হোম » বিরোধী জোটে আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে

বিরোধী জোটে আন্দোলন ও নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে

admin- Friday, May 19th, 2017

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা কথা শোনা যাচ্ছে বেশ কিছুদিন থেকে। চলছে ব্যাপক তোড়জোড়ও। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বেশকিছু দিন থেকেই নৌকার পক্ষে ভোট চাইছে। দলটির সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে নৌকা মার্কায় ভোট চাইছেন। তাদের এমন বক্তব্যে এখন একটি বিষয়ই আলোচনা হচ্ছে। সেটি হলো- দেশে কি নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে? ক্ষমতাসীনরা নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও অনেক পিছিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারাও নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। একই সঙ্গে দলটির নেতারা বলছেন, তারা ক্ষমতাসীনদের অধীনে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। এমনকি নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকার ছাড়া কোনো নির্বাচনও হতে দিবে না বলে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী আগামী বছরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেদের মতো করে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। কিন্তু এ ব্যাপারে জনগণ মনে হয় অনেকাংশেই নির্বিকার। হয়তো কিছুটা আতঙ্কিতও। তারা নির্বাচনের আগে কোনো হানাহানি দেখতে চান না। তারা চান ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল। দেশের সকল নাগরিক মুখিয়ে আছেন নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য। এ জন্য তারা স্বপ্নে বিভোর। সবার আশা, অচিরেই দেশে একটি শান্তিপূর্ণ ও সুস্থ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে দেশ পরিচালনায় তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবেন। নির্বাচনের মাধ্যমেই দেশে গণতন্ত্রের সত্যিকার বহিঃপ্রকাশ চান তারা।

বাগেরহাটের বাসিন্দা আবদুল্লা আল ইসলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানান, বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বোঝা যাচ্ছে নির্বাচন যথাসময়েই অনুষ্ঠিত হবে। তাই জনগণ চায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, কিন্তু ক্ষমতাশীন দলের অধীনে তা সম্ভব কিনা এ নিয়ে জনমনে এখনো সংশয় আছে। কাজীপাড়া মিরপুর থেকে মেজবাহ উদ্দিন সেলিম বলেন, শুধু নির্বাচনী আমেজ তৈরি করলেই হবে না। সরকারকেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিয়ে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।

জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যাবে বা যাওয়া উচিত, সার্বিকভাবে এ আলোচনাই দলটির মধ্যে এখন বেশি। দলটির অধিকাংশ নেতাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কিছুতেই নির্বাচনে যাওয়ার পক্ষপাতী নয়। তাদের ভাষ্য, শেখ হাসিনা নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান থাকলে ভোট সুষ্ঠু হবে না। তিনি নির্বাচন প্রভাবিত করবেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী নির্বাচনে সরকারকে কোনোভাবেই ছাড় দিতে রাজি নন বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। আর এ জন্য তারা বিগত ৫ জানুয়ারির মতোই এবারও নির্বাচনে না যাওয়ার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের যুক্তি, শেখ হাসিনার অধীনে গেলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যাওয়াই উচিত ছিল। আর তার অধীনে আগামী নির্বাচনে গেলে দুই নির্বাচনকেই বৈধতা দেয়া হবে বলে মূল্যায়ন তাদের।

এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচন হবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে। এবার আর ক্ষমতাসীনদের একতরফা খেলতে দেয়া হবে না। সরকার যে আবারো তাদের অধীনে নির্বাচন করার স্বপ্ন দেখছে সেটি কখনোই বাস্তবায়ন হবে না।

দলের স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, আগামী নির্বাচন শেখ হাসিনার অধীনে হবে না। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতা না ছাড়লে জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে হটিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীন ভোট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাবে। তিনি বলেন, আমরা নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায় করেই নির্বাচনে যাবো।

দলের স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রথম থেকেই বলে আসছেন, শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। সর্বশেষ গত ১০ মার্চ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এক আলোচনা সভায় স্পষ্ট করেই তিনি বলেন, কেয়ামত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলেও শেখ হাসিনার অধীনে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবিটি শুধু বিএনপি বা বিরোধী জোটের একার নয়। তাই এবার সরকারকে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করতেই হবে। তারা বলেন, বিএনপি একটি নির্বাচনমুখী দল। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করতে চায় না বিএনপি। আসনভিত্তিক সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। প্রার্থী হতে আগ্রহীরা লবিং শুরু করেছেন। ৩০০ আসনের প্রতিটিতে তিনজন করে খসড়া প্রার্থী তালিকা রয়েছে চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার হাতে। অনেক আসনে ৩ জনের অধিক প্রার্থীর নামও রয়েছে। বিএনপি এখন ৯ শতাধিক প্রার্থীর তালিকা নিয়ে কাজ শুরু করবে। ইতোমধ্যে দলের হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে আন্দোলন এবং নির্বাচনের প্রস্তুতির বার্তা নিয়ে সারাদেশে কর্মিসভা প্রায় শেষ করেছেন দলের ৫১টি সাংগঠনিক টিম। ওই ৫১টি টিমের প্রতিবেদন প্রস্তুত হচ্ছে এখন। ওই প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনার পর ৩০০ আসনের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা করা হবে বলে জানা গেছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সরকারকে ফাঁকা মাঠে আর ছাড়া হবে না। আগামী নির্বাচনে বিএনপি যাবে, বর্জন করবে না। তবে সে নির্বাচন হতে হবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে এবং সহায়ক সরকারের অধীনে। তারা বলেছেন, আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হবে যাতে সরকার নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার দিতে বাধ্য হবে। কেন বিএনপি নির্বাচন বর্জন করবে না- তার ব্যাখ্যা দিয়ে মওদুদ বলেন, মানুষ এখন বর্তমান সরকারের পরিবর্তন চায়, সে জন্য বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এই পরিবর্তন আনবে। নির্বাচন করতে হবে এ জন্য যে, বিগত সাড়ে তিন বছর ধরে অনির্বাচিত এই সরকার জবাবদিহিহীনভাবে শাসন করছে। বাংলাদেশের মানুষ এখন এই সরকারকে আর সহ্য করতে পারছে না। খালেদা জিয়া ঘোষিত রূপকল্প-২০৩০ এর মাধ্যমে দেশের মানুষের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একটা চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। আমরা এটাতে কমিটেড। আমরা ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়ন করার সুযোগ পাব। জনগণ সেই সুযোগের অপেক্ষায় আছে। তিনি বলেন, আন্দোলন করব এজন্য যে, একটি সরকার নির্বাচনকালীন সময়ে থাকতে হবে যাদের রাজনৈতিক স্বার্থ থাকবে না। যাতে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যার যার ভোট যাকে খুশি তাকে দিতে পারে। যদি সরকার এটা নিয়ে সমঝোতায় না আসেন, তাহলে এমন আন্দোলন করবো যাতে সরকার বাধ্য হয়। দেশে একদলীয় নির্বাচন আর হবে না। আমরা নির্বাচন করব এবং আন্দোলন করব।

নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গতবার একতরফা নির্বাচন করতে পারলেও এবার বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন সহজ হবে না। তিনি বলেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ৩০০ আসনে বিএনপির ৯০০ প্রার্থীর খসড়া তালিকা প্রস্তুত রয়েছে। প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় বিএনপির তিন-চারজন করে প্রার্থী আছেন।