ফ্রান্স যে কারণে আইএসের টার্গেট

ইসলামিক স্টেট (আইএস) আক্রমণের মূল লক্ষ্য পূর্বে ইরাকের সরকার, পশ্চিমে বাশার আল-আসাদের সরকার। ২০১৪ সালে ঝড়ের গতিতে আইএস সিরিয়া ও ইরাকের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। দুইয়ের মাঝে বিস্তৃত অংশে এখনো কায়েম আছে তাদের আধিপত্য। ইরাকি সেনা, শিয়া মিলিশিয়া এবং কুর্দ পেশমেরগা যোদ্ধারা ইরাকের বেশ কিছু অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারলেও বাগদাদের পরে ইরাকের সবচেয়ে বড় শহর মসুল আজও আইএসের হাতে রয়েছে। অন্যদিকে, সিরিয়ায় আকাশ থেকে মার্কিন, ফ্রান্স, রাশিয়ার যুদ্ধবিমান আইএসের বিভিন্ন ঘাঁটিতে তীব্র আঘাত হানলেও মাটিতে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। সিরিয়ার পূর্বদিকের বিপুল অঞ্চলের অধিকার কার্যত আইএসের হাতেই। চলতি বছর আইএস তাদের হামলার লক্ষ্যস্থল পরিবর্তন করে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উত্থানের সময় সুন্নিপন্থি জঙ্গি গোষ্ঠীটি শিয়াদের ওপর হামলার কথা বললেও ইদানিং সেটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। তারা এখন ইউরোপের দিকে নজর দিয়েছে।

ইউরোপে মনযোগ কেন: আইএস আগে কখনো বিদেশের মাটিতে প্যারিসের মতো এতো বড় হামলা চালায়নি। তাদের এতো বড় হামলা চালানোর সামর্থ্য নেই বলেও মনে করা হতো। কিন্তু ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্সের মতো একটি দেশে সেই হামলা হলো। আইএস কি অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠন থেকে সহায়তা পেয়েছে? না কি কারো কাছ থেকে কোনো অর্থ সহায়তা পেয়েছে? এসব প্রশ্ন অনেকের। ইউরোপ তথা পশ্চিমা বিশ্বে আইএসের হামলার অনেক কারণ পাওয়া যায়। যদিও একটার সঙ্গে আরেকটার বৈপরীত্য খুঁজে পাওয়া যায়। ১) আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীরা কখনো একে অপরকে সহায়তা করে না। ২) এই ধরনের হামলা সবসময়ই পরিকল্পনা মাফিক হয়। কিন্তু আইএসের এই ধরনের হামলা চালানোর কোনো সামর্থ্য কিংবা সুযোগ ছিল না। ৩) আইএস বড় ধরনের হামলা করে সিরিয়া এবং ইরাকে তাদের সিংহাসন হারানোর প্রতিশোধ নিতে চায়। ৪) আইএস দেখাতে চায়, তারা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আল-কায়েদার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। ৫) আইএস চায় এসব হামলার মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে হামলায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো পিছিয়ে যাক। ৬) আরো কিছু কারণ আছে। এই যেমন আইএস চায়, বড় দেশগুলো তথা তাদের শত্রুরা সিরিয়া এবং ইরাকে আসুক। দেশগুলো তাদের সম্পদ ব্যয় করুক, গলযোগ সৃষ্টি করুক, মুসলিমদের সঙ্গে একটা সংঘর্ষে উপনীত হোক।

আমরা এখনো জানি না, আল-কায়েদা কেন যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলা চালালো। সেই প্রশ্ন এতো বছরে আজও অজানা। কিন্তু কাবুলে আল-কায়েদার অফিস থেকে কম্পিউটারে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, আল কায়েদা চেয়েছিল, এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম দেশগুলো থেকে তাদের সব সৈন্য প্রত্যাহার করবে। না হলে তারা বড় ধরনের অভিযান চালাবে যাতে তাদের সম্পদের ব্যয় হবে। মুসলমানদের মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব গড়ে উঠবে। এই মনোভাবের ফলেও যুক্তরাষ্ট্র মুসলিম বিশ্ব থেকে সরে যেতে বাধ্য হবে।

ফ্রান্স কেন টার্গেট: বিবিসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ব্রিটেনের ৭৫০, বেলজিয়ামের ৫২০, জার্মানির ৬০০ নাগরিক সিরিয়া এবং ইরাকে আইএসের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গেছে। ব্রিটেনের অন্তত ৫০ জন মারা গেছে। তবে অন্য তথ্যে জানা গেছে মৃতের সংখ্যা ১০০। ডয়চেভেলে ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের পুলিশ এবং নেদারল্যান্ডের জাতীয় নিরাপত্তা বিভাগের উদ্ধৃতি দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, জার্মানি থেকে গেছে ৭৪০ জন, ফিরে এসেছে ২৪৭ জন;  ব্রিটেন থেকে ৭০০, ফিরে এসেছে ৩০০; ফ্রান্স থেকে ৫৭১ জনের যাত্রা, ফিরে এসেছে ২৪৫ জন; বেলজিয়াম থেকে গেছে ৫০০ জন, ফিরে এসেছে ১৩০ জন এবং নেদারল্যান্ড থেকে গেছে ২২০ জন, ফিরে এসেছে মাত্র ৪০ জন। অন্য একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিলের হিসাবে ফ্রান্স থেকে আইএসে যোগ দিয়েছে ১৫৫০ জন।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্ব থেকে প্রতি সাতজনে একজন জিহাদি গ্রুপে যোগ দিচ্ছে। ফ্রান্সে অনেক মুসলমান রয়েছে। দেশটির জনসংখ্যার ৮ শতাংশ মুসলিম এবং জেলে আটকদের মধ্যে ৭০ শতাংশ মুসলমান। তিনি বলেন, মুসলমানরা এখানে সুবিধাবঞ্চিত। অপরাধপ্রবণ এবং তাদের এলাকাও বঞ্চিত। আইএস ফ্রান্সকে পছন্দ করে আরো দুটি কারণে।

প্রথমত, আইএস ইউরোপীয় দেশ হিসাবে ফ্রান্সকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে। গত বছর আইএসের শীর্ষ মুখপাত্র আবু মোহাম্মদ আল-আদানি বলেছিলেন, তোমরা যদি অবিশ্বাসী আমেরিকান কিংবা ইউরোপীয়ান কাউকে হত্যা করতে পারো বিশেষ করে ফ্রান্সের ওপর, সেটা যে উপায়ে হোক। ফ্রান্স আইএসবিরোধী অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত অংশীদার।

দ্বিতীয়ত, ফ্রান্সকে টার্গেট করার পেছনে বাস্তব কারণ আছে।পশ্চিম ইউরোপের ফ্রান্সে সবচেয়ে বেশি মুসলমান বাস করে। সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশটি আইএসের অন্যতম প্রধান উত্স। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে খুব অল্প কিছু লোক আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া এবং ইরাকে গেছে। প্যারিসের ইনস্টিটিউট অব পলিটিক্যাল সায়েন্সের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জ্যঁ পিয়েরে ফিলিলু ফ্রান্সের রেডিও নেটওয়ার্ককে বলেন, আইএস মূলত ফ্রান্সে মুসলিম বিরোধী উস্কানি বাড়িয়ে দিতে চাইছে। তারা চায় এখানে মুসলমানদের হত্যা করা হোক। তারা এখানে গৃহযুদ্ধ চায়। তার মানে এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্র আইএসের কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ এবং তার সোশালিস্ট পার্টি এখন দুর্বল অবস্থানে আছে। তার বিরোধী মেরি লে পেনের ন্যাশনাল ফ্রন্ট রাজনৈতিক সফলতার দিকে যাচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরে আঞ্চলিক নির্বাচনে জিতে যায় তাহলে ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রে মেরি লে পেনের দল একধাপ এগিয়ে যাবে। ফলে ওলাঁদের রাজনৈতিক জীবনের জন্য সংকটময় মুহূর্ত এখন। ওলাঁদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে আইএস। তাদের এই হামলা যে বিশ্বে বিশেষ করে ফ্রান্সের আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, মানসিকভাবে প্রভাব ফেলবে সেটা আইএস খুব ভালো করেই জানে। তারা পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখে। আইএস জানে, ওলাঁদ তার দুর্বলতা ঢাকতে এবং রাজনৈতিক সংকট কাটাতে বড় ধরনের অভিযান চালাবে আইএসের বিরুদ্ধে। এর ফলে ফ্রান্স থেকে নতুনদের নিয়োগে তাদের সুবিধা হবে। কারণ মুসলমানরা ক্ষুব্ধ হয়ে আইএসে যোগ দেবে।

You Might Also Like