বিদেশে কী করছেন আবদুর রাজ্জাক?

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা তিনি। তবে রাজনৈতিক কর্মকান্ডে তিনি যতটা জড়িয়েছেন, দলের নেতাদের আইনি সহায়তা দিয়েছেন তার চেয়ে বেশি। তাই জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বা সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের পরিচয় অতটা বড় হয়ে উঠেনি কখনো। বরং জামায়াত নেতাদের আইনজীবী হিসেবেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের রক্ষায় আইনি লড়াইয়ে তিনিই ছিলেন প্রধান আইনজীবী। অথচ মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর থেকে তিনি চলে গেছেন বিদেশে।

ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের কথা বলা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের পাশাপাশি কাদের মোল্লাকে রক্ষায় আপিল বিভাগেও ছুটেছেন তিনি। কিন্তু এরপর থেকে কেন তিনি লাপাত্তা, তার কোনো জবাব নেই জামায়াতের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের কাছে। বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে বিব্রত হন তারা। তাই চুপ করে থাকাকেই শ্রেয় মনে করছেন।

জামায়াতের আইনজীবী আর রাজ্জাকের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে বিভিন্ন দেশ ঘুরে এখন যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন এই জামায়াত নেতা। তিনি কবে ফিরবেন বা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে আদৌ ফিরবেন কি না তা নিশ্চিত নন জামায়াত নেতারা। পরিবারের আশঙ্কা, দেশে ফিরলে দলের অন্য শীর্ষ নেতাদের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গ্রেপ্তার হতে পারেন আবদুর রাজ্জাকও। এ জন্যই জামায়াতের কোনো কোনো নেতা তাকে বিদেশে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে তার পরিবার সূত্র।

আবদুর রাজ্জাককে জামায়াত এতোদিন সামনে না নিয়ে এলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে জামায়াতের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে তাকেই ধরা হয়। দলের আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনিই মূল ভূমিকা পালন করেন। তাছাড়া জামায়াতের স্বাধীনতাবিরোধী নেতা হিসেবে তার নাম কখনো সামনে আসেনি, যদিও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতা ছিল তারও।

রাজ্জাককে নিয়ে বিব্রত সহকর্মীরা

আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল এবং আপিল বিভাগে জামায়াত নেতাদের হয়ে লড়েছেন এমন আইনজীবীরা তাদের সিনিয়রের এমন আচরণে বিব্রত। তবে জানতে চাইলে এক আইনজীবী বলেছেন, ‘জামায়াত নেতাদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে আইনি পরামর্শ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন সময় বিদেশ সফরে গেছেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক। প্রতিবারই তিনি কাজ শেষে দেশে ফিরে আসেন।’

আবদুর রাজ্জাক দেশের বাইরে বসে সরকারবিরোধী নানা তৎপরতায় জড়িত হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন সরকারি দলের নেতারা। তাদের অভিযোগ, রাজ্জাক দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনের কর্তা ব্যক্তি, কূটনীতিক ও প্রভাবশালী সরকারি-বেসরকারি লোকদের সঙ্গেও দেখা করছেন। তিনি বাংলাদেশের চলমান সংকট এবং বিশেষকরে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের বিচার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য তুলে ধরছেন।

তবে এসব বিষয়ে জানতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এবং প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দের সঙ্গে কয়েকবার টেলিফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের আইনজীবি শিশির মুনির বলেন, ‘উনি পেশার কারণেই বিদেশে অবস্থান করছেন। সেই কাজ শেষ হলেই তিনি দেশে চলে আসবেন।’ দলের নেতাদের ফাঁসির রায় হচ্ছে অথচ প্রধান আইনজীবীর দেশের বাইরে। বিষয়টি অস্বাভাবিক কি না, এমন প্রশ্নের কোনো জবাব অবশ্য দেননি এই আইনজীবি। বিদেশে বসে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন আবদুর রাজ্জাক, এমন অভিযোগ অসত্য বলে দাবি করেছেন এই আইনজীবী।

আবদুর রাজ্জাক কখন দেশে আসবেন জানতে চাইলে তার ছেলে এবং ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষের আরেক আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক বলেন, ‘কাজ শেষ হলেই তিনি দেশে ফিরে আসবেন।’ তিনি কী কাজে গেছেন আর বিদেশে গিয়ে কী করছেন তার কোনো জবাব নেই এহসান এ সিদ্দিকের কাছেও। আবদুর রাজ্জাক কবে ফিরবেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানা নেই বলেও জানান তার ছেলে।

স্বাধীনতাবিরোধী তৎপরতার অভিযোগ

জামায়াতের বর্তমান নেতৃত্বের মতো মুক্তিযুদ্ধের সময় আবদুর রাজ্জাকও ছিলেন দলটির তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা। এই দলের নেতারাই তখন গঠন করেন আলবদর বাহিনী, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবী হত্যায়ও জড়িত ছিল।

আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার নানা অভিযোগ তুলেছেন ইসলামী ঐক্যজোটের একাংশের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী। তিনি বলেন, যুদ্ধের শুরুর দিকে আবদুর রাজ্জাক চট্টগ্রামে অবস্থান করেন এবং ইসলামী ছাত্রসংঘের অন্য নেতাদের মতোই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতায় জড়িত হন। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সিলেট চলে যান, সেখানে গিয়েও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে নানা তৎপরতা চালান।

২০০৬ সালে এসব বিষয়ে তথ্য প্রকাশের পর আবদুর রাজ্জাক তার বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন বলেও জানিয়েছেন মিছবাহুর রহমান চৌধুরী। তবে মামলা করেও শুনানির কোনো উদ্যোগ নেননি ওই জামায়াত নেতা। মিছবাহুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘তিনি আইনি নোটিশ পাঠানোর পর আমি মামলায় লড়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলাম। কিন্তু তিনিই বারবার সময় নিয়েছেন।’

এদিকে যোগাযোগ করা হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানায়, জামায়াত নেতা আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে এখনো কোনো তদন্তে নামেননি তারা। তবে যেকোনো সময় তা শুরু হতে পারে।

জানতে চাইলে তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হান্নান বলেন, ‘আমাদের কাছে আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না থাকলেও তার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতার বিষয়ে নানা তথ্য এসেছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলেই আমরা তদন্ত শুরু করব।’

বিস্ফোরক মামলায় আসামি

আবদুর রাজ্জাক বিদেশে যাওয়ার পরদিন ১৮ ডিসেম্বর রাজধানীর কলাবাগান থানায় জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক আইনে যে মামলা হয় তাতে আবদুর রাজ্জাকের নামও আছে। দলের সূত্র জানিয়েছে, মামলা হওয়ার পর আবদুর রাজ্জাক নির্বাচন পর্যন্ত বিদেশ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের চেষ্টা করেন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর মহাজোট সরকার পুনরায় সরকার গঠন করে। এরপর নতুন করে একাত্তরে রাজ্জাকের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। বিষয়টি জানতে পেরেই তিনি দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সরকার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত তাকে বিদেশে অবস্থান করার পরামর্শ দিয়েছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আবদুর রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠ জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘সরকার পরিকল্পিতভাবে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দিয়েছে। দেশে এলে বিমানবন্দরেই তাকে আটক করা হবে। তার বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালেও মামলা শুরুর উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। এসব কারণে শিগগিরই তিনি দেশে ফিরছেন না। সরকার পরিবর্তন বা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরবেন না।’

জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, ২০০৭ সালের এক-এগারোর পর জামায়াতের নেতৃত্বে আমূল পরিবর্তন আনার পক্ষে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে তরুণদের সামনে আনার পক্ষে ছিলেন তিনি। জামায়াত নিষিদ্ধ হলে নতুন নামে দল গঠনের বিষয়েও কথা বলেছেন তিনি। বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর মধ্যমসারির নেতা-কর্মীদের মধ্যে তাকে নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও হয় তখন। তবে জামায়াত নেতাদের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে তার অবস্থানের কারণে আগের অবস্থান অনেকটা চাপা পড়ে যায় কর্মী-সমর্থকদের কাছে।

২০১০ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি একটি গোপন তারবার্তায় লেখেন জামায়াত নেতা রাজ্জাক তাকে বলেছেন, জামায়াত ‘সাংবিধানিক পথে’ বিশ্বাস করে, দলটি আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে চলবে। বাংলাদেশে যদি ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিষিদ্ধ হয়ে যায়, তাহলে জামায়াত তুরস্কের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। জামায়াত দলের নাম পরিবর্তন করবে, দলীয় গঠনতন্ত্র থেকে ধর্মীয় মতবাদগুলো বাদ দেবে।

রাজ্জাকের ভাষ্য অনুসারে, ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে জামায়াতে ইসলামীর নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও ট্রাস্টে যে অর্থ আছে, দলটি তা হারাবে, কিন্তু দল টিকে থাকবে। রাজ্জাক বলেন, একটি ক্ষত সৃষ্টি হবে, তবে সেই ক্ষত সারানো যাবে। সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে

You Might Also Like