হোম » ফেসবুকের ভালো-মন্দ

ফেসবুকের ভালো-মন্দ

admin- Saturday, April 22nd, 2017

চিররঞ্জন সরকার

খানিকক্ষণ দূরে থাকলেই মন ছটফট করতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধুদের ৬০-৭০ ভাগের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় নেই, অথচ তাদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য চেনা মানুষদের থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে সারাক্ষণ কম্পিউটার-ল্যাপটপ-মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে চায়!

এটা এক-দুজনের ব্যাপার নয়। আমাদের অনেকের এমনটা হয়, আর হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ এর আসক্তি যে মাদকের চেয়ে অনেক বেশি! কোকেন খেলে মস্তিষ্কে যে প্রভাব পড়ে, এতেও তেমনটা ঘটে; এর নাম ‘ফেসবুক’৷

এগুলো মোটেও বানানো কথা নয়। বিভিন্ন দেশের গবেষকেরা রীতিমতো গবেষণা চালিয়ে এসব বের করেছেন। তারা দেখেছেন যে মদ-সিগারেটকে ‘না’ বলার চেয়ে ফেসবুক থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকা ঢের কঠিন। আর যারা দিনের বেশিরভাগ সময় এই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কাটান, তাদের জন্য ‘ফেসবুক অ্যাডিকশন ডিসঅর্ডার’ নামে এক রোগেরও উৎপত্তি ঘটিয়েছেন কেউ কেউ। ফেসবুক-হীন হয়ে খানিকক্ষণ কাটানো সত্যিই অসম্ভব হলে আপনাকে এই ‘এফএডি’ আক্রান্ত বলা হবে।

মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, ফেসবুক নয় আসলে নিজেকে নিয়ে মেতে থাকার এবং অন্যদের মাতিয়ে রাখার এমন সহজ উপায় আর দ্বিতীয়টি নেই বলেই আমরা এত আসক্ত। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক বছর তিনেক আগের একটি গবেষণায় দেখেছিলেন, নিজেকে নিয়ে কথা বলতে, নিজেদের মতামত ব্যক্ত করতে মানুষ এতটাই ভালোবাসে যে সেটা করতে গিয়ে যদি কিছু আর্থিক ক্ষতি হয়, তাহলেও আপত্তি থাকে না।

কোকেন বা সেরকম কোনো নেশার দ্রব্যে মস্তিষ্কের যে অংশ জেগে ওঠে, নিজের সম্বন্ধে কথা বলতে গেলে মানুষের নিজেকে নিয়ে কথা বলতে গিয়েও মস্তিষ্কের সেই অংশই সক্রিয় হয়। কী সাংঘাতিক ব্যাপার, ভাবা যায়?

কে কোথায় কী খেল, কী রান্না করল, কী জামা কিনল, কোথায় বেড়াতে গেল, কীভাবে ঘুমোচ্ছিল, মানে সব ফেসবুকে তুলে দেওয়ার পেছনে কোনো যুক্তিবোধ থাকতে পারে? কিন্তু তারপরও আমরা সবাই প্রায় এমন হাজার হাজার পোস্ট দিচ্ছি ফেসবুকে৷। ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ও জুটছে দেদার। অনেকে কিছু না ভেবে নতুন কোনো পোস্ট দেখলেই লাইক দেয়, ওটা স্বভাব। এভাবে সারাক্ষণ ‘আমিত্ব’ নিয়ে মেতে থাকতে পারার মধ্যে দুর্দান্ত উত্তেজনা।

তাতে অবশ্য কারও কারও বেশ সমস্যা হয়। অত বেখাপ্পা, বেঢপ জিনিসপত্র দেখে মগজ গরম হয়ে যায়। কিন্তু তারপর মনে হয়, কী-ই বা করবে? নিজেকে নিয়ে মেতে থাকুক না। আমি পাত্তা না দিলেই হল!

ফেসবুক কিন্তু গণতন্ত্রের ‘গণদেবতার’ রাগ-ক্ষোভ-ঘৃণা প্রকাশেরও জায়গা। আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের আর কথা বলার জায়গা কোথায়? এখানকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘গণদেবতা’ই তো সবচেয়ে উপেক্ষিত!

এখানে শাকিব খান, অপু, জয়া আহসান কিংবা পরীমনিকে নিয়ে মিডিয়া যতটা ব্যস্ত, সাধারণ মানুষদের নিয়ে তার ছিঁটেফোটাও নয়। মিডিয়া যেমন সেলিব্রেটি বানায়, আবার নিজেরা সবসময় সেলিব্রেটি খোঁজে। মন্ত্রীরা খেলা দেখতে গেলে ছবি বেরোয়, কিন্তু আপনি যতই জানা-বোঝাওয়ালা পাবলিক হোন না কেন, কোনো কানেকশান যদি না থাকে, কোনোভাবে সমাজে আপনার নাম যদি না ফাটে, তাহলে মিডিয়ায় আপনার কোনো স্থান নেই। এ কথাটা তো ঠিকই যে আমাদের অনেকেরই নানা ভাবনাচিন্তা থাকে; অনেককিছু বলার, দেখানোর থাকে। ফেসবুক সেই নিশ্চিন্ত উঠোন, যেখানে আমরা নিজেদের মেলে ধরতে পারি। হাসি-আড্ডা চলে, চলে ঝগড়াঝাঁটিও; যদিও তা ‘আমাকে’ নিয়ে।

আমার এই আমিকে জাগিয়ে রাখে যে ঠিকানা, সে ফেসবুকের নেশা কাটানো সত্যিই কঠিন। আর গবেষকেরা তো জানিয়েই দিয়েছেন:

‘ফেসবুক = কোকেন’।

তবে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ এক সমীক্ষায় প্রকাশ, ফেসবুক ব্যবহার করলে ক্ষুদ্রমনা হয়ে ওঠেন মানুষ। আমাদের মতের সঙ্গে মেলে এমন তথ্য ও মতামতই আমরা ফেসবুকে খুঁজি। এতদিন মনে করা হত যে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের জগতের পরিধি বাড়ে। ক্ষুদ্র ভাবনা ছেড়ে বৃহৎ চিন্তার খোরাক পায় মানুষ। কিন্তু বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষা অন্য কিছুর ইঙ্গিত দেয়।

গবেষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়। নিজের মতের সমর্থনে এমনকি জেনেবুঝেও কোসো মত বা ছবি শেয়ার করেন অনেকে। আর বিরুদ্ধ মত হলে অধিকাংশ মানুষই তা এড়িয়ে চলেন। গবেষকরা বলছেন, ‘কনফারমেশন বায়াসনেস’–এর কারণেই এমনটা হয়। মানে এমন কিছু বিষয়, যা আপনি প্রমাণ করতে চাইছেন। কিন্তু হাতের কাছে যুক্তি খুব কম বা জোরালো নয়। এই অবস্থায় সবচেয়ে সহজ হবে বিরুদ্ধ যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া।

শুধু তাই নয়, ফেসবুক মানুষকে এক আলাদা সমাজের বাসিন্দা বানিয়ে ফেলছে। এটা বাস্তব পৃথিবীর বাইরে আলাদা এক সমান্তরাল পৃথিবী। সোশ্যাল মিডিয়ার মানস-পৃথিবী। সেখানে মানুষ বেজায় সামাজিক। তার উদার, অনায়াস বিচরণ দেখলে তা-ই মনে হয়। বাস্তব পৃথিবীতে প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে তার যোগাযোগ যত কমছে, তত বেশি বাড়ছে ভার্চুয়াল জগৎ বা সেই কল্পপৃথিবীর সমাজ-জীবন।

বাস্তব থেকে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পাঁচ-সাড়ে পাঁচ ইঞ্চির পর্দায় এ ধরনের ডুবে থাকার ফল ভালো হবে, না মন্দ– তা পর্যালোচনার দায়িত্ব সমাজবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসকদের উপর ছেড়ে দেওয়াই ভালো। কিন্তু তা তর্কসাপেক্ষ ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল।

সোশ্যাল মিডিয়াকে দিনযাপনের অপরিহার্য অঙ্গে পরিণত করার তাৎক্ষণিক ফল যে রীতিমতো ভীতিপ্রদ, তা বিভিন্ন মেয়ে-শিক্ষার্থীর প্রেমে পড়া ও প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনাগুলো আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

দেখা যায়, অনেক ছেলেমেয়েরই আলাপ-পরিচয় হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। তারপর অনেক মেয়ে, বিশেষত কিশোরীরা প্রতারণার ফাঁদে পড়ে যায়। ফেসবুকে আলাপের সূত্রে কোনো একটি ছেলের আহ্বানে সাড়া দেওয়া আদৌ মেয়েটির পক্ষে উচিত কি না, তা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে। কিন্তু, তাতে মূল সমস্যার ভরকেন্দ্রটি বদলে যায় না।

সোশ্যাল মিডিয়ায় আলাপের পর সম্পূর্ণ অপরিচিতকে নিজের বলে ভাবা, তার সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করা এবং শেষে সম্পূর্ণ প্রতারিত হওয়ার বহু উদাহরণ চতুর্দিকে অহরহ তৈরি হচ্ছে। কিছু ধরপাকড় ও শাস্তিদান এই বিপুল সংকটের উৎস অবধি পৌঁছুতে পারবে না।

আশঙ্কা হয়, ভবিষ্যতে সংকট আরও সর্বগ্রাসী হতে পারে। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা প্রকট। এটি অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও যেমন সত্য, অভিভাবকদের অনেকের ক্ষেত্রেও তেমনই। তারা বাস্তব জগতে সন্তানের চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে যত আগ্রহী, কল্পদুনিয়ায় ততটা নন। সুষ্ঠু নজরদারির অভাবেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধের নিশানা হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্করাই।

সম্প্রতি একটি দৈনিকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে দুজন মায়ের করুণ আর্তি তুলে ধরা হয়েছে। ওই দুই মা জানিয়েছেন, তাদের কলেজপড়ুয়া ছেলেরা ফেসবুকে আসক্ত। সেই আসক্তি এত প্রবল যে ইন্টারনেট ব্যবহারের টাকা না পেলে মা-বাবাকে পর্যন্ত মারতে আসে। মায়েদের প্রশ্ন, তারা কোথায় যাবেন? কীভাবে বাঁচাবেন সন্তানদের?

একজন মায়ের মতে, ছেলেকে টিফিন কিনে খাবার জন্য টাকা দেন, ছেলে ইন্টারনেট ব্যবহার করে সে টাকা খরচ করে। সারা রাত জেগে থাকে। কিছু বললেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আত্মহত্যার হুমকি দেয়। কলেজের প্রথম পরীক্ষায় শুধু দুটি বিষয়ে ষাটের কোঠায় নম্বর পেয়েছে, বাকিগুলোয় কোনো রকমে পাস করেছে। টাকা না দিলে ভাঙচুর করে। সংসারে মূল্যবান যা কিছু ছিল, সবই ছেলে ভেঙে শেষ করেছে।

অন্য মায়েরও করুণ দশা। তাঁকে তাঁর স্বামী ছেড়ে চলে গেছেন মাসখানেক হল। ছেলেকে পুলিশে সোপর্দ না করলে আর ফিরবেন না বলেছেন। আর ছেলে হুমকি দিয়েছে, পুলিশে সোপর্দ করলে ফিরে এসে সে ‘ঐশীর মতো’ কাণ্ড ঘটাবে। ছেলে ইদানীং টাকার জন্য মাকে মারধরও করে।

সরকার ছয় ঘণ্টার জন্য ফেসবুক বন্ধ করার চিন্তাভাবনা করছে, কয়েক দিন আগে এমন একটা খবর শুনে তাঁরা খুশি হয়েছিলেন। এখন কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ চাইলেন এই দুই মা।

উল্লিখিত প্রতিবেদনটি আমাদের এক ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়! মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক সত্যিই কি আমাদের নবীন প্রজন্মকে ভিন্ন এক ‘মারণ নেশা’র পথে নিয়ে যাচ্ছে? এ ব্যাপারে আমরা কি সচেতন? শুধু তা-ই নয়, আমাদের সমাজে সোশ্যাল মিডিয়া-সংক্রান্ত অপরাধের ঘটনা, বিশেষ করে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়া আরও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। প্রশ্নটি নৈতিকতা বনাম স্বাধীনতার।

সন্তানকে বড় করার সময় কি তাকে নীতিগত প্রশ্নে অবিচল থাকবার পরামর্শ দেওয়া উচিত, নাকি নিরাপত্তার স্বার্থে তার স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা কর্তব্য? নৈতিকতা অভ্যেস হিসেবে অতুলনীয়। যৌন নির্যাতনমুক্ত আদর্শ পৃথিবী গড়তে এর প্রয়োজনও সর্বসম্মত। তার জন্য লড়াই শুরু হয়েছে। সেই লড়াই জোরদার করাও জরুরি। কিন্তু যতদিন না সেই আদর্শ পৃথিবী তৈরি হয়, ততদিন কিছু সতর্কতারও প্রয়োজন আছে। সেটা প্রয়োজন নিজ নিরাপত্তার স্বার্থেই। নৈতিকতা দিয়ে অসতর্কতা ব্যাখ্যা করা যায় না। একজন সম্পূর্ণ অপরিচিত বা অর্ধপরিচিতের আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মধ্যে এই অসতর্কতার চিহ্নই প্রকট। নির্মম সত্য এটাই যে, পুরুষরা আজও মেয়েদের ‘না’কে ‘না’ বলে ভাবতে শেখেনি!

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার, এর প্রতি আসক্তির ভালোমন্দ নিয়ে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। এ ব্যাপারে ব্যাপক গবেষণা-সমীক্ষারও প্রয়োজন রয়েছে। সময় কিন্তু দ্রুতই ফুরিয়ে যাচ্ছে। ব্যাধি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে জঙ্গিবাদের মতো ফেসবুক-আসক্তিও জাতির জন্য সীমাহীন ক্ষতির কারণ হতে পারে।