বাকশাল বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ছিল : প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দাবী করেছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত বাকশাল বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ছিল। এই শাসন ব্যবস্থা (বাকশাল) কার্যকর থাকলে নির্বাচন নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকত না, প্রশ্ন উঠত না। বাকশাল সর্বোত্তম পন্থা ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

সোমবার বিকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিনের আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালন করেন দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এবং উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

আলোচনা সভা উপলক্ষে দুপুরের মধ্যে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। স্থান সংকুলান না হওয়ায় মিলনায়তনের বাইরে, ফোয়ারার দিকে, এমনকি রাস্তায়ও অনেক নেতাকর্মীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সাবেক শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক সুজিদ রায় নন্দী, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ প্রমুখ।

নির্বাচন নিয়ে বঙ্গবন্ধু সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমলে বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধি ৭ ভাগে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিল। তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। আজ নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা উঠে; আর আমাদের বিরোধী দল বাকশাল বাকশাল করে গালি দেয়।

তারা যদি একবার চিন্তা করতেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন একটা বিপ্লবের পর যে কোনো দেশে একটা বিবর্তন দেখা দেয়। সেই বিবর্তনের ফলে কিছু মানুষ হঠাৎ ধনী শ্রেণীতে পরিণত হয়, আবার ভালো উচ্চবিত্ত মানুষ তাদের ধন-সম্পদ ধরে রাখতে পারে না।

কাজেই এক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক ধারা সুনিশ্চিত করা এবং ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা একান্তভাবে দরকার। সব বিবেচনায় বঙ্গবন্ধু সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে আমি বিশ্বাস করি। বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ধারা ছিল না। আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দিল, সে গণতন্ত্রের ফর্মুলা দিল বেসিক ডেমোক্রেসি! মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেয়া হল। আর বঙ্গবন্ধু চাইলেন মানুষ যেন তার ভোটের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকে।

যে অধিকার তিনি দিয়েছিলেন ’৭২-এর সংবিধানে। জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে বঙ্গবন্ধু এমন একটি পদ্ধতি এনেছিলেন যেখানে কেউ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারবে না। সরকারের পক্ষ থেকে যে যে প্রার্থী হবে সবার নাম একটি পোস্টারে দিয়ে প্রচার করা হবে। যে ব্যক্তি যত বেশি জনগণের কাছে যেতে পারবে, জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারবে সেই শুধু নির্বাচিত হবে। বাকশালের স্বচ্ছতা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এ পদ্ধতিতে দুটি নির্বাচন হয়।

সে নির্বাচনের একটি হয়েছিল কিশোরগঞ্জে। সেখানে সৈয়দ নজরুল ইসলামের ভাই দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু জনগণ ভোট দিয়েছিল একজন স্কুল মাস্টারকে। আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় পটুয়াখালীতে। এ পদ্ধতি চালু নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেছিলেন জানিয়ে আলোচনা সভায় তিনি বলেন, আমি তাকে (বঙ্গবন্ধু) জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি এ পদ্ধতি করলেন কেন? তিনি আমাকে বলেছিলেন, আমাদের দেশে একটি বিপ্লব হয়েছে। এখানে গেরিলা যুদ্ধ হয়েছে।

একটা বিপ্লবের পর কিছু মানুষের হাতে অর্থ চলে আসে। আমি চেয়েছি নির্বাচন যেন অর্থ এবং লাঠি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়। জনগণের কাছে যেন ভোটের অধিকারটা থাকে, প্রতিনিধি নির্বাচন করার অধিকারটা থাকে। তা নিশ্চিত করার জন্যই আমি এ পদ্ধতিটা শুরু করেছি।

বাকশাল বাংলাদেশের জন্য উপযোগী ছিল দাবি করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এটা বাংলাদেশের জন্য যে কতটা উপযোগী ছিল একসময় বাংলাদেশের মানুষ তা ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি। বঙ্গবন্ধু যে পদ্ধতিটা করে গিয়েছিলেন সেটা যদি কার্যকর করতে পারতেন তাহলে এসব প্রশ্ন (নির্বাচনে অস্বচ্ছতা) আর আসত না। সব থেকে জনদরদি যে ব্যক্তিটি জনসেবা করে সেই নির্বাচিত হয় আসতে পারত।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু দেশ গঠনে সময় পেয়েছিলেন মাত্র সাড়ে তিন বছর। সে সময় বাংলাদেশ ছিল দীর্ঘদিন শোষণ-বৈষ্যমের শিকার। তিনি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলছিলেন, তখনও বারবার একের পর এক ষড়যন্ত্র হয়েছে। তখন দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। তার সেই জাতীয় ঐক্যের ডাক আজকের দিনেও প্রাসঙ্গিক।

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা অনেকেই জানতেন কিন্তু বলতেন না- এমন মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। কেবল মহান মুক্তিযুদ্ধ নয়, ভাষা আন্দোলনেও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসামান্য অবদান রেখেছেন। হাতেগোনা দু-একজন সে অবদানের কথা বললেও অনেকেই সেসব কথা বলতেন না।

তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনে তার যে অবদান, একসময় সে ইতিহাস হারিয়ে গেছে। অনেক জ্ঞানী-গুণী মানুষও উল্লেখ করতেন না তার অবদান। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন, তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু ভাষার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ওই বছরই তিনি ভাষা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছেন। তার এসব অবদানের কথা অনেকেই জানতেন, কিন্তু লিখতেন না, বলতেন না।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, জাতির পিতার অবদানের এসব তথ্য একসময় মুছে দেয়া হয়েছিল। জাতির পিতার বিরুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যেসব রিপোর্ট করেছিল, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমি সেসব রিপোর্ট সংগ্রহ করেছিলাম। সেসব গোয়েন্দা রিপোর্টেই ভাষা আন্দোলনে জাতির পিতা কী করেছিলেন, সেসব তথ্য সংগ্রহ করি। তখন আমি ভাষা আন্দোলন নিয়ে অনেক বক্তব্য দেই। অনেকেই তখন আমার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন।

`তারা বলেন, আমি নাকি তথ্য আবিষ্কার করেছি’

শেখ হাসিনা বলেন, কেউ কেউ অবশ্য সেসব কথার উত্তরে লিখলেন। কিন্তু আজ সেই সত্য প্রকাশিত হয়েছে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, গোয়েন্দা নথি- এগুলো একে একে প্রকাশ করতে শুরু করেছি। এরই মধ্যে দুই খণ্ডে গোয়েন্দা নথি বের হয়েছে। এর দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে ১৯৫২ সালে জাতির পিতা যেসব কাজ করেছেন, সেগুলোর কথা। তিনি জেলখানায় থেকেই কিভাবে যোগাযোগ করেছেন, কিভাবে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, এমন সব তথ্য পাওয়া যাবে এই খণ্ডে। এরপর ১৯৫৩ সালের রিপোর্ট নিয়ে আরও এক খণ্ড বের হবে। তিনি কিভাবে আন্দোলন করেছেন, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাবে এই খণ্ডে।

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, সেই যে ভাষা আন্দোলন, সেই থেকেই কিন্তু স্বাধীনতার সূচনা। ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জেল থেকে ছাড়া পান তিনি। ফিরেই কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদার যে আন্দোলন, তা ফের শুরু করেন। তিনি আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই সময়ই তিনি বুঝতে পারলেন, এরা (পশ্চিম পাকিস্তানি) তো আমাদের নিজের মায়ের ভাষায় কথা বলতে দেবে না। এরা যেভাবে অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, তাতে আর এই হানাদার-পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকা যাবে না। এভাবে দেশ চলে না। স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে, সেই চিন্তা ওই ভাষা আন্দোলনের সময়ই বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় আসে। ১৯৫৮ সালে যখন আইয়ুব খান মার্শাল ল জারি করে গ্রেফতার করে, তখন থেকেই তার পরিকল্পনা- আর নয়, এবার স্বাধীন হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে স্বাধীনতার কথা বঙ্গবন্ধু কখনও প্রকাশ্যে বলেননি। যেহেতু তিনি স্বাধীনতার সংগ্রাম করবেন, সেহেতু যখন যতটুকু প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী ধাপে ধাপে তিনি আন্দোলন-সংগ্রাম এগিয়ে নিয়ে গেছেন। শোষণ আর বঞ্চনার কথা মানুষের মাঝে পৌঁছে দিয়েছেন, মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছেন। ১৯৭১ সালের সেই অসহযোগ আন্দোলনকে কিভাবে সশস্ত্র বিপ্লবে রূপ দেয়া যায়, ধীরে ধীরে পরিকল্পিতভাবে একের পর এক পদক্ষেপ নিয়ে তিনি সেই পরিস্থিতি তৈরি করেন। তারই ফল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও তাতে বিজয়।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী পালনের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, জাতির পিতার জন্মদিন পালন করছি। ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত আমরা ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা করেছি। আমরা চাই সারা বাংলাদেশে ইউনিয়ন থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি এলাকায় প্রস্তুতি নিতে হবে। জাতির পিতার এই জন্মদিন থেকে আমাদের শুরু হবে জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি।

You Might Also Like