হোম » পয়লা বৈশাখ

পয়লা বৈশাখ

admin- Saturday, April 15th, 2017

সৈয়দ আশরাফ আলী
বাংলা নববর্ষ সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করি যে, পয়লা বৈশাখ নববর্ষ উদযাপন করা উচিত নয়। কারণ এটি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ। এটি কিন্তু ভ্রান্ত ধারণা। এ কথা সত্য যে, মহানবী সা: বলেছেন, মুসলমানদের জন্য দু’টি উৎসব রয়েছেÑ ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। কিন্তু নতুন একটি বছরের শুরুতে যদি মহান আল্লাহ তায়ালাকে ঐকান্তিকভাবে স্মরণ করে সারা বছর যেন নিরাপদ ও নির্বিঘœ থাকে সে বিষয়ে তার রহমত কামনা করা হয়, তাহলে সেই নববর্ষ উদযাপন শরিয়তবিরোধী হবে কেন? নর-নারীর বল্গাহীন, উন্মত্ত মেলামেশার মাধ্যমে বাংলা, গ্রেগরিয়ান বা হিজরিÑ কোনো নববর্ষের উদযাপনই শরিয়ত সমর্থন করে না।
তা ছাড়া বাংলা সনের জন্ম দিয়েছেন মুসলমানরাই। মহানবী সা:-এর মহান স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক হিজরতভিত্তিক হিজরি সন অবলম্বনেই এই বাংলা সন প্রণীত হয়েছে। এর জন্ম দিয়েছেন একজন মুসলমান। বাংলা সনের ইতিহাস ঘটনাবহুল ও বৈচিত্র্যময়। জন্মের অব্যবহিত পরেই তার বয়স হয় ৯৬৩ বছর। অর্থাৎ, বাংলা সনের প্রথম বছরটি যখন শেষ হয়, তখন সে ৯৬৪ বছরের এক সবল, স্বাস্থ্যবান তরুণ। আজগুবি বা হেঁয়ালি মনে হলেও এ দাবি কিন্তু ইতিহাস সমর্থিত। শুধু তা-ই নয়, বাংলা সনের প্রবর্তন যিনি করেছেন তিনি কোনো বাংলাভাষী বা বাংলাদেশী নন। তিনি ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর দ্য গ্রেট। সুদূর দিল্লিতে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত থেকেই তিনি এ দেশে বাংলা সন প্রবর্তন করেন।
‘সন’ ও ‘তারিখ’ দু’টিই আরবি শব্দ। প্রথমটির অর্থ হলো বর্ষ বা বর্ষপঞ্জি এবং অন্যটির অর্থ, দিন। তারিখ বলতে আবার ইতিহাসও বোঝায়। সাল হচ্ছে একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হলো বছর। বাংলা সনের সূত্রপাত আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে। অর্থাৎ, ইসলামি সনের ওপর ভিত্তি করেই বাংলা সনের প্রবর্তন। যারা ইতিহাসকে স্বীকার করেন না বা যারা ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, তারাই মনে করেন, বাংলা সন অমুসলিমদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি বর্ষপঞ্জি।
সর্বশ্রেষ্ঠ ও শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর মক্কা থেকে মদিনায় ঐতিহাসিক হিজরত অবলম্বন করে প্রবর্তিত, এই হিজরি সন শুরু হয় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই থেকে। হিজরি সালকেই সুকৌশলে বাংলা সনে রূপান্তর করা হয়।
আকবরের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে ৯৯৮ হিজরি মোতাবেক ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে ১০ কিংবা ১১ মার্চ তারিখ-এ-ইলাহি নামে একটি নতুন বর্ষপঞ্জিকা চালু করা হয়, যা পরবর্তী পর্যায়ে তদানীন্তন বঙ্গ ভূখণ্ডে ‘বাংলা সন’ নামে অভিহিত হয়।
পিতা সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর বাদশাহ আকবর ৯৬৩ হিজরিতে অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দে (১৪ অথবা ১৫ ফেব্রুয়ারি) দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। তখন আকবরের বয়স ছিল ১৩ বছর ৪ মাস মাত্র। ৫ নভেম্বর, ১৫৫৬ তারিখে ঐতিহাসিক পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে বাদশাহ মুহাম্মদ শাহ আদিলের প্রধান সেনাপতি হিমু চন্দ্র বিক্রমাদিত্যর বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করে সম্রাট আকবর দিল্লি দখল করেন।
এই ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণীয় করে রাখার জন্য ৯৬৩ হিজরি অবলম্বন করেই তারিখ-এ-ইলাহি তথা ‘বাংলা সন’ চালু করা হয়। অর্থাৎ ১, ২ ও ৩ এভাবে হিসাব না করে মূল হিজরি সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ফলে, জন্মবছরেই বাংলা সন ৯৬৩ বছর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু করে। হিজরি সনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। মহানবী সা: স্বয়ং আনুষ্ঠানিকভাবে হিজরি সন চালু করেননি। এটি প্রবর্তন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর বিন খাত্তাব রা: ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দে। ঐতিহাসিক হিজরতের ১৬ বছর পর।
সম্রাট আকবরের নির্দেশে প্রচলিত হিজরি সনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাজ-জ্যোতিষী আমির ফতেহ উল্লাহ সিরাজী বহু ভাবনাচিন্তার পর যে বর্ষপঞ্জিকা প্রচলন করেন, তা ‘তারিখ-এ-ইলাহি’ নামে অভিহিত হয়। বিভিন্ন অঞ্চলের নাম অনুযায়ী এই ‘ফসলি সন’ পরিবর্তিত রূপ ধারণ করে এবং বাংলা ভূখণ্ডে তা বাংলা সন নামে অভিহিত হয়।
‘হিজরি সন’ হচ্ছে চান্দ্রসন এবং ‘বাংলা সন’ সৌরসন। ফলে, একই সময়কাল থেকে যাত্রা শুরু করলেও (৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই তারিখে) ‘হিজরি ও ‘বাংলা’ সন দু’টির বয়সে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে এই পার্থক্য ১৪ বছরের। হিজরি সনের হিসাব অনুযায়ী এ বছরটি হলো ১৪৩৬ হিজরি। কিন্তু বাংলা সনের হিসাবে এটি হচ্ছে ১৪২২ সাল। এই পার্থক্য অতি স্বাভাবিক। কারণ চান্দ্রবছর এবং সৌরবছরের পার্থক্য প্রায় ১১ দিনের। পয়লা বৈশাখ ১৪২২ সনে এই পার্থক্য হচ্ছে ১৪৩৬-১৪২২=১৪ বছর।
বাংলা সন শকাব্দের কাছেও কিঞ্চিৎ ঋণী। বাংলা সনে আমরা বর্তমানে দিন ও মাসের যে নামগুলো ব্যবহার করি, সেগুলো শকাব্দ থেকেই গৃহীত। সপ্তাহের নামগুলোÑ রবি, সোম, মঙ্গল, বুধ ইত্যাদি গৃহীত হয়েছে গ্রহপুঞ্জ ও সূর্য থেকে। মাসের নামগুলো যেমনÑ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ইত্যাদি আমরা পেয়েছি নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে।
বর্তমান ভারতের জাতীয় সন হচ্ছে শকাব্দ। রাজা চন্দ্রগুপ্ত খ্রিষ্টপূর্ব ৩১৯ অব্দে গুপ্তাব্দ প্রবর্তন করেন। এই সন পরে ‘বিক্রমাব্দ’ নামে অভিহিত হয়। এই ‘অব্দ’ প্রথমে শুরু হতো চৈত্র মাস থেকে। পরবর্তী পর্যায়ে কার্তিক মাসকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে পরিচিহ্নিত করা হয়।
১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার বাংলা একাডেমি কর্তৃক বহুভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে বাংলা সনের যুগোপযোগী সংস্কার সাধিত হয়। অধিবর্ষের (Leap year) বিধানসহ দিন ও তারিখের অনিয়ম সংশোধন করে নি¤েœবর্ণিত সিদ্ধান্তগুলো গৃহীত হয়েছিল : ১. মোগল আমলে বাদশাহ আকবরের সময়ে হিজরি সনভিত্তিক যে বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করা হয়, তা থেকে বছর গণনা করতে হবে। ২. বাংলা মাস গণনার সংবিধার্থে বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি মাস ৩১ দিন হিসাবে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন পরিগণিত হবে।
সংশোধিত এই বাংলা সন এ দেশ কিন্তু সহজে গ্রহণ করেনি। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলো যে রকম গড়িমসি করেছিল, বাংলা একাডেমি কর্তৃক সংশোধিত ‘বাংলা সন’ গ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশেও অনুরূপ কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায়। ফলে, সংশোধনের প্রায় দুই যুগ পর ১৯৮৮ সালের ১৯ জুন তারিখে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘বাংলা সন’-এর সংশোধিত রূপ স্বীকৃত হয়েছে।
সন হিসেবে ‘বাংলা সন’ নিঃসন্দেহে অতীব কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত বলে বিবেচিত। এর কারণ হলো, এটি একই সাথে চান্দ্র (Lunar) ও সৌর (Solar) পদ্ধতির সার্থক উত্তরাধিকারী। এর প্রথমাংশ, অর্থাৎ ৯৬৩ বছর, সম্পূর্ণরূপে হিজরি সনভিত্তিক তথা চান্দ্রসন। পরবর্তী অংশ, অর্থাৎ ৯৬৩ থেকে অদ্যাবধি, সৌরভিত্তিক। ফলে, বিশ্বে সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত ‘ইংরেজি’ তথা ‘গ্রেগরিয়ান’ ক্যালেন্ডারের সাথে ‘বাংলা সন’ সামঞ্জস্য রেখে চলছে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ৯৬৩ বাংলা বর্ষে পয়লা বৈশাখ হয়েছিল ১১ এপ্রিল, ১৫৫৬ তারিখে। এ বছর অর্থাৎ ১৪২২ বাংলা সনে, পয়লা বৈশাখ আমরা পাচ্ছি ১৪ এপ্রিল। অর্থাৎ ১৪২২-৯৬৩=৪৫৯ বছরে পার্থক্য হয়েছে মাত্র তিন দিনের। আর, ভবিষ্যতে সে পার্থক্য এর চেয়ে এক দিনের বেশি কখনো হবে না। বিজ্ঞানসম্মত এবং মুসলমান কর্তৃক প্রবর্তিত হিজরিভিত্তিক, এই ‘বাংলা সন’ নিঃসন্দেহে আমাদের গৌরব।
লেখক : সাবেক ডিজি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, এটি মরহুমের জীবদ্দশায় শেষ লেখা হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

সর্বশেষ সংবাদ