হোম » বিচার বিভাগের সাথে সঙ্ঘাত অনিবার্য ছিল

বিচার বিভাগের সাথে সঙ্ঘাত অনিবার্য ছিল

admin- Saturday, August 19th, 2017

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। প্রবীণ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ। জন্ম ১৯৪০ সালে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, লন্ডনের টেম্পল ইন থেকে বার-অ্যাট-ল’ নেয়ার পর ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে আইন ব্যবসায় শুরু করেন।

১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে দেশে একদলীয় প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকারব্যবস্থা চালু করা হলে তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দেন।

১৯৭৫ সালে মর্মান্তিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বচ্ছ নির্বাচনের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ দাবি গড়ে তোলার পক্ষে কাজ করার জন্য তৎকালীন সরকার তাকে গ্রেফতার করে তিন মাস ডিটেনশনে আটক রাখে। ১৯৭৭ সালে ফেব্রুয়ারিতে তিনি মুক্তি পান। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানী ও আতাউর রহমান খানের মতো প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি সক্ষম হয়েছিলেন।

স্বাধীন দেশে ব্যক্তি উদ্যোগ ও মুক্তচিন্তার প্রসার ঘটানোর জন্য তিনি ‘নিউ ন্যাশন’ নামে একটি ইংরেজি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন, পরবর্তীকালে পত্রিকাটিকে তিনি দৈনিকে রূপান্তরিত করেন। মইনুল হোসেন বাংলাদেশ সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি এবং প্রেস কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০০-২০০১ সালে তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

ওয়ান-ইলেভেনের পর তিনি এক বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আলফাজ আনাম

প্রশ্ন : সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে এখন বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এর পরিণতি কী হতে পারে বলে মনে করেন?

মইনুল হোসেন : দেশ একনায়কতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে। বিচার বিভাগের সাথে যে সঙ্ঘাত এটি শেষ ধাপ। নির্বাচনপ্রক্রিয়া ধ্বংস হয়ে গেছে, সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যে সংসদ গঠিত হয়েছে তাতে কোনো বিরোধী দল নেই। বিরোধী দল ছাড়া সংসদীয় সরকার চলতে পারে না।। অথচ বলা হচ্ছে, এই সংসদকে অকার্যকর বলা চলবে না। এখন আছে শুধু বিচার বিভাগ। এই বিচার বিভাগ যদি ধ্বংস করা যায়, অধীনস্থ করা যায়, তাহলে তো হয়ে গেল। একনায়কত্ববাদী শাসন কায়েমের শেষপর্যায়ে এসে এগুলো করা হয়। একদলীয় শাসনে এই বিরোধ অনিবার্য ছিল।

প্রশ্ন : এই বিরোধ তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে হুমকির মুখে ফেলবে..

মইনুল হোসেন : আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকেই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। বঙ্গবন্ধুকে যে বাকশালের দিকে সমাজতন্ত্রের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হলো, এটি আওয়ামী লীগের রাজনীতির বাইরে ছিল। তাকে বুঝানো হয়, যদি সমাজতন্ত্র বা একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে হয় তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রেখে আপনি কিছু করতে পারবেন না। বর্তমান সরকার কারা চালাচ্ছে আমি ঠিক জানি না। কিন্তু আওয়ামী লীগ চালাচ্ছে বলে আমি মনে করি না। আওয়ামী লীগের যে ঐতিহ্য নীতি আদর্শ ছিল, তা তো দেখি না। এখন নির্বাচন নেই, জনগণের ভোটের অধিকার নেই। নির্বাচন হওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। সমস্যা হচ্ছে- দেশে না আছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, না আছে রাজনীতি। ফলে সংবিধান কী, গণতন্ত্র কী- এসব নিয়ে তাদের কোনো চিন্তাভাবনা নেই। তাদের একমাত্র চিন্তা ক্ষমতায় আছি, ক্ষমতায় থাকব, ক্ষমতা ছাড়ব না। একই কাজ বঙ্গবন্ধুকে করতে হয়েছে। তিনি এভাবে নির্বাচন ছাড়া প্রেসিডেন্ট হয়ে গেলেন। একদলীয় সংসদ হয়ে গেল। এখনকার সংসদও একই।

প্রশ্ন : আপনি তো চতুর্থ সংশোধনীর সময়ে সংসদ সদস্য ছিলেন। এখন কি মিল খুঁজে পাচ্ছেন?

মইনুল হোসেন : হ্যাঁ, মিল খুঁজে পাচ্ছি। সেদিকে ক্ষমতাসীনেরা যাবেই এবং যাচ্ছে। কারণ, আওয়ামী লীগের ওপর সওয়ার হয়েছে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি। ফলে এই পদক্ষেপগুলোকে সেভাবে দেখতে হবে। বিচার বিভাগের সাথে সঙ্ঘাতে যাওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল। আসলে তারা বিচার বিভাগকে নতজানু রাখতে চায়। বিচার বিভাগকে প্রধানমন্ত্রীর অধীনে রাখতে চায়। বঙ্গবন্ধুর সময় এমন করা হয়েছিল। তিনি ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলেন, সংসদের হাতে দেননি।

সে সময় বঙ্গবন্ধুর ওপর এ ধরনের শক্তি সওয়ার হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর অসুবিধা ছিল, তিনি দেশে আসার পর হতাশ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি এসে যে পরিস্থিতি দেখলেন, তা ছিল সম্পূর্ণ নতুন। ফলে তার সরকার ব্যর্থ হচ্ছিল। একমাত্র বামপন্থীরা বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। জাসদ বিভিন্ন স্থানে মানুষ খুন করল। অথচ স্বাধীন বাংলাদেশে এমন হওয়ার কথা ছিল না। চিন্তাশীল রাজনীতিবিদের অভাবে আমরা বঙ্গবন্ধুকে হারালাম। এরপর আওয়ামী লীগের চার নেতাকে হারালাম।

প্রশ্ন : অনেক দেশের পার্লামেন্টে তো বিচারপতিদের অভিসংশনের ক্ষমতা আছে।

মইনুল হোসেন : দেখুন, আমাদের আজকের যে সংসদ আর ইংল্যান্ডের বা ভারতের সংসদ এক নয়। এসব দেশে দুটো হাউজ নিয়ে পার্লামেন্ট হয়। ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টের যে অংশ লিডার থাকে প্রাইম মিনিস্টার, তারা কিন্তু ইমপিচ করে না। হাউজ অব কমন্স করে না। হাউজ অব লর্ডস ইমপিচ করে। সেখানে বিচারপতিদের বিচার করা হয়। আমরা যদি ভারতের ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া দেখি তাহলেও সেখানে দু’জন বিচারক এবং একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকেন। বিচার তারা করেন। শাস্তি অর্থাৎ ইমপিচমেন্ট হবে কি না, তা ঠিক করে পার্লামেন্ট।

প্রশ্ন : তাহলে ষোড়শ সংশোধনীতে অভিসংশনপ্রক্রিয়া কি যথাযথ ছিল না?

মইনুল হোসেন : না, না। এই সংসদ পারে না। যে সংসদে প্রধানমন্ত্রী নেতা। এটা তো সরকারের হাতে চলে গেল। বিচারপতিদের বিচারের ক্ষমতা তো সংসদের হাতে থাকছে না, আসলে প্রধানমন্ত্রীর হাতে চলে গেল। সংবিধান তো প্রধানমন্ত্রীকে এই ক্ষমতা দেয়নি। আসলে তো কারো রাজনৈতিক চিন্তা নেই। ফলে আমরা অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি। রাজনীতিকেরা বলছেন, তোমরা আমাদের কাছে আসো আমরা তোমাদের বিচার করব। এ অবস্থায় বিচারপতিরা বুঝেশুনে আত্মহত্যা করতে পারেন না। সুপ্রিম কোর্ট তো সংবিধানের রক্ষক। সংবিধান তো প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষক করেনি, সংসদকেও করেনি। জনগণ-প্রদত্ত সংবিধান। এই সংবিধান তো আওয়ামী লীগই প্রণয়ন করেছিল।

প্রশ্ন : সরকারের মন্ত্রীরা তো বলছেন, তারা জনগণের প্রতিনিধি। সংসদ সদস্যরা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিয়েছেন। সংসদকে অস্বীকার করলে তো প্রধান বিচারপতির নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে এমন যুক্তি তারা তুলে ধরছেন।

মইনুল হোসেন : তারা যদি জনগণের প্রতিনিধি হন, সংবিধানের অধীনে হয়েছেন। সংবিধান সর্বোচ্চ আইন। সংবিধান তো বলেনি তারা বিচারপতিকে অপসারণ করতে পারবেন। সুপ্রিম কোর্ট যে অধিকার চাইছে, তা তো সংবিধান তাকে দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের রক্ষক এটা তো সংবিধান বলছে। জনগণের প্রতিনিধি হয়েছেন আইন প্রণয়নের জন্য। বিচারপতিদের বিচার করার জন্য তো করা হয়নি। আইন প্রণয়নের মধ্যে বিচারপতিদের শাস্তি দেয়ার কথা আসবে কেন?

প্রশ্ন : সরকারের মন্ত্রীরা তো প্রধান বিচারপতির অপসারণ চেয়েছেন।

মইনুল হোসেন : আসলে যারা সংবিধানের অর্থ বোঝে না, অথবা যাদের সংবিধানের প্রতি কোনো সম্মান নেই, তারা তো সবই বলতে পারে। তারা তো এখন ক্ষমতায় থাকা নিয়ে ব্যস্ত। বিশ্বের কোনো দেশে এমন নজির আছে মন্ত্রী বিচারপতিদের পদচ্যুতি বা চাকরিচ্যুতি চান। বিচারপতিরা স্বাধীন। এই স্বাধীন হওয়ার অর্থ কী তাদের আরেকজন চাকরিচ্যুতি করবে। পার্লামেন্ট তো স্বাধীন নয়, মন্ত্রীরাও স্বাধীন নন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের জবাবদিহি করতে হয়। একমাত্র স্বাধীন হচ্ছে বিচার বিভাগ। এর অর্থ কি তারা বোঝে? তাদের এসব কথায় দুঃখ লাগে, আমরা জাতি হিসেবে ছোট হয়ে যাচ্ছি। আমরা তো এত মূর্খ বা অজ্ঞ ছিলাম না। এ দেশে সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হকের মতো রাজনীতিক ও মানিক মিয়ার মতো সাংবাদিক ছিলেন। গণতন্ত্রের জন্য আমরা সংগ্রাম করেছি। এখন আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে এসব কথা শুনলে সত্যি কষ্ট হয়।

প্রশ্ন : সামরিক শাসনমালের সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ফিরে আসার মধ্য দিয়ে বিচার বিভাগ কী স্বাধীন অবস্থান ফিরে পাবেন বলে মনে করেন?

মইনুল হোসেন : প্রথম কথা হলো শূন্যতা তো থাকতে পারে না। আজকে বারবার সামরিক শাসনের কথা বলা হচ্ছে। সামরিক শাসন যদি এতই খারাপ হয়ে থাকে সামরিক শাসনের অধীনে কারা নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল? সেই পার্লামেন্টকে কেন অবৈধ বলা হচ্ছে না। সামরিক শাসনে আমলে হোক আর যে আমলে হোক সংসদ যা বৈধ করেছে তা এখন সংবিধানের অংশ। এতটুকু বোঝার মতো পার্থক্য তারা যদি করতে না পারে, এর চেয়ে দুঃখ আর কী হতে পারে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল সংবিধানের কাঠামো হয়ে গেছে। নির্বাচিত সংসদ বৈধতা দিয়েছে। যারা এখন প্রশ্ন তুলছে সামরিক শাসনামলে তারা তো নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এখন অবৈধ হয়ে তারা কী জেলে যাবে?

প্রশ্ন : বিচারপতি নিয়োগ নিয়েও অনেক প্রশ্ন আছে বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

মইনুল হোসেন : অবশ্যই। আসলে বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারটা সংসদের দেখা দরকার। কিন্তু তারা বিচারপতি অপসারণ নিয়ে ব্যস্ত। তারা তো বলতে পারে সংসদের একটি কমিটির মাধ্যমে বিচারপতি নিয়োগ হবে। কারা বিচারপতি হবে তা জনগণ জানতে পারবেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিচারপতি নিয়োগ প্রকাশ্য হয়। গোপনে গোপনে বিচারপতি নিয়োগ করবেন, আর পরে তাদের অপসারণ করতে চাইবেন- এটা তো হয় না।

প্রশ্ন : আপনি বলছিলেন শূন্যতা থাকতে পারে না।

মইনুল হোসেন : অবশ্যই। একটা আইন বাতিল হয়ে গেলে আগে যা থাকে তা কার্যকর হবে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল পুনর্বহাল হয়েছে।

প্রশ্ন : আপনা আপনি পুনঃস্থাপন হবে, না সংসদে বিল আনতে হবে?

মইনুল হোসেন : এ নিয়ে দ্বিমত আছে। আমার মত হচ্ছে, আপনি যে আইন দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল বাতিল করেছিলেন, সেই আইন যদি অবৈধ হয় তাহলে তো আগেরটা বহাল থাকবে। কারণ এটাকে শুধু বেআইনি নয় অবৈধ বলা হয়েছে। এ নিয়ে আরো আলোচনা হতে পারে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আছে, যদি এর পরিবর্তন করতে হয় তাহলে প্রস্তাব দিতে পারে। কিন্তু আপনার অধীনে থাকতে হবে কেন? এমন প্রস্তাব তারা দিতে পারে যার মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষিত হয়।

প্রশ্ন : সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলছেন, আমরা এখন জাজেস রিপাবলিকে বাস করছি। তার এই মতকে কিভাবে দেখেন?

মইনুল হোসেন : বিচারপতি খায়রুল হক মনে হয় নিজের মানসম্মান সম্পর্কে সচেতন নন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করার জন্য তিনি তার রায়ে যেসব কথা বলেছেন, সেগুলো তিনি কিভাবে লিখেছিলেন। এমন রায়ের দৃষ্টান্ত তো দুনিয়াতে পাওয়া যাবে না। তিনি রায় দিয়েছেন নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন হতে হবে। কোন দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হয়? তিনি অত্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবিত ব্যক্তি। এর পরও তাকে সম্মান করতে চাই। কিন্তু এমন লোক প্রধান বিচারপতি ছিলেন ভাবতে লজ্জা লাগে। পঞ্চম সংশোধনী তিনি বাতিল করেছেন। অথচ এটি তার মামলার বিষয়বস্তু ছিল না। মুন সিনেমা হলের মামলা থেকে টেনে এনে তিনি পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করেছিলেন।

প্রশ্ন : আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি রায় নিয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে থাকতে পারেন।

মইনুল হোসেন : তিনি আইন কমিশনের চেয়ারম্যান। তার ক্ষমতা আইন দিয়ে নির্ধারিত। তার কাজ একমাত্র আইন পর্যালোচনা করা, রায়ের সমালোচনা করা নয়। যে আইনে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছেন সেখানে বলা আছে, তিনি আইন দেখবেন। আইন সংশোধন বা যুগোপযোগী করা যায় কি না, এসব দেখবেন। তিনি কিভাবে প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে কথা বলেন? তিনি কিভাবে এ ধরনের নিম্নমানের একটি সংবাদ সম্মেলন করেন? তিনি যে রাজনৈতিক প্রভাবিত তা স্পষ্ট বোঝা যায়। তিনি যুক্তি দিয়েছেন, যদি সংসদ সদস্যরা ইমম্যাচিউর হয় তাহলে বিচারপতিরাও ইমম্যাচিউর। এটা কোনো যুক্তি হলো? তিনি পাগল হলে সেও পাগল এ ধরনের যুক্তি আর কী। অদ্ভুত সব কথা।

প্রশ্ন : আইনমন্ত্রী বলেছেন, তারা রায়ের পর্যালোচনার কিছু বিষয় এক্সপাঞ্জ চাইবেন- বিষয়টি কিভাবে দেখেন?

মইনুল হোসেন : আইনমন্ত্রী তালিকা করুক কী তারা বাদ চাইবেন। কিন্তু তারা সংসদে ও বাইরে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন সে বক্তব্যগুলো আমাদের স্মরণে রাখতে হবে। তারা এর আগে বলেছেন সংসদে বিচারপতিদের আসতে হবে। ব্যাখ্যা করতে হবে কিভাবে এই আইন অসাংবিধানিক হলো। তখন তো এ কথা আসবে সংসদে বিচারকদের নিয়ে যেসব বলা হয়েছে সেগুলো এক্সপাঞ্জ করেন। প্রধান বিচারপতি তার পর্যবেক্ষণে এমন কী বলেছেন যা নিয়ে জনগণের মধ্যে, টকশোতে বা সংবাদপত্রে আলোচনা নেই। যেমন সংসদ সদস্যরা ইমম্যাচিউর, এ কথা বহুভাবে বলা হয়েছে। তারা ব্যবসায় করেন। রাজনীতির চেয়ে ব্যবসায় যাদের মুখ্য তারা তো রাজনীতিবিদ হিসেবে ইমম্যাচিউর। এমন কথা তো রাষ্ট্রপতিও বলেছেন, আজকাল রাজনীতিবিদেরা ব্যবসায়ী হয়ে গেছেন। সংসদ অকেজো, এ কথা কে না বলছে? সংসদ তো আসলেই অকেজো। দেশের বাস্তবতায় প্রধান বিচারপতিকে এসব কথা বলতে হয়েছে। আমি মনে করি, এসব নিয়ে আওয়ামী লীগের চুপচাপ থাকা ভালো। যা হয়ে গেছে, তা নিয়ে তিক্ততা আর বাড়ানো ঠিক হবে না।

প্রশ্ন : এসব পর্যবেক্ষণ কি এড়িয়ে যাওয়া যেত না?

মইনুল হোসেন : বিচারপতিদের তো ধাক্কা দেয়া হয়েছে। ধাক্কা না দিলে হয়তো তারা এসব বিষয় নিয়ে দূরে থাকত। আরেকটি দিক হচ্ছে, পর্যবেক্ষণে যা এসেছে তা আগে বিভিন্নভাবে অনেকে বলেছে। এসব নতুন কিছু নয়। সংবিধান হচ্ছে সুশাসনের একটি কাঠামো। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের রক্ষক। সুপ্রিম কোর্ট অবশ্যই দেখতে পারে সুশাসন আছে কি নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে কি না। তাদের এগুলো দেখা দায়িত্ব, কারণ, তারা সংবিধানের রক্ষক। সংবিধান মেনে যদি সংসদ না হয়, সংবিধান লঙ্ঘন করে ফাঁকি দিয়ে নির্বাচন হয়, তা দেখার অধিকার সুপ্রিম কোর্টের আছে। সুপ্রিম কোর্ট সহজে এগুলো করতে চায় না। কারণ তারা চায় রাজনীতিবিদেরা রাজনীতি দিয়ে এগুলোর সমাধান করুক। সরকারের পাশাপাশি বিরোধী দল আছে, সংবাদপত্র আছে- তারা এগুলো দেখবে। এখন তো বিরোধী দলও নেই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও নেই। কিন্তু সংবিধান রক্ষা করতে হলে সুশাসন রক্ষার কথা আসবে। এখনো সুপ্রিম কোর্টের ওপর মানুষের বেশি আস্থা আছে।

প্রশ্ন : মন্ত্রীরা যেভাবে বিচার বিভাগ সম্পর্কে কথা বলছেন, তাতে কি আদালত অবমাননা হয় ?

মইনুল হোসেন : নিশ্চয় আদালত অবমাননা হচ্ছে। কিন্তু আদালত সব ব্যাপারে কনটেম্পট আনে না। কারণ, আদালতকে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা সব বিষয়ে চিন্তা করতে হয়। দেশটা যখন পাগলামোর ভেতরে আছে, তখন এসব নিয়ে কনটেম্পট করা ঠিক হবে না। শুধু মন্ত্রীরা কেন বিচারপতি খায়রুল হকের বক্তব্য নিশ্চিতভাবে আদালত অবমাননা। আপনি রায়ের সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু বিচারকের সমালোচনা করতে পারেন না। সবাইকে বুঝতে হবে বিচার বিভাগ যদি স্বাধীন না থাকে, তাহলে আমার আপনার কারো অধিকার রক্ষা করার আর কেউ থাকবে না। সুপ্রিম কোর্ট দুর্বল হলে নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষার গ্যারান্টি থাকবে না।

নয়াদিগন্ত