‘বিজেপি সরকারের পরিকল্পিত গণহত্যা’

ভারতের দিল্লিতে সংঘটিত সাম্প্রতিক সহিংসতায় বহুসংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছে। এ সম্পর্কে রেডিও তেহরানকে দেয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে পশ্চিমবঙ্গের বিশিষ্ট সমাজকর্মী, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও ভাষা-চেতনা সমিতির সম্পাদক ড. ইমানুল হক বলেছেন, এটি ভারতের কেন্দ্রীয় সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকারের পরিকল্পিত গণহত্যা।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ ইস্যুতে বিবাদের জেরে বহুসংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. ইমানুল হক: দেখুন, দিল্লির ঘটনাকে আমি বলব এটি পরিকল্পিত গণহত্যা। গত দুমাস ধরে সিএএ ইস্যুতে দিল্লির শাহিনবাগে আন্দোলন চলছে; গোটা ভারতজুড়ে আন্দোলন চলছে। অন্যদিকে যারা ভারতের মানুষকে বে-নাগরিক করতে চাচ্ছে তারা এদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। গোটা ভারতজুড়ে কঠিন অর্থনৈতিক সংকট চলছে। অর্থনৈতিক সংকটে এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পেছনে পড়ে আছে ভারত। বাংলাদেশ এখানে সবার শীর্ষে তারপর চীন এমনকি পাকিস্তানও ভারতের চেয়ে এগিয়ে।

এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বভারতীতে এবছর বেতন হবে না বলে নোটিশ দিয়েছে। রেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লোক ছাটাই হয়েছে। তীব্র আর্থিক মন্দা দেখা দিয়েছে ভারতে। শেয়ারেরসূচক মারাত্মকভাবে নিচে নেমে গেছে। শুধু তাই নয় যখন দেশে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে জেতাতে তার দেশের বাতিল অকেজো অস্ত্র এবং সামরিক হেলিকপ্টার কেনা হলো ২৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। অথচ এগুলোর কোনো প্রয়োজন আমাদের এখন ছিল না।

আর এসব বিষয়কে আড়াল করার জন্য, মানুষের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দিল্লিতে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হলো। এই গণহত্যা চালানো এইজন্য যে যাতে করে মানুষের নজর এ বিষয় থেকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয়া যায়। এটাকে হিন্দু মুসলিম সমস্যা হিসেবে দেখানোর ছক কষেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গা যেভাবে হয়েছিল এখনও ঠিক সেই একইভাবে ২০২০ সালে এসে দিল্লির ঘটনা ঘটানো হলো।

একটা বিষয় খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, বিহারে যেখানে বিজেপি সরকার ক্ষমতায়। সেখানে এনপিআরবিরোধী বিল পাস করা হয়েছে। এসব বিষয়কে মানুষের কাছ থেকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে দিল্লি-গণহত্যার মাধ্যমে। সম্প্রতি ৭টি রাজ্যের নির্বাচনে ৬ টিতে বিজেপি পরাজিত হয়েছে। সিএএপাসের পর ঝাড়খণ্ড ও দিল্লির নির্বাচন হয়েছে। দুটোতেই পরাজিত হয়েছে। সর্বশেষ দিল্লির নির্বাচনে ধস পরাজয় ঘটেছে বিজেপির। আর সেই পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেও দিল্লিতে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়েছে।

রেডিও তেহরান: দিল্লির ভয়াবহ সহিংস ঘটনা বন্ধে ব্যর্থতার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে দায়ী করে তাঁর পদত্যাগ দাবি করেছেন কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী। আপনার কী মনে হয় এই সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বিজেপি সরকারের অবহেলা আছে?

ড. ইমানুল হক: দেখুন, বিজেপি সরকারের অবহেলা তো ছিলই; যেকারণে আমি একে পরিকল্পিত গণহত্যা বলছি। আর পুলিশ তো নিষ্ক্রিয় ছিল না; আসলে পুলিশকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। এমনকি বহু জায়গায় পুলিশ নিজেরাই জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে পাথর ছুড়েছে এবং গুলি ছুড়েছে। এদিকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা গুলিতে আহত হয়েছেন। কিন্তু তিনি কাদের গুলিতে আহত হয়েছেন সে বিষয়েও সন্দেহ জাগছে। আগে বলা হচ্ছিলো পাথরের আঘাতে আহত হয়েছে। তারমানে দাঁড়াচ্ছে সিএএবিরোধীদের ছোড়া পাথরে আহত হয়েছেন ঐ পুলিশ কর্মকর্তা। এমনই একটা বিষয় প্রমাণ করতে চাওয়া হয়েছিল। অথচ এখন দেখা যাচ্ছে আসলে পাথরে নয়; গুলিতে আহত হয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তা। এমনকি দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে খুব মারাত্মক মিথ্যা ছড়ানো হচ্ছে। একজন ব্যক্তির নাম অনুরাগ মিশ্র বা চন্দ্রাল শুক্লা তাকে শাহরুখ বলে পরিচয় দেয়া হচ্ছে পুলিশের পক্ষ থেকে। দিল্লিতে যেখানে মসজিদে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয়েছে অথচ দিল্লি পুলিশ টুইট করে বলেছে সেখানে কোনো আগুন লাগানো হয় নি। আগুন লাগানোর ঘটনাটি একটি মিথ্যে ভিডিও। পরে অবশ্য প্রমাণিত হয়েছে যে মসজিদে আগুন লাগানো হয়েছিল। মসজিদের মিনারে হনুমানজির পতাকা লাগানো হয়েছিল। ভারত একটি গণতান্ত্রিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। সেখানে এ ধরনের ঘটনা খুবই অবাঞ্ছিত।

রেডিও তেহরান: দিল্লির ঘটনায় কী ভারতের গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র প্রশ্নের মুখে পড়ল?

ড. ইমানুল হক: দেখুন, দেশটি গণতান্ত্রিক কিন্তু সরকার ফ্যাসিস্ট। ভারতের মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ কিন্তু এখানকার সরকার সাম্প্রদায়িক। একটি বিষয় লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন। দিল্লির ঘটনায় মাঝরাতে বসে একজন বিচারপতি রায় দিচ্ছেন যারা সহিংসতা ঘটাচ্ছে এবং উসকানি দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। অথচ পুলিশ বলছে তারা উসকানিমূলক কোনো ভিডিও দেখে নি। তবে সে ভিডিও দেখানো হয়েছে। আর সেই বিচারপতিকে রাতারাতি বদলি করা হলো। এমন ঘটনা ভারতবর্ষ কখনও প্রত্যক্ষ করে নি। একজন রাষ্ট্রীয় অতিথি আছেন দেশে। সেই সময় এধরনের ঘটনা ঘটল- এমনও কখনও ভারতবর্ষ লক্ষ্য করে নি। শুধু তাই নয়-দেশের দারিদ্র্য ঢাকার জন্য ২২ কিলোমিটার রাস্তা ৮ ফুট করে উঁচু করে দেয়া হলো। যাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিষয়টি লুকোনো যায়।

দেখুন, ভারতবর্ষ এমন বিষয় প্রত্যক্ষ করিনি যে-সহিংস ঘটনার ৬৯ ঘন্টা পর প্রধানমন্ত্রী টুইট করার সময় পাচ্ছেন। তাও কখন যখন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করছেন এবং বিরোধী দলনেত্রী সোনিয়া গান্ধী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ’র পদত্যাগ চাইছেন ঠিক তখন। আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এত বড় সহিংসতা নিয়ে কোনো বিবৃতি বা বক্তব্য দিচ্ছেন না। এরাই হচ্ছে ফ্যাসিস্ট। এরাই হচ্ছে সাম্প্রদায়িক।

আর এদেশ ধর্মনিরপেক্ষ একারণে বলছি যে, দিল্লির ভয়াবহ সহিংস ঘটনায় আহত মুসলিম ফোরকানের জন্য রক্ত খুঁজে বেড়াচ্ছে হিন্দু গোপাল। প্রেমাকান্ত নামে একজন হিন্দু তার ৬ জন প্রতিবেশী মুসলমানকে বাঁচিয়ে এখন হাসপাতালে। আর যে ছেলেটি জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে মুসলমানদের বাড়িতে পেট্রোল বোমা ছুড়েছে তাকে যখন মুসলিম জনতা ধরে ফেলেছে তাকে না মেরে পুলিশের কাছে তুলে দিয়েছে। যেসব ছাত্ররা রাস্তায় নেমে ঐ সহিংস ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে তারা তো মুসলিম না, যে বিচারপতি ঐ ঘটনার জন্য রায় দিলেন তিনিও তো মুসলিম নন। হাসপাতালে যে ডাক্তার ও নার্সরা আহতদের সেবা করছেন তাদের বেশিরভাগই তো হিন্দু। তারা মানুষ হিসেবে সেবা করছেন। মানুষ মানুষের পাশে আছে এটাই হচ্ছে ভারতবর্ষ।

রেডিও তেহরান: ড. ইমানুল হক আপনি যে কথা বললেন তার পাশাপাশি কিন্তু এ চিত্রও দেখা গেল যারা সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন বলে বলা হচ্ছে তারা হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির সমর্থক।

ড. ইমানুল হক: দেখুন, ওদেরকে হিন্দুত্ববাদী বলা মানে সম্মান করা। ওদের সাথে হিন্দু ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। ওদের ধর্ম হচ্ছে ফ্যাসিস্ট ধর্ম। ওরা হিটলারের ধর্ম পালন করছে। ওরা ফ্যাসিবাদী। হিন্দু ধর্মের কোথাও কী বলা আছে তোমাদের মসজিদ ভাঙতে হবে। এরা হিন্দু ধর্মের নামের অপব্যবহার করছে। ওরা আসলে হিন্দুত্ববাদী নয়; ওরা হচ্ছে রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদী। ওরা হচ্ছে রাজনৈতিক হিন্দুধর্মের ক্ষমতা ব্যবসায়ী। ওদের সাথে হিন্দু ধর্মের কোনো যোগসুত্র নেই। ওরা হিন্দু ধর্মের কলঙ্ক।

রেডিও তেহরান: দিল্লির ঘটনায় কারফিউ জারির আহ্বান জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কীভাবে দেখছেন তার এ আহ্বানকে?

ড. ইমানুল হক: দেখুন, দেশের গণতান্ত্রিক রীতিনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের দল বিজেপি মানছে না। দিল্লির পর পর তিন তিনবারের নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর কথাও শুনছে না কেন্দ্রীয় ফ্যাসিস্ট সরকার। আর ফ্যাসিস্টদের যখন পতন আসন্ন হয় তখন তারা এইরকম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করে। আর এর জবাব ভারতের জনগণ দেবে। আগামী দিনে অবশ্যই এদেশের জনগণ তার জবাব দেবে। এর আগেও আপনাদের রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে আমি কথা বলেছি। দেখবেন যত নির্বাচন হবে তার বেশিরভাগেই বিজেপি পরাজিত হবে। এরা আসলে ভারতের কেউ না। এরা টুকরো টুকরো গ্যাং। ভারতে যদি দেশদ্রোহী বলে কিছু থাকে –তাহলে এরাই সেই দেশদ্রোহী। এই সরকার ফ্যাসিস্ট এবং অগণতান্ত্রিক সরকার। রাষ্ট্রপতির যদি কোনো ক্ষমতা বা নীতিমালা থাকে তাহলে বর্তমান সরকারকে অবিলম্বে বরখাস্ত করা উচিত।

রেডিও তেহরান: কেউ কেউ বলছেন, চলমান সহিংসতায় বিজেপি সরকারের অবস্থান কাঙ্ক্ষিত নয়। দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে তাহলে কেন্দ্রীয় সরকার আরো কী করতে পারে?

ড. ইমানুল হক: প্রথমত: নতজানু হয়ে মানুষের কাছে ব্যর্থ এই সরকারের ক্ষমা চাওয়া উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে বরখাস্ত করা উচিত। দিল্লির পুলিশ প্রধানকে বরখাস্ত করা উচিত। দিল্লিতে সেনা নামানো উচিত। দিল্লি পুলিশের দায়িত্ব দিল্লি রাজসরকারের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রাখার কোনো অধিকার নেই। তারা কোনো সহিংসতা থামাতে পারে না, ধর্ষণ বন্ধ করতে পারে না। তারা হত্যা খুন জখম থামাতে ব্যর্থ। আর গণহত্যাতো পরিকল্পিতভাবে চালিয়েছে তারা।#

পার্সটুডে

You Might Also Like