বাংলাদেশের তিনটি অপরাধ

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরাশক্তির চোখে বাংলাদেশ তিনটি ঘোরতর অপরাধে অপরাধী। এই অপরাধ সম্পর্কে বাংলাদেশের নাগরিকদের ধারণা স্পষ্ট থাকা দরকার। এই দিকটি স্পষ্ট না থাকলে বাংলাদেশের জনগণের এখনকার বিপদের গুরুত্ব যেমন আমরা বুঝব না এবং একই সঙ্গে এই বিপদ থেকে বেরুবার পথের হদিস দেওয়াও সম্ভব হবে না।

প্রথম অপরাধ হচ্ছে : সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়; এ অভ্যুদয় যারা ঘটিয়েছে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক থেকে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের আরব, ইরানি বা পাকিস্তানি গণ্য না করে নিজেদের বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষের ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মধ্যেই তাদের ভবিষ্যৎ বিকাশের বীজ নিহিত রয়েছে বলে তাকে আঁকড়ে ধরেছে। কিন্তু অন্য দিকে, তারা ইসলামও ছাড়ে নি। অন্য কাউকে ইসলামের ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ারও মানে নি।
দ্বিতীয় অপরাধ হচ্ছে এই জনগোষ্ঠি প্রাকৃতিক ও প্রাণসম্পদে সমৃদ্ধ। তৃতীয় কারণ হচ্ছে এদের জনসংখ্যা অন্যান্য দেশের ভীতির কারণ এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

বাংলাদেশের প্রথম ও প্রধান অপরাধ এই যে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠি গরিব এবং তাদের ধর্ম ইসলাম। পরাশক্তির চোখে ইসলাম পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে নতুন চিন্তা ও রাজনীতির ইন্ধন জোগাতে সক্ষম। বিশেষত কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রের পতনের পর ‘ইনসাফ’ বা আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের ধারণার অধীনে ইসলাম নির্যাতিত ও শোষিত শ্রেণীগুলোকে পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে ফেলতে পারে। এই ভয় পরাশক্তিগুলো যথার্থই করে। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধরনে পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধনীতির মধ্যে দুটো প্রধান প্রবণতা আমরা দেখি। প্রথমত, বর্বর ও সন্ত্রাসের প্রধান উৎস বলে ইসলামকে চিহ্নিত করা এবং ইসলাম ও ইসলাম প্রধান জনগোষ্ঠির বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত ঐক্যবদ্ধ রাখা। ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ’ চালাবার জন্য ইসলাম ও ইসলাম-প্রধান সমাজগুলোর জন্য এই প্রচার ও প্রপাগান্ডা জরুরি। এই বিষয় নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে এবং আমাদের দেশেও একধরনের সচেতনতা আছে বলে এই বিষয়ে আমি অধিক কথা ব্যয় করব না। তবে ইসলামবিরোধী সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধনীতির দ্বিতীয় দিকটা নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। এই নীতির লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হোল, ধর্মতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার পরিমণ্ডলের বাইরে ইসলামের রাজনৈতিক-দার্শনিক ভাবুকতা ও রাজনৈতিক শক্তির বিকাশকে রুদ্ধ করা, যেন বিশ্ব-পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা অতিক্রম করে মানবেতিহাসের নতুন ইচ্ছা ও সঙ্কল্প নির্মাণে ইসলাম আদৌ কোনো ভূমিকা রাখতে না পারে। এই ধরনের কোনো প্রকার সম্ভাবনাকে গোড়াতেই অস্বীকার করা হয়। ইসলামকে মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্ম এবং ধর্মতাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে সঙ্কীর্ণ রাখবার কাজটি ইসলামপন্থী ও ইসলামবিরোধী উভয়েই সমান দক্ষতার সঙ্গে করে। একটি সম্প্রদায়ের ধর্ম ও ধর্মতত্ত্ব কিম্বা মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অধিক কিছু যেন না হতে পারে তার জন্য পরাশক্তি ও ইসলামবিরোধীরা যেমন সচেষ্ট, তেমনি মানবেতিহাসের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে যারা রুখে দিতে চায় তারাও সমান তৎপর। পরাশক্তির রাজনীতির এই দিক সম্পর্কে আমাদের সচেতনতার অভাব আছে। যার পরিণতি বাংলাদেশের জন্য মারাত্মক হতে পারে।

ইসলাম যেন মানবেতিহাসের সার্বজনীন, ভাব, চিন্তা বা রাজনীতির উপাদান না হতে পারে তার জন্য ইসলামের বিরোধিতাই শুধু নাই, একই সঙ্গে পরাশক্তির অধীনস্থ করে রাখবার দরকারে ইসলামের নানান ব্যাখ্যা ও নানান কিসিমের রাজনীতিও প্রচলিত। এই বাস্তবতা মনে রেখে সাম্রাজ্যবাদ বা পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই-সংগ্রামের আলোকে ইসলামি ভাবুকতা, চিন্তা ও রাজনীতির একটা পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে।
ইসলামকে বারবারই ‘আধুনিকতা’Ñ অর্থাৎ গ্রিক-খ্রিষ্টীয় ইতিহাস, জায়নবাদ (ুরড়হরংস) এবং সেকুলারিজমের বিপরীতে দাঁড় করাবার প্রাণপণ কোশেশ আমরা দেখি। পাশ্চাত্য ইতিহাসের একটা ইতিবাচক মুহূর্ত হিশাবে সেকুলারিজম বা তথাকথিত ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র একটা বিচার হতেই পারে, কারণ পাশ্চাত্য মানুষের ইতিবাচক অভিজ্ঞতায় ধর্মনিরপেক্ষতার ভাব ও রাজনীতি যে অবদান রেখেছে তাকে অস্বীকার করার উপায় নাই। কিন্তু বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় সেকুলারিজম একান্তই ইসলামের বিরুদ্ধে পরাশক্তির যুদ্ধ এবং জায়নিজমের ছদ্মবেশী মতাদর্শ ছাড়া অধিক কিছুই নয়।
অর্থাৎ ইসলাম সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠতে যেন সক্ষম না হয় তার চেষ্টা ইসলামবাদী রাজনীতির মধ্যে যেমন, ঠিক তেমনি ইসলামের দুষমনদের মধ্যেও আছে। দুটোই সমান মাত্রায়। পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা অতিক্রম করে যাবার জন্য যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, ভাব বা রাজনৈতিকতার চর্চা দরকার ইসলাম-প্রধান দেশগুলোতে সেই বিকাশের গোড়াতেই আঘাত করা হচ্ছে নানান দিক থেকে। এই নীতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইসলামকে সাম্প্রদায়িক, ধর্মবাদী ও ধর্মতাত্ত্বিক রাজনীতির বা অন্য কথায় প্রাক-পুঁজিতান্ত্রিক প্রাচীন চিন্তা ও মনোগঠনের শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখা। বর্তমান পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা অতিক্রম করে যাবার জন্য ইসলাম আগামির নতুন ভাব, নতুন চিন্তা বা নতুন রাজনীতি হাজির করতে সক্ষম কি না সেই বিচার দূরের কথাÑ এই অতি আবশ্যিক কাজটিকেই বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। গোড়ায় এই কাজ করা গেলে ইসলাম-প্রধান দেশগুলোকে পরাশক্তির অধীনস্থ রাখা সহজ। এই দিকগুলো আমরা পাঠকদের বিশেষ ভাবে বিবেচনায় রাখতে অনুরোধ করি।

বলাবাহুল্য, অন্যান্য ধর্ম, নীতি বা বিশ্বাসের মধ্যে মানবেতিহাসের আগামি দিনের ইচ্ছা বা সংকল্পের আহ্বান আছে। না থাকাটাই বরং বিস্ময়ের কারণ হবে। কিন্তু একই ভাবে সেখানেও আমরা দুই প্রবণতার লড়াই দেখি। ইসলাম সম্পর্কে আমাদের নিষ্ঠা ও আগ্রহের প্রধান কারণ ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার। এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মের মধ্যে ভবিষ্যৎ ইতিহাস নির্মাণের উপাদান আদৌ আছে কি না সেই বিচারে মনোযোগী না হয়ে কীভাবে বিপুল জনগোষ্ঠির মনের অন্দরমহলে প্রবেশ সম্ভব?

পরাশক্তি ধারণা করেছিল গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পুঁজিতান্ত্রিক রূপান্তর না ঘটিয়ে মাইক্রোক্রেডিটওয়ালা ও দাতাসংস্থাগুলোর মাধ্যমে ‘পুঁজিবাদ’ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হোলে বাংলাদেশের জনগণকে পরাশক্তির ধ্যানধারণা ও আদর্শের গোলামে পরিণত করা যাবে। এটা এখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে যে দারিদ্র্য বিমোচনের নামে কোটি কোটি ডলার খরচ ও একটি কৃত্রিম ‘সুশীলসমাজ’ বানিয়ে এবং বাংলাদেশকে দুর্নীতিবাজ, অসৎ ও মৌলবাদীদের স্বর্গ বলে প্রপাগান্ডা চালিয়েও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে পরাশক্তির গোলামে পরিণত করা যায় নি। বাংলাদেশের জনগণের এই স্বাতন্ত্র্যবোধ, মর্যাদাজ্ঞান এবং নিজেদের সার্বভৌম অস্তিত্ব সম্পর্কে আগের চেয়েও তুলনামূলক ভাবে অধিক সচেতনতা পরাশক্তিকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। এখন তারা আরো কঠিন আঘাত হানবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
দ্বিতীয় যে অপরাধ করেছে বাংলাদেশ সেটা দৈব রহমতও হতে পারে। বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ। তেল, গ্যাস, কয়লা ও খনিজ পদার্থ ছাড়াও প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে প্রাণসম্পদ ও প্রাণের বৈচিত্র্য, মিষ্টি পানি ও অন্যান্য জৈবসম্পদ। একদিকে জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং কাজে কাজেই জ্বালানির উৎস ও সরবরাহের ওপর একচেটিয়া অধিকার কায়েমের জন্য পরাশক্তির নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্য দিকে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নামক নতুন শিল্প খাতের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহ করবার তাগিদ। একই সঙ্গে পানি বেসরকারীকরণ এবং জলমহাল ও নদীনালা কোম্পানির দখলে দিয়ে দেবার চিন্তাভাবনা চলছে। প্রাকৃতিক ও প্রাণসম্পদের অধিকারী হবার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবার কারণে বাংলাদেশ আজ বিপজ্জনক সংঘর্ষ ও সংঘাতের মুখোমুখি হয়েছে। বাংলাদেশের এই অপরাধগুলো জানা থাকলে পরাশক্তি ও তাদের এই দেশীয় দালাল ও ভাঁড়দের কথাবার্তা বোঝা সহজ হবে।

তৃতীয় যে কারণের জন্য বাংলাদেশ পরাশক্তির চোখে অপরাধী সেটা হোল এই দেশের জনসংখ্যা। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো মহাদেশে যারা আদিবাসীদের হত্যা ও উৎখাত করে দখল করেছে কিম্বা কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে আদিবাসীদের নিজ বাসভূমেই জবরদস্তি থাকতে বাধ্য করেছে তাদের জন্য এই সংখ্যা হুমকি। জনসংখ্যা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও যুদ্ধনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক। অতএব জনসংখ্যা কমানো, এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষের চলাচল এবং অভিবাসনের ওপর কড়াকড়ি বা নিয়ন্ত্রণ আরোপকে এই দিক থেকে দেখতে শিখতে হবে। ধনীদের ভোগদখল নিশ্চিত করবার জন্য গরিবদের টার্মিনেট বা ‘নিয়ন্ত্রণ’ করার কর্মসূচি আর পরিবার পরিকল্পনা সমার্থক নয়। সম্পদ ও সংখ্যার ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রতিটি সমাজ এমনকি প্রতিটি পরিবারই কিছু কিছু পরিকল্পনা করে বা পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। কিন্তু পরিবার পরিকল্পনা এক কথা আর যেকোন মূল্যে যুদ্ধনীতির অংশ হিসেবে গরিবদের সংখ্যা খতম করবার কর্মসূচির সাম্রাজ্যবাদী মানে আমাদের বুঝতে হবে। পরাশক্তির যুদ্ধের ভাষা হচ্ছে এই রকম : ধনী এবং ধনীদের দেশ ও তাদের শক্তিকাঠামোর বিরুদ্ধে আগামি দিনের সম্ভাব্য লড়াকুকে মায়ের গর্ভে এখনই হত্যা করবার খরচ যুদ্ধের ময়দানে হত্যার চেয়েও কম। একদিকে অবাধ বাজার ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক পুঁজির পুঞ্জীভবন ও আত্মস্ফীতি ত্বরান্বিত করে দুনিয়ায় অল্প কিছু ব্যক্তিকে ধনী করে আর সকলকে গরিব করবার বিশ্বব্যবস্থা আর অন্য দিকে দারিদ্র্যের সংখ্যা কমানোর নামে গরিবের ভ্রƒণ গর্ভে নষ্ট করাÑ এই হচ্ছে দুইমুখো সাপের, তো সাম্রাজ্যবাদী নীতি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি অতএব গর্ভে আগামি দিনের যোদ্ধাদের হত্যার কর্মসূচি ছাড়া আর কী! একই আলোকে ‘এইডস’-এর নামে এক দেশ থেকে অন্য দেশেÑ বিশেষত অর্থনৈতিক ভাবে গরিব দেশ থেকে ধনী দেশে মাইগ্রেশান বা ট্রাফিকিং বন্ধ করা এই নীতিরই ধারাবাহিকতা। জনসংখ্যা হ্রাস করবার কর্মসূচির সঙ্গে এইডস বা সন্ত্রাস দমনের নামে মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ একই সূত্রে গাঁথা। জনসংখ্যায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ আজ পরাশক্তির জন্য হুমকি। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জনগণকে কী ধরনের অপরাধে পরাশক্তিগুলো শনাক্ত করছে সেই দিকগুলো বুঝতে পারলে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার দিকগুলোও আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে।

You Might Also Like