হোম » বিদেশ থেকে ডিগ্রী করে এসে আমার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার চাকরী থাকবে না কেন?

বিদেশ থেকে ডিগ্রী করে এসে আমার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকতার চাকরী থাকবে না কেন?

admin- Saturday, September 2nd, 2017

আশিকুর রহমান

ছাত্র জীবনে জাতীয় দৈনিকের ক্যাম্পাস রিপোর্টার ছিলাম। শিক্ষকরা বিদেশে গিয়ে ডিগ্রী করে দেশে আসেননা এ নিয়ে অনেকবার রিপোর্ট করেছি। তখন থেকেই যারা বিদেশ থেকে ফিরেননা তাদের ব্যাপারে একটা ঘৃণাবোধ নিজের মধ্যে জন্ম নিয়েছে। কিন্তু কেন ফিরেননা সে বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান তখন আমার ছিলো বলে মনে হয়না। অন্ততঃ বিদেশ থেকে ফিরে থাকেননা, নাকি থাকতে দেয়া হয়না এ আমার জানা ছিলোনা।

এক: আমি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক। ২০০১ সালের ৬ জানুয়ারী যোগদান করি। সে হিসেবে চাকরির বয়স ১৭ বছর চলছে। এই সময়ে সুইডেন থেকে মাস্টার্স করেছি, আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছি এবং পোস্ট ডক করেছি। গত দুই বছরে নেচার সহ বিভিন্ন জার্নাল এ ৬ টি আর্টিকেল প্রকাশ করেছি। পোস্টডক্টরাল ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে ৪ টি কোর্স পড়িয়েছি এবং আমার টিচিং এফেক্টিভনেস হলো ৪.৯/৫। নিজেকে অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য টিচিং মেথড এর উপর সার্টিফিকেট কোর্স করেছি। এই সূচনাটা নিজেকে জাহির করার জন্য নয়, প্রেক্ষাপটটা বোঝানোর জন্য দিলাম।

দুই: সুইডেন থেকে মাস্টার্স করে ফেরার ৬ মাস পর আমেরিকায় পিএইচডি অফার পেলাম কিন্তু কর্তৃপক্ষ ছুটি দিবেনা কারণ মাস্টার্স করা অবস্থায় নেয়া সকল বেতন ভাতা ফেরত দিতে হবে। অগত্যা অনেক কষ্ট করে সুদ আসল সহ টাকা ফেরত দিয়ে বিদেশে গেলাম, পিএইচডি করলাম, পোস্ট ডক করলাম। এই সময়ে আমি বিশ্ববিদ্দালয় থেকে এক পয়সা ও বেতন ভাতা নেই নাই।

তিন: পিএইচডি করার জন্য ১ লাখ পঁচাত্তর হাজার টাকা আমার নামে বরাদ্দ করা হয়েছিল স্টাডি গ্রান্ট হিসেবে। ২০১০ সালে অন্য সবাই বরাদ্দকৃত টাকা পেলেও শুধু আমার টাকাটা ছাড় করা হয়নাই। প্রয়োজনিও অভিজ্ঞতা এবং প্রকাশনা থাকলেও ৫ বছর আমার সহযোগী অধ্যাপকের দরখাস্ত আটকে রাখা হয়েছে। আমার ছাত্রতুল্য যারা তাদেরকে ও প্রমোশন দিয়ে আমার সিনিয়র করা হয়েছে কিন্তু আমাকে প্রমোশন দেয়া হয়নাই। ২০১৩ সালে প্রমোশন দেয়া হলো কিন্তু এখনো কার্যকর করা হয়নাই। অর্থাৎ সকল প্রকার যোগ্যতা এবং অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও আমি গত ১৫ বছর ধরে সহকারী অধ্যাপক।

চার: উচ্চ শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে অনেক আশা নিয়ে দেশে ফিরে গেলাম। উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বিভাগে যোগদান করলাম ২০১৬ সালের ২২ মে। একাডেমিক কমিটির মিটিং করে ক্লাস বন্টনের আগেই পড়ানো শুরু করলাম। কিন্তু চার্ মাস অপেক্ষা করেও আমার যোগদানপত্র চুড়ান্তভাবে গৃহীত না হওয়ায় অত্যন্ত হতাশ হৃদয় নিয়ে আবার বিদেশে পারি জমালাম কিন্তু মন পরে থাকলো দেশে। ভাবলাম, কতদিন আর যোগদানপত্র না গ্রহণ করে থাকবে। ইতোমধ্যে বিনা অনুমতিতে দেশ ত্যাগের কারণে সিন্ডিকেট সিদ্ধান্ত দিলো ২০১৭ সালের মে মাসের ১৬ তারিখের মধ্যে যোগদান না করলে চাকরি থাকবেনা। শুভাকাংখীরা প্রায় সবাই বললো আমেরিকায় থেকে যাও এখানে আসার দরকার নাই। কিন্তু মনকে মানাতে পারলামনা কারন পিএইচডি করেছি, পোস্ট ডক করেছি, টিচিং এর উপর সার্টিফিকেট কোর্স করেছি আর সব সময় দেশে আমার ছাত্র ছাত্রীদের পড়ানোর কল্পনা করেছি। সব কিছু ছেড়ে দেশে ফিরলাম, ১৫ মে ২০১৭ তারিখে দেশে গিয়ে বিভাগে যোগদান করলাম এবং যথা নিয়মে যোগদানপত্র রেজিস্ট্রার অফিসে পাঠালাম। একেতো ১ বছর আগে দেয়া যোগদানপত্রতো গৃহীতই হয়নি এবার যোগদান পত্র পাওয়ার সাথে সাথেই আমার বেতন ভাতা বন্ধ করে দিলো। ১ জুন, ২০১৭ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেক কর্মকর্তা, কর্মচারী, এবং শিক্ষক বেতন ভাতা পেলেও পেলামনা শুধু আমি। এখানে টাকাটা বড় কথা নয়, সম্মানটা বড়।

রাগে,দুঃখে, অভিমানে এক সপ্তাহের মধ্যে টিকেট করে আবার আমেরিকা চলে যাই। পরে নাকি আমার এক শুভাকাংখী তদবির করে এটি ২২ দিন পর ছাড় করিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার মাত্র ৯ দিনের মাথায় আবারো আমার বেতন বন্ধ করা হয়েছে। আজ ১৫ মাস দুই দিন হলো কিন্তু আমার যোগদানপত্র গৃহীত হলোনা। চাকরির বয়স ১৭ বছর হলো কিন্তু প্রমোশন কার্যকর হলোনা।

পাঁচ: আমার একটি অপরাধ হলো বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করেছি। কিন্তু আমি একাধিকবার ছুটির জন্য দরখাস্ত দিয়েছি। প্রতিবারই এই বলে আমার দরখাস্ত নাকচ করা হয়েছে যে, আমার পূর্বের ছুটি সমন্বয় না হওয়ায় আমাকে ছুটি দেয়া যাবেনা। ১৫ মাসেও ছুটি সমন্বয় হয়না আবার ছুটি সমন্বয় না হওয়ায় নতুন ছুটি দেয়া হয়না। এ যেন হাত পা বেঁধে সাঁতার প্রতিযোগিতায় নামানোর মতো ! বেটা ছুটি দেবোনা কিন্তু গিয়ে দেখ!!

ছয়: আমি যোগদান করেই ভিসি স্যারের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, তার কাছে ফাইল আটকে থাকেনা, আসলেই তিনি করে দেবনা । আমার জানামতে, ভিসি অফিসে দুই দিনের বেশি ফাইল আটকে ছিলোনা। নিশ্চয়ই ভিসি সাহেবের চেয়েও শক্তিশালী কেও আটকে রেখেছে।

সাত: সকল শর্ত পূরণ করেও ১৫ বছরেও প্রমোশন হয়না, একটা যোগদানপত্র ১৫ মাসেও গৃহিত হয়না, স্টাডি গ্রান্ট ছাড় হয়না। এ হচ্ছে আমার প্রিয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এখানে যোগ্যতার চেয়েও চাটুকারিতার মূল্য বেশি। আমেরিকান পিএইচডির চেয়েও লোকাল পিএইচডির মূল্য বেশি, পিএইচডি না থাকলে মূল্য আরো বেশি।

আট: আমার সীমাবদ্ধতা আছে। আমি কালোকে কালো বলি, সাদাকে সাদা। অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলি। মাথা উঁচু করে চলি। চাটুকারিতা, তোষামোদি, আর তেলবাজি আমার চরিত্রে নেই। হাত কচলানো আর বাঁকা হয়ে সালাম দেয়া আমি শিখিনি এবং শিখতেও চাইনা। এটাই আমার চরিত্র এবং এ নিয়েই আমি সন্তুষ্ট। এই অযোগ্যতাটা আমি দূর করতে চাইনা।

নয়: এতো ঝামেলার পর ও কেন জানি দেশ ই ভালো লাগে। স্বপ্ন দেখি চাটুকারিতার অবসান হবে, যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে, অর্জিত জ্ঞান দেশের কাজে লাগাবো, যাদের ট্যাক্সের টাকায় লেখা পড়া করেছি তাদের ছেলে মেয়েদেরকেই পড়াবো। মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে ভিজবো আবার রোদে শুকাবো। বাবার কবর নিয়মিত জেয়ারত করবো। মায়ের সেবা করবো। আত্মীয় স্বজন বন্ধু -বান্ধব আর আমার প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়েই বাকি জীবন কাটাবো।