ফাহিম সালেহ’র বোন জানালেন- দাফনের সময় লাশ জোড়া লাগানো হয়েছিল

ফাহিম

নিউইয়র্কের ম্যানহাটানের একটি অ্যাপার্টমেন্টে নৃশংসভাবে খুনের শিকার টেক সিই্ও ফাহিম সালেহর বোন বৃহস্পতিবার তার ‘সুন্দর’ ভাই সম্পর্কে আবেগময় একটি পোস্ট দিয়েছেন। এতে তিনি জানিয়েছেন যে, দাফনের সময় ফাহিমের কাটা মাথা ও অঙ্গ-প্রতঙ্গগুলো তার লাশের সাথে সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল।

তেত্রিশ বছর বয়স্ক সালেহ’র বীভৎস মৃত্যুর এক মাস পর রুবি অ্যাঞ্জেলা সালেহ মোটামুটি বড় এই পোস্টটি দেন।

রুবি লিখেছেন, ‘ঠিক এক মাস আগে ২০২০ সালের ১৩ জুলাই আমার ভাই তিন মাইল দূর থেকে ফিরে আসে, তার অ্যাপার্টমেন্টে খুন হয়।’ তিনি লিখেছেন, ‘এখনো অনেক সময় বিশ্বাস করতে পারি না যে ফাহিম চলে গেছে। অনেক সময় ঘটনাটি নৃশংস, জঘন্য ও অসহনীয় বাস্তবতার মতো খুবই রূঢ়ভাবে হানা দেয়, অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখি না, আমার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি ভাগে তীব্র যন্ত্রণা আঘাত করে।’

মর্মস্পর্শীই পোস্টে দুই বোন ও মা-বাবার সাথে ফাহিমের কয়েকটি পারিবারিক ছবিও প্রকাশ করা হয়। তাছাড়া তার সংক্ষিপ্ত জীবন, ৩ বছরের শঙ্কর প্রজাতির কুকুর লায়লার প্রতি ফাহিমের ভালোবাসা, পরিবার ও কর্মীদের প্রতি তার উদারতা, একেবারে শিশু বয়স থেকে প্রযুক্তির প্রতি তার আচ্ছন্নতার মতো বিষয়গুলোও সামনে আনা হয় এই পোস্টে।

রুবি তার প্রযুক্তি পাগল ভাই সম্পর্কে লিখেছেন, ‘ফাহিমের মাথাটি ছিল তলাবিহীন ম্যাজিক হ্যাটের মতো। ছোট ও বড়, মজাদার এবং কঠিন, স্থানীয় ও বৈশ্বিক- নানা আইডিয়ায় ভরা থাকত তার মাথা। এরপর ও কী করবে, তা কোনোভাবেই বোঝা যেত না। তবে এটা ঠিক, ও প্রতিটি আইডিয়া নিয়ে সাথে সাথে কাজে বসে যেত। ও বসে থাকার লোক ছিল না। আমাদের সবাইকে খুশি করতে ও তার মাথায় আসা আইডিয়া কাজে পরিণত করতে খুবই উদ্দীপ্ত থাকত।’

রুবি বলেন, ফাহিমরা সৌদি আরব থেকে যখন আমেরিকায় পাড়ি জমায়, তখন পরিবারটি ভেঙে যায়। তার বাবা লুজিয়ানায় কম্পিউটার প্রোগ্রামার হিসেবে কাজ করতেন।

রুবি বলেন, অন্যান্য ধনী উদ্যোক্তার সাথে সারাক্ষণ মেলামেশা করার প্রতি ফাহিমের আগ্রহ একেবারেই ছিল না। প্রতিবেশিদের প্রতি তার হৃদয় ছিল সবচেয়ে খোলা।

ফাহিম নাইজেরিয়ায় মোটরবাইট-হেইলি অ্যাপ গোকাদা তৈরী করেছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘এসব চালক আমার ওপর নির্ভরশীল।’ রুবি বলেন, ফাহিম একসময় আমাদের বাবার কঠিন জীবন দূর করতে যেভাবে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল, ঠিক একই রকম ছিল অসংখ্য লোকের জীবন-সংগ্রাম সহজ করতে।

ফাহিমের সাবেক নির্বাহী সহকারী টাইরেস হ্যাসপিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তার সাবেক বসকে নৃশংসভাবে হত্যা করার। অভিযোগ রয়েছে, এই লোক ফাহিমের ৯০ হাজার ডলার আত্মসাৎ করেছিলেন। ফাহিম প্রস্তাব দিয়েছিলেন, হ্যাসপিল (২১) যদি কিস্তিতে ওই অর্থ পরিশোধ করে দেয়, তবে তিনি পুলিশ ডাকবেন না।

রুবি জানান, ফাহিমের খুন হওয়ার খবরটি তিনি পেয়েছিলেন তার চাচির কাছ থেকে। খবরটি পেয়ে তিনি ভয়াবহ রকমের আতঙ্কিত হওয়ার কথাও স্মরণ করেছেন।

তিনি বলেন, বসার ঘরে মাথা ও হাত-পাহীন লাশটি তিনি দেখেছিলেন। বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে ফাহিমের মাথা ও হাত-পা কেটেছিলেন হ্যাসপিল। ওই অবস্থাতেই ফাহিমের লাশটি পাওয়া গিয়েছিল তার ২.২ মিলিয়ন ডলারের অ্যাপার্টমেন্টে।

ফাহিমের হাত ও পা দুটি আবর্জনা ফেলার ব্যাগে ভরে রাখা হয়েছিল।

রুবি বলেন, কম্পিউটারে ছবির মাধ্যমে তার ভাইয়ের টুকরা টুকরা করা লাশটি শনাক্ত করতে হয়েছিল। করোনাভাইরাসের কারণে তিনি নিজে সেখানে যেতে পারছিলেন না।

তিনি লিখেছেন, “আমি কম্পিউটার স্ক্রিনেই আমার তর্জনি আঙুল দিয়ে তার মুখটি যখন স্পর্শ করছিলাম, আমার গাল বেয়ে কান্না ভেঙে পড়ছিল। আমি কেবল তাকে বলতে চাইছিলাম, ‘আমি খুবই দুঃখিত, ফাহিম আমি খুবই দুঃখিত, ফাহিম। আমার হতভাগা, মিষ্টি ভাই আমার। আমার জান।”

রুবি জানান, তিনি কফিনে ভরার আগেই ফাহিমের মাথা ও অন্যান্য অংশ দেহের সাথে জুড়ে দেওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, দাফনের আগে ওগুলো সেলাই করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, আমার পরিবার ও আমি খুবই দুঃখ পেয়েছি, যন্ত্রণাকাতর হয়ে পড়েছি। আমাদের সুন্দর ছেলেটিকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে, জীবন আর কখনো আনন্দময় হবে না।

রুবি বলেন, তার বাবা দিন কাটিয়ে দেয় ফাহিমের প্রিয় লায়লাকে নিয়ে। তিনি ফাহিমের সাথে যেভাবে কথা বলতেন, লায়লার সাথেও সেভাবে করেন। আর তিনি তার ছেলের অর্জনগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকেন, সেগুলো পড়েন।

রুবি লিখেছেন, আমার মা সারা দিন কেবলই কাঁদেন। রাতে তিনি ঘুমাতে পারেন না।
রুবি দৃঢ়তার সাথে বলেন, তার পরিবার ফাহিমের হত্যাকারীর বিচারের জন্য লড়াই করবে। তিনি বলেন, ফাহিমের মৃত্যু ‘সবচেয়ে নৃশংস ও জঘন্য প্রকৃতির অপরাধ।’

You Might Also Like