বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসের ভেতরে ময়লার স্তুপ

মূল ফটকে দুটি মাঝারি আকারের তালা ঝুলছে। ফটকের ভেতরের মেঝেতে পড়ে আছে পুরোনো কয়েকটি পত্রিকার কপি। ধুলো-ময়লার কারণে পত্রিকাগুলোও ভালো করে চেনা যায় না। এমন দৃশ্য দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের। রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত অফিসটি গত একমাসের বেশি সময় ধরে এমন অবস্থা।
কেন্দ্রীয় তো দূরের কথা সাধারণ কোনো নেতাকর্মীও আসছেন না দলের কার্যাালয়ে। কারণ সেখানে সবসময় পুলিশ অবস্থান করছেন।পুলিশের পক্ষ থেকে কার্য্লায়ের নিরাপত্তার জন্য অবস্থানের কথা বললেও বিএনপি বলছে, সেখানে গেলেই গ্রেফতার করা হবে। পরে যে কোনো মামলায় আসামি করে কারাগারে পাঠানো হবে।
গত ৩ জানুয়ারি রাতে ‘অসুস্থ’ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব (দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত)রুহুল কবির রিজভীকে কার্যালয় থেকে হাপসাতালে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। সঙ্গে কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকেও বের করে দেয়। পরে পুলিশ মূল ফটকে দুটি তালা ঝুলিয়ে দেয়।
এরপর থেকে কার্যালয়টি এক অর্থে পুলিশের দখলে।কারণ নেতাকর্মী না আসলেও কার্যালয়ের নীচে সবসময়ই অবস্থান করছেন পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য। একজন কর্মকর্তাসহ প্রায় দশজনের মতো পুলিশ সদস্য পালাবদল করে দায়িত্ব পালন করছেন।
নয়াপল্টনে গিয়ে দেখা যায়, বিএনপির কার্য্লায়ের গেইটের ভেতরের দিক দিয়ে মাঝারি আকারের দুটি দামি তালা লাগানো। আর একটি তালা লোহার গ্রিলের সঙ্গে লাগানো আছে। গেইটের ভেতরের মেঝেতে বেশকিছু পুরানো পত্রিকা পরে আছে। ধুলো-ময়লায় পত্রিকাগুলোর অনেকটা ঢেকে গেছে। পাশের দেয়ালে লাগানো পোস্টারগুলোতেও ময়লা জমে গেছে। গেইটের পাশে স্থাপিত দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ম্যুরলের ওপরও ধুলোর স্তুপ।
কার্যালয়ের নীচ তলার খালি জায়গায় পল্টন থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) বসে আছেন। পাশে পুলিশের কয়েকজন পুরুষ সদস্য অলস সময় পার করছেন। আর তিনজন নারী সদস্য খোশগল্প করছেন।
অন্যদিকে কার্যালয় ঠিক পূর্ব দিকে রাস্তার ওপর হলুদ রঙের একটি জলকামান রাখা আছে।যা শুরু থেকেই সেখানে আছে বলে জানালেন একজন পুলিশ সদস্য।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়াপল্টনে দায়িত্বরত পল্টন থানার একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই) বলেন, “কার্যালয়ের নিরাপত্তার জন্য আমরা এখানে আছি। পালাবদল করে দায়িত্ব পালন করা হয়।বিএনপির নেতাকর্মী তো দূরের কথা, আপনারা (সাংবাদিক) ছাড়া আর কেউ এখানে আসছে না।”
কার্যালয়টি নেতাকর্মীদের পদচারণায় মুখর থাকতো সব সময়। বিশেষ করে সংবাদ সম্মেলনের সময় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।যদিও হরতালের সময় চিত্র পাল্টে যেত। কারণ ওই সময় গ্রেফতারের ভয়ে রিজভী আহমেদ ছাড়া তেমন কোনো নেতা কার্যালয়ে আসতেন না। কিন্তু এখনকার চিত্রটা পুরোপুরি উল্টো।কারণ গত একমাসে দলটির কোনো পর্যাইয়ের নেতাকর্মী কার্যালয়ের আশপাশেও আসেননি।
যদিও দুই একজন বিএনপি নেতা ছাড়া গ্রেফতারের ভয়ে মূল দল ও অঙ্গ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কোনো নেতাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
এছাড়া কার্যালয়ের সামনের অংশে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের নামে বড়বড় ব্যানার চোখে পড়লেও এখন সেগুলোও নেই।অবরোধ শুরুর দিকে মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের নেতাকর্মীরা সেগুলো ছিঁড়ে ফেলছেন বলে অভিযোগ আছে।
এদিকে নেতাকর্মীদের আনাগোনা না থাকায় কার্যালয়ের আশপাশের ফুটপাত থেকে দোকান গুটিয়ে নিয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
বিএনপি কার্যালয়ের পশ্চিম পাশে হোটেল ভিক্টোরির গলির মুখে হরিবল নামের একজন মুচির সঙ্গে কথা হয়।এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে ঢাকায় এসে তিনি এই এলাকায় কাজ করছেন বলে জানান।
মলিন চেহারা নিয়ে হাতে জুতা পলিশ করছিলেন হরিবল। কাজ কেমন চলছে- জানতে চাইলে কিছুটা বিরক্তির সূরে বললেন, “শুনে কি করবেন।একমাসে নেতা-খাতা কেউ আসে না। আগে ৪শ থেকে ৫শ টাকা কামাইতাম আর অহন দেড়শর বেশি হয় না।”
এদিকে প্রতিনিয়ত সংবাদ বিবৃতিতে পুলিশ সরিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয় খুলে দিয়ে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে বিএনপি। তবে কবে নাগাদ নেতারা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যেতে পারবেন সে বিষয়ে কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির দফতরে কাজ করতেন এমন একজন বলেন, “পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগে আপাতত এভাবেই চলবে। কারণ যেই নেতা কার্যালয় বসে দায়িত্ব পালন করবেন তাকে যে গ্রেফতার করা হবে না সেই গ্যারান্টি কে দিবে?

You Might Also Like