বন্যা নিয়ে কথা নেই, এলাকায় নেই মন্ত্রী-এমপিরা

বিশেষ প্রতিনিধি : দেশের উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষ ভয়াবহ বন্যায় বানভাসি মানুষে পরিণত হয়েছে। উজানের ঢলে বাড়িঘর, ক্ষেতের ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর এখন লাখ লাখ মানুষ ঘরের চালে, নৌকা-কলাগাছের ভেলা অথবা বেড়িবাঁধ ও উঁচু রাস্তার ওপর আশ্রয় নিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহের ক্রমাবনতিশীল বন্যার শুরুতে সরকারি-বেসরকারি কোনো ত্রাণ তৎপরতা বা ত্রাণ পরিকল্পনা দেখা যায়নি। এলাকায় নেই মন্ত্রী এমপিরা। এদিকে বন্যার পানি স্ফীত ও ভয়াল রূপ নেয়ার পর সরকারের তরফ থেকে ত্রাণ তৎপরতার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এরই মধ্যে পানিবন্দি ও আশ্রয়হীন লাখ লাখ মানুষ সুপেয় পানি, খাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের তীব্র সংকটে পড়েছে বলে জানা যায়। কয়েক দিন ধরে প্রতিদিনই ক্রমাবনতিশীল বন্যা পরিস্থিতির সচিত্র খবর প্রকাশিত হচ্ছে। অসহায় দরিদ্র নারীরা দুগ্ধপোষ্য শিশুদের কাঁধে নিয়ে বুক সমান পানি ডিঙিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছে। পোল্ট্রি খামার, গৃহপালিত গবাদিপশু-ছাগল, ভেড়াগুলোও বিপন্ন অবস্থায় পতিত হয়েছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ জেলার পদ্মা-যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, সুরমা-কুশিয়ারা, বিধৌত অঞ্চল থেকে বন্যার পানি এখন মধ্য-নি¤œাঞ্চলে ধেয়ে আসতে শুরু করেছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশে আরেকটি বড় বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদনদীর পানি বিপদসীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যা ক্রমে নি¤œমুখী হওয়ায় আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকাগুলো বন্যার শিকার হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, পাকা রাস্তা ও বহুতল বাড়িতে বসবাসকারী রাজধানীর বাসিন্দাদের কেউ কেউ হয়তো বন্যা নিয়ে একটু ফ্যান্টাসি বোধ করতে পারেন। তবে এই মুহূর্তে রাজধানীবাসী বন্যার চেয়ে অনেক বড় নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিক বিড়ম্বনার শিকার। জঙ্গিবিরোধী নানামুখী তৎপরতার আড়ালে বানভাসি লাখো মানুষের দুর্দশার দিকে চোখ ফেরানোর যেন কোনো ফুরসতই নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবির পুরো শক্তি-সামর্থ্যই জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমে নিয়োজিত। এনজিও, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান এবং বিত্তশালী দানশীল ব্যক্তিরাও এখন আর আগের মতো ত্রাণ নিয়ে আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসে না। উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় আইলা ও সিডরের কথা বাদ দিলে গত একযুগে বড় ধরনের বন্যা পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়নি বাংলাদেশ। এই সময়ে দেশে কোটিপতির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, বেড়েছে মাথাপিছু আয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। কিন্তু এই মুহূর্তে বন্যার্ত মানুষের মধ্যে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ নিয়ে পাশে দাঁড়ানোর লোকের সংখ্যা খুবই অপ্রতুল। ১৯৮৮’র বন্যা, ১৯৯১ সালে উপকূলীয় ঝড়, ১৯৯৮ সালের বন্যায় মানুষের জন্য অনেক বেশি ত্রাণ তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে কোটিপতির সংখ্যা অনেক বেড়েছে, অর্থনৈতিকভাবে আমাদের রাষ্ট্রের সক্ষমতাও বেড়েছে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। গত সোমবার পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে দেখা গেল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সক্ষম ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি খাবার ও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। উত্তরের জেলাগুলোতে অনেক দুর্গম অঞ্চলের আটকেপড়া, বন্যাপীড়িত মানুষের মধ্যে এখন খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য হাহাকার চলছে। বন্যার্তদের মধ্যে ইতিমধ্যে অন্ততঃ ৪০ জনের মৃত্যু এবং ৩ হাজারের বেশি অসুস্থ্য হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রয়োজনের সময় নিজেদের সক্ষমতা অনুসারে আর্তমানুষের পাশে দাঁড়ানো মানুষের একটি স্বাভাবিক মানবিক দায়িত্ব ও দাবি। নিজেদের মানবিক চেতনা যদি আমাদের সেই দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ না করতে পারে আমাদের মানবিক দায়বোধ ও মানবিক সত্তার অস্তিত্বই বিশ্বের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য।

You Might Also Like