বাংলাদেশে জঙ্গি আবিষ্কারের এত চেষ্টা কেন?

গত ৫ মে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে একটি বক্তব্য দিয়েছেন; যে বক্তব্যটিকে আমি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বলে অভিহিত করতে পারি। তিনি বলেছেন, ‘এই মাটিতে (বাংলাদেশে) কোনো জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের স্থান নেই। অনেকেই চেষ্টা করবে জঙ্গি আছে বলে এই দেশটাকে নিয়ে খেলা করতে। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে কাউকে এ দেশ নিয়ে খেলতে দেব না।’ তাঁর এই মন্তব্যটি শুনে মনে হয়েছে একটি ছোট দেশের নেতাও যদি সাহসী ও আত্মপ্রত্যয়শীল হন, তাহলে সে দেশটির শুধু মর্যাদাই বাড়ে না, তার সার্বভৌমত্বেরও একটা গর্বিত প্রকাশ ঘটে।

শেখ হাসিনা এমন সময় এই উক্তিটি করেছেন, যখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্যতম কর্মকর্তা নিশা দেশাই ঢাকায় এসে মাত্র পা রেখেছেন। বাংলাদেশে জঙ্গি বা আইএস আছে বলে অনবরত দাবি করছে আমেরিকাই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ও সরকার বারবার অস্বীকৃতি জানানোর পরও সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্মকর্তাদের টনক নড়েনি। তাঁরা বাংলাদেশে জঙ্গি আছে বলে অনবরত চিৎকার করে চলেছেন। উদ্দেশ্যটা অনেকের কাছে স্পষ্ট; জঙ্গি দমনে বাংলাদেশকে সাহায্য দানের নামে দেশটিতে ঢুকে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের সামরিক সম্প্রসারণনীতিটি সফল করা এবং বাংলাদেশেও পাকিস্তানের পরিস্থিতি তৈরি করা।
নিশা দেশাই তাঁদের এই নীতি সফল করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যই কি ঢাকায় এসেছিলেন? যদি এসে থাকেন, তাহলে শেখ হাসিনার স্পষ্টোক্তি তাঁকে অবশ্যই নিরাশ করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্র কর্মকর্তা ঢাকা ত্যাগের আগে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাঁদের বৈঠক থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান হাসিনা সরকারকে সহযোগিতা দানের ব্যাপারে দিল্লি ও ওয়াশিংটন দুই সরকারই ঐকমত্য পোষণ করে। এই খবরটি আশাব্যঞ্জক। মনে হয়, নিশা দেশাই হাসিনা সরকারের ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্য নিয়ে যদি ঢাকায় এসে থাকেন, তাতে তিনি সফল হননি। বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন নীতির মৌলিক পরিবর্তন হওয়া দরকার। তাদের সত্তরের দশকের ঢাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অমিত্রজনোচিত মনোভাবের ভূতকে এখনো কাঁধ থেকে একেবারে নামাতে পারেনি।
বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতিই নন, তিনি যত দিন বেঁচে ছিলেন তত দিন দেশের সার্বভৌমত্বের মর্যাদায় কাউকে আঘাত করতে দেননি। আমার একটি ঘটনার কথা মনে আছে। ১৯৭৪ সালের গোড়ায় পাকিস্তানের লাহোর শহরে ইসলামী রাষ্ট্রের শীর্ষ সম্মেলন হয়। এই সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং বাংলাদেশের দাবি মোতাবেক পাকিস্তানের ভুট্টো সরকার মুজিব সরকারকে স্বীকৃতি দেয়। বঙ্গবন্ধু লাহোর সম্মেলনে যোগ দিতে রাজি হন। তখন মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তান সফরে যাওয়ার ব্যাপারে ভারতের সঙ্গে একটু পরামর্শ করে গেলে হয় না? বঙ্গবন্ধু জবাব দিয়েছিলেন, ভারত আমাদের মিত্র রাষ্ট্র। অবশ্যই আমরা ভারতের সঙ্গে অনেক ব্যাপারে সহযোগিতা করব। তাই বলে আমরা ভারতের করদরাজ্য নই যে আমাদের নিজস্ব সব ব্যাপারে ভারতের মতামত নিতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর লাহোর গমনের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দিল্লির একটি ইংরেজি দৈনিক খবরটি ছেপে হেডিং দিয়েছিল, গঁলরন’ং রহফড়সরঃধনষব পড়ঁৎধমব ঃড় ঃধশব ফবপরংরড়হ রহফবঢ়বহফবহঃষু (স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে মুজিব অদম্য সাহস দেখালেন)। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাও আরো বড় শক্তি আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতার ব্যাপারে একই সাহস ও স্বাধীন চিত্ততার প্রমাণ দেখালেন। তাঁর সরকার আমেরিকার সঙ্গে মৈত্রী ও সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু তা বশ্যতামূলক সহযোগিতা নয়। পদ্মা সেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের সাহায্য দান ও ড. ইউনূস সংক্রান্ত সমস্যার ক্ষেত্রেও হাসিনা সরকার নতজানু নীতি অনুসরণ না করার প্রমাণ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশে জঙ্গি বা আইএস আছে বলে মার্কিন দাবির পেছনে দক্ষিণ এশিয়ায় তাদের সামরিক সম্প্রসারণ নীতির যেমন যোগসাজশ আছে, তেমনি আরো একটি উদ্দেশ্য কাজ করছে বলে আমার ধারণা। এই উদ্দেশ্যটি হচ্ছে বাংলাদেশে সব সন্ত্রাসের উৎস জামায়াতের ভূমিকাকে আড়াল করার জন্য বাংলাদেশের মাটিতে আইএসের অস্তিত্ব আবিষ্কার করা এবং সাম্প্রতিক টার্গেটেড কিলিংয়ের দায়িত্বও আইএসের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া। তাতে জামায়াতকে কলঙ্কমুক্ত রাখা যাবে; বাংলাদেশ সরকার যাতে সন্ত্রাসী দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করে তার জন্য চাপ সৃষ্টি করা যাবে এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের অবস্থান রক্ষা করা যাবে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার গোড়া থেকেই দেশটিতে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার কাজে আমেরিকা জামায়াতকে প্রচ্ছন্ন সহযোগিতা দিয়েছে। পাকিস্তানে পঞ্চাশের দশকে কাদিয়ানিবিরোধী দাঙ্গায় ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশে গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যায় জামায়াতের বর্বর ভূমিকার কথা জানা থাকা সত্ত্বেও আমেরিকা জামায়াতকে ‘মডারেট মুসলিম দল’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছে এবং বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের সাবেক জোট সরকারের প্রতিই আমেরিকার কৃপা ও অনুকম্পা ছিল বেশি। জামায়াত তাই একটি চরমপন্থী সন্ত্রাসী দল হিসেবে বাংলাদেশে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত হোক ও হাসিনা সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করুক (দেশবাসীর দাবি অনুযায়ী) তা ওয়াশিংটন চায় না। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও চূড়ান্ত দণ্ডদানের ব্যাপারেও আমেরিকার মনোভাব খুব একটা অনুকূল ছিল না। এখন বাংলাদেশে জামায়াতকে রক্ষা করার স্বার্থে জামায়াতের সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতির দায় আইএসের ঘাড়ে আমেরিকা চাপাতে চাইলে বিস্ময়ের কিছু নেই।
তবে এখানে একটি প্রশ্ন, আমেরিকা কি তাদেরই সৃষ্ট আইএসকেও দমন করতে চায়? সিরিয়া ও ইরাকে তার সামরিক ভূমিকা এর প্রমাণ দেয় না। বরং আমেরিকা চেয়েছে আইএসের সহায়তায় সিরিয়ার সেক্যুলার আসাদ সরকারকে সরাতে। তারপর ইরানে রেজিম চেঞ্জের পরিকল্পনার বাস্তবায়নে ছিল তাদের আগ্রহ। রাশিয়ার হস্তক্ষেপে তাদের এই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। আইএস যে এখন আগের মতো আগ বাড়াতে পারছে না তার মূল কারণ রাশিয়ার আইএসবিরোধী সামরিক অভিযান।
বাংলাদেশে আইএস বা জঙ্গিরা যে এখনো ঘাঁটি গাড়তে পারেনি তার প্রমাণ গত চার দশকে সংঘটিত হত্যার রাজনীতির ধারা ও পদ্ধতি। এটা যে জামায়াত ও তার ছায়া সন্ত্রাসী দলগুলোর পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—এটা জানার জন্য এফবি আই বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের গোয়েন্দা দ্বারা তদন্ত চালানোর কোনো দরকার নেই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত যে বর্বর হত্যার রাজনীতি শুরু করে বর্তমানের সন্ত্রাস ও হত্যাও তার ধারাবাহিকতা মাত্র। একটু লক্ষ করলেই এই ধারাবাহিকতার প্রমাণ পাওয়া যাবে।
একাত্তরের গণহত্যা ও বুদ্ধিজীবী হত্যার কথা বাদই দিলাম। তখন জামায়াতের ভূমিকা ছিল মূলত কোলাবরেটরের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সামরিক শাসকদের কৃপায় রাজনৈতিক পুনর্বাসনের পর তারা নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য নিজেরাই সন্ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির পথ বেছে নেয়। সত্তরের দশকের শেষের দিকে ও আশির দশকের গোড়ায় জামায়াতের ছাত্রসংগঠন শিবির ছদ্মবেশী সন্ত্রাসীর ভূমিকায় নামে। শুরু হয় দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমতের ছাত্র ও যুবকদের হাতের ও পায়ের রগ কেটে দেওয়া। যাদের হত্যা করা হয় তাদের রক্তাক্ত মৃতদেহ ড্রেনের মধ্যে ফেলে রাখা হতে থাকে। এই রগ কাটার সন্ত্রাস তখন সারা দেশে বিভীষিকার সৃষ্টি করেছিল।
আমেরিকার কাছ থেকে ‘মডারেট ইসলামী দল’-এর সার্টিফিকেট পেয়ে বিএনপির মদদে রাষ্ট্রক্ষমতায় শরিক হয়ে জামায়াতের সন্ত্রাস এক নতুন রূপ ধারণ করে। বাংলা ভাই, শায়খ আবদুর রহমান প্রমুখ ত্রাস সৃষ্টিকারী সন্ত্রাসীদের আবির্ভাব ঘটে। গোটা উত্তরবঙ্গে শুরু হয় তাদের হত্যা, লুণ্ঠন ও অত্যাচারের তাণ্ডব। পুলিশের চোখের সামনে তারা মানুষ হত্যা করে গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখতে থাকে। জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী তাদের অত্যাচার ঢাকা দেওয়ার জন্য বলতে থাকেন, দেশে বাংলা ভাই বলে কেউ নেই, এটা মিডিয়ার আবিষ্কার। এই বাংলা ভাইরা পরে আবিষ্কৃত হয় এবং তাদের ফাঁসি হয়।
জামায়াত তার সন্ত্রাসের রাজনীতির পদ্ধতি বারবার বদল করেছে। তা সত্ত্বেও তা ধরা পড়তে দেরি হয়নি। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য তারা বিএনপির নির্বাচন বর্জনের আন্দোলনে সমর্থন দানের নামে শুরু করে পেট্রলবোমা সন্ত্রাস। নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মারার অভিযান। দূরপাল্লার বাসে বোমা হামলা, যাত্রী পুড়িয়ে মারা। এই মৃতদের মধ্যে নারী ও শিশুও ছিল। সরকার সর্বশক্তি প্রয়োগে এই সন্ত্রাসও দমন করেছে। বিএনপি ও তাদের সমর্থক সুধীসমাজের সদস্যরা একে আখ্যা দিয়েছেন রাজনৈতিক নির্যাতন। আমেরিকাসহ পশ্চিমা জগতের অনেকে এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার ক্ষুণœ হচ্ছে।
জামায়াতের সাম্প্রতিক সন্ত্রাস মুক্তমনা ব্লগার হত্যা ও বিদেশি হত্যা। ধর্মের নামে টার্গেটেড কিলিং। মানুষ কথা বলতে এখন ভয় পাচ্ছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে সব শ্রেণির মানুষের মনে। এই জামায়াতি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও উদ্দেশ্য দেশের স্থিতিশীলতা ধ্বংস করা; অসাম্প্রদায়িক সরকারের পতন ঘটানো এবং দেশে তালেবানি ধরনের মধ্যযুগীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা। জামায়াত এখন ক্ষমতায় নেই। তথাপি দেশে তারা বেছে বেছে স্বাধীন চিন্তার মানুষ হত্যা করছে। আবার ক্ষমতায় এলে বা অন্য কোনো বিশেষ দল ক্ষমতায় এলে তাদের সহযোগী বা শরিক সেজে তারা কী করতে পারে, দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বধ্যভূমিগুলো (রায়েরবাজারসহ) কি তার প্রমাণ নয়?
বাংলাদেশে তথাকথিত ইসলামিক স্টেট (খেলাফত) প্রতিষ্ঠার জন্য আইএস সন্ত্রাস চালাচ্ছে না। সন্ত্রাস চালাচ্ছে জামায়াত। আর এই সত্যটা ঢাকা দেওয়ার জন্য অবিরাম প্রচার চালানো হচ্ছে বাংলাদেশে আইএস আছে এবং তারাই এই সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এই প্রচারণা যেমন মিথ্যা প্রমাণ করা দরকার, তেমনি জামায়াতের এই টার্গেটেড কিলিং বন্ধ করার জন্য সরকারকে আরো কঠোর হতে হবে। দেশের সচেতন মানুষ এখন বুঝতে পেরেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ভালো হোক আর মন্দ হোক, এই সরকারই সর্বশক্তি প্রয়োগে দেশকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো কিলিং ফিল্ডে পরিণত হতে দেয়নি। এই সরকারের বদলে জামায়াত সমর্থিত কোনো সরকার ক্ষমতায় এলে আজকের সুধীসমাজের যে বুদ্ধিজীবীরা কথায় কথায় হাসিনা সরকারের সমালোচনা করে ‘নিরপেক্ষতা’র ঢেঁকুর তুলছেন, তাঁরাও আর নিজের ঘরে নিরাপদ থাকতে পারবেন কি?

You Might Also Like