বাংলাদেশের পাকিস্তান সফর নিয়ে জটিলতার নেপথ্যে ভারত

বাংলাদেশ পাকিস্তান

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পাকিস্তান পুরো সফর করার ইচ্ছা আছে কিন্তু ভারতের জন্য পারছে না, এমন একটি মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশী। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সফরসূচি অনুযায়ী পাকিস্তানে দুটো টেস্ট ম্যাচ ও তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলার কথা বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের।

 

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তানে কেবলমাত্র টি-টোয়েন্টি খেলতে রাজি, তাও আবার একটি নির্দিষ্ট ভেন্যুতে। যদিও ভেন্যুর নাম প্রকাশ করেনি কোনো বোর্ড। তবে টেস্ট ম্যাচ খেলতে না চাওয়ায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ও দেশটির সরকার মহলে তীব্র অসন্তুষ্টি দেখা গিয়েছে। তার মধ্যে একটি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, সেখানে ভারতের প্রসঙ্গ ব্যাপারটিতে বাড়তি একটি প্রেক্ষাপট নিয়ে এসেছে।

 

‘ক্রিকেট: বাংলাদেশের পাকিস্তান সফর নিয়ে জটিলতায় ভারতের ভূমিকা আছে?’ শিরোনামে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে।

 

বিবিসি বাংলার ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-শাহ মেহমুদ কোরেশী বলেন, শ্রীলঙ্কা মাত্র খেলে গিয়েছে, তাদের ক্রিকেটাররা সবই ইতিবাচক বলেছেন। আমরা বাংলাদেশকে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশ মনে হয় তৈরিই ছিল কিন্তু আমার ধারণা ভারত এখানে চাপ দিচ্ছে।

 

মূলত এই দ্বন্দ্ব শুরু হয় এর আগেই পাকিস্তান সফরে টেস্ট খেলা নিয়ে যখন বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ডের মধ্যে আলাপ চলছে ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক বোর্ডের জয়েন্ট সেক্রেটারি জয়েশ জর্জ বলেছেন শেখ মুজিবুর রহমানের শতবর্ষ উৎযাপন উপলক্ষ্যে যে টি-টোয়েন্টি সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে সেখানে যদি ভারতের ক্রিকেটার খেলে তাহলে পাকিস্তানের কোনো ক্রিকেটার নেয়া যাবে না।

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের একজন মুখপাত্র বিবিসি উর্দুকে জানায়, এই খেলা হবে এশিয়া একাদশ ও বিশ্ব একাদশের মধ্যে ১৮ ও ২১শে মার্চ। কিন্তু তখন তো পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা পাকিস্তান সুপার লিগে খেলবে।

বিবিসি উর্দুকে পাকিস্তানের ক্রিকেট বোর্ডের মুখপাত্র আরো বলেন, বাংলাদেশ মে মাসে একটি টেস্ট খেলতে চেয়েছে তাও আবার ইসলামাবাদে যেটা সম্ভব নয়। একে তো ইসলামাবাদে স্টেডিয়াম নেই এবং সে সময় রমজান মাস চলবে। এবারই প্রথম এমন একটি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড।

এর আগে ১৯৯৭ সালের মে মাসে ভারতের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে যে খেলা হয়েছিল সেখানে ভারত, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান অংশ নেয়। এই সিরিজেই সাইদ আনোয়ার ১৯৪ রানের একটি ইনিংস খেলেন।

২০০৪ সালে ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থার ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ভারত ও পাকিস্তান কলকাতায় একটি ম্যাচ খেলে।

১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের রজত জয়ন্তী অর্থাৎ ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপ আয়োজিত হয়েছিল যেখানে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশ খেলেছে। উল্লেখ্য ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে পাকিস্তানি ক্রিকেটার নিষিদ্ধ হয়েছে প্রায় এক দশক আগে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশীর বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একজন মুখপাত্র জালাল ইউনুসের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়, এখানে ভারতের কোনো চাপ আছে কি নেই।

বিসিবির মিডিয়া বিভাগের এই প্রধান বিবিসি বাংলাকে বলেন, এনিয়ে আমাদের কোনোই বক্তব্য নেই। এটা তাদের মতামত, এখানে আমরা কী বলবো। আমি মনে করি আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে আমরাই যথেষ্ট। সরকার ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড পাকিস্তানে নিরাপত্তা নিয়ে সফর করেছে। এটা বাংলাদেশ সরকার থেকেই বলা হয়েছে শুধু টি-টোয়েন্টি খেলতে দল পাঠানো হবে।

ভারতের ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিসিসিআইয়ের কাছেও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রসঙ্গে মন্তব্য চাওয়া হয় ইমেইলের মাধ্যমে কিন্তু সেই ইমেইলের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

এখানে পাকিস্তানে টি-টোয়েন্টি খেলতে পারলে টেস্ট খেলতে সমস্যা কোথায় এমন একটি প্রশ্ন থেকে যায়। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী নিজামুদ্দিন চৌধুরী বলেন, “নিরাপত্তা নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা বোঝেন যে অল্প সময় থাকা ও বেশি সময় থাকার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। আমরা টি-টোয়েন্টি খেলতে রাজি হয়েছি, এটা পাকিস্তানের মাটিতে ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।”

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড আমাদের এই প্রস্তাব যদি গ্রহণ করে সেটা পাকিস্তানের মাটিতে ক্রিকেট ফেরানোর যে প্রক্রিয়া সেখানে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন মি: চৌধুরী।

পাকিস্তানের মাটিতে টেস্ট খেলা নিয়ে জলঘোলা চলছে প্রায় ১৫ দিন ধরেই। এর মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে গণমাধ্যমে বক্তব্যে একটা অনড় অবস্থান লক্ষ্য করা গিয়েছে।

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি এহসান মানি বলছেন, পাকিস্তানের কোনো খেলা পাকিস্তানের বাইরে হবে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড থেকে জানানো হয়েছে, টি-টোয়েন্টি খেলাটা হোক, টেস্টের ব্যাপারটা এখন নয় পরে দেখা যাবে।

বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল বলেন, বাংলাদেশ সরকার এখানে সিদ্ধান্ত নেবে। নিউজিল্যান্ডে একটা ঘটনা প্রায় ঘটে গিয়েছিল। এখন কোনো ধরণের ঝুঁকিই নেয়া যাবে না। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সিদ্ধান্ত এখানে মুখ্য নয়, সরকার থেকে যে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছে সেটাই হবে।

জালাল ইউনুস বিবিসি বাংলাকে আবারো পাকিস্তান সফর নিয়ে নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানান, আমরা শুধু টি-টোয়েন্টিই খেলবো, এটায় যদি তারা রাজি না হয় সেটা একান্ত তাদের ব্যাপার। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ক্রিকেট অপারেশন্স প্রধান আকরাম খান বলেন, এতো কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এক মাস থাকলে মানসিকভাবে সেটার নেতিবাচক প্রভাব থাকবে।

সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দল পাকিস্তানের মাটিতে দুই দফা সফর করে, যেখানে ওয়ানডেতে শ্রীলঙ্কার দশজন ক্রিকেটার নিজেদের নাম সরিয়ে নিলেও টেস্ট ক্রিকেটে পুরো দল খেলেছে দুটি ম্যাচ। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ২০১৯ সালে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট দল ও অনুর্ধ্ব ১৬ ক্রিকেট দলকে পাকিস্তানে সিরিজ খেলতে পাঠিয়েছে।

You Might Also Like