হোম » ফুটানির বুদ্বুদ সৃষ্টি করে সরকারকে বৈধ করা যাবে না

ফুটানির বুদ্বুদ সৃষ্টি করে সরকারকে বৈধ করা যাবে না

সিরাজুর রহমান- শনিবার, এপ্রিল ৫, ২০১৪

ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধকল সামলে নিতে বেশ সময় লেগেছিল। তারপর পঞ্চাশের দশকের শেষার্ধ থেকে ষাট ও সত্তরের দশকে মার্কিন পর্যটকেরা ভিড় করে ব্রিটেনে আসতে থাকে। শত চেষ্টা করেও তখন তাদের এড়ানো সম্ভব ছিল না। বাসে-ট্রেনে, পথে-দোকানে, মিউজিয়াম ও থিয়েটারেÑ মোটকথা সর্বত্রই তাদের উপস্থিতি ছিল। ব্রিটিশ ও মার্কিনিদের অভিন্ন ভাষা ইংরেজি। কিন্তু উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গির তফাত আকাশ-পাতাল। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করে বলেন, ব্রিটেন-আমেরিকা ইংরেজি ভাষা দ্বারা বিভক্ত দুই দেশ।

ইংরেজ সাধারণত সংযত জাতি। থিয়েটার হলে, সঙ্গীতানুষ্ঠানে ও লাইব্রেরিতে কথা বলা কিংবা শব্দ করা তাদের জন্য গুরুতর অপরাধ। অন্যত্র যেখানে অনেক লোকের উপস্থিতি সেখানেও জোরে কথা বলা কিংবা হাসা অন্যদের বিরক্তি উৎপাদন করে। ব্রিটিশ সংস্কৃতির এই অলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো অনেক মার্কিনিরই দুর্বোধ্য মনে হয়। তার ওপর ইংরেজের বিবেচনায় মার্কিনিরা দাম্ভিক হয়। কথায় কথায় তারা জাহির করতে চায় তারা কত ধনী, তাদের দেশ কত বিশাল, সে দেশের ঘরবাড়ি ইমারত ইত্যাদি কত বড় বড়, এমনকি রেস্তোরাঁয় কত বড় বড় স্টেক খেতে দেয়। তারা যেখানে সেখানে প্রচণ্ড শব্দ করে অট্টহাসি হাসে, বজ্রস্বরে নাক ঝাড়ে।

এসব দাম্ভিক উক্তি, গলা ছেড়ে কথা বলা, বাজখাঁই হাঁচি দেয়া ইত্যাদিতে বহু ইংরেজকে কপাল কুঁচকাতে দেখেছি। আড়ালে তো বটেই অনেক সময় মুখ ফিরিয়ে ফিস ফিস করে কেউ মন্তব্য করেছেন, জানি তোমাদের দেশ বড়, অর্থ-সম্পদ অনেক বেশি, কিন্তু জাতি হিসেবে তোমরা সবচেয়ে বড় আহাম্মক। ইউরোপের অনেক দেশই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতিগুলো মেরামত করে ফেলেছে। নতুন কিছু করা, নতুন কোথাও যেতে চাওয়া মার্কিনিদের আরেকটা বৈশিষ্ট্য। এখন তাদের অনেকে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপের দেশে যাচ্ছে ভিড় করে। অনেক ইংরেজ বোধ হয় নীরবে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।

প্রবাসে আছি ৫৪ বছর ধরে। তার আগের যে বাংলাদেশকে জানতাম সে সমাজ ছিল ভদ্র, বিনয়ী ও সংযত। জনতার মধ্যে আমাদের গলা একটু উঁচু হলেই গুরুজনরা চোখ গরম করে তাকাতেন। অশোভন আর দুর্বিনীত আচরণ করলে তো উপায়ই ছিল না। এখন মিডিয়া থেকে জানতে পারি সমাজের শীর্ষে যারা জবরদস্তি স্থান করে নিয়েছেন তাদের আচরণে স্তম্ভিত হতে হয়, তাদের কথা ও ভাষা ব্যবহারে দুর্গন্ধ বের হয়। মাঝে মধ্যে ভাবতে ইচ্ছে করে, ব্লিচ সহযোগে শক্ত ব্রাশ দিয়ে ঘসলেও কি তাদের মুখের দুর্গন্ধ দূর হবে? সজীব ওয়াজেদ জয় খালেদা জিয়াকে মিথ্যাবাদী বলেন। ছোটবেলা বয়োজ্যেষ্ঠ কাউকে মিথ্যুক বললে বাবা-মা অবশ্যই ঠাস করে চড় কষিয়ে দিতেন গালে। কিন্তু জয় বাংলাদেশের সংস্কৃতি শিখবেন কোত্থেকে? জয়ের জন্ম হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে, পাকিস্তানি দখলদারদের হেফাজতে। জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার পরে।

ভুল ইতিহাস থেকে সঠিক শিক্ষা হয় না

তিনি পড়েছেন আওয়ামী লীগ রচিত ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস নয়। প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষা ভারতে। ভারতীয়রা কোন ইতিহাস তাকে শিখিয়েছে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তার স্থায়ী নিবাস আমেরিকায়। তিনি সে দেশের নাগরিক। তার ওপর বিদগ্ধ পিতার কোনো প্রভাব তার ওপর পড়েনি বলেই মনে হয়। তিনি প্রভাবিত ক্ষমতালিপ্সু আর প্রতিহিংসা পরায়ণ মায়ের দ্বারা। এরা হয়তো ইতিহাসের বর্জ্য পদার্থ। আমার উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তা আগামী প্রজন্মের জন্য। ক্ষমতাসীনদের চুরি আর দুর্নীতি তাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। চোখের সামনে তারা অহরহ খুন-খারাবি ধর্ষণ দেখছে। বড় হয়ে কি এসবকেই তারা আদর্শ হিসেবে ধরে নেবে? মিডিয়ায় তারা অহরহ শুনছে মন্ত্রীদের অশ্লীল ভাষা। বড় হয়ে কী ভাষায় কথা বলবে তারা? আওয়ামী লীগ মন্ত্রীদের ভাষাই কি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা হয়ে যাবে?

আর মার্কিন পর্যটকদের দাম্ভিকতার কথা মনে পড়িয়ে দেয় বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের মেকি স্বীকৃতি ও প্রশংসা পাওয়ার জন্য কাঙালপনা দেখে। ইদানীং ‘গরিবের ঘোড়া রোগে’ পেয়ে বসেছে তাদের। সব চেয়ে বড়, সবচেয়ে সোচ্চার ও কর্কশ কিছু করতে হবে। হাজার হাজার মানুষ জড়ো করে সবচেয়ে বড় জাতীয় পতাকা সাজাতে হবে। লাখো মানুষের কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াতে হবে। তাহলে নাকি গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম উঠবে। বাংলাদেশের ক’জন মানুষ জানে গিনেস বুক অব রেকর্ডস কাকে বলে? গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নাম উঠলে তারা কি ভাত-কাপড় পাবে, নাকি চালের দাম এক টাকা কমবে? রান্না করার সময় বউ কি গ্যাস পাবে, আর ছেলেমেয়ে পরীক্ষার পড়া তৈরির জন্য বিদ্যুৎ? অথচ এই ফুটানিতে নাকি ৯৫ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে গরিব দেশের?

বাংলাদেশের অনুমোদিত জাতীয় সঙ্গীত এ দেশের জন্য বিবিসির উপহার। আমার চেষ্টায় বিবিসি সেটির রেকর্ডিংয়ের ব্যয় বহন করতে রাজি হয়েছিল। আয়োজন ও তদারকি করেছি আমি। পরে বহু রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শুনেছি নষ্ট হয়ে যাওয়া সিডিতে বিকৃত হয়ে যাওয়া জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হচ্ছে। লজ্জায় তখন মরে যেতে ইচ্ছে করে। ফুটানি না দেখিয়ে সঠিক সুরে জাতীয় সঙ্গীত বাজানো আরো ভালো কাজ হবে বলে আমি মনে করি।

সরকার আর তাদের পোষ্য মিডিয়ায় ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছে, প্রায় আড়াই লাখ লোক নাকি স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এবং স্বেচ্ছায় এসে এ অনুষ্ঠানে গান গেয়ে গেছে। তাহলে এত লোকের সাজগোজ, তাদের দেয়া খাবার ও উপহারের ব্যাগের ব্যয় কে বহন করেছিল? আর যে শুনেছি অনুষ্ঠানে এসে ভিড় বৃদ্ধির জন্য হাজার হাজার কর্মী পাঠাতে গার্মেন্ট কারখানার মালিকদের বাধ্য করা হয়েছিল সেটা কি সত্যি নয়? অনুষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা করেছিল সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের তিনটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। সাধারণ মানুষের মনে একটাই জিজ্ঞসা। ৯৫ কোটি টাকার কত কোটি এই কোম্পানিগুলোর পকেটে গেছে? মন্ত্রীর দফতরের কাজের কন্ট্রাক্ট তার মালিকানাধীন  কোম্পানি পেয়েছেÑ এটা মস্তবড় একটা দুর্নীতি। কোনো উন্নত দেশে হলে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে তলব করতেন, তাৎক্ষণিক তার পদত্যাগপত্র আদায় করে নিতেন।

এরা সংস্কৃতি বেচে ব্যবসায় করে

আসাদুজ্জামান নূরের কোম্পানিগুলোর আর কী কী লাভ হয়েছিল বলতে পারব না, কিন্তু সেসব কোম্পানির যে প্রচার হয়েছে, মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে সেটা তো অবশ্যই সত্যি। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি। অর্থাৎ ‘লাখো লোকের জাতীয় সঙ্গীত’ অনুষ্ঠানে ব্যয় হয়েছে মাথাপিছু ছয় টাকা করে। সবাইকে ছয় টাকা নগদ দেয়া হলে তারা অন্তত কিছু কাঁচা লঙ্কা কিনে পান্তা ভাতের সাথে ডলে খেতে পারত। আর আসাদুজ্জামান নূর? এক কালে তার পরিচয় ছিল সংস্কৃতিসেবী হিসেবে। এখন লোকে তাকে চেনে দাঙ্গাবাজরূপে। তার ‘শাহী’ মিছিলে যারা বাধা দিয়েছিল তাদের লাশ পাওয়া গেছে পথে-প্রান্তরে। সংস্কৃতি কথাটা শুনলে এখন কি লোকের গা-বমি করবে না? আসলে কিছু লোক সংস্কৃতির ব্যাপারী। সংস্কৃতি বেচে বড়লোক হতে চায়।

গিনেস বুক অব রেকর্ডস কি কথা দিয়েছে যে, জাতীয় সঙ্গীতের তামাশাটা তারা পরবর্তী সংস্করণে সংযুক্ত করবে? করলেও ব্যাপারটা কিন্তু সঠিক হবে না। আমি বিলেতে থাকি। এ দেশে প্রায় আড়াই লাখের বেশি মানুষ জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে থাকে। কী করে বলছি। এ দেশে ফুটবল স্টেডিয়াম আছে ১১৮টি। লন্ডনের ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ৯০ হাজার। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড স্টেডিয়ামের আসন সংখ্যা ৭৬ হাজার। লন্ডনে আর্সেনালের স্টেডিয়াম ইমিরেটসে ৬০ হাজার আসন আছে। ম্যানচেস্টার সিটি, লিভারপুল আর এভারটনসহ আরো কয়েকটি স্টেডিয়ামেও আসনসংখ্যা ৪১ থেকে ৫৩ হাজারের মধ্যে। প্রতি শনিবারে এবং হয়তো সপ্তাহের আরো এক দিন এসব স্টেডিয়ামে খেলা হয় ফুটবল মওসুমে। খেলার সময় নিজেদের এবং খেলোয়াড়দের উদ্দীপনা বৃদ্ধির আশায় দর্শকেরা সমস্বরে অন্যান্য গানের সাথে ‘গড সেভ দ্য কুইন’ গানটি গেয়ে থাকেন। কয়েকটি লিগ আর কয়েকটি কাপের ফাইনাল খেলা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আনুষ্ঠানিকভাবেই জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। দর্শক কর্মকর্তা-নির্বিশেষে সবাই তাতে যোগ দেন। অর্থাৎ বড় কোনো খেলার দিন অন্তত আট থেকে দশ লাখ লোক সমস্বরে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে থাকেন। অথচ তাতে সরকারকে এক পয়সাও ব্যয় করতে হয় না।

বিবিসি প্রতি গ্রীষ্মে লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হল থেকে ‘হেনরি উড প্রোমিনাড কনসার্ট’ প্রচার করে থাকে। এ হলের আসনসংখ্যা সোয়া পাঁচ হাজার। আরো কয়েক হাজার লোক দাঁড়িয়ে অনুষ্ঠান দেখতে পারেন। অনুষ্ঠানের শেষ দিনে লন্ডনের হাইড পার্ক, কার্ডিফ, বেলফাস্ট আর স্কটল্যাণ্ডের বড় কোনো পার্ক থেকেও একযোগে এ অনুষ্ঠান প্রচারিত হয়। এসব প্রত্যেকটি পার্কে দু-চার লাখ দর্শক যোগ দেন। অনুষ্ঠান শেষে সবাই সমস্বরে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে থাকেন। তাহলে সে দিন মোট কত লোক জাতীয় সঙ্গীতে অংশ নিলেন আপনারাই ভেবে দেখুন।

বাংলাদেশ এখন হুজুগের দেশ বলেই মনে হয়। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট হচ্ছে আরেকটা হুজুগ। আর খোদ প্রধানমন্ত্রী তার প্রধান ‘চিয়ার-লিডার’। শুনেছি এ উপলক্ষে পোস্টার-বিলবোর্ডে অজস্র কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। খেলার স্টেডিয়ামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে কলকারখানা বন্ধ রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কী লাভ হয়েছে তাতে? সব দেশের কাছেই তো হেরে গেল বাংলাদেশ। বিদেশে কোন কোন খেলার ফলাফল প্রচারিত হচ্ছে, কিন্তু প্রায়ই বলা হচ্ছে না খেলাটা কোন দেশে হলো। তারপর একটা খেলার মাঝামাঝি উল্লাস দেখাতে গিয়ে হাস্যকর হয়েছে বাংলাদেশ। সে উল্লাসে যোগ দিয়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও কি হাস্যকর হননি? অথচ সে খেলায় বেদম পেটানি খেয়েছে বাংলাদেশ। এসব মিথ্যা ফুটানি না দেখিয়ে যদি প্রকৃতই বাংলাদেশের ক্রিকেটের মানোন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেয়া হতো তাহলে কি বেশি ভালো হতো না?

সরকার বন্ধুত্ব ও সমর্থনহীন

অবশ্য কারোই বুঝতে বাকি নেই কেন এসব বুদ্বুদ সৃষ্টি করা হচ্ছে দরিদ্র দেশের সম্পদ ব্যয় করে। সরকার অবৈধ। দেশের মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে নির্বাচনী তামাশা করেছে সরকার। সে তামাশা দেখতে কোনো দেশই পর্যবেক্ষক পাঠায়নি। তারপরও জবরদস্তি গদি দখল করে আছে শুধু ভারত সরকারের কৃপায়। দেশের মানুষ তাদের চায় না। ফুটানি প্রকল্পের বুদ্বুদ সৃষ্টি করে দেশ-বিদেশের মানুষকে হাইকোর্ট দেখানোই হচ্ছে সরকারের আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু মানুষ এতই কি বোকা যে এত সহজে তারা প্রতারিত হবে?

আসলে প্রতারিত তারা হচ্ছে না। সরকার শুধু নিজেকেই প্রতারিত করছে। গত এক সপ্তাহের কথাই ধরুন। অস্ট্রেলিয়ার সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল রবিলিয়ার্ড এসেছিলেন বাংলাদেশে। এসেছিলেন ব্রিটিশ বৈদেশিক উন্নয়নমন্ত্রী অ্যালান ডানকান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি প্রতিনিধিদল। তারা সবাই সরকারকে পরামর্শ দিয়ে গেছেন ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়, সরকারের উচিত শিগগিরই সংলাপ ও সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন করে নির্বাচন করা। মার্কিন সরকার তো বারবার করে বলেছে নির্বাচন সম্বন্ধে তাদের মনোভাব ৫ জানুয়ারির আগে যা ছিল এখনো তাই আছে। রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা স্বদেশে গিয়েছিলেন তার ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ নিতে।  ১৮ দিন পরে ঢাকায় ফিরে এসে গত সোমবার তিনি বলেছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সম্বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মতামত এতটুকু বদলায়নি। তিনি বলেছেন, ‘সব দলের অংশগ্রহণে (নতুন) নির্বাচন চায় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সিনেটের শক্তিধর পররাষ্ট্র কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর রবার্ট মেনেন্ডিজও এসেছিলেন বাংলাদেশে। মার্কিন কংগ্রেস ও সরকারের মনোভাব বাংলাদেশ সরকারকে আবারো জানিয়ে গেছেন তিনি।

সেনেটার মেনেন্ডিজ সরকারকে আরো জানিয়ে গেছেন গার্মেন্ট শ্রমিকদের অবস্থা উন্নয়নের জন্য সরকার যা করেছে সেটা যথেষ্ট নয়। কংগ্রেসের সব দাবি মেনে নেয়া না হলে গার্মেন্ট রফতানিতে জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশ পাবে না। বর্তমান বাংলাদেশের ওপর যে গোটা বিশ্ব বিমুখ তার কারণও সরকারের ভ্রান্ত পররাষ্ট্র নীতি। ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের বাণিজ্য মেলা রাশিয়ায় হওয়ার পক্ষে ভোট দিয়ে সরকার সংযুক্ত আমিরাতকে চটিয়েছে। আমিরাত এখন বাংলাদেশী শ্রমিক নেবে না। এমনকি বাংলাদেশীদের ট্রানজিট ভিসাও দেবে না। এখন আবার রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের ব্যাপারে জাতিসঙ্ঘের ভোটে বিরত থেকে গোটা পশ্চিমী বিশ্বকে চটিয়েছে সরকার। সোমবার রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা এ-ও বলেছেন যে ক্রিমিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের ভোট না দেয়া দুর্ভাগ্যজনক।

দলে ও সরকারে গৃহযুদ্ধ

এ দিকে সরকারের নিজের অবস্থা সাবানের বুদ্বুদের মতো, অলীক ও ক্ষণস্থায়ী। দেশে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেই, অনেক দিন ধরেই ছিল না। লক্ষণীয় যে এখন মারামারি কাটাকাটি শুরু হয়ে গেছে সরকার ও শাসক দলের ভেতরে। অর্থসম্পদ ও প্রভাব বিস্তারের লোভে বন্দুকযুদ্ধগুলো এখন হচ্ছে আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে। ছাত্রলীগ যুবলীগ নেতাদের, যুবলীগ ছাত্রলীগ কর্মীদের এবং তারা উভয়েই আওয়ামী লীগ নেতাদের খুন করছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? এক সপ্তাহের পত্রিকাগুলো পড়ে দেখুন।

মন্ত্রীরা এখন বিএনপিকে গালাগাল দিয়ে তৃপ্তি পাচ্ছেন না। একে অন্যের দফতরের সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেছেন, ‘ভূমিদস্যুতা এখন ক্ষমতাসীনদের (অর্থাৎ সরকারি দলের লোকেদের) চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারাই ক্ষমতাবান তারাই ভূমিদস্যু।’ মুহিত আরো বলেছেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে যে জালিয়াতি হয়েছে তাতে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি আমরাও দায়ী।’  কিন্তু এমন প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করায় পরিকল্পনামন্ত্রী লোটাস কামাল খুশি হতে পারেননি। তিনি বলেছেন, ‘অর্থমন্ত্রী মুহিত বিশ্বব্যাংকের পেনশন খেয়ে চলেন’।

তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু যে আদৌ লজ্জা শব্দটা জানেন আমার ধারণা ছিল না। তিনি বলেছেন, ‘সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যারহস্য উদঘাটনে প্রশাসনের ব্যর্থতা লজ্জাকর।’ কিন্তু ইনু সাহেব তো মন্ত্রী হয়েছেন বেশ কিছু দিন আগে। এই হত্যারহস্য উদঘাটনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন? পুলিশের এবং প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তাকে তাগিদ দিয়েছেন? দেশে যখন ছিলাম ‘আমড়াগাছি’ বলে একটা কথা প্রায়ই শুনতাম। অর্থহীন লোক দেখানো কথাকে আমড়াগাছি বলা হতো তখন। হাসানুল হক ইনু কি সাংবাদিকদের ক্রোধ প্রশমিত করার ব্যর্থ চেষ্টায় আমড়াগাছি করছেন না?

আসলে সরকারের ভেতরেও এখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খামোখা অর্থহীন ফুটানি করে সে আতঙ্কই তারা ঢাকার চেষ্টা করছে। বিরোধীদের, বিশেষ করে বিএনপির নেতানেত্রীদের গালাগাল করে, তাদের গ্রেফতার করে, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করে এবং বিরোধী নেতাকর্মীদের হত্যা করে সরকার টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা করছে, যেমন করে ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো ধরে বাঁচার চেষ্টা করে। এ দিকে দলে, এমনকি মন্ত্রীদের মধ্যেও যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে সেটা চূড়ান্ত সর্বনাশের কিছু আলামত মাত্র।

(লন্ডন, ০২.০৪.১৪)

বিবিসি বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান

serajurrahman34@gmail.com