বিএনপিকে ঘরোয়া রাজনীতিতে আবদ্ধ করার চিন্তা সরকারে

বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজার রায়ের পর দলটির চলমান শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর প্রতি মানুষের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জনগণের এমন প্রতিক্রিয়া দেখে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে । ফলে আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপিকে আবারো ঘরোয়া রাজনীতিতে আবদ্ধ করা হতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র এমন আভাস দিয়েছে।
সূত্রগুলো জানায়, দলীয় প্রধান খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পর বিএনপি সহিংস না হয়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের কৌশল নিয়েছে। হরতাল, অবরোধসহ কোনো ধরনের কঠোর কর্মসূচিতে না গিয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, মানববন্ধন, অনশন এবং কালো পতাকা মিছিলসহ নানা অহিংস কর্মসূচি পালন করছে দলটি। এসব কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও বাড়ছে, যাকে সরকার উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে। বিএনপির শান্তিপূর্ণ এসব কর্মসূচিকে সুশীল সমাজসহ দেশের সাধারণ মানুষও বেশ ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণ করছে। এসব কর্মসূচি পালনে সহযোগিতা করা হলে পর্যায়ক্রমে আন্দোলন আরো বড় আকার ধারণ করতে পারে। একপর্যায়ে সহিংস রূপ নিতে পারে বিএনপি এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করে সরকার। সেজন্য বিএনপির চলমান আন্দোলনকে আর সামনের দিকে যেতে দিতে চান না সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
বরং বিএনপির রাজনীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের পক্ষে তাদের অনেকে। সূত্রগুলো আরো জানায়, খালেদা জিয়ার কারাদণ্ডের পর আওয়ামী লীগ উল্লসিত হলেও বিষয়টি নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়ায় কিছুটা চিন্তিত সরকার। নির্বাচনের বছরে এমন রায়ের পর জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর তাদের নজরদারি বাড়িয়েছে। এ রায়ের পর বিএনপির রাজনৈতিক কৌশলের কারণে সরকার তাদের কাবু করতে পারেনি। খালেদা জিয়ার সাজার পর বিএনপি সহিংস হয়ে উঠতে পারে এমন তথ্য ছিল সরকারের কাছে।
ফলে সরকারও সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়। বিএনপি উগ্র হলে মামলা ও গ্রেফতার করে তাদের দমন করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছিল। এভাবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার সাথে দলের সিনিয়র নেতাদেরও কারাগার এবং আদালতপাড়ায় ব্যস্ত রাখার পরিকল্পনা নেয় সরকার। এতে খুব সহজেই নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা যাবে বলে মনে করা হচ্ছিল। কিন্তু সরকারের সেই ফাঁদে বিএনপি পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি বেছে নেয়। এতে খালেদা জিয়ার রায়কে কেন্দ্র করে বিএনপিকে দমনে সরকারের পরিকল্পনা আপাতত ভণ্ডুল হয়ে যায়।
তবে বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা প্রদান এবং নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অব্যাহত রেখেছে সরকার। সর্বশেষ সমাবেশের অনুমতি না দেয়ার প্রতিবাদে বিএনপির কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচিও লাঠিচার্জ এবং গরম পানি নিক্ষেপ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। ওই দিন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে বেশ সমালোচনা হলেও সরকার আরো কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে। খালেদা জিয়ার কারামুক্তি আন্দোলনকে ঘরোয়া রাজনীতিতেই আটকাতে চান সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ইতোমধ্যেই এমন আভাস দিয়ে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করলে ঘরে বসে ও অফিসে বসে করুক।’
বিএনপির শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মসূচিকে সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি আরো বলেন, ‘রাস্তা বন্ধ করে কোনো সভা-সমাবেশ করা যাবে না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন করে মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন। আপনারা যদি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করেন, তাহলে ঘরে করুন, অফিসে করুন। রাস্তায় কেন? জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন কেন?’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুই নেতা বলেন, ‘খালেদা জিয়া ও তার ছেলে দুর্নীতিবাজ এ কথা প্রমাণ হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মনে হচ্ছে এ রায় তার জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিএনপির কর্মসূচিতে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিও দিন দিন বাড়ছে। এভাবে তাদের কর্মসূচি পালনের সুযোগ দেয়া হলে একপর্যায়ে তা আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। ফলে এখন থেকেই তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কথা ভাবা হচ্ছে।’
দলের সম্পাদকমণ্ডলীর তিন নেতার মতে, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরো কয়েকটি মামলা রয়েছে। এসব মামলার কারণে জেল থেকে তার শিগগির বের হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ অবস্থায় রাজপথে বিএনপিকে কর্মসূচি পালনে অবাধ সুযোগ দেয়া হলে তা এক সময় ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। সেজন্য ক’দিন ধরে তাদের গতিবিধি এবং কর্মসূচি পর্যবেক্ষণের পর দমনের দিকেই যাচ্ছে সরকার। এক দিকে দলীয় প্রধান জেলে আবার অন্য দিকে নেতাকর্মীরাও রাস্তায় নামতে না পারলে এক সময় তারা নৈরাজ্য শুরু করবে। এতে তাদের আইনিভাবে দমন করা সহজ হবে। আর নৈরাজ্য না করে ঘরোয়া রাজনীতিতে আবদ্ধ থাকলে তেমন প্রচার হবে না। এতে জনগণের সমর্থন লাভ করা সহজ হবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘সরকার হটাতে বিএনপি নানা ধরনের ষড়যন্ত্র করছে। তারা যেকোনো সময়ে সহিংস হয়ে উঠতে পারে, অতীত অভিজ্ঞতা তাই বলে। সরকার তা মোকাবেলা করার চেষ্টা করবে- এটাই স্বাভাবিক।’

You Might Also Like