হোম » ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’

‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী- Tuesday, April 25th, 2017

গত শতকের কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য, ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা। ’ তিরিশের দশকের শেষদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিশ্বধ্বংসী রণদামামা বেজে উঠেছিল। নাৎসবাদের অভ্যুত্থানে মানবসভ্যতা বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষেও মানুষ শান্তির মুখ দেখেনি। শুরু হয়েছিল অনুরূপ ভয়াবহ স্নায়ুযুদ্ধ। একমাত্র গত শতকের নব্বইয়ের দশকটাকেই মনে হয়েছিল একটি শান্তি ও স্বস্তির যুগ।

এই সময়ে বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলা হয়। দুই জার্মানির একত্রীকরণ ঘটে। ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে হোয়াইট হাউসে মিলিত হয়ে করমর্দন করেন। আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সৈন্য প্রত্যাহৃত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায় এবং দুই পরাশক্তির মধ্যে বিপজ্জনক স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। কাশ্মীর সমস্যায় স্থিতাবস্থা দেখা দেয়। বাংলাদেশে এরশাদ স্বৈরশাহির পতন ঘটে, গণতান্ত্রিকব্যবস্থা ফিরে আসে—ইত্যাদি। কিছুকালের জন্য হলেও মনে হয়েছিল, বিশ্বে বুঝি শান্তি ও স্বস্তির যুগ শুরু হতে চলেছে।

স্বপ্নভঙ্গ হতে বেশি দেরি হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার বিপর্যয়ে বাংলাদেশেও অনেক কমিউনিস্ট খোল-করতাল নিয়ে রাস্তায় নাচতে নেমেছিলেন এবং দুদিন আগের সুর পাল্টে বলতে শুরু করেছিলেন, সোভিয়েতের পতনে বিশ্বে গণতন্ত্রের ‘অমলধবল পালে মন্দমধুর হাওয়া’ লেগেছে। এমনকি তাঁদের অনেকে কার্ল মার্ক্সকে পরিত্যাগ করে কামাল হোসেনকে নেতা বরণ করে (গণফোরামে যোগ দিয়ে) ‘নব্য গণতন্ত্রী’ সেজেছিলেন। দুদিন পর দেখা গেল তাঁদের অনেকের মোহভঙ্গ হয়েছে। এখন তাঁরা তাঁদের বণিত পাতিবুর্জোয়া দলগুলোতেই গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন।

নব্বইয়ের দশকের কালটা ছিল মরুভূমিতে মরীচিকার মতো। মানুষকে শান্তি ও স্বস্তির আশা দেখিয়ে সহসাই মিলিয়ে গেছে। বিশ শতকের শেষ ভাগেই বোঝা গেল সুপার পাওয়ার হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনে বিশ্বশান্তির জন্য কী সংকট দেখা দিয়েছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা বলে পরিচিত আমেরিকা বিশ্বের একক সুপার পাওয়ার হওয়ার পর দেখা গেল বিশ্বে আরেকটি অন্ধকার যুগ শুরু হতে চলেছে। মনে হলো, অরওয়েলের লেখা ‘১৯৮৪’ নামক বইটিতে বর্ণিত পরিস্থিতি পৃথিবীতে বুঝি বাস্তব সত্য হতে চলেছে। গণতন্ত্রের রক্ষক বলে পরিচিত আমেরিকাই ‘এ বুল ইন দ্য চায়না শপ’-এর মতো গণতন্ত্রের শান্তির বাগানে অসুরের সংহার মূর্তিতে আবির্ভূত।

এখন বিশ্বে গরমযুদ্ধ ও শীতলযুদ্ধ দুটিই পাশাপাশি চলছে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার রেজিম চেঞ্জের অশুভ নীতি, একতরফা গালফ যুদ্ধ বাধানো, এশিয়ায় চীন ও ভারতের মধ্যে বিরোধ উসেক দিয়ে নিজের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা (এই একই চেষ্টা গত শতকে তারা চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে বিরোধ লাগিয়ে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য করেছে), জাতিসংঘকে এড়িয়ে যুদ্ধ করা, অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন, ইচ্ছামতো বোমা হামলা বিশ্বশান্তি ও মানবসভ্যতাকে এক নতুন হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একুশ শতকের শুরু থেকেই বিশ্বে যে আতঙ্ক ও অস্থিরতার যুগ শুরু হয়েছে, অতীতে তার তুলনা বিরল। নিউ ইয়র্কে টুইন টাওয়ারের ঘটনা দিয়ে এ যুগের শুরু। তারপর একটার পর একটা ঘটনায় বিশ্ববাসীর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সময় আর হয়নি। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘প্রিয়, ভুল খেলবার দিন নয় অদ্য। ’ এ যুগে বেঁচে থাকলে তিনি কী লিখতেন? অথবা গত শতকেই রবীন্দ্রনাথ যে লিখেছিলেন, শান্তির ললিতবাণী শোনায় যে ব্যর্থ পরিহাস—সে কথাই কি আবার সত্য হবে?

বিশ শতক জন্ম দিয়েছে হিটলার, মুসোলিনি, তোজোকে। একুশ শতকে আবির্ভাব ঘটেছে জর্জ বুশ জুনিয়র, ডোনাল্ড ট্রাম্প, ল্য পেন প্রমুখের। তাঁদের হাতে বিশ্বধ্বংসী ক্ষমতা আরো বেশি। গত শতকের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান কোরিয়া যুদ্ধে আণবিক বোমা ব্যবহারের হুমকি দিয়েছিলেন; এ শতকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে মিসাইলবাহী যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছেন। সিরিয়ায় অন্যায়ভাবে মিসাইল হামলা চালিয়েছেন। আতঙ্কিত বিশ্ববাসী ভাবছে, তাহলে কি একটি আণবিক যুদ্ধ সত্য সত্যই আসন্ন? এই যুদ্ধ হলে পৃথিবী নামক গ্রহটির অস্তিত্ব থাকবে কি? প্রেমিকদের ফুল খেলবার দিনটি সত্যই ধ্বংসের মুখোমুখি হবে?

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘চারিদিকে নাগিনীরা ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস’। মনে হয়, এই কথাটি একুশ শতকের এই যুগে এসে পরিপূর্ণভাবে সত্য হতে চলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ে মানবসভ্যতার সংকট কাটেনি। বরং একক দানবের অভ্যুত্থানের পথ প্রশস্ত করেছে। ফলে হিটলারের ইহুদিবিদ্বেষ প্রচার দ্বারা ক্ষমতা দখলের মতো আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমবিদ্বেষ প্রচার দ্বারা হোয়াইট হাউস দখল করতে পারেন। বিনা যুদ্ধ ঘোষণায় হিটলারের অস্ট্রিয়া দখল ও পোল্যান্ডে হামলা চালানোর মতো সিরিয়ায় মিসাইল হামলা চালাতে পারেন, উত্তর কোরিয়াকে আণবিক বোমা হামলার হুমকি দিতে পারেন। ভারতে হিংস্র হিন্দুত্ববাদ প্রচণ্ডভাবে মাথা তুলতে পারে। তুরস্ক ও মিসরে সেক্যুলার কামালবাদ ও নাসেরবাদের বিপর্যয় ঘটতে পারে। আর সব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই মাথা তুলতে পারে মধ্যযুগীয় মৌলবাদী সন্ত্রাস।

গত শতকের ইউরোপে ফ্যাসিবাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছে মনে করা হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার ৭০ বছর না যেতেই ফান্স, জার্মানি, পর্তুগাল, স্পেনে আবার নব্য ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিতে শুরু করে। আমেরিকায় ‘নিউকনদের’ নব্য ফ্যাসিবাদী বললে অত্যুক্তি করা হয় না। জর্জ বুশ জুনিয়রের প্রশাসন ছিল এই নিউকনদের প্রশাসন। মিথ্যা অজুহাতে হিটলারের পোল্যান্ড দখলের সঙ্গে একই মিথ্যা অজুহাতে জর্জ বুশের ইরাক দখল প্রক্রিয়ার কোনো পার্থক্য নেই। বারাক ওবামা ক্ষমতায় এসেও মার্কিন প্রশাসনে ‘নিউকনদের’ আধিপত্য উচ্ছেদ করতে পারেননি। ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো বেশি ফ্যাসিবাদী মনোভাব নিয়ে আমেরিকায় ক্ষমতা দখল করতে পেরেছেন।

ইউরোপ-আমেরিকাজুড়েই এখন ফাররাইট বা উগ্র দক্ষিণপন্থার ঝড় বইছে। কমিউনিজম, সোশ্যালিজম যেন এখন অতীতের পচা বিষয়। ফ্রান্সে চরম দক্ষিণপন্থী ও বর্ণবিরোধী দল ন্যাশনাল ফ্রন্ট এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। চলমান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই দলের প্রার্থী ল্য পেন জয়ী হতে পারেন বলে অনেকেই মনে করছেন। নির্বাচনের প্রথম দফায় ভোটের বুথফেরত সমীক্ষায় দেখা যায়, উদারপন্থী মাক্রোঁ ন্যাশনাল ফ্রন্টের ল্য পেনের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে আছেন। কিন্তু প্যারিসে বৃহস্পতিবারের সন্ত্রাস বর্ণবাদী ল্য পেনের জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে কি না সে প্রশ্নও উঠেছে।

আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয় লাভের মতো যদি ফ্রান্সেও উগ্র দক্ষিণপন্থীদের জয় হয়, তাহলে গত মহাযুদ্ধের আগে ইউরোপে হিটলার ও মুসোলিনির ক্ষমতা লাভের ফলে যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছিল প্রায় অনুরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে। ব্রিটেনে বেক্সিট বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের প্রশ্নে গণভোটে ব্রেক্সিটপন্থীদের জয় হলেও গোটা জাতি বিভক্ত। ব্রেক্সিটপন্থী টোরি প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে তাঁর হাত আরো শক্তিশালী করার জন্য আকস্মিকভাবে ৮ জুন নতুন সাধারণ নির্বাচন ডেকেছেন।

ফ্রান্সের মতো ব্রিটেনেও ডানপন্থীরা শক্তিশালী এবং বামপন্থী করবিনের নেতৃত্বাধীন লেবার পার্টিকে ধ্বংস করার জন্য সম্মিলিত চেষ্টা শুরু করেছেন। টোরিদের চেয়েও লেবার পার্টির বড় শত্রু সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের অনুসারীরা, বিশেষ করে এক বিরাটসংখ্যক এমপি। এই ঘরের শত্রুরাই লেবার পার্টির বিপর্যয় ঘটাতে পারে এবং টেরেসা মে ক্ষমতায় ফিরে এলে ব্রিটেনও উগ্র জাতীয়তাবাদের দিকে আরো ঝুঁকতে পারে। আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও চান, ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসুক। তাহলে ইউরোপ দুর্বল হবে, আমেরিকার অনেক কাজে ‘না’ বলার শক্তি হারাবে। এবং ব্রিটেন আরো বেশি আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হবে। থ্যাচার-রিগ্যান গলাগলির যুগ ফিরে আসবে।

গোটা বিশ্বেই এই দক্ষিণপন্থার দিকে ঝোঁক এবং উগ্র দক্ষিণপন্থার ঝোড়ো হাওয়ার বিস্তার অতীতের অনেক সময়ের চেয়ে বিশ্বশান্তি ও মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করেছে। এতটা বড় না হলেও এই হুমকি আগেও ছিল কিন্তু তখন তার প্রতিরোধও ছিল। গত শতকে তখনকার দুই সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যের গরম ও শীতলযুদ্ধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নেহরু-নাসের-টিটোর নেতৃত্বে শান্তিকামী ছোট-বড় অনেক দেশ মিলে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এই আন্দোলন বা ‘ন্যাম’ এখন দুর্বল ও নিষ্ক্রিয়। এ অবস্থায় বিশ্বশান্তি ও  মানবসভ্যতাকে সুরক্ষা  দানের জন্য কোনো বিকল্প শক্তির খোঁজই বর্তমান দুনিয়ায় কি খুঁজে পাওয়া যাবে না?

বর্তমান বাংলাদেশের দিকে তাকালেও দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একা সব ফ্রন্টে লড়ছেন। কখনো আপস, কখনো প্রতিরোধ আন্দোলনের দোলাচলের মধ্য দিয়ে দেশের নাজুক গণতান্ত্রিকব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর দলের ভেতরেও রয়েছেন ঘরের শত্রুরা। তাঁরা প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থার দিকে দলটাকে ক্রমাগত টানছেন। বামপন্থীরা বিভক্ত ও দুর্বল। সুধীসমাজ সুবিধাবাদী ও পশ্চাদ্গামী। এই সমাজের সৎ ও নীতিনিষ্ঠ অংশ নানাভাবে কোণঠাসা। লাভের ও লোভের মধুচক্র এখন দেশটির ভাগ্যনিয়ন্তা।

গত শতকে বসে ভবিষ্যতের এই দৃশ্য কল্পনা করেই কি নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন, ‘সত্যকে হায় হত্যা করে অত্যাচারীর খাঁড়ায়, নেই কিরে কেউ শক্তিসাধক বুক ফুলিয়ে দাঁড়ায়?’ এই মুহূর্তে মনে হয় বিশ্ব দানবদের বিরুদ্ধে বুক ফুলিয়ে দাঁড়ানোর কোনো শক্তিসাধক বুঝি কোথাও নেই! কিন্তু হতাশা তো মানবসভ্যতার মিত্র নয়, শত্রু। এই শত্রুকে পরাস্ত করার জন্য এখনই হয়তো একজন মহামানবের আবির্ভাব হবে না; কিন্তু ঘরে ঘরে সাধারণ মানুষ তো তৈরি হতে পারে। হয়তো আমাদের নজরের বাইরে ‘দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে, প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে’, তাদের আবির্ভাব বহুদূরের নয়।

লন্ডন, সোমবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৭

সর্বশেষ সংবাদ