হোম » ‘বাংলাদেশের তিন শত্রু পাকিস্তান বিএনপি ও জামায়াত’

‘বাংলাদেশের তিন শত্রু পাকিস্তান বিএনপি ও জামায়াত’

ঢাকা অফিস- বুধবার, জানুয়ারি ১৩, ২০১৬

একান্ত সাক্ষাৎকারে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু

বীর মুক্তিযোদ্ধা হাসানুল হক ইনু। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের তথ্যমন্ত্রী। ২০০৮ সালে গঠিত মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দায়িত্ব দিয়েছিলেন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে। এখনো সেই মন্ত্রণালয়েরই দায়িত্বে আছেন। সরকারের দুই বছর পূর্তিতে তার মুখোমুখি হয়েছিল বাংলাদেশ প্রতিদিন। মন্ত্রণালয়ের নিজ দফতরে দেওয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে তিনি কথা বলেছেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পঁচাত্তরের পটপরিবর্তন, জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসন, রাজাকারদের পুনর্বাসন, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন প্রতিহতের নামে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামায়াত জোটের দেশব্যাপী সহিংসতা, সর্বশেষ একাত্তরে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সংশয় এবং দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে। কথা বলেছেন সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বাংলাদেশ প্রতিদিন এর বিশেষ প্রতিনিধি শিমুল মাহমুদ ও জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক নিজামুল হক বিপুল।

প্রশ্ন : শুরু করতে চাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিভিন্ন দিকের পাশাপাশি দেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

হাসানুল হক ইনু : মুক্তিযুদ্ধ একটা রাজনৈতিক যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ কখনই একজন মেজরের বাজানো হুইসেলের শব্দ নয়। অথবা কোনো সৈনিকের ছোড়া একটা গুলিও নয়। মুক্তিযুদ্ধে পক্ষ-বিপক্ষ ছিল, শত্রু-মিত্র ছিল। যোদ্ধা ছিল, সমর্থক ছিল, নেতা ছিল। মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া কোনো ধন নয় অথবা মুক্তিযুদ্ধ দুই মলাটে বাঁধা একটা ইতিহাসের বইও নয়। মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন। আবার এই মুক্তিযুদ্ধের ভিতর সংগঠিত পাকিস্তানি ও আলবদর-রাজাকারদের এবং জামায়াতে ইসলামীর গণহত্যা ও নারী নির‌্যাতন— ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক ও বেদনাদায়ক একটা অপরাধযজ্ঞ। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ পাকিস্তানের ভিতর সংঘটিত বিচ্ছিন্নতাবাদী কোনো আন্দোলন নয়। ২৬ মার্চ বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর পাকিস্তানিরা আক্রমণ পরিচালনা করে দখল করে নেয়। সে জন্য আমরা বলি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেই হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করা হয়। সে জন্য বাংলাদেশের দুটো দিবস আছে। বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস। বিজয় দিবসটা পাকিস্তানিদের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো ‘সন্ধি চুক্তি’ ছিল না। এটি আত্মসমর্পণের দলিল। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তানিরা বাংলাদেশ ও ভারত দুই সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদ ছিল। প্রশাসন ছিল। কর ও আবগারি বিভাগ ছিল। ডাক বিভাগ ছিল। ট্রেজারি ছিল। বেতার ছিল। দূতাবাস ছিল। সশস্ত্র বাহিনী ছিল, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ছিল। বন্ধু রাষ্ট্র ও শত্রু রাষ্ট্র ছিল। সেই সরকারের অসংখ্য কর্মচারীর মধ্যে একজন কর্মচারী জিয়াউর রহমানও ছিলেন। স্বাধীনতার ঘোষণা কে দিয়েছেন এ বিতর্ক যারা করেন, তাদের উদ্দেশে বলতে চাই— বঙ্গবন্ধু ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ইমাম। তার পেছনের কাতারে ছিলেন কোটি কোটি জনগণ। ছিলেন অনেক মোকাব্বির। জিয়া তেমনই একজন মোকাব্বির।

১৯৭১ সালে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল, ’৭২ থেকে ’৭৫ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সরকারের প্রশাসনিক পদক্ষেপ সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে। ৭৩টি আদালত গঠন করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রায় ৩৮ হাজারের মতো পাকিস্তানপন্থি ও একাত্তরের গণহত্যায় সম্পৃক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। একপর‌্যায়ে যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল, অথচ তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তাদের বঙ্গবন্ধু ক্ষমা করেন। কিন্তু বাকি প্রায় ১২ হাজার মানুষকে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, শিশু নির‌্যাতন, গণহত্যাসহ নানা জঘন্য অপরাধের অভিযোগে ক্ষমা করা হয়নি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আগ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজারের মতো অভিযুক্তের তদন্ত সম্পন্ন এবং বিচারকাজ শুরু হয়েছিল। দু-একজনের বিচার শেষ করে সাজাও দেওয়া হয়েছিল। তাই এই যে ১২ হাজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আজ যারা একাত্তরে কিছু্ হয়নি বলে চিত্কার করছেন— তাদের উদ্দেশে বলি, একাত্তরে জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। এর মধ্যে ১২ হাজার কারাগারে ছিল বিভিন্ন অভিযোগ মাথায় নিয়ে। আজকের যে যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে, এ তালিকা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক না করে সেই ১২ হাজার অভিযুক্তের তালিকা ধরে তদন্ত করলেই যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে যুক্তদের বিচার সম্পন্ন হয়ে যাবে। পঁচাত্তরের পর জিয়ার সামরিক সরকার এ আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। শুধু তা-ই নয়, কারাগার থেকে ১২ হাজার জঘন্য অপরাধীকে মুক্ত করে দেয়। সংবিধানে হস্তক্ষেপ করে ধর্মভিত্তিক দল গঠনের অধিকার এবং অপরাধের সঙ্গে জড়িত ১২ হাজার ব্যক্তিকে রাজনীতিতে জড়িত থাকার অধিকার দেয়। এভাবেই জেনারেল জিয়ার হাত ধরে ১২ হাজার কুখ্যাত রাজাকার বাংলাদেশে রাজনীতি ও নির্বাচন করার সুযোগ পায়। ’৭৮ সালের রাষ্ট্রপতির হ্যাঁ-না নির্বাচন আর ’৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এসব চিহ্নিত পাকিস্তানপন্থি রাজাকার নির্বাচনে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়। ভোট-ডাকাতির নীলনকশার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শাহ আজিজুর রহমানসহ কুখ্যাত পাকিস্তানি রাজাকাররা সংসদে প্রবেশের সুযোগ পায় ও সংসদকে অপবিত্র করে।

দেশে এখন গণতন্ত্রের যাত্রা অব্যাহত থাকলেও অতীতের এই রাজাকারের জঞ্জাল রাজনীতির ময়দানে আছে। যেহেতু তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে সাজা সম্পন্ন হয়নি, তাই তারা সেই সুযোগে এখনো রাজনীতি করছে। আমি মনে করি, পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফর বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গোলাম আযম, নিজামী, সাকা চৌধুরীসহ রাজাকাররা দ্বিতীয় মীর জাফর হিসেবে বিশ্বাসঘাতকতা করে। আর তিন নম্বর মীর জাফর খন্দকার মোশতাক, যিনি পঁচাত্তরে পেছন দিক থেকে বঙ্গবন্ধুর পিঠে ছুরি মারার মধ্য দিয়ে মীর জাফরী করেন। চার নম্বর মীর জাফর হচ্ছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। যিনি ইতিহাসের আঁস্তাকুড় থেকে রাজাকার জামায়াতে ইসলামীকে পুনর্বাসন করেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ধারায় বাংলাদেশকে পরিচালিত করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে মীর জাফরী করেছেন। রাজাকারদের প্রথম জন্মদাতা পিতা পাকিস্তান; বাংলাদেশে পঁচাত্তরের পর মৃত রাজাকারদের দ্বিতীয় জীবন দিলেন জেনারেল জিয়া এবং তাদের দ্বিতীয় জন্মদাতা পিতা হিসেবে নিজের নাম লেখান তিনি।

জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক শাসন জারির জন্য অপরাধ করেছেন, তার চেয়েও বড় অপরাধ করেছেন বাংলাদেশকে রাজাকারদের কাছে ইজারা দেওয়ার চক্রান্ত করে। বীরউত্তম খেতাবধারী জিয়াউর রহমান মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কলঙ্ক। ভবিষ্যতে ইতিহাস তা-ই বলবে।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড় করায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র। এই চার স্তম্ভের ওপরই কেবল বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হতে পারে, মানবিক হতে পারে, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত হতে পারে। পঁচাত্তরের হস্তক্ষেপকারী সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং জিয়া এই চারটি স্তম্ভকে ধ্বংস করল। সামরিকতন্ত্র দিয়ে গণতন্ত্র হত্যা করে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নামে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র উঠিয়ে দিয়ে চারটি স্তম্ভ ধ্বংস করে। জিয়াউর রহমানের এই চার স্তম্ভ ধ্বংসের মধ্য দিয়ে যুদ্ধাপরাধীরা, সাম্প্রদায়িক শক্তি, জামায়াতে ইসলামী ও রাজাকাররা বাংলাদেশের ইতিহাসকে নির্বাসনে পাঠায়, ধামাচাপা দেয়। বঙ্গবন্ধুকে নির্বাসনে পাঠায়, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসনে পাঠায়, জাতীয় কবি নজরুলকে খণ্ডিত আকারে উপস্থাপন করে এবং বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও কৃষ্টিকে বিকৃত করে। ’৭৫ থেকে ’৯৬ ছিল বাংলাদেশের জন্য একটা অন্ধকার যুগ। এই সময়ে জন্মগ্রহণ করা কোটি কোটি নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের এক পাল্লায় মেপে রাজাকারদের হালাল করার চক্রান্ত চলেছে।

ইতিহাসের ডাস্টবিন বুকে নিয়ে বাংলাদেশ কখনই গতিশীলভাবে সামনের দিকে এগোতে পারবে না। তা বুকের ওপর রেখে বাংলাদেশ সামনের দিকে এগোতে গেলে বারবার হোঁচট খাবে। বাংলাদেশকে যদি সামনে এগোতে হয়, তাহলে ইতিহাসের ডাস্টবিনকে বুকের ওপর থেকে ফেলে দিতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। নব্বইয়ে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে সামরিক শাসনকে উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে জনগণ আশা করেছিল বাংলাদেশ এবার গণতন্ত্রের দিকে এগোবে। আর কোনো বিপদের মধ্যে পড়বে না। নব্বইয়ের সামরিক শাসনবিরোধী গণঅভ্যুত্থান দুই যমজ সুযোগ তৈরি করে দেয়। এর একটি হচ্ছে গণতন্ত্র ও আরেকটি ডিজিটাল বাংলাদেশ। সারা বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির পথে যাত্রা করে। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া ’৯১ থেকে ’৯৬ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন থাকায় নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের দুই যমজ সুযোগ গণতন্ত্র ও ডিজিটালাইজেশন হাতছাড়া হয়। গণতন্ত্রের সুযোগে তিনি আবারও সামরিক শাসনের রেখে যাওয়া সাম্প্রদায়িকতার জঞ্জালকে পাশে টেনে নেন এবং রাজনীতিতে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তখন জাতির সামনে প্রশ্ন দেখা দেয়— ইতিহাসের ডাস্টবিন কে সরিয়ে দেবে? প্রত্যাশা ছিল একাত্তর ও পঁচাত্তরের খুনিসহ বড় বড় অপরাধ কর্মের বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশ আইনের শাসনের দিকে যাবে, যাতে কোনো দিন আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবৈধ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ না করতে পারে। কিন্তু খালেদা জিয়া তার স্বামীর যোগ্য স্ত্রী হিসেবে জিয়া যা পারেননি তা-ই করলেন। তিনি রাজাকারদের সঙ্গে প্রকাশ্য দহরম-মহরম শুরু করলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে জানে মেরে ফেলার চক্রান্ত করলেন। ফলে শেখ হাসিনাকে হত্যার প্রচেষ্টা হিসেবে ২১ আগস্ট ভয়াবহ হামলা দেখি। পাকিস্তানিরা যে কৌশল গ্রহণ করত, খালেদা জিয়া একই কৌশল গ্রহণ করলেন। এক. দমন কর, না পারলে জানে মার, দুই. ইতিহাস বিকৃত করে দাও। জনগণকে বিভ্রান্ত কর। ভোট-ডাকাতির মাধ্যমে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাক। প্রশ্ন দেখা দিল, গণতন্ত্র-উত্তর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদী অপরাজনীতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। এ প্রশ্নে আমরা দেখছি, বাংলাদেশের জনগণকে অতীতে একাত্তরের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের উচ্ছেদ পর্ব। পঁচাত্তরের সামরিক হস্তক্ষেপের পর নব্বইয়ের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামরিক শাসনের উচ্ছেদ পর্ব। এরপর তিন নম্বরে দেখা দিল সাম্প্রদায়িক, জঙ্গিবাদী, রাজাকার-সমর্থক সরকারকে উচ্ছেদের পর্ব। সুতরাং আবার গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়। সরকারে আসীন রাজাকার, জঙ্গিবাদ, জামায়াত-সমর্থিত খালেদার নেতৃত্বে জঙ্গিবাদী সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মহাসংগ্রামের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া ক্ষমতাচ্যুত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়েও তারা ক্ষমতাচ্যুত হলো। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত খালেদা জিয়া আরেকবার প্রমাণ করলেন, তিনি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন না। তিনি প্রথম দিন থেকেই অনুপস্থিত থেকে সংসদকে অকার্যকর করার চেষ্টা করেছেন। সেখানেও ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি আগুনযুদ্ধ করেছেন। খালেদা জিয়া নির্বাচন ও আলোচনার ধার ধারেননি। তিনি একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে অস্বাভাবিক সরকার গঠন করতে চান। এর আড়ালে তিনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিচালিত যে উন্নয়ন ও সংস্কারের ধারা চলছে তা স্তব্ধ করে দিতে চান। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দিতে চান। এই হচ্ছে খালেদা জিয়ার মূল উদ্দেশ্য। ফলে ২০০৮ সাল থেকে তিনি সংসদে আসেননি, সংলাপে আসেননি, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেননি।

খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করে একে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছেন। নির্বাচন আটকানোর চেষ্টা করেছেন। যখন পারেননি তখন তিনি নাশকতা-অন্তর্ঘাত, জঙ্গিবাদী তত্পরতার মধ্য দিয়ে পুরো নির্বাচনকেই বানচালের চক্রান্ত করেছিলেন। বাংলাদেশে খালেদার চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনী ধারা রক্ষা পেয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের এক বছর পর গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের ওপর আগুনযুদ্ধ চাপিয়ে দেন। দিবালোকে এবং গোপনে তিনি মানুষ পোড়ানোর জঘন্য অপরাধ কর্মে লিপ্ত হন। সেখানেও তিনি পরাজিত হন। আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি, খালেদার নেতৃত্বে ক্ষমতাচ্যুত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত, জেএমবি জঙ্গিচক্র বাংলাদেশে নতুনভাবে চক্রান্তের জাল বিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত করছে।

আমরা এখন চতুর্থ পর্বে আছি। অর্থাৎ ক্ষমতাচ্যুত খালেদা-জামায়াত-জেএমবি চক্রের চক্রান্ত নস্যাৎ করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিরাপদ হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ মুহূর্তে বাংলাদেশ কোন পথে যাবে। বাংলাদেশ কি উন্নয়নের পথে যাবে? নাকি তালেবানি পথে যাবে? আইএসের পথে যাবে? নাকি সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী পথে যাবে? আমার উত্তর, বাংলাদেশ কখনই পাকিস্তান, তালেবান, আইএসের পথে যাবে না। বাংলাদেশকে বাংলাদেশের পথেই হাঁটতে হবে। তবেই বাংলাদেশ সমৃদ্ধির মুখ দেখবে। বাংলাদেশে আর কোনো দিন সামরিক সরকার আসবে না। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত-সমর্থক, জেএমবি-সমর্থক সরকার হবে না। এর নিশ্চয়তা বিধান করতে হলে ক্ষমতাচ্যুত খালেদা, জামায়াত, জেএমবি চক্রকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে দমন ও ধ্বংস করে দিতে হবে। এখানে কোনো মাঝামাঝি পথ নেই। অতীতে জাতির ক্রান্তিলগ্নে একাত্তরের যুদ্ধে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে যেমন মিটমাট হয়নি, পঁচাত্তরের পর যেমন গণতন্ত্র ও সামরিক সরকারের মধ্যে মিটমাট হয়নি, জামায়াত-জেএমবি, রাজাকার-সমর্থিত খালেদার সরকারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের যেমন কোনো মিটমাট হয়নি, মাঝামাঝি কোনো পথ তৈরি করা যায়নি, ঠিক এবারও যত নির্মমই হোক না কেন, খালেদার নেতৃত্বে জেএমবি, জামায়াত, রাজাকার চক্রের সঙ্গে গণতান্ত্রিক শক্তির কোনো মিটমাট সম্ভব নয়। এই মিটমাটের ফর্মুলা যারা দেখাচ্ছেন এবং রাজনীতিতে ‘পলিটিক্যাল স্পেস’ দেওয়ার নামে যারা খালেদার সঙ্গে সংলাপের কথা বলছেন, কার্যত তারা পাকিস্তানকে হালাল করতে চান। সামরিক চক্রের রাজনীতিকে হালাল করতে চান। সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতিকে হালাল করতে চান। এই মিটমাট জাতি ও গণতন্ত্রের জন্য আত্মঘাতী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জন্য আত্মঘাতী। রাজনীতিতে ভিন্নমতের জায়গা আছে। কিন্তু সন্ত্রাসী, জঙ্গিদানবদের কোনো জায়গা নেই। আগুনসন্ত্রাসীদের কোনো জায়গা নেই। খালেদা জিয়া পেট্রলবোমা হাতে নিয়ে এবং জঙ্গিদানব সঙ্গে নিয়ে গণতন্ত্রের ঘর থেকে নিজেই নিজেকে গণতন্ত্রের বাইরে সন্ত্রাসের পথে নিয়ে গেছেন। তিনি গণতন্ত্রের বাইরে, চৌকাঠের ওপারে অগণতান্ত্রিক পথে নিজেকে নিয়ে গেছেন। গণতন্ত্রের ঘরে গণতন্ত্রের চৌকাঠ পেরিয়ে আগুনসন্ত্রাসী খালেদা জিয়াকে জায়গা দেওয়া কোনো রাজনৈতিক বিষয় নয়। সুতরাং গণতন্ত্রের ঘরে এ মুহূর্তে জঙ্গিদানবের যে উত্পাত চলছে, সেটি মানবের সঙ্গে দানবের যুদ্ধ। দানবদের সঙ্গে কোনো সংলাপ বা মিটমাট সম্ভব নয়। একাত্তরে যেমন পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করেছে, ধ্বংস হয়েছে, পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসকরা যেভাবে বিতাড়িত হয়েছে। ২০০০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত রাজাকার-সমর্থিত খালেদা জিয়ার সরকার যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে, ঠিক তেমনি জঙ্গিদানবদের একটাই পরিণতি—তাদের ধ্বংস করে দিতে হবে।

প্রশ্ন : সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ঢাকায় এক মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে বলেছেন, একাত্তরে ৩০ লাখ নয়, তিন লাখ শহীদ হয়েছিলেন। বেগম জিয়ার এ বক্তব্য দেওয়ার কারণ কী? এ বিষয়ে যদি কিছু বলেন।

হাসানুল হক ইনু : খালেদা জিয়া যখন রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা, সামাজিকভাবে কোণঠাসা, মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে কোণঠাসা, তখন তিনি রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য, দম ফেলার জন্য, দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রশ্নে কটূক্তি করেছেন। এর মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া বেপরোয়াভাবে পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন। অবশেষে খালেদা জিয়া পাকিস্তানের মাইক হলেন। বাংলাদেশের হূদয়ে পাকিস্তানের বিষাক্ত তীর ছুড়তে শুরু করলেন। খালেদা জিয়া সব রাখঢাক, ঘোমটা, ওড়না ফেলে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে সাহায্য করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। পাকিস্তানের বক্তব্য হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ হয়নি। এত লোক মারা যায়নি। এটি একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী ব্যাপার। এটি একটি চক্রান্ত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ৬০ লাখ ইহুদি মারা গিয়েছিল। এটি নিয়ে কেউ বিতর্ক করে না। এত বছর পর মুক্তিযুদ্ধে কতজন লোক মারা গেছে, সে সংখ্যা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করছেন। এ সন্দেহ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে গণহত্যার শহীদদের প্রতি তিনি অসম্মান প্রদর্শন করলেন। যুদ্ধাপরাধীদের মহিমান্বিত করলেন এবং যুদ্ধাপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করলেন।

আমি মনে করি, পাকিস্তানের সঙ্গে এবং পাকিস্তানপন্থিদের সঙ্গে কোনো তর্কে লিপ্ত হওয়ার দরকার নেই। তাদের দমন, ধ্বংস ও বর্জন করা উচিত। এ মুহূর্তে আমার কাছে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশের তিন শত্রু— পাকিস্তান, বিএনপি ও জামায়াত। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও পাকিস্তান কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এটি কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত। এখনো তারা একাত্তরের যুদ্ধের অপরাধের জন্য ক্ষমা চায়নি। বরং উল্টো পাকিস্তান সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। পাকিস্তানের সঙ্গে সমগ্র সম্পর্কটা নতুনভাবে পর‌্যালোচনা করে দেখার দরকার রয়েছে। আমি মনে করি, ১৯৫ জন চিহ্নিত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীর বিচারকাজটা আবার হাতে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পঁচাত্তরের পর যখন বাংলাদেশের ক্ষমতা সামরিক বাহিনী দখল করে নিল এবং রাজাকারদের হালাল করার প্রক্রিয়া চালু হলো, তখন শহীদমাতা জাহানারা ইমাম ১৯৯২ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি ও ২৬ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণআদালতে বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের সাজা দেওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বের সূত্রপাত করেন। এই দ্বিতীয় পর্বের লক্ষ্যটা কী? সামরিক শাসনের, সাম্প্রদায়িকতার, যুদ্ধাপরাধীর, জঙ্গিদের জঞ্জালটা পরিষ্কার করে ফেলা। সংবিধান থেকে, আইনকানুন থেকে, সমাজ থেকে, রাজনীতি থেকে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাস্তাটা সম্পূর্ণ নিরাপদ করে দেওয়া, যাতে ওই রাজাকার সরকার আর না আসে। এই গ্যারান্টি অর্জনটাই হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় পর্বের লক্ষ্য। আজ আমরা সেই দ্বিতীয় পর্বের একটা পর‌্যায়ে এসেছি যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাজা সম্পন্ন হচ্ছে। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদী চক্রের প্রধান খালেদা জিয়া এখনো বিপদ হিসেবে টিকে আছেন। সুতরাং আমি মনে করি, বাংলাদেশের বিপদ এখনো কাটেনি। দুই-পাঁচটা জঙ্গি দমন করলে, বিচার করে সাজা দিলে, দুই-পাঁচটা যুদ্ধাপরাধীর বিচার করলে ও সাজা দিলে এই বিপদ থেকে মুক্ত হবে না বাংলাদেশ। যতক্ষণ না জঙ্গি উত্পাদনের কারখানা জামায়াত ও বিএনপিকে নিষ্ক্রিয় না করা যায়। জঙ্গি উত্পাদনের এই কারখানার মালিক বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতির ময়দানে নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এ জন্য আগুনসন্ত্রাস, নাশকতা, অন্তর্ঘাত ও গুপ্তহত্যার অপরাধে বেগম খালেদা জিয়ার বিচার করে তাকে রাজনীতির ময়দান থেকে বিদায় জানানো উচিত।

প্রশ্ন : ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বর্তমান সরকার দুই বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে। এই সময়কালে ২০১৫ এর প্রথম তিন মাস কেটেছে চরম সহিংসতার মধ্যে। এই দুই বছরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

হাসানুল হক ইনু : সরকার সাফল্যের সঙ্গে সাংবিধানিক ধারা, নির্বাচনের ধারা, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রেখেছে। সরকার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করেছে। সরকার এই দুই বছরে অত্যন্ত ন্যক্কারজনক সন্ত্রাসের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আগুনসন্ত্রাস, সন্ত্রাসী তাণ্ডব দেখেছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক পরিধির ভিতরে থেকে, আইনের ভিতরে থেকে তা দমন করেছে। এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয়। কাউকেই কর্নেল তাহেরের ন্যায় গোপন বিচারে ফাঁসি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেনি। কাউকেই প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেনি। প্রত্যেক আগুনসন্ত্রাসীকে, জঙ্গিবাদীকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। এমনকি আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অনেক জঙ্গি আবার জামিনও পেয়ে যাচ্ছে। আমি এর ওপর গুরুত্ব দেব যে, সরকার অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে গণতান্ত্রিক পরিধির ভিতর থেকে, গণতান্ত্রিক আইনকানুনের ভিতর থেকে জঙ্গি দমনে যে দক্ষতা প্রদর্শন করেছে, তা পৃথিবীর শিক্ষণীয় বিষয়। একই সঙ্গে এই দুই বছর উন্নয়নের প্রশ্নটাকেও গুরুত্ব দিয়েছে। নিজ অর্থে পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করেছে, যা কেউ ভাবতেও পারেনি। বিদ্যুৎ উত্পাদনের কাজ অব্যাহত রেখেছে। প্রায় ৭৫ লাখ শিশুর হাতে নতুন বই দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। খাদ্য উত্পাদন অব্যাহত রেখেছে। রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। রপ্তানি আয় বেড়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মাত্রা বৃদ্ধি করেছে এবং সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধিও রক্ষা করেছে। পোশাকশিল্পের শ্রমিক ও সাধারণ শ্রমিকদের মজুরিসহ আইনকানুন আরও আধুনিক করেছে। সংসদের কার্যক্রমকে গতিশীল ও অব্যাহত রেখেছে। খালেদা জিয়ার এই চক্রান্ত যদি না থাকত, তাহলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ঘরে যেতে পারত। আরও উন্নয়ন করতে পারতাম। আরও মানুষের উপকার করতে পারতাম।

২০২১ সালের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে সরকার। জলবায়ুর অভিঘাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য বলিষ্ঠ ভূমিকা নিয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের কাজে চমত্কার অগ্রগতি হয়েছে। প্রায় ১৩ কোটির মতো মোবাইল, প্রায় চার কোটির মতো মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছে। গণমাধ্যমেরও বিশাল প্রসার ঘটিয়েছে। বেসরকারি খাতে নতুন নতুন টেলিভিশন লাইসেন্স প্রদান করেছে। প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশনার অধিকার দেওয়া হয়েছে এবং একটা জীবন্ত সক্রিয় গণমাধ্যম বজায় আছে, যা সরকারের সমালোচনায় মুখর। সরকার প্রমাণ করেছে, এতকিছুর পরও সরকার সমালোচনাসহিষ্ণু। তবে জঙ্গি দমনে সরকার কঠোর। বর্তমান সরকার মুক্তিযোদ্ধাবান্ধব। নারী ও কৃষকবান্ধব সরকার। এই দুই বছরে ঈর্ষণীয় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সমুদ্র বিজয়, ছিটমহল বিনিময়ের মতো বড় সাফল্যের মধ্য দিয়ে কূটনীতিতে পারদর্শিতা প্রদর্শিত হয়েছে। আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। বিশ্বায়নের সঙ্গে চমৎকার খাপ খাওয়ানোর নীতি গ্রহণ করেছে। এই দুই বছরে সব সমালোচনা পিছে ফেলে আদালতের প্রদত্ত রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছে শেখ হাসিনার সরকার জঙ্গিবাদী ও যুদ্ধাপরাধীদের একচুল ছাড়ও দেয় না। বাকি যুদ্ধাপরাধীদের দমন ও ধ্বংস করার ব্যাপারে সরকার আপসহীন ভূমিকায় আছে।

প্রশ্ন : আপনাদের মহাজোট সরকারের দুই মেয়াদে অনেকগুলো বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনেকেই প্রচারে চলে এসেছে। টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান ও সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো আইন বা সম্প্রচার কমিশন করার চিন্তাভাবনা সরকারের আছে কি না?

হাসানুল হক ইনু : আমরা গণমাধ্যমের প্রসারে সম্প্রচারনীতি করেছি। সম্প্রচার আইন ও সম্প্রচার কমিশন করার কাজে হাত দিয়েছি, যা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা সংযোজন করবে। ইলেকট্রনিক মাধ্যমের সাংবাদিকতাকে সাহায্য করবে। আমরা চলচ্চিত্র নীতিমালা করেছি। গণমাধ্যমের, বিশেষ করে বাসস ও প্রেস কাউন্সিলের পুরনো আইনকে পর‌্যালোচনা করে নতুনভাবে হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছি। সব কিছু মিলিয়ে এই দুই বছরে গণমাধ্যমকে আরও বিকশিত ও নিরাপদ করতে আইনগুলোকে হালনাগাদ করছি। ইলেকট্রনিক মিডিয়া কোনো গোপন টেলিফোনের নির্দেশ কিংবা প্রশাসনের কোনো মৌখিক নির্দেশে চলে না। কোনো গোপন টেলিফোনও ওখানে করা হয় না, কোনো মৌখিক নির্দেশও দেওয়া হয় না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সব অনুষ্ঠান যদি পর‌্যালোচনা করেন তাহলে দেখবেন, তারা সরকারের সব ত্রুটি-বিচ্যুতি, ক্ষেত্রবিশেষে ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্মকর্তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতির সমালোচনায় মুখর। সমালোচনামুখর টেলিভিশন এক দিনের জন্যও স্তব্ধ হয়নি। সমালোচনা বন্ধ করেনি। তাহলে হস্তক্ষেপ কোথায়? এসব টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনাও করা হয়। বহু ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতাবহির্ভূত সমালোচনা করা হয়। মিথ্যাচার করা হয়। সেগুলোও আমরা উপেক্ষা করি। সমালোচনামুখর টেলিভিশন ও প্রিন্ট মিডিয়ার সমালোচনা করার অধিকার কোনো রকম ধমক দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা হয়নি। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। তবে জঙ্গিবাদীদের ধ্বংস করব, স্তব্ধ করে দেব। সাংবাদিকদের উত্সাহিত করব। তা-ই কেবল গণতন্ত্রকে নিরাপদ করবে এবং জীবন্ত রাখবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী?

হাসানুল হক ইনু : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু এর ওপর যে বাংলাদেশে আর কখনো সামরিক সরকার ও রাজাকারনির্ভর সরকার আসবে না। এটি যদি নিশ্চিত করতে পারেন তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে। কারণ সংবিধানের চার নীতি পুনঃস্থাপিত হওয়ার পর উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে বেগবান ও মানবিক করতে, ‘উন্নয়নও করব বৈষম্যও কমাব’ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে পুনরাবিষ্কার করা হয়েছে। সমাজের চাহিদা স্বীকার করে নিয়ে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বিদেশি বন্ধুদের সব পরামর্শ অস্বীকার করে কৃষকের ভর্তুকি, সামাজিক নিরাপত্তার জাল, নারীর পক্ষে অর্থায়ন, শ্রমিকদের পক্ষে ভূমিকা রাখা এসব গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সেই লাগামহীন তথাকথিত মুক্তবাজারের পাগলামির কাছে বাংলাদেশকে ছেড়ে না দিয়ে, সমাজের চাহিদার সঙ্গে উদ্যোক্তা শ্রেণি ও বাজারশক্তির সমন্বয় সাধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ক্রমাগত সামাজিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে।

শেখ হাসিনার সরকার অতীতের সরকারের মতো না করে সংবিধানের চার নীতির প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে অর্থনীতি পরিচালনা করছে। সুতরাং এ মুহূর্তে আমাদের ছয়টি চ্যালেঞ্জ— গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনকানুন তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, অতীতের রেখে যাওয়া সাম্প্রদায়িকতা ও সামরিক শাসনের জঞ্জালগুলো বিচার-আচারের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার করে দেওয়া। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতা অর্জনের চ্যালেঞ্জ। চতুর্থত, সমৃদ্ধিও করতে হবে, বৈষম্যও কমাতে হবে— এ বিষয়টি দেখা। পঞ্চমত, বিশ্বায়ন ও আঞ্চলিকায়নের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর নীতি গ্রহণ করা। ষষ্ঠত, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আয়ত্ত করে জনবান্ধব, গ্রামবান্ধব, গরিববান্ধব ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা। এই ছয়টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বৈষম্যমুক্ত সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হবে। বাংলাদেশের একাত্তরের যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানিদের পরাজিত করেছিলাম। এ মুহূর্তে বাংলাদেশ চার যুদ্ধের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র্য উচ্ছেদের যুদ্ধ, লিঙ্গবৈষম্য দূর করার যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার যুদ্ধ এবং জঙ্গিবাদের আতঙ্ক থেকে শান্তি প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। এই চার যুদ্ধ এবং ওই ছয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ সমৃদ্ধ, বৈষম্যমুক্ত, ডিজিটাল, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে রূপান্তরিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের সরকারের বিকল্প রাজাকারের সরকার— এ জায়গা থেকে সরে এসে মুক্তিযুদ্ধের সরকারের বিকল্প মুক্তিযুদ্ধের সরকারই হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। ধারাবাহিকভাবে এ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করে সামরিক শাসকদের দালাল, রাজাকারদের দালাল ও পাকিস্তানপন্থিদের এই বাংলাদেশের মাটি থেকে চিরবিদায় জানানোর আয়োজন করতে হবে।
-বাংলাদেশ প্রতিদিন