলিম দেশগুলো বিবেচনা করছে, এ পরিপ্রেক্ষিতে অনেক দেশই মার্কিনিদের ওপর মিত্রতার আস্থা রাখতে চাইছে না।
এক দিকে যেভাবে ভূ-রাজনীতির পাশফেরা (মেরুকরণ) দ্রুত ঘটছে, অন্য দিকে সামরিক সম্পর্কেও নানা পরিবর্তন অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরো জোরদার হচ্ছে। এসব লক্ষণীয় পরিবর্তন শক্তির ভারসাম্যে যে তারতম্য ঘটছে তাতে পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা করছেন বিশ্বব্যাপী না হলেও মহাদেশজুড়ে যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধের দামামা বেধে যেতে পারে।
সে রকম একটা আভাস বিগত বছরে ভারতের নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মিরের লাইন অব কন্ট্রোলের নিকটবর্তী উরি সামরিক ছাউনিতে হামলাকারীদের দ্বারা ১৯ ভারতীয় জওয়ান নিহত হওয়ার ঘটনার পর উভয় দেশের যুদ্ধের সাজ সাজ পরিস্থিতি থেকে বোঝা গিয়েছিল। পরে ভারত কর্তৃক দাবি পাকিস্তানে চালানো ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের’ জবাব দিয়ে তারা আপাতত বিজয় ঘোষণা করে যুদ্ধ থেকে সরে আসার যুক্তি দাঁড় করায়।
অপর দিকে, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের অন্তর্গত তিন লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটারের পানিসীমা দক্ষিণ-চীন সাগরে বিগত ছয় মাস যেসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং তা বর্তমানে আক্রমণাত্মক ‘বাগ্যুদ্ধের’ মাধ্যমে একটি চীন-মার্কিন মুখোমুখি যুদ্ধংদেহি পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তা বিশ্বের জন্য কম উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের নয়!
উল্লেখ্য, চীনের হাতে এমন অত্যাধুনিক ক্রুজ মিসাইল রয়েছে, যা সাবমেরিন, যুদ্ধবিমান কিংবা ভূমি থেকে নিক্ষেপ করে (সাইডেড পদ্ধতিতে) বিমানবাহী রণতরী ডুবিয়ে দেয়া সম্ভব। চীন সে-ই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করতেও দ্বিধা করেনি। এতদসত্ত্বেও যে কারণে দক্ষিণ চীন সাগর থেকে সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র হাত গুটিয়ে নিতে বাধ্য হলো, দু’টি কারণে। এক. যুক্তরাষ্ট্র দেখল তার আহ্বানে ভারত ও ফ্রান্স ছাড়া কোনো মিত্রদেশ এগিয়ে আসেনি। এশিয়ার সবচেয়ে বড় নৌশক্তিধর দেশ জাপান সম্পূর্ণ নীরবতা পালন করে। ফ্রান্স ও ভারতের ফ্রিগেড নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে। ফিলিপাইনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সীমিতপর্যায়ে নৌমহড়ার মাধ্যমে মুখ রক্ষা করে।
আসলে ভূ-রাজনীতির পাশফেরায় জাপান ইতোমধ্যে ৭০ বছরের বিবাদকে ভুলে রাশিয়ার কাছাকাছি এসেছে। রাশিয়ার কারণে চিরবৈরী চীনকেও জাপান ছাড় দিতে বাধ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রতার ওপর নির্ভর না রেখে জাপান নিজেরাই নিরাপত্তা জোরদার করতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সিনজো আবে চার হাজার ৩৬০ কোটি ডলারের বিশাল এক প্রতিরক্ষা বাজেটে স্বাক্ষর করেন। ভূ-মধ্যসাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যে ভারত এমনিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। তাই মার্কিনিদের তুষ্ট করতে চারটি ফ্রিগেড নিয়ে দক্ষিণ প্রশান্ত সাগরে পাড়ি জমালেও যৌথমহড়ায় যোগ দিয়ে সংঘর্ষমুখী হয়নি। আর ফিলিপাইন তো বলা যায় অ্যাবাউট টার্ন। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট দুতার্তে প্রকাশ্যে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আর নয়। সামরিক চুক্তির মেয়াদ উত্তীর্ণ হতে-না-হতেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে- চুক্তি নবায়ন করা হবে না- পাততাড়ি গোটাও মার্কিনিরা! ইন্দোনেশিয়া তলে তলে চীনের সাথে হাত মিলিয়েছে বড় ধরনের বিনিয়োগ পেতে।
কিন্তু দক্ষিণ-চীন সাগর নিয়ে সঙ্কট কাটেনি। চীন-মার্কিন উত্তেজনাও প্রশমিত হয়নি। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন চীনকে তার দক্ষিণ-চীন সাগরের দ্বীপে যেতে বাধা দেয়ার অভিপ্রায় ব্যক্ত করে আগের ধুঁয়া ওঠা আগুনে যেন কেরোসিন ঢেলে দিলেন।
চীন সরকারি পত্রিকা ‘গ্লোবাল টাইমস’ রেরে রবে জানাল, ‘ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হলে বিশাল আকারের যুদ্ধ শুরু হবে।’ ‘চায়না ডেইলি’ লিখন- ‘টিলারসন এ বক্তব্যের বাস্তবায়ন করতে চাইলে মারাত্মক সঙ্ঘাত বাধবে’।
চীনের সাথে মার্কিনিদের বাগযুদ্ধ শুধু দক্ষিণ-চীন সাগর নিয়ে নয়, সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় তাইওয়ানের অধিকার নিয়েও। ট্রাম্প চীনের সাথে ৪৪ বছরের সমঝোতা মেনে নেয়া ‘একচীন নীতিতেও হাত দিয়ে উসকে দিয়েছেন চীনাদের। নির্বাচনের আগে বাণিজ্যে হাত দেয়ার কথা বললেও এখন দেখা যাচ্ছে আসল জায়গায় হাত দিতে যাচ্ছেন তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগেই তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট সাই ইং ওয়েনের সাথে ফোনালাপ করার মাধ্যমে ট্রাম্প বোঝাতে চান তিনি চীনের সাথে আগের সম্পর্ককে সম্মান করতে চান না। আর তা না চাইলে চীনের সরকারি পত্রিকা মোতাবেক চীনের জবাবÑ ‘এটি চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বজায় রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।’ দক্ষিণ-চীন সাগরে চীনের ভূমিকা মার্কিনিদের উৎসাহিত করেছিল সুযোগকে কাজে লাগিয়ে চীনকে এক হাত নিতে; কিন্তু তা বুঝিবা করা গেল না ওই অঞ্চলের সন্নিহিত দেশগুলোর প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায়। এখানেও মার্কিনিরা মিত্রহীন হয়ে পড়েছে। তবু মার্কিনিরা হাল ছাড়েনি। দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বুঝিবা তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তেই ফাঁস করে দিলেন মার্কিনিদের গোপন তৎপরতার খবর। দুতার্তে বললেন, মার্কিনিরা নানা মারাত্মক মারণাস্ত্র গুদামজাত করছে, এমনকি পরমাণু বোমাও থাকতে পারে। তিনি বলেন, এসব তৎপরতাকে তিনি মোটেই অনুমোদন দেবেন না।
পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা করছেন বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (যাকে জর্জ বুশ এ যাবৎকালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেপরোয়া মেজাজের প্রেসিডেন্ট) লাভ-ক্ষতির হিসাব কষতে এবং মার্কিন আধিপত্য বজায় রাখতে গিয়ে চীনের সাথে সংঘর্ষ বাধিয়ে বসতে পারেন। চীনও সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছে। ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নের আস্থা হারিয়েছেন তা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের বক্তব্যে স্পষ্ট। ওঁলাদ বলেছেন, ইউরোপ ট্রাম্পের পরামর্শের বাধা মানে না। ন্যাটোর ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি ঘোষিত হলে ন্যাটোও ঘোষণা দিয়েছে মার্কিনিদের ছাড়া ন্যাটোকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে নয়া পদক্ষেপ নিচ্ছে। ন্যাটোর অন্যতম শক্তি তুরস্ক হুমকি দিয়েছে ন্যাটো ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার। কারণ তুরস্ক সিরিয়া প্রশ্নে রাশিয়াকে যে সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছে তা প্রমাণ করে তাদের পাশফেরা কোনো দিকে। ইরান তার নিজস্ব ভূমি বিমান উড়াতে রাশিয়াকে দিয়ে প্রমাণ করেছে তাদের সখ্য কার সাথে।
উল্লেখ্য, সিরিয়ায় চলা পাঁচ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে প্রায় পাঁচ লাখ বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে দেশটির অর্ধেকের বেশি মানুষ। বাশার আল আসাদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জিদের বলি হয়েছে বৃহৎ দুই শক্তিধর দেশের অস্ত্র প্রতিযোগিতার মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে রাশিয়া তার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে সাময়িক স্থিতিশীলতা আনতে পারলেও তা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
এ দিকে, আরো একটি মেরুকরণ চলছে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান এর উদ্যোক্তা। সৌদি আরব ইতোমধ্যে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল রাহিল শরিফকে সন্ত্রাসবিরোধী একটি জোট গঠনের দায়িত্ব দিয়েছেন। রাহিল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ইরানকে ওই জোটে না রাখা হলে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন না। আপাতত পাকিস্তান, তুরস্ক, ইরানকে নিয়ে নয়া মুসলিম জোট গঠনের কাজ এগিয়ে চলেছে। ধারণা করা হয়েছিল, ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে রাশিয়ার সাথে বুঝিবা সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে। এতে চীনের সমস্যা হবে।
চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিতে পেরেছে পুরনো সখ্য পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভুটান এমনকি বাংলাদেশকে। পাকিস্তান ছাড়া অন্যান্য ছোটখাটো দেশগুলো নিয়ে চীনের স্ট্র্যাটেজিক রিলেশনস ভারতের মাথাব্যথার কারণ।
তা ছাড়া যুদ্ধের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটে গেছে অনেক। বিমানবাহী রণতরীর নৌবহর, বিশাল সেনাবাহিনী, ভারী ভারী অস্ত্রের সমাহার যুদ্ধের প্রাধান্য বিস্তারে সহায়ক নয়। এখন মিসাইলের যুগ। ড্রোনের যুগ। এই মিসাইলের প্রযুক্তি চীন-রাশিয়ার হাতেই সবচেয়ে উন্নত। চীন-রাশিয়ার মিত্রদেশগুলোর হাতেও রয়েছে অত্যাধুনিক মিসাইলের বহর। এসব সুপারসনিক মিসাইল মোকাবেলা করার মতো গতিসম্পন্ন মিসাইল যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদের হাতে নেই। শুধু মিসাইল নয়, যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রেও রাশিয়া এখন এগিয়ে। চীন সেই সবচেয়ে উন্নত বিমান সুকইই-৩৫ কিছু দিন আগে রাশিয়ার কাছ থেকে পেয়েছে।
ঝোঁকের মাথায় ট্রাম্প যদি কোনো যুক্ত বাধিয়ে বসেন, তাহলে তাকে একাই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে। সে ক্ষেত্রে পুরনো ঝাল মিটিয়ে নিতে রাশিয়া হয়তো সক্রিয় হয়ে উঠবে। এমন কিছু না ঘটুক শান্তিকামী মানুষ অন্তত বিশ্বনেতাদের কাছে এ প্রার্থনা করে।