প্রসঙ্গঃ রবীন্দ্রনাথ

উমাপদ কর

এই লেখাটা আমাকে কেউ লিখতে বলেনি। মানে কোনো পত্রিকা সম্পাদক তার কাগজের ইচ্ছে বা চাহিদা অনুসারে আমাকে লিখতে বলেননি। আমি নিজেই লেখার কথা ভাবলাম। সেও এক বিশেষ অবস্থান থেকে। ক’দিন আগে ট্রেনে বাড়ি আসছিলাম কলকাতা থেকে। কানে লাগিয়েছিলাম ইয়ারফোন, আর শুনছিলাম রবীন্দ্র সঙ্গীত। মূলত দেবব্রত হেমন্ত পীযুষ সুবিনয় সাগর সুচিত্রা কণিকা সুমিত্রা স্বাগতালক্ষ্মী। আর সামান্য সুমন। এ গান আগেও শুনেছি বহুবার। ফিরেফিরে। এমনকি স্টেজ়ে সামনাসামনি গান শুনেছি প্রায় প্রত্যেকেরই। তবু শোনার আশটা মেটে না। ভাল লাগে অশোকতরু, সুমিত্রা, হেমন্ত, পীযুষ সরকার, শ্রাবনী, আর অনেককেই। তো রবীন্দ্রসঙ্গীত তো অনেকেরই ভাল লাগে, আমারও লাগে। তাতে হলটা কী? না, তাতে কিছু না। আমি ভাবছিলাম—রবীন্দ্রনাথ আর কতদিন এমন সরবে বেঁচে থাকবেন আমাদের মধ্যে। কিসের জন্য আজও তিনি অনেকেরই মনে একটা স্থায়ী আসন করে ফেলেছেন? কোথায় তাঁর জোর? তিনি কি কবিতায় উপন্যাসে ছোটগল্পে প্রবন্ধে নাটকে আজো সমানভাবে বেঁচে আছেন? বেঁচে আছেন তাঁর অমূল্য সব চিঠিপত্র, ডাইরি, বা ভ্রমণ কাহিনীতে? আর বেঁচে থাকলেও কতদিন তিনি বেঁচে থাকতে পারেন সরবে আর প্রাসঙ্গিক হয়ে? এইরকম প্রশ্ন ওঠায় মনটা একটু দুলে ওঠে বৈকি।

কিছুটা স্মৃতিও উথলে ওঠে। সেই কবে থেকে এই প্রবাদ-প্রতীম শিল্পীর সঙ্গে আমার পরিচয়। হোকনা তা একপাক্ষিক। তবু পরিচয়ই বলব। তখন জানতাম না, এখন জানি। ১৯৬১ সাল। রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী। আমি ছয়। শিশু। বাড়িতে বারান্দায় শাড়ি পর্দা এসব টাঙিয়ে অনুষ্ঠান। আমি হাত-পা নাড়িয়ে দিদি-দাদাদের শেখানো ছড়া। রবীন্দ্রনাথের। হলতো পরিচয়ের সূত্রপাত। পরে কৈশোরে, যৌবন প্রারম্ভে, রবীন্দ্র কবিতা আবৃত্তি, মঞ্চে মঞ্চে, প্রতিযোগিতায়, মুখস্ত, প্রান ঢেলে বলার আপ্রান, আরো আরো কবিতা পড়া, রবীন্দ্রনাথ কেমন একটু জাঁকিয়েই বসলেন। গুনমুগ্ধতা। ওঁর কবিতা ধরেই অন্য কবির কবিতা। আরেকজন ছিলেন। তাঁর কথা না বললে ভুল হবে। সুকুমার রায়। কিন্তু কবিতার প্রতি প্রাথমিক ভালবাসাটা গড়ে দিলেন তিনিই। তিনিই প্রভাব, তিনিই আনন্দ খনির উৎস।

পঁচিশ পর্যন্ত গোটা রবীন্দ্রনাথের কতটুকুই বা পড়েছি! কতটুকুই বা শুনেছি গান, বা দেখেছি মঞ্চে নাটক। তবু মত্ত হয়ে পড়লাম। বিশ থেকে ত্রিশে— তাঁকে নিয়ে বেশ কিছু লেখাও লিখে ফেললাম। অনেকটাই রবীন্দ্রভক্তের মত। দু-একটা প্রবন্ধ বা নিবন্ধ। বেশির ভাগই আলেখ্য, কবিতা এবং সঙ্গীত। যেমন—‘প্রেমিক রবীন্দ্রনাথ’, ‘পূজা পর্বে রবীন্দ্রনাথ’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও স্বদেশচিন্তা’, ‘রবীন্দ্রনাথ ও মৃত্যুচিন্তা’, ‘আনন্দধারা’, ‘ঋতুরঙ্গে রবীন্দ্রনাথ’ ইত্যাদি। নৃত্যনাট্য রূপায়ণ— সন্ন্যাসী উপগুপ্ত, সাগরিকা, ইত্যাদি কবিতা। ভাবনাট্য রূপায়ণ—‘ওরা কাজ করে’, ‘ব্রাম্মন’ ইত্যাদি কবিতা। নাট্য রূপান্তর—‘শাস্তি’, ‘গুপ্তধন’ ইত্যাদি ছোটগল্প। নাট্যপ্রয়োগ— ‘ডাকঘর’, ‘মুক্তধারা’। ব্যঙ্গকৌতুক–‘বশিকরন’ আর ছোট ছোট অনেক কটা হাস্যকৌতুক। যখন পড়ছি, জীবনানন্দ—‘পৃথিবীর গভীর গভীরতম অসুখ এখন’, পড়ছি সুনীল—‘আমি কিরকমভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ’, পড়ছি শক্তি—‘ফুটপাত বদল হয় মধ্যরাতে’। যৌবনের এক বিশেষ ধরনের দেখা ও হতাশার মধ্যে লিখলাম এক যুবকের কথা—‘তখনই তুমি এক রবীন্দ্রনাথ’। এসবই হচ্ছে রবীন্দ্র-জলে রবীন্দ্রপূজা, হয়ত সামান্যই মূল্যায়ণের চেষ্টা।

এরপর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আর বেশি লেখা হয়নি। নানা কারনে। তবে তর্ক করতে হয়েছে বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে। কেননা পত্রিকা করা কালে এরা অনেকেই রবীন্দ্রনাথকে পছন্দ করতনা। পড়তও না। বুর্জুয়া বলে তিনি বেশ নাম কিনেছেন। বা ‘ও পড়ে কী হবে’? বিশ্বসাহিত্য পড়া অনেক জরুরী। ফলে তর্ক-বিতর্ক। এটা ঠিক, সেটা ছিল কিছুকালের। পরে এদের মুখেই কারনে অকারনে রবীন্দ্র-সঙ্গীত শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম, বুঝেছিলাম শুধু গান নয়, এরা কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, মায় চিঠিপত্রও পড়ে ফেলেছে। বছর দশ-বারো আগে এক পত্রিকা সম্পাদকের আদেশ বা অনুরোধে রবীন্দ্রনাথের গানে আমার অনুভব নিয়ে একটা নিবন্ধ লিখি, যার নাম মনে নেই, কিন্তু প্রথম বাক্যটি ছিল এরকম—‘রবীন্দ্রনাথের গানে কাঠের চোখে জল আসে’।

তো এইরকম একটা প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রশ্নটা উঠে পড়ল। রবীন্দ্রনাথ আমাদের মধ্যে আর কতদিন বাঁচবেন এবং কিছুটা হলেও প্রাসঙ্গিক থাকবেন। বাঁচলে কী দিয়ে বাঁচবেন? কবিতা, গান, নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, স্মৃতিকথা, চিঠিপত্র, আঁকা, ইত্যাদির কোনটি বা কোনগুলির মাধ্যমে?

স্বাভাবিকভাবেই আমি নিজের পড়া, দেখা, শোনা, বোঝা, এবং সমকালের সাহিত্য গতির ভিত্তিতে আমার ভাবনা আর সম্ভাবনার কথা বলব সীমিত জ্ঞানে। স্বাভাবিক যে, হয়ত অনেকেরই তা মনমত হবেনা। তবু—

একটা মুখবন্ধ দরকার। বিভাগে যাওয়ার আগে। রবীন্দ্র রচনা কাল দুটি শতাব্দীতে ছডিয়ে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দুটি দশক আর বিংশ শতাব্দীর প্রথম চারটে। প্রায় ৬২-৬৩ বছরের রচনা। অর্থাৎ ঠিক এই সময়ে তাঁর একদম প্রথম দিককার লেখালিখির বয়স হল ১৩০-১৩২ বছর। আর একদম শেষ দিককার নির্মাণের বয়স ৭০-৭২ বছর। এতদিন পরে আমি এই লেখাটি স্বতপ্রনোদিত হয়ে লিখতে চলেছি, অর্থই হল তিনি আমার কাছে বেঁচে এবং সরবে।

 

এক

কবিতা

রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্বকবি’ বলা হয়। সেটা যতটা না বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের জন্য তার চেয়ে বেশি নোবেল প্রাপ্তির জন্য বলে আমার মনে হয়। উনাকে ‘গুরুদেব’ বলা হয়। সেটা যতটা না তাঁর শিল্প সৃষ্টির জন্য তার চেয়ে বেশি আশ্রমিক রবীন্দ্রনাথ এবং ভক্তি জ্ঞাপনের জন্য বলে আমার মনে হয়। এই উপাধিগুলো মন থেকে সরিয়ে নিয়ে যদি রবীন্দ্রনাথে প্রবেশ করি, তাহলে তাঁর শিল্পী-সত্ত্বার ভার হয়ত কমে, কিন্তু ধার কমে না। প্রথমে কাব্যগ্রন্থগুলির (গান সহ) প্রকাশকাল সহ একটা সারণী প্রস্তুত করা যাক।

ক্রমিক নং কাব্যগ্রন্থের(গান সহ)নাম প্রথম প্রকাশ রচনাকাল(আনু)

১) সন্ধ্যা সংগীত ১২৮৮(১৮৮১) ১২৮৬-৮৮

২) প্রভাত সংগীত ১২৯০ ১২৮৮-৯০

৩) ছবি ও গান ১২৯০ ১২৮৯

৪) ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ১২৯১ পুরাতন খাতা

৫) কড়ি ও কোমল ১২৯৩

৬) মানসী ১২৯৭

৭) সোনার তরী ১৩০০

৮) নদী ১৩০২

৯) চিত্রা ১৩০২/১৩০৩

১০) চৈতালী ১৩০৩

১১) কণিকা ১৩০৬

১২) কথা ১৩০৬

১৩) কাহিনী ১৩০৬

১৪) কল্পনা ১৩০৭

১৫) ক্ষনিকা ১৩০৭

১৬) নৈবেদ্য ১৩০৮

১৭) স্মরণ ১৩০৯

১৮) শিশু ১৩১০

১৯) উৎসর্গ ১৩১১

২০) খেয়া ১৩১৩(১৯০৬)

২১) গীতাঞ্জলী ১৩১৭

২২) গীতিমাল্য ১৩২১

২৩) গীতালি ১৩২১

২৪) বলাকা ১৩২৩ (১৯১৬)

২৫) পলাতকা ১৩২৫

২৬) শিশু ভোলানাথ ১৩২৯

২৭) পূরবী ১৩৩২

২৮) লেখন ১৩৩৪

২৯) মহুয়া ১৩৩৬

৩০) বনবানী ১৩৩৮

৩১) পরিশেষ ১৩৩৯

৩২) পুনশ্চ ১৩৩৯

৩৩) বিচিত্রতা ১৩৪০

৩৪) শেষ সপ্তক ১৩৪২

৩৫) বীথিকা ১৩৪২

৩৬) পত্রপুট ১৩৪৩

৩৭) শ্যামলী ১৩৪৩

৩৮) খাপছাড়া ১৩৪৩ (১৯৩৬)

৩৯) ছড়ার ছবি ১৩৪৪

৪০) প্রান্তিক ১৩৪৪

৪১) সেঁজুতি ১৩৪৪

৪২) প্রহাসিনী ১৩৪৫

৪৩) আকাশপ্রদীপ ১৩৪৬

৪৪) নবজাতক ১৩৪৭

৪৫) সানাই ১৩৪৭

৪৬) রোগশয্যায় ১৩৪৭

৪৮) আরোগ্য ১৩৪৭

৪৯) জন্মদিনে ১৩৪৮

৫০) ছড়া ১৩৪৮

৫১) শেষলেখা ১৩৪৮ (১৯৪১)

৫২) স্ফুলিঙ্গ ১৩৫২ (১৯৪৫)

 

দেখা যাচ্ছে কবিতায় হাতেখড়ি খুব অল্প বয়সে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় কুড়ি বছর বয়সে যা লেখা আগের দু বছরে। আবার ‘ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী’ কাব্যগ্রন্থটির কবিতা ‘পুরাতন খাতা হইতে বাছিয়া’ লওয়া। অর্থাৎ সেগুলি হয়ত আরও আগে লেখা। এগুলি যে কবিতা নয়, ছড়া তা নিজেই বলেছেন। “ লোকে যাকে বলে কবিতা সেই ছন্দ-মেলানো মিল-করা ছড়াগুলো সাধারন কলম দিয়ে সাধারন লোকে লিখে থাকে।” “ আট অক্ষর দশ অক্ষরের চৌকো-চৌকো কত রকম শব্দ ভাগ নিয়ে চলল ঘরের কোণে আমার ছন্দ-ভাঙাগড়ার খেলা।” সুতরাং এগুলোকে আমরাও তাঁর কাব্য বলে ধরব না। আলোচনার বাইরে রাখব। সবারই একটা মক্সো পিরিয়ড থাকে। তাঁরও ছিল। এবং সেটা খুব কম দিনের নয়। প্রথম প্রকাশিত পাঁচটা কাব্যগ্রন্থ (সন্ধ্যা সংগীত,১২৮৮। প্রভাত সংগীত,১২৯০। ছবি ও গান,১২৯০। ভানু সিংহ ঠাকুরের পদাবলী,১২৯১। কড়ি ও কোমল,১২৯৩।) তিনি নিজেই কাব্যপদবাচ্য মনে করেননি। কেননা ‘সঞ্চয়িতা’র ভূমিকায় তিনি লিখেছিলেন, “ ‘মানসী’ (প্রকাশ-১২৯৭) থেকে আরম্ভ করে বাকি বইগুলির কবিতায় ভালো মন্দ মাঝারির ভেদ আছে, কিন্তু আমার আদর্শ অনুসারে ওরা প্রবেশিকা অতিক্রম করে কবিতার শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে।” কবিই যখন মানছেন না আমরা না মানলে ক্ষতি কী?

আরও আছে। ‘মানসী’র পর ‘সোনার তরী’ (প্রকাশ-১৩০০)। তারপর ‘নদী’ (প্রকাশ-১৩০২)। এই কাব্যগ্রন্থে একটি ‘বিজ্ঞাপন’ ছিল। “এই কাব্যগ্রন্থখানি বালকবালিকাদের পাঠের জন্য রচিত হইয়াছে। … ইহার ছন্দ শিশুরা সহজেই আবৃত্তি করিতে পারে। ……।” “শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর”। একেও আলোচনার বাইরে রাখাই শ্রেয়। বালকবালিকা বা শিশুদের জন্য ও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে, এজন্য। কবিতা ও গান মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫২। এর মধ্যে ৩টি শুধুই গানের। তাহলে, মোট ৯টি কাব্যগ্রন্থ (গান সহ) আলোচনায় আসছে না। কেননা গানের কথা আমরা আলাদা বলব। রইল ৪৩ টি কাব্যগ্রন্থ। এবং রচনাকালের শুরুও বদলে হয়ে গেল ১২৯৬-৯৭।

এবারে আরও কিছু রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই শুনে নিই এবং আলোচনায় ঢুকি। বিশ্বভারতী গ্রন্থ-প্রকাশ সমিতি রবীন্দ্রনাথের সমগ্র বাংলা রচনার একটি নূতন সংস্করণ খন্ডে খন্ডে প্রকাশের আয়োজন করলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনেক রচনা অত্যন্ত অপরিনত হিসেবে বর্জন করতে চান এবং রচনাবলীতে স্থান দিতে চাননি। এ বিষয়ে তিনি সমিতিকে জানান—“ ভূরিপরিমান যে-সকল লেখাকে আমি ত্যাজ্য বলে গন্য করি আপনাদের সম্মিলিত নির্বন্ধে সেগুলিকেও স্বীকার করে নিতে হবে। আমার লজ্জা চিরন্তন হয়ে যাবে এবং তাতে আমার নাম-স্বাক্ষর থাকবে। অর্থাৎ ভাবী কালের সামনে যখন দাঁড়াব তখন গাধার টুপিটা খুলতে পারব না। আপনারা তর্ক করে থাকেন, ইতিহাসের আবর্জনা দিয়ে যে গাধার টুপিটা বানানো হয়, ইতিহাসের খাতিরে সেটা মহাকালের আসরে পরে আসতেই হবে। কবির তাতে মাথা হেঁট হয়ে যায়।” এখানেই থামেননি তিনি। এই কর্মকান্ডের ‘ভূমিকা’য় এবং ‘অবতরণিকা’য় অনেক কথা লিখেছেন (৮০ বছর বয়সে) যার অধিকাংশই কাব্য-কবিতা কেন্দ্রীক। অর্থাৎ তাঁরও কবিতা বিষয়ে উদবেগ ছিল যথেষ্ট বেশি। তিনি লিখছেন—“ … ইতিহাসের সম্বল আর কাব্যের সম্পত্তি এক জাতের নয়। ইতিহাস সবই মনে রাখতে চায় কিন্তু সাহিত্য অনেক ভোলে। …। কবির রচনাক্ষেত্রকে তুলনা করা যেতে পারে নীহারিকার সঙ্গে। তার বিস্তীর্ণ ঝাপসা আলোর মাঝে মাঝে ফুটে উঠেছে সংহত ও সমাপ্ত সৃষ্টি। সেইগুলিই কাব্য। আমার রচনায় আমি তাদেরই স্বীকার করতে চাই। বাকি যত ক্ষীণ বাস্পীয় ফাঁকগুলি যথার্থ সাহিত্যের শামিল নয়।” এক জায়গায় লিখছেন—“ … তারা যে এসে পড়েছে, তা এই বইয়ের গোড়ার দিকের কবিতাগুলি দেখলে ধরা পড়বে। কুয়াশা যেমন বৃষ্টি নয় এরাও তেমনি কবিতা নয়।” সত্তর বছরের জন্ম জয়ন্তিতে যা লিখেছিলেন, তা এই খন্ড গ্রন্থাবলীতে ‘অবতরণিকা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সেখানে তিনি বলছেন—“ সাহিত্যের ইতিহাসে ক্ষণমুখরা খ্যাতির মৌনসাধন বার বার দেখা গেছে। …। কালে কালে সাহিত্যবিচারের রায় একবার উলটিয়ে আবার পালটিয়েও থাকে। অব্যবস্থিতচিত্ত মন্দগতি কালের সবশেষ বিচারে আমার ভাগ্যে যদি নিঃশেষে ফাঁকিই থাকে তবে এখনই আগাম অনুশোচনা করতে বসা কিছু নয়।” সুতরাং কালের বিচার নিয়ে সংশয় তাঁর মনেও ছিল। পুনরাবৃত্তির কথাও এসেছে। “ একেবারে থামবার আগে চলার ঝোঁকে অতীত কালের খানিকটা ধাক্কা এসে পড়ে বর্তমানের উপরে। …। সেটা অতীতেরই পুনরাবৃত্তি। …। পুনরাবৃত্তিকে দীর্ঘকাল তাজা রাখবার চেষ্টা আর কইমাছটাকে ডাঙায় তুলে বাঁচিয়ে রাখবার চেষ্টাও তাই।” তাঁর খ্যাতি আজও অনেকটাই অটুট। খ্যাতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য। “ খ্যাতির কথা থাক। ওটার অনেকখানিই অবাস্তবের বাস্পে পরিস্ফীত। তার সংকোচন-প্রসারণ নিয়ে যে-মানুষ অতিমাত্র ক্ষুব্ধ হতে থাকে সে অভিশপ্ত। ভাগ্যের পরম দান প্রীতি, কবির পক্ষে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার তাই।” কবির কাজ সম্পর্কেও নিজস্ব একটা বক্তব্য আছে তাঁর। “ সুন্দরের অন্তরে আছে একটি রসময় রহস্যময় আয়ত্তের অতীত সত্য, আমাদের অন্তরের সঙ্গে তার অনির্বচনীয় সম্বন্ধ। তার সম্পর্কে আমাদের আত্মচেতনা হয় মধুর, গভীর, উজ্জ্বল। আমাদের ভিতরের মানুষ বেড়ে ওঠে, রঙিয়ে ওঠে, রসিয়ে ওঠে। আমাদের সত্তা যেন তার সঙ্গে রঙে রসে মিলে যায়—একেই বলে অনুরাগ। কবির কাজ এই অনুরাগে মানুষের চৈতন্যকে উদ্দীপ্ত করা, ঔদাসীন্য থেকে উদবোধিত করা।” কবি তাঁর বাসনা কিভাবে চরিতার্থ করার চেষ্টা করেছেন তার লেখালিখিতে? “ অনেকদিন থেকেই লিখে আসছি, জীবনের নানা পর্বে নানা অবস্থায়। শুরু করেছি কাঁচা বয়সে—তখনো নিজেকে বুঝিনি। তাই আমার লেখার মধ্যে বাহুল্য এবং বর্জনীয় জিনিস ভুরি ভুরি আছে তাতে সন্দেহ নেই। এ-সমস্ত আবর্জনা বাদ দিয়ে বাকি যা থাকে আশা করি তার মধ্যে এই ঘোষণাটি স্পষ্ট, যে আমি ভালবেসেছি এই জগৎকে, আমি প্রণাম করেছি মহৎকে, আমি কামনা করেছি মুক্তিকে—”। আর বিনিময়ে চাওয়াটাও দেখে নেওয়া যেতে পারে। “আমার যা-কিছু অকিঞ্চিৎকর তাকে অতিক্রম করেও যদি আমার চরিত্রের অন্তরতম প্রকৃতি ও সাধনা লেখায় প্রকাশ পেয়ে থাকে, আনন্দ দিয়ে থাকে, তবে তার পরিবর্তে আমি প্রীতি কামনা করি, আর কিছু নয়।” এখন এই সমস্ত কথাবার্তার প্রেক্ষিতে আমি বলি, ক) না, কবির লজ্জাকে চিরন্তন করার প্রয়োজন নেই। খ) মহাকালের আসরে তাঁর গাধার টুপিটি খুলে নেওয়া ভাল। গ) ইতিহাস নয় কাব্যের সম্পদকেই আমরা মর্যাদা দিতে সচেষ্ট থাকব। ঘ) পুনরাবৃত্তিকে এড়াতে চাইব। ঙ) কবির খ্যাতি নয়, প্রীতির কথাই স্মরণে রাখব।

 

তাহলে প্রথেমেই আরেকটা কাজ করতে হয়। তা হল আরও বাদ দেওয়া। এখন কবির বিচার ও আদর্শের কথা ভেবে বাদ দিতে হয়— ‘কথা’ ‘কাহিনী’ ‘শিশু’ ‘শিশু ভোলানাথ’ ‘খাপছাড়া’ ‘ছড়ার ছবি’ ‘ছড়া’ ইত্যাদি গ্রন্থগুলি। এগুলি বস্তুত কথা, কাহিনী, গল্প, এবং অবশ্যই কিছু ছড়া। কবিতা নয়। বাদ দিতে হয় ‘লেখন’ যা চীনে-জাপানে স্বাক্ষর দাবী মেটাতে লেখা। আর ‘কণিকা’ ও ‘স্ফুলিঙ্গ’ যা টুকরো নীতিমূলক ছড়া। এগুলো বাদ দিলে থাকে ৩৩ টি কাব্যগ্রন্থ।

 

রবীন্দ্রনাথের কবিতা-যাত্রাকে কয়েকটি পর্বে ভাগ করা দরকার। আমার চিন্তা-চেতনায় তা এই রকম।

প্রথম – ১২৮৭ থেকে ১২৯৩। বয়স ১৯ থেকে ২৬। কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধ্যাসংগীত’ থেকে ‘কড়ি ও কোমল’। প্রথম মক্‌সো পিরিয়ড।

দ্বিতীয় – ১২৯৪ থেকে ১৩০৭। বয়স ২৭ থেকে ৪১। কাব্যগ্রন্থ ‘মানসী থেকে ‘ক্ষণিকা’। কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্ব। এবং বিকাশ পর্বও।

তৃতীয় – ১৩০৮ থেকে ১৩৩৬। বয়স ৪২ থেকে ৭০। কাব্যগ্রন্থ ‘নৈবেদ্য’ থেকে ‘বলাকা’ হয়ে ‘মহুয়া’। ভাবনাগত দিকে ও আঙ্গিকে নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়া। নিজস্ব ভাষা পাওয়া। বাংলা কবিতার ‘ডিকশন’ বদলে দেওয়া।

চতুর্থ – ১৩৩৭ থেকে ১৩৪৮। বয়স ৭১ থেকে ৮০। কাব্যগ্রন্থ ‘বনবানী’ থেকে ‘শেষলেখা’। আবারও নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রয়াস। হামেশাই ‘গদ্য কবিতা’য় নিজেকে প্রকাশ। দর্শন গভীরতা নিয়েও কবিতায় ডুবে যাওয়া।

মনে রাখতে হবে আমার উদ্দেশ্য রবীন্দ্র-কাব্যের আলোচনা নয়। উদ্দেশ্য তাঁর বিশাল কাব্যজগতের মধ্যে আজো যেসব কবিতা প্রাসঙ্গিক মনে হয়, মনে হয় তা আজো কাব্যানুরাগীর মনে ছোঁয়া দেয় দোলা দেয়, তাকে ভাবতে শেখায়, এবং মনে প্রশ্ন তোলে যে এসব কবিতা আরও কতটা সুদূরপ্রসারী হতে পারে। তাই এই কাব্যগ্রন্থগুলি থেকে আমি বাছতে চেষ্টা করব কিছু কবিতা যা সেই সময়ের প্রেক্ষিতে নতুন, যা পূর্বসূরীদের চেয়ে আলাদা, যা আজকের প্রেক্ষিতেও যথেষ্ট বিবেচ্য। সুতরাং বাছাইএ নেমে আমাকে বাদ দিতে হবে। ক্রমাগত বাদ দিতে দিতে যেসব কবিতা বিস্ময় সৃষ্টি করে, আজকের কবিকে বা পাঠককে আবেদনে সম্পৃক্ত করে, নতুন নতুন কবিকে কবিতা লিখতে প্রানিত করে, তাদের চিহ্নিত করতে হবে এবং সেগুলি আরও কতদিন পাঠকের মনে বেঁচে থাকতে পারে তার অনুমান করতে হবে। অনুমানের পেছনে রাখতে হবে যুক্তি।

শেষের বক্তব্যটিকে মান্যতা দিতে গেলে আজকের কবিতা চিন্তা-চেতনার কথাটি সামনে আনা দরকার। কেননা রবীন্দ্র পরবর্তীকালে আমরা পেরিয়ে এসেছি ৭৪-৭৫ বছর। যুগের বিচারে প্রায় ছ-যুগ। দশকের বিচারে ৭-৮ দশক। তাঁর সময়কালে অধিকাংশ কবিই তাঁর প্রভাবে প্রভাবান্বিত ছিলেন। তার পরেও কয়েক দশক ধরে তাঁর প্রভাব ছিল অবিসংবাদিত। তাঁর সমসময়ে যেমন রবীন্দ্র-বিরোধিতা ছিল, তেমনি তাঁর মৃত্যুর পরও সেই বিরোধিতা ছিল দীর্ঘদিন। ফলে এই প্রভাব ও বিরোধিতায় কবিতায় তিনি সেই সময় পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন দারুনভাবেই। আজ আমরা বাংলা কবিতায় পেরিয়ে এসেছি নানা দিক-বাঁক-বদল, নানা পত্রিকা-গোষ্ঠী আলোড়ন, নানা আন্দোলন-আলোড়ন।

 

দিক-বাঁক-বদলের ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে কবি জীবনানন্দ দাশ এর নাম, যিনি কাব্য-ভাষায়, ভাবনায়, চেতনায় ছিলেন ভিন্নতর। এই বাঁক-বদলের ও ডিকশন বদলের যথেষ্ট ছাপ পড়ে পরবর্তী কালের কবিদের মধ্যে। যার ফলে রবীন্দ্রানুসারিতা যায় কমে এবং বিরোধিতাও। শুরু হয় জীবনানন্দানুসারিতা। পত্রিকা ও লেখক গোষ্ঠীগুলির মধ্যে নাম করা যায় ‘কালি কলম’ ও ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর। পরে ‘কৃত্তিবাস’ এবং তারওপরে ‘কৌরব’ পত্রিকা গোষ্ঠী। ‘কল্লোল’ যুগ বলা হয়। যে যুগে রবীন্দ্র বিরোধিতা ছাড়া যেন সাহিত্যে টিকে থাকাই মুশকিল ছিল, এমনই ছিল রবীন্দ্র প্রভাব। ‘কৃত্তিবাস’এ এসে দেখা গেল একইভাবে জীবনানন্দানুসারিতা এবং একই সঙ্গে বিরোধিতা বা ছাপিয়ে যাওয়া। পরবর্তীকালে ‘কৌরব’ ছিল পরীক্ষা – নিরীক্ষা সাহিত্যকে প্রাধান্য দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম। তারও পরে ‘পোষ্টমডার্ণ কবিতা’ কেন্দ্রীক ‘কবিতা পাক্ষিক’ পত্রিকা গোষ্ঠী আর ‘নতুন কবিতা’ কেন্দ্রীক ‘কবিতা ক্যাম্পাস’ ‘নতুন কবিতা’ পত্রিকা গোষ্ঠী। আলোড়ন-আন্দোলনের ক্ষেত্রে বলতে হয় গত শতাব্দীর ষাটের দশকের স্বল্পস্থায়ী ‘হাংরি’, ‘শ্রুতি’, ‘শাস্ত্রবিরোধী’ ‘নিম সাহিত্য’ ‘অব্যয়’ ইত্যাদির কথা। এই সমস্ত কিছুর মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে একটা বিষয় খুব প্রকট হয়ে পড়ে। একদিকে মিডিয়া প্রমোটিত – লালিত – পুরস্কৃত, সরকারি সিল – ছাপ্পরবেশিত কবিতার ধারা বা ধারা-কবিতা। যাকে অনেকেই মূলধারা (Main stream) বলেন। যা মূলত পঞ্চাশ ও সত্তর দশকের কবিদের প্রলম্বিত (Extented) রূপ। এবং তা শত চেষ্টার পরও আসলে রবীন্দ্র – জীবনানন্দানুসারিতাই। অন্যদিকে ভিন্ন চিন্তা-চেতনার ষাট ও আশি দশকের আন্দোলন আলোড়নে সমৃদ্ধ এবং আত্মস্থ নব লেখ্যর ধারা। নতুন-অন্য-অপর যে কোনোভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। যাঁরা নিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় থাকেন, বদলাতে চান, পুরস্কার-তিরস্কারে বীতক্ষুব্ধ, এবং স্বাভাবিকভাবেই উপরিউক্ত মূলধারাকে ছাপিয়ে যান। আমি চেষ্টা করব এই দুটি অবস্থা ও অবস্থানের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে দেখতে, চেষ্টা করব তাঁর কাব্য-ভ্রমণের আস্বাদ পেতে যার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে।

 

 

 

বিকাশ পর্বের রবীন্দ্র-কবিতার বৈশিষ্ট্যগুলি সাজালে এমন দাঁড়ায়। (ক) ভাবাবেগ সমৃদ্ধ (খ) প্রেম ( নিসর্গ, নারী, মানুষ) (গ) বর্ণনাধর্মী (ঘ) গল্প বলার প্রবনতা (ঙ) একটা কাব্য প্রতিমা তৈরীর চেষ্টা (চ) নিটোল কবিতা নির্মাণ প্রয়াস (ছ) নতুন নতুন শব্দ তুলে আনা (জ) পটাপট শব্দ-জোড় বানিয়ে দেওয়া (ঝ) শব্দ চয়নে নতুন মাত্রা আনা (ঞ) ভাষায় পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে সরে আসা (ট) অলংকার ব্যবহারে মুন্সীয়ানা দেখানো এবং ভিন্ন মাত্রা জোড়া (ঠ) ছন্দের ভাঙচুড় (ড) নতুনভাবে ক্রিয়াপদের ব্যবহার (ঢ) সব মিলিয়ে তাঁর সময়ের বহমান ধারা থেকে সম্পূর্ণ এক আলাদা মাত্রা আনার প্রয়াস।

 

দুই

 

‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থে ‘বধূ’ কবিতার শুরু এইরকম—

“ ‘বেলা যে পড়ে এল, জল্‌কে চল’

পুরানো সেই সুরে কে যেন ডাকে দূরে

কোথা সে ছায়া সখী, কোথা সে জল!

কোথা সে বাঁধা ঘাট, অশথতল!

ছিলাম আনমনে একেলা গৃহকোণে,

কে যেন ডাকিল রে ‘জল্‌কে চল্‌’।।”

আর শেষটা এইরকম—

“দেবে না ভালোবাসা, দেবে না আলো!

সদাই মনে হয়—আঁধার ছায়াময়

দিঘির সেই জল শীতল কালো,

তাহারি কোলে গিয়ে মরণ ভালো।

ডাক্‌ লো ডাক্‌ তোরা, বল্‌ লো বল্‌–

‘বেলা যে পড়ে এল, জল্‌কে চল্‌।’

কবে পড়িবে বেলা, ফুরাবে সব খেলা,

নিবাবে সব জ্বালা শীতল জল,

জানিস যদি কেহ আমায় বল্‌।।”

এই কবিতায় ধরা পড়ে ভাবাবেগ, প্রেম, বর্ণনা, গীতিময়তা, ছন্দের দুলকি চাল ( পাঁচ মাত্রার মাত্রাবৃত্ত), ধ্বনি ব্যাঞ্জনা, এবং অবশ্যই পূর্ববর্তী ভাষা অবস্থানের বদল। নিসর্গ প্রেমের সঙ্গে মানুষিক প্রেমের জড়াজড়ি এবং মিলিয়ে দেবার প্রয়াস।

‘অপেক্ষা’ কবিতায় একই রকম ছন্দে তালে গীতিময়তায় বর্ণনায় অসাধারন সব ছবি উঠে আসে। আর ছবির মধ্য দিয়েই কবিতার বুনোট প্রতীয়মান হয়।

“ সকল বেলা কাটিয়া গেল, বিকাল নাহি যায়।

দিনের শেষে শ্রান্তছবি কিছুতে যেতে চায় না রবি,

চাহিয়া থাকে ধরণী পানে—বিদায় নাহি চায়।।”

শুরু এইরকম। আর শেষ—

“ থামিয়া গেল অধীর স্রোত, থামিল কলতান,

মৌন এক মিলনরাশি তিমিরে সব ফেলিল গ্রাসি—

প্রলয়তলে দোঁহার মাঝে দোঁহার অবসান।।”

কবিতাটিতে ধরা পড়ে একটা পূর্ণতা বা টোটালিটি। একটি কাব্যপ্রতিমা নির্মিত হয় যেন। একটা বৃত্ত যেন শেষ হয় শেষের ‘অবসান’ এ। ‘জল্‌কে’, ‘দোঁহা’ এই রকম শব্দগুলো নতুন প্রয়োগ মনে হয়। এরকম নতুন প্রয়োগের কিছু শব্দ, উপমা, ছন্দে বিচরন কেমন তা দেখা যেতে পারে। “ প্রেম যদি এক কালে/ হয়ে আসে দূরস্মৃত কাহিনী কেবলি” (তবু)। ‘দূরস্মৃত’ শব্দটি। “ কলস-ঘায়ে ঊর্মি টুটে/ রশ্মিরাশি চূর্ণি উঠে”। মাত্রাবৃত্তের চলন। “ হেথা কেন দাঁড়ায়েছ, কবি/ যেন কাষ্ঠপুত্তলছবি?” (কবির প্রতি নিবেদন)। “ অরণ্য যথা চিরনিশিদিন/ শুধু মর্মর স্বনিছে” ( প্রকাশ বেদনা)। উপমা। “ কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে/ হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব” ( বর্ষার দিনে)। ‘হৃদি’ শব্দের ব্যবহার।

মানসী কাব্যগ্রন্থ থেকে আমরা কবিতায় এমনই সব ছবি আকূতি ভাবাবেগ এবং নিটোল বর্ণনা দেখতে পাই। যেমন, ‘তবু’ ( তবু মনে রেখ, যদি দূরে যাই চলি), ‘প্রকাশ বেদনা’ ( আপন প্রাণের গোপন বাসনা), ‘অনন্ত প্রেম’ ( তোমারেই যেন ভালবাসিয়াছি/ শতরূপে শতবার), ‘বর্ষার দিনে’ ( এমন দিনে তারে বলা যায়)। মকসো পিরিয়ডের মধ্যাহ্নে আছেন কবি।

 

‘সোনার তরী’ কাব্যগ্রন্থ রবীন্দ্রনাথের কবি সত্তার স্বাভাবিক স্ফুরণ ও বিকাশ স্থল বলে আমার মনে হয়েছে। আবেগের হাত ধরে এখানে এসেছে গতি। ছবির হাত ধরে এসেছে চিত্রকল্প। বর্ণনাকে একঘেয়ে থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছে উপমা। রূপকের আড়াল রহস্যময়তাকে বাড়িয়েছে সবেগে। ভাবনার বিস্তৃতি গল্প বলার ঝোঁক কে কমিয়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। কল্পনাশক্তির প্রাধান্যে বাস্তবও একটা বিমূর্তি পেয়েছে। প্রাণের স্পন্দনে নির্মিতি প্রবাহের নতুন মাত্রা খুঁজে পেয়েছে যেন। প্রথমেই উল্লেখ করি প্রায় মিথ হয়ে যাওয়া একটা কবিতা। নাম ‘সোনার তরী’

“ গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা—

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।।”

শেষ স্তবক—

“ ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই, ছোটো সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।

শ্রাবণগগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি—

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।।”

কবিতাটির রচনাসময় ও স্থান এইরকম। “বোট। শিলাইদহ। ফাল্গুন ১২৯৮।” বোঝা যাচ্ছে পূর্ণ বসন্তকালে লেখা ভরা বর্ষার কবিতা। আবার ‘কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা’য় একটা ধন্দ থাকতে পারে, এ কোন ধান যা হেমন্তে কাটা না হয়ে বর্ষার সময় কাটা হচ্ছে? বলা বাহুল্য এই সোনার ধান আমন নয় আউশ বা আশু ধান। ফলে কল্পনা বাস্তব রূপক সব মিলেমিশে এই কবিতা। সোনার তরী নিজেই একটি রূপক হয়ে কল্প-চরিত্র হয়েছে। শূন্য নদীতীরে কবিকে রেখে যা কবিরই সোনার ধান নিয়ে চলে গেছে। কবিতায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ—‘ভারা ভারা’, ‘ক্ষুরধারা’, ‘খরপরশা’, ‘বাঁকা জল’, ‘তরুছায়ামসী-মাখা’, ‘থরে বিথরে’, ‘রহিনু’ ইত্যাদি। শব্দগুলোতে ভাবনার ছাপ স্পষ্ট কিন্তু পটাপট ব্যবহারের মুন্সীয়ানা দেখবার মত। কবিতা ‘পরশপাথর’ (খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশপাথর), ‘দুই পাখি’ ( খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে), ‘মানসসুন্দরী’ (আজ কোনো কাজ নয়, সব ফেলে দিয়ে/ ছন্দোবদ্ধগ্রন্থগীত, এসো তুমি প্রিয়ে), ‘বসুন্ধরা’ ( আমারে ফিরায়ে লহো অয়ি বসুন্ধরে), ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ ( আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে হে সুন্দরী?) পেরিয়ে আসতে টুকরো-টাকরা কিছু উদ্ধৃত করি। যেমন—“ মৃদু মৃদু বহে শ্বাস অধরে লাগিছে হাস” (বর্ষাযাপন)। ‘হাস’ শব্দের ব্যবহার। “ যেন রৌদ্রময়ী রাতি” (যেতে নাহি দেব)। উপমাটি। “ রাঙা রেখা জ্বলজ্বল্‌/ কিরণ মালে” ( অনাদৃত)। ‘মালে’ শব্দটি। “ লয়ে কুশাঙ্কুর বুদ্ধি শানিত প্রখরা” ( মায়াবাদ)। ইত্যাদি। এবারে নোঙর করি কবিতা ‘ঝুলন’ এ। প্রাণের মাতন ধরা পড়ে। একটা দুদ্দাড় প্রেম উসকে ওঠে। একটা তুফান বয়ে যায় সমগ্র চৈতন্যে। প্রথমে কবিতাটির প্রথম ও শেষ স্তবক তুলে ধরি—

“ আমি পরানের সাথে খেলিব আজিকে মরণখেলা

নিশীথবেলা।

সঘন বরষা, গগন আঁধার,

হেরো বারিধারে কাঁদে চারি ধার—

ভীষণ রঙ্গে ভবতরঙ্গে ভাসাই ভেলা;

বাহির হয়েছি স্বপ্নশয়ন করিয়া হেলা

রাত্রিবেলা।।”

“ আয় রে ঝঞ্ঝা, পরানবধূর

আবরণরাশি করিয়া দে দূর,

করি লুন্ঠন অবগুন্ঠন-বসন খোল্‌।

দে দোল্‌ দোল্‌।।

 

প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ

চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয় লাজ,

বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁহে ভাবে বিভোল।

দে দোল্‌ দোল্‌।

স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরেছে আজ দুটো পাগল।

দে দোল্‌ দোল্‌।।”

প্রানের সঙ্গে ‘আমি’ এই অস্তিত্বের ঝুলন তথা দোল-দোল খেলা বীররসে পূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বপ্নশয়ন হেলায় ফেলে, পেছনের হাহা হাসি উপেক্ষা করে, আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল এর মধ্যে এই ঝুলন দোলা। দোলায় ত্রাসে উল্লাসে পরান ব্যাকুল, নিবিড় বন্ধনসুখে নৃত্যরত হৃদয়, বক্ষশোনিতে হিল্লোল, ভিতরে-বাইরে জেগে ওঠা কল্লোল, পরানবধূর অবগুন্ঠন-বসন খোলার আর্তি, স্বপ্ন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা পাগল শুধু দে দোল দোল এই মত্তবোল-এ নিজ অস্তিত্বে উন্মাদ। কোথায় যেন কবিকে বহু মানুষ রিলেট করতে পারে। আজ এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম পাদে এসেও যে তরুন তারুন্যকে পাথেয় করতে চায় তার ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হতে বাধা দেখি না। ভাব ভাবনায় নয় পার্থক্য যা তা ভাষায়, এবং কিছুটা প্রকাশভঙ্গীতে। এ কবিতা আজও প্রাসঙ্গিক এবং আরও বেশ কিছুদিন এর আবেদন পঁচিশকে ছুঁয়ে যাবে। এই কাব্যগ্রন্থে ‘হিং টিং ছট’ এর মত গল্প বলা দীর্ঘ কবিতা যেমন আছে, যা কোনোমতেই কবিতা নয় তেমনি আছে ‘বসুন্ধরা’র মত দীর্ঘ কবিতা। ‘দুই পাখি’ কবিতায় যেখানে কথোপকোথনের মাধ্যমে কবিতা জারি এই কবিতায় মোনোলগের (Monolog) মাধ্যমে দীর্ঘ কবিতার আদল। কয়েকটি পঙক্তি তুলি—

“ সর্ব অঙ্গে সর্ব মনে অনুভব করি

তোমার মৃত্তিকা মাঝে কেমনে শিহরি

উঠিতেছে তৃণাঙ্কুর, তোমার অন্তরে

কী জীবনরসধারা অহর্নিশি ধরে

করিতেছে সঞ্চরণ, কুসুমমুকুল

কী অন্ধ আনন্দভরে ফুটিয়া আকুল

সুন্দর বৃন্তের মুখে, নব রৌদ্রালোকে

তরুলতাতৃণগুল্ম কী গূঢ় পুলকে

কী মূঢ় প্রমোদরসে উঠে হরষিয়া

মাতৃস্তনপানশ্রান্ত পরিতৃপ্তহিয়া

সুখস্বপ্নহাস্যমুখ শিশুর মতন।”

উপমাটি নজর কাড়া। আর জোড় শব্দগুলো ( জীবনরসধারা, কুসুমমুকুল, তরুলতাতৃণগুল্ম, মাতৃস্তনপানশ্রান্ত, সুখস্বপ্নহাস্যমুখ ইত্যাদি) একদম প্রচল নয় সেকালে। ‘সোনার তরী’র কয়েকটি (উল্লেখিত) কবিতা দোলা খাওয়ার দোলা দেওয়ার। দোলনটা বন্ধ হতে হয়ত আরও কিছু কালাতিপাতের প্রয়োজন।

 

 

 

‘চিত্রা’ এর পরের কাব্যগ্রন্থ। এখানে কবি আরও অনেক বেশি বাস্তব ঘেঁষা। আবেগের জোয়ারেও বেশ কিছুটা টান। মানুষ আরও কেন্দ্রক-এ। কয়েকটি কবিতাকে সামনে আনা যাক। কবিতা—‘প্রেমের অভিষেক’। কবিতাটির টুকরো-টাকরা অংশ তুলে ধরি।

“তুমি মোরে করেছ সম্রাট্‌। তুমি মোরে

পরায়েছ গৌরবমুকুট; পুস্পডোরে

সাজায়েছ কন্ঠ মোর। তব রাজটিকা

দীপিছে ললাট মাঝে মহিমার শিখা

অহর্নিশি।”

“ হৃদিশয্যাতল

শুভ্র দুগ্ধফেননিভ, কোমল শীতল,

তারি মাঝে বসায়েছ।’’

“ তপস্বিনী মহাশ্বেতা

মহেশমন্দিরতলে বসি একাকিনী

অন্তরবেদনা দিয়ে গড়িছে রাগিনী

সান্ত্বনাসিঞ্চিত; গিরিতটে শিলাতলে

কানে কানে প্রেমবার্তা কহিবার ছলে

সুভদ্রার লজ্জারুণ কুসুমকপোল

চুম্বিছে ফাল্গুনী;”

“ হেথা আমি কেহ নহি,

সহস্রের মাঝে একজন—সদা বহি

সংসারের ক্ষুদ্র ভার, কত অনুগ্রহ

কত অবহেলা সহিতেছি অহরহ।”

প্রথমে ব্যবহৃত কয়েকটি ক্রিয়াপদের কথা বলি। ‘পরায়েছ’, ‘সাজায়েছ’, ‘বসায়েছ’, ‘সহিতেছি’ ইত্যাদি। স্বাভাবিক ছিল ব্যবহৃত হবে ‘দীপিতেছে’, ‘চুম্বন করিছে’। কিন্তু কবি ব্যবহার করলেন—‘দীপিছে’, ‘চুম্বিছে’ ইত্যাদি। প্রচল ভাঙা। এবার আসি শব্দ-জোড়ের কথায়। ‘গৌরবমুকুট’, ‘হৃদিশয্যাতল’, ‘দুগ্ধফেননিভ’, ‘মহেশমন্দিরতলে’, ‘সান্ত্বনাসিঞ্চিত’, ‘লজ্জারুণ’, ‘কুসুমকপোল’ ইত্যাদি। এর মধ্যে ‘হৃদিশয্যাতল/ শুভ্র দুগ্ধফেননিভ’ পর পর ভারী শব্দগুলি বসাবার সাহস দেখিয়েছেন। আবার উল্লেখিত শেষ তিনটি শব্দ জোড়ের ব্যবহার অভিনব, যা সমসময়কে অনায়াসে অতিক্রম করে যাওয়ার ক্ষমতা ধরে। ‘সোনার তরী’ তে আমরা শব্দজোড়ের সামান্য প্রয়োগ দেখেছিলাম। ‘চিত্রা’য় এসে তা বহুল এবং সুব্যবহৃত। উদ্ধৃত শেষ কয়েকটি পঙক্তিতে ধরা পড়েছে কবির বাস্তব বোধ। ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতাতেও আমরা প্রভূত শব্দজোড় লক্ষ্য করি। যেমন—‘দূরবনগন্ধবহ’, ‘পথকুক্কুর’, ‘হোমহুতাশন’, ‘জীবনকন্টকপথে’, ‘করপদ্মপরশনে’ ইত্যাদি। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়াপদ সবাইকেই সামিল করা হয়েছে এই জোড়ে। ‘এবার ফিরাও মোরে’ এক আকূতি ভরা কবিতা। আত্মবিশ্লেষণের কবিতা। নিজেকে সমাজে সংসারে খুঁজে দেখা ও পাওয়ার কবিতা। বহুশ্রুত এই কবিতার কিছু পঙক্তি পুনরুল্লেখ করা যাক।

“ ওরে, তুই ওঠ্‌ আজি আগুন লেগেছে কোথা! কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি জাগাতে জগৎ-জনে! কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনে শূন্যতল! কোন্‌ অন্ধ কারা-মাঝে জর্জর বন্ধনে অনাথিনী মাগিছে সহায়! স্ফীতকায় অপমান অক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুষি করিতেছে পান লক্ষ মুখ দিয়া! বেদনারে করিতেছে পরিহাস স্বার্থোদ্ধত অবিচার; সংকুচিত ভীত ক্রীতদাস লুকাইছে ছদ্মবেশে! ওই-যে দাঁড়ায়ে নতশির মূক সবে, ম্লান্মুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর বেদনার করুণ কাহিনী; স্কন্ধে যত চাপে ভার বহি চলে মন্দগতি যতক্ষণ থাকে প্রাণ তার— তারপর সন্তানেরে দিয়ে যায় বংশ বংশ ধরি, নাহি ভর্ৎসে অদৃষ্টেরে, নাহি নিন্দে দেবতারে স্মরি, মানবেরে নাহি দেয় দোষ, নাহি জানে অভিমান, শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোনোমতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ রেখে দেয় বাঁচাইয়া।”

“ কবি তবে উঠে এসো—যদি থাকে প্রাণ তবে তাই লহো সাথে, তবে তাই করো আজি দান। বড়ো দুঃখ, বড়ো ব্যথা—সম্মুখেতে কষ্টের সংসার বড়োই দরিদ্র, শূন্য, বড়ো ক্ষুদ্র, বদ্ধ, অন্ধকার। অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু, চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ উজ্জ্বল পরমায়ু, সাহসবিস্তৃত বক্ষপট। এ দৈন্য মাঝারে, কবি, একবার নিয়ে এসো স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি।।”

এই বিশ্বাসের ছবি প্রাণবন্ত করতে পারলে ‘হয়তো ঘুচিবে দুঃখনিশা’ এমনই তাঁর ভাবনা। পরবর্তীকালে আমরা দেখব এই ভাবনার বিস্তার এবং এর ওপর আস্থাস্থাপন। ‘সাধনা’ কবিতায় দেখছি এক জায়গায় লিখছেন—“মনে যে গানের আছিল আভাস”। আছিল ক্রিয়াপদের ব্যবহার, যা দেখেছি পরবর্তীকালে কোনো কোনো কবি ব্যবহার করে কৃতার্থ হয়েছেন। ‘নগরসংগীত’ কবিতার প্রথম আট পঙক্তি তুলে ধরার লোভ সংবরণ করা গেল না তার ধ্বনি মাধুর্যে। যেমন—

“কোথা গেল সেই মহান্‌ শান্ত নবনির্মল শ্যামলকান্ত উজ্জ্বলনীলবসনপ্রান্ত সুন্দর শুভ ধরণী! আকাশ আলোকপুলকপুঞ্জ, ছায়াসুশীতল নিভৃত কুঞ্জ, কোথা সে গভীর ভ্রমরগুঞ্জ—কোথা নিয়ে এল তরণী। ওই রে নগরী, জনতারণ্য—শত রাজপথ, গৃহ অগণ্য, কতই বিপণি কতই পণ্য, কত কোলাহলকাকলি! কত-না অর্থ কত অনর্থ আবিল করিছে স্বর্গমর্ত, তপনতপ্ত ধূলি আবর্ত উঠিছে শূন্য আকুলি।”

এতদিন আমরা ‘আনা দরে আনা যায় কত আনারস’এ অভ্যস্ত ছিলাম। কিন্তু এখানে ধ্বনিমাধুর্যযুক্ত যে অনুপ্রাসের ব্যবহার তা কবিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেয়। এছাড়াও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই ‘জনতারণ্য’ আর ‘তপনতপ্ত’ শব্দ দুটির গঠন। হ্যাঁ গঠন। আকছার তিনি শব্দ গঠন করে চলেছেন। এই কবিতারই আর দুটি শব্দ এমন—‘স্বর্ণবরনমরণাসক ্ত’ এবং ‘জনসংঘাতমদিরা’। কবিতা ‘দিনশেষে’ ( দিনশেষ হয়ে এল, আঁধারিল ধরণী/ আর বেয়ে কাজ নাই তরণী।), ‘স্বর্গ হতে বিদায়’ ( ম্লান হয়ে এল কন্ঠে মন্দারমালিকা) , ‘জীবনদেবতা’ (ওহে অন্তরতম,/ মিটেছে কি তব সকল তিয়াষ আসি অন্তরে মম?), ‘১৪০০ সাল’ (আজি হতে শতবর্ষ পরে/ কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি/ কৌতূহলভরে) অভিনিবেশ সহ পাঠ এখনও দাবি করে। ‘জীবনদেবতা’ কবিতায় “ দুঃখসুখের লক্ষ ধারায়/ পাত্র ভরিয়া দিয়েছি তোমায়/ নিঠুর পীড়নে নিঙাড়ি বক্ষ দলিতদ্রাক্ষাসম।” উপমাটি আরো বেশ কিছুদিন পাঠকসমাজে রসাস্বাদনে সহায়তা করবে।

 

‘চৈতালী’ কাব্যগ্রন্থে ‘উৎসর্গ’র (আজি মোর দ্রাক্ষাকুঞ্জবনে/ গুচ্ছ গুচ্ছ ধরিয়াছে ফল) মত কিছু কবিতা থাকলেও এটি মূলত চতুর্দশপদী কবিতার (সনেট) সংকলন। চতুর্দশপদীগুলোর মধ্যে দুই ধরনের কবিতা লক্ষ্য করা গেল। ক) ছোট ছোট কখনো তুচ্ছাতিতুচ্ছ দেখাকে অবলম্বন করে গল্প বা গল্পের আভাস সমন্বিত কবিতা, যেখানে শেষে গিয়ে গল্পটি প্রাধান্য পায় না, পায় মানবিক কোনো বোধ। খ) দেখার মাধ্যমে দেখার চেয়ে দর্শণকে প্রাধান্য দিয়ে বক্তব্য প্রতিষ্ঠার ভার সহ কবিতা। প্রথম ক্ষেত্রে উদাহরন হতে পারে ‘দিদি’ ( নদীতীরে মাটি কাটে সাজাইতে পাঁজা), ‘পরিচয়’ ( একদিন দেখিলাম উলঙ্গ সে ছেলে), ‘সঙ্গী’ ( আরেক দিনের কথা পড়ি গেল মনে), ‘করুনা’ (অপরাহ্নে ধূলিচ্ছন্ন নগরীর পথে) ইত্যাদি। আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে ‘সভ্যতার প্রতি’ ( দাও ফিরে সে অরণ্য লও হে নগর), ‘বঙ্গমাতা’ ( পূন্যে পাপে দুঃখে সুখে পতনে উত্থানে), ‘মানসী’ (শুধু বিধাতার সৃষ্টি নহ তুমি নারী!), ‘স্নেহগ্রাস’ ( অন্ধ মোহবন্ধ তব দাও মুক্ত করি।) ইত্যাদি। প্রথম ভাগের দেখায় কিছু কবিতা, কবিতা হিসেবে দেখা গেলেও দ্বিতীয় ভাগের বক্তব্যে ঠাসা ভার ঠিক কবিতা বলে মনে না করা যেতে পারে, যেখানে বানীই প্রধান। যদিও ‘সোনার তরী’ বা ‘চিত্রা’ কাব্যগ্রন্থ থেকে এখানে কবি প্রায় সম্পূর্ণ আলাদা। একটা পরীক্ষা করার মেজাজ লক্ষ্য করা যায়।

 

কথায় ও ছন্দে একটি বক্তব্যকে তুলে ধরার নেশা সমৃদ্ধ টুকরো কবিতার মালা গাঁথা আছে ‘কণিকা’ কাব্যগ্রন্থে। কবিতা নয়, হিউমার সহ কিছু অভিজ্ঞানের প্রকাশ এখানে, যা কিছু আপেক্ষিক সত্যকে পাঠকের সঙ্গে শেয়ার করার প্রেরণায় লেখা।

 

পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘ কল্পনা’। এই কাব্যগ্রন্থে অসাধারন কয়েকটি কবিতা আছে। আমরা শুরু করতে পারি ‘দুঃসময়’ কবিতাটি দিয়ে। প্রথম ও শেষ স্তবক। “ যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে, সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া, যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে, যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া, মহা-আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে, দিক্‌-দিগন্ত অবগুন্ঠনে ঢাকা— তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।।”

এবং

“ ওরে ভয় নাই, নাই স্নেহমোহবন্ধন— ওরে আশা নাই, আশা শুধু মিছে ছলনা। ওরে ভাষা নাই, নাই বৃথা বসে ক্রন্দন— ওরে গৃহ নাই, নাই ফুলশেজ-রচনা। আছে শুধু পাখা, আছে মহানভ-অঙ্গন ঊষা-দিশাহারা নিবিড়-তিমির আঁকা। ওরে বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর, এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।।”

দীপ্ত রবীন্দ্রনাথ। শুধু সন্ধ্যা ওরফে দুঃসময়ের বর্ণনা নয়, বর্ণনা ছাপিয়ে এখানে ভাবনাই প্রধান হয়ে উঠেছে। শব্দ চয়িত হয়েছে নিখুঁত ভাবে। কয়েকটি শব্দ ও শব্দ-বন্ধ তুলে ধরা যাক। ‘অজাগর-গরজে’, ‘আশ্রয়শাখা’, ‘সুচির শর্বরী’, ‘ফুলশেজ-রচনা’, ‘মহানভ-অঙ্গন’ ইত্যাদি। ভাবে, ভাষায়, নির্মাণে অনবদ্য এই কবিতাটি অনেকদিন পাঠককে উদ্বেলিত করে চলবে। পূর্ণ কবিতা বলতে যা বোঝায় তাই এই কবিতাটি। ‘বর্ষামঙ্গল’ ( ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে), ‘বিদায়’ ( ক্ষমা করো, ধৈর্য ধরো হউক সুন্দরতর), ‘বর্ষশেষ’ (ঈশানের পুঞ্জমেঘ অন্ধবেগে ধেয়ে চলে আসে), ‘বৈশাখ’ ( হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ) কবিতাগুলোও উল্লেখনীয়। আরেকটি কবিতা ‘অশেষ’ (আবার আহ্বান?) যা উদ্ধৃতির দাবি রাখে। দুটি ভিন্ন স্তবক থেকে চারটে করে পঙক্তি।

“ নামে সন্ধ্যা তন্দ্রালসা সোনার-আঁচল-খসা,

হাতে দীপশিখা—

দিনের কল্লোল-’পর টানি দিল ঝিল্লিস্বর

ঘন যবনিকা।”

সন্ধ্যাকে কর্তা করে তার আঁচল খসিয়ে নেমে আসা এবং তারই হাতে সন্ধ্যার দীপশিখা চিত্রকল্পটি অসাধারন এক মাত্রা পায়।

“ খেয়াতরী যাক বয়ে গৃহ-ফেরা লোক লয়ে

ও পারের গ্রামে,

তৃতীয়ার ক্ষীণ শশী ধারে পড়ে যাক খসি

কুটিরের বামে।”

এই চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবিতা ঝমঝমিয়ে ওঠে। এছাড়া ‘বিদায়’ ও ‘অশেষ’ কবিতা দুটি ত্রিপদী আঙ্গিকে লেখা। সুতরাং কবিতার আঙ্গিকেও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। উল্লেখিত কবিতাগুলি রবীন্দ্রনাথের বিকাশপর্বকে এক পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়।

 

‘কথা’ ও ‘কাহিনী’ পেরিয়ে ‘ক্ষণিকা’য় আসতে চাই। যদিও ‘কথা’ ও ‘কাহিনী’র নিজস্ব একটা আবেদন আছে, এবং তা হল তার performing দিক। ‘কথা’য় মূলত আছে ছন্দ ও মিলে কিছু গল্প। এগুলি আবৃত্তিযোগ্যও, এবং দীর্ঘদিন ধরে আবৃত্তি হয়ে আসতে আসতে এখন কিছুটা ভাটার টানে আছে। উদাহরন, ‘দেবতার গ্রাস’ ( গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে), ‘বন্দী বীর’ ( পঞ্চ নদীর তীরে/ বেনী পাকাইয়া শিরে), ‘পণ রক্ষা’ ( ‘মারাঠা দস্যু আসিছে রে ওই, করো করো সবে সাজ) ইত্যাদি। আছে কাহিনীমূলক কবিতা প্রচেষ্টা, যা নিয়ে বছরের পর বছর নৃত্যনাট্য/ভাবনাট্য ইত্যাদি মঞ্চস্থ হয়ে এসেছে, ইদানীং যার তোড় কিছুটা কম। উদাহরন—‘পূজারিনি’ ( সেদিন শারদদিবা-অবসান, শ্রীমতী নামে সে দাসী), ‘অভিসার’ (সন্ন্যাসী উপগুপ্ত), ইত্যাদি। আর আছে কাব্য-নাটক, যেখানে হয়ত কাব্যের ভাগ বেশি নাট্য ভাগ কম। হয়ত সে কারনে মঞ্চে এসব দীর্ঘদিন শ্রুতি নাটকের ফরমাস মিটিয়ে গেছে। উদাহরন—‘কর্ণ-কুন্তী সংবাদ’, ‘গান্ধারীর আবেদন’ ইত্যাদি। বলা বাহুল্য এখানে যত না অক্ষর, শব্দ, ভাব, ভাষা, ভাবনার রবীন্দ্রনাথ তার চেয়ে অনেক বেশি নৃত্য-নাটক আবৃত্তি সমন্বয়ে মঞ্চের রবীন্দ্রনাথ। Creator রবীন্দ্রনাথের চেয়ে performer রবীন্দ্রনাথই প্রধান। কিন্তু এতে একটা ঘটনা ঘটে গেল যাতে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা আলোচিত এবং প্রাসঙ্গিক থেকে গেলেন। এবং বলা চলে এর ধার নিয়ে এখনও কিছু করে খাওয়া মানুষ করে খাচ্ছেন। তাদের দোষ ধরি না। এখানেও রবীন্দ্রনাথ এখনো বেশ কিছুটা জীবন্ত।

 

‘ক্ষণিকা’ কাব্যগ্রন্থটির কয়েকটি বিশেষত্ব দেখতে পাই। ক) কবিতায় ‘নিতেম’, ‘দিতেম’ এই চলতি ক্রিয়াপদের ব্যবহার। খ) প্রায় সব কবিতায় ‘স্পেস’ এর যথেষ্ট ব্যবহার। আগেও করেছেন, কিন্তু এখানে অনেক বেশি। গ) গ্রন্থটিতে বেশ কিছু গান রেখেছেন। কিছু কবিতা হয়ত পরবর্তী কালে গান হিসেবে গীত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছু গানও সন্নিবেশিত হয়েছে। ঘ) কবিতাগুলিতে (হিউমার) মজা ছড়িয়ে আছে। উদাহরন দিয়েই শুরু করা যাক। কবিতা ‘যথাস্থান’।

“ কোন্‌ হাটে তুই বিকোতে চাস ওরে আমার গান,

কোনখানে তোর স্থান?

পন্ডিতেরা থাকেন যেথায় বিদ্যেরত্ন-পাড়ায়,

নস্য উড়ে আকাশ জুড়ে কাহার সাধ্য দাঁড়ায়,

চলছে সেথায় সূক্ষ্ম তর্ক সদাই দিবারাত্র

পাত্রাধার কি তৈল কিম্বা তৈলাধার কি পাত্র,

পুঁথিপত্র মেলাই আছে মোহধ্বান্তনাশন—

তারি মধ্যে একটি প্রান্তে পেতে চাস কি আসন?

গান তা শুনি গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া কহে—

নহে, নহে, নহে।।

পঙক্তির আগে এই স্পেস এর ব্যবহার আগে এত ছিল না। এই স্পেস কবিতাগুলিতে নতুন মাত্রা এনেছে। কোনো পঙক্তিতে কোন শব্দে বিশেষ জোড় দেওয়া, কোনো কথাকে প্রাধান্য দেওয়া ইত্যাদি। আঙ্গিকগত ভাবেও কবিতাগুলো দেখতে আলাদা। পড়তেও হয় একটা নতুন চালে।

‘সেকাল’ কবিতায়—“ আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে

দৈবে হতেম দশম রত্ন নবরত্নের মালে,

একটি শ্লোকে স্তুতি গেয়ে রাজার কাছে নিতাম চেয়ে

উজ্জয়িনীর বিজন প্রান্তে কানন-ঘেরা বাড়ি।”

ক্রিয়াপদের ব্যবহার দেখা গেল। ‘উদ্‌বোধন’ (শুধু অকারণ পুলকে), ‘জন্মান্তর’ ( আমি ছেড়েই দিতে রাজি আছি সুসভ্যতার আলোক), ‘আষাঢ়’ (নীল নব ঘনে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে), পেরিয়ে আমরা নোঙর করি ‘এক গাঁয়ে’ কবিতায়। একটি অসাধারন কবিতা। পুরো লিরিক্যাল মেজাজ এর মননে। আর ধরা পরে এক নির্মল গ্রামচিত্র। ভেতরটা যেন পুরো আন্দোলিত হয়ে ওঠে ধীরে যখন শুনি– “ আমাদের এই গ্রামের নামটি খঞ্জনা,

আমাদের এই নদীর নামটি অঞ্জনা,

আমার নাম তো জানে গাঁয়ের পাঁচজনে,

আমাদের সেই তাহার নামটি রঞ্জনা।।“

আর শেষত বলব কবিতা ‘কৃষ্ণকলি’র কথা। এও এক অসাধারন কবিতা, গ্রামের পরিবেশে ‘কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ’ এর কথা। এ কবিতার আয়ু সহজে ফুরোবার নয়।

শেষ হল বিকাশ পর্বের কাব্যগ্রন্থগুলির কথা। এখানে দেখা গেল ছটি কাব্যগ্রন্থের প্রায় ত্রিশ-পয়ত্রিশ টি কবিতা আজও তার নান্দনিকতা সহ পাঠকের মনে সারা ফেলে দিতে সক্ষম বলে আমার চিন্তা-ভাবনায় চিহ্নিত হয়েছে। এবং এর মধ্যে অধিকাংশরই আজকের সময়কে পেরিয়ে আরো কিছুকাল সজীব থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

 

তিন

 

তৃতীয় পর্ব। ভাব-ভাবনা-ভাষায় পূর্ণ রবীন্দ্রনাথ কে পাই এই পর্বে। কাব্যগ্রন্থ ‘নৈবেদ্য’ থেকে ‘বলাকা’ হয়ে কাব্যগ্রন্থ ‘মহুয়া’। প্রায় তিরিশ বছরে প্রকাশিত বাছাই দশটি কাব্যগ্রন্থকে এই পর্বে তুলে আনব, যার প্রথমটি ‘নৈবেদ্য’। এই কাব্যগ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কে। আগাগোড়া ভাবনা-প্রধান নির্মেদ এই কবিতাগুলি তাঁর অভিজ্ঞতার স্ফুরণ ও নির্যাস। শিরোনামহীন কবিতাগুলি গ্রন্থে এক দুই করে একশ পর্যন্ত সন্নিবেশিত। প্রায় সব কবিতাই (২১ নং এর পর থেকে) চতুর্দশপদী। অন্তে মিল থাকলেও যতি চিহ্নের ব্যবহারে বাক-রীতিতে যথেষ্ট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় পূর্বেকার রচিত চতুর্দশপদীর তুলনায়। প্রথম ২১ টি কবিতার মধ্যে কিছু গান হিসেবে গাওয়া হয়েছে। যেমন, ‘প্রতিদিন আমি হে জীবন স্বামী/ দাঁড়াব তোমারি সম্মুখে’, ‘নিশীথশয়নে ভেবে রাখি মনে/ ওগো অন্তরযামী’, ‘তোমার অসীমে প্রাণমন লয়ে/ যত দূরে আমি যাই’, ‘তোমার পতাকা যারে দাও, তারে/ বহিবারে দাও শকতি’ ইত্যাদি। এ সবই তথ্য হিসেবে বলা হল। কবিতার কথা বললে যে কবিতাগুলো তার প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখে এখনও সংবেদনশীল সেগুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করা যেতে পারে, এইরকম—২৮ নং কবিতা, “তুমি তবে এসো নাথ, বোসো শুভক্ষণে/ দেহে মনে গাঁথা এই মহা সিংহাসনে”, ৩০ নং কবিতা, “ বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।।/ অসংখ্য বন্ধন-মাঝে মহানন্দময়/ লভিব মুক্তির স্বাদ।”, ৩৭ নং কবিতা, “ মহারাজ, ক্ষণেক দর্শন দিতে হবে/ তোমার নির্জণ ধামে।”, ৩৯ নং কবিতা, “ হে রাজেন্দ্র, তব হাতে কাল অন্তহীন।” ৪৭ নং কবিতা, “ আঘাত-সংঘাত-মাঝে দাঁড়াইনু আসি/ অঙ্গদ কুন্ঠল কন্ঠী অলংকাররাশি/ খুলিয়া ফেলেছি দূরে।” ৪৮ নং কবিতা, “ এ দুর্ভাগ্য দেশ হতে, হে মঙ্গলময়,/ দূর করে দাও তুমি সর্ব তুচ্ছ ভয়–/ লোকভয়, রাজভয়, মৃত্যুভয় আর।” ৫২ নং কবিতার শেষ ছ টি পঙক্তি—“কর্মেরে করেছে পঙ্গু নিরর্থ আচারে/ জ্ঞানেরে করেছে হত শাস্ত্রকারাগারে,/ আপন কক্ষের মাঝে বৃহৎ ভূবন/ করেছে সংকীর্ণ রুধি বাতায়ণ–/ তারা আজ কাঁদিতেছে। আসিয়াছে নিশা–/ কোথা যাত্রী, কোথা পথ, কোথায় রে দিশা।”, ৫৬ নং কবিতা, “ ত্রাসে লাজে নতশিরে নিত্য নিরবধি/ অপমান অবিচার সহ্য করে যদি”, ৬১ নং কবিতা “ এ মৃত্যু ছেদিতে হবে, এই ভয়জাল,/ এই পুঞ্জ পুঞ্জীভূত জড়ের জঞ্জাল,/ মৃত আবর্জনা।” ৬৪ নং কবিতার প্রথম ছয় পঙক্তি—“ শতাব্দীর সূর্য আজি রক্তমেঘ-মাঝে/ অস্ত গেল, হিংসার উৎসবে আজি বাজে/ অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদ রাগিনী/ ভয়ংকরী। দয়াহীন সভ্যতানাগিনী/ তুলেছে কুটিল ফণা চক্ষের নিমেষে/ গুপ্ত বিষদন্ড তার ভরি তীব্র বিষে।” বলা বাহুল্য বিস্তারিত বিশ্বের মানব সমাজের, সেই সমাজে একজন ব্যাক্তি বিশেষের, নিজের চারপাশের ঘরোয়া সামাজিক অবস্থানে নিজের কথা আছে এখানে। আছে সামাজিক বিচারে নৈতিকতা ও মানবিক মানসিকতার কথা। আছে যাপনে অর্জিত অভিজ্ঞতার সারাংশ, আর মানুষ হয়ে আপাত যাপন ছাপিয়ে প্রকৃত যাপনের কিছু নির্দেশিকা। মনে হতে পারে এগুলি জ্ঞান দান, মনে হতে পারে এসব সমাজ সংস্কারকের কাজ, হতে পারে কবিতা বড় উচ্চকিত কথাবার্তায় ভরা, বানীময় চিন্তা-চেতনার অভিব্যক্তি, আর দর্শনের ভারে ভারাক্রান্ত। তবু আমি বিংশ শতাব্দীর সেই সামাজিক পরিবেশ ও পরিমন্ডলে নিজের ও নিজের চারপাশের মানুষের কথায় ভরা নির্মাণকে নৈবেদ্য হিসেবেই দেখব। শুধু উল্লেখে এটুকু আলোকিত করতে চাইব, এই নৈবেদ্য দেবতার জন্য নয়। মানুষের জন্য মানুষেরই দেওয়া নৈবেদ্য যা পূজা উপচার নয় যাপন উপচার, উপাদানও বটে। তাই এইসব কবিতার আবেদন অনেকদিন ধরে কাজ করতে থাকে। কেননা মানবিক মূল্যবোধের সেই আদর্শ আর আবেগ বারবার তার খোঁচা দিয়ে আমাদের ভাবনাকে আলোড়িত করে, হয়ত একটা দিক নির্দেশিকাও রাখে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।

 

‘স্মরণ’ ব্যাক্তি-জীবনের চির বিচ্ছেদ বেদনার প্রতিলিপি। ব্যক্তিগত এবং পবিত্রও। ১৩০৯, ৭ অগ্রহায়ন কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু। স্মৃতি সমৃদ্ধ শোকগাঁথা। তাই স্মরণ। কবিতাগুলো ১৩০৯ এ প্রথমে প্রকাশ পায় ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায়, পরে ১৩১০এ সংকলিত হয় মোহিত চন্দ্র সেন সম্পাদিত গ্রন্থাবলীতে, আর স্মরণ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশ পায় ১৩২১ সালে। শিরোনামহীন ২৭টি কবিতা। অগ্রহায়ন, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন স্ত্রীর মৃত্যুর অব্যবহিত পরেই এই কবিতাগুলো রচিত। সম্ভবত তাই বিয়োগ বা বিচ্ছেদ বেদনা তীব্র, প্রাণ আর মৃত্যুর দর্শন জড়ানো, ব্যাক্তিক অনুভূতিমালার লিপিকরন প্রয়াস, আবেগ প্রেম পরস্পরের হাত ধরাধরি। আজ লিখতে বসে যখন আবার পড়ছি তখন নিজেকে দিয়ে বিচার করে এটুকু বলতেই পারি এর ভাব-ভাবনা-আবেগ-এ সমলয়ে দুলে যাই, বেজে উঠি, বড় ছুঁয়ে যায়, একাত্ম হয়ে পড়ি। এই তো প্রীতি হে কবি। তুমি তো তাই চেয়ে গেছ। ৩ নং কবিতা—‘ প্রেম এসেছিল, চলে গেল সে যে খুলি দ্বার’। ৫নং কবিতার প্রথম, ১৩তম ও ১৪তম পঙক্তি যথাক্রমে—‘আমার ঘরেতে আর নাই সে যে নাই’, ‘ ঘরে মোর নাহি আর যে অমৃতরস/ বিশ্বমাঝে পাই সেই হারানো পরশ’। ৮ নং কবিতা—‘ মিলন সম্পূর্ণ আজি হল তোমা-সনে/ এ বিচ্ছেদবেদনার নিবিড় বন্ধনে’। ১০ নং কবিতায়—‘জীবীত অবস্থায় যে কথা বলতে পারনি, সেই অসমাপ্ত কথা আজ বল ভাষাবাধাহীন বাক্যে’ বা ‘ দেহমুক্ত তব বাহুলতা/ জড়াইয়া দাও মোর মর্মের মাঝারে একবার–/ আমার অন্তরে রাখো তোমার অন্তিম অধিকার।’ ১৩ নং কবিতা—‘ তুমি মোর জীবনের মাঝে/ মিশায়েছ মৃত্যুর মাধুরী।’ ১৭ নং কবিতা—‘ ক্রমে সবা হতে যত দূরে গেলে ভাসি/ তত মোর কাছে এলে।’ বা ‘ আমার নয়নে তুমি পেতেছ আলোক/ এই কথা মনে জানি নাই মোর শোক।’ ২৬ নং কবিতা—‘ আজিকে তুমি ঘুমাও, আমি জাগিয়া রব দুয়ারে’। স্মরণ, প্রেম, আবেগ, মৃত্যুচেতনা, দর্শন সব একাকার হয়ে মিশে এই কবিতাগুলোর আবেদন ব্যাক্তিক হয়েও সমষ্টি ও সামগ্রিকের। শোক আছে, শোক থেকে উত্থানের বার্তা আছে, বিচ্ছেদ-বিয়োগের পরেও আছে কল্পমিলনের ভূমানন্দ।

 

রেভারেন্ড্‌ সি,এফ, এন্ডরুজকে (বন্ধু) উৎসর্গীকৃত ‘উৎসর্গ’ কাব্যগ্রন্থটিও শিরোনামহীন কবিতা সংকলন। এই কাব্যগ্রন্থে কবি নিজেকে বারবার বহুভাবে আবিস্কার করেন। আত্মানুসন্ধানের এই পর্বে নিজের মানসিক অবস্থানের ভাবনাটি চারিয়ে দেন কবিতায়। আমরা তাঁকে নিবিড় করে পাই যেন। কয়েকটি উদাহরনে বিষয়টি স্পষ্ট করা যেতে পারে। ৭ নং কবিতা—“ পাগল হইয়া বনে বনে ফিরি আপন গন্ধে মম/ কস্তুরীমৃগসম।/ ফাল্গুনরাতে দক্ষিণবায়ে কোথা দিশা খুঁজে পাই না।/ যাহা চাই তাহা ভুল করে চাই, যাহা পাই তাহা চাই না।।” ৮ নং কবিতা—“ আমি চঞ্চল হে/ আমি সুদূরের পিয়াসি।” (এটি গান হিসেবে গাওয়া হয়)। ১৪ নং কবিতা—“ সব ঠাঁই মোর ঘর আছে, আমি সেই ঘর মরি খুঁজিয়া।/ দেশে দেশে মোর দেশ আছে, আমি সেই দেশ লব যুঝিয়া।” ২১ নং কবিতার দুটি স্তবক—

“ বাহির হইতে দেখো না এমন করে

আমায় দেখো না বাহিরে।

আমায় পাবে না আমার দুখে ও সুখে,

আমার বেদনা খুঁজো না আমার বুকে,

আমায় দেখিতে পাবে না আমার মুখে

কবিরে খুঁজিছ যেথায় সেথা সে নাহিরে।”

 

“ যে গন্ধ কাঁপে ফুলের বুকের কাছে,

ভোরেরে আলোকে যে গান ঘুমায়ে আছে।

শারদ-ধান্যে যে আভা আভাসে নাচে

কিরণে কিরণে হসিত হিরণে হরিতে,

সেই গন্ধই গড়েছে আমার কায়া,

সে গান আমাতে রচিছে নূতন মায়া,

সে আভা আমার নয়নে ফেলেছে ছায়া—

আমার মাঝারে আমারে কে পারে ধরিতে।”

৪১ নং কবিতা—“ পথের পথিক করেছ আমায়”। ৪৫ নং কবিতা “ অত চুপি চুপি কেন কথা কও/ ওগো মরণ, হে মোর মরণ।/ অতি ধীরে এসে কেন চেয়ে রও,/ ওগো একি প্রনয়েরি ধরন।” এছাড়া আর দুটো কবিতাও উদ্ধৃত করব, যেখানে তাঁর মননের খোঁজ কিছু পাওয়া যেতে পারে। ৯ নং কবিতা—“কুঁড়ির ভিতরে কাঁদিছে গন্ধ অন্ধ হয়ে/ কাঁদিছে আপন মনে,/ কুসুমের দলে বন্ধ হয়ে/ করুন কাতর স্বনে।” বলা বাহুল্য এখানে গন্ধকে চরিত্র করা হয়েছে। আর ১৭ নং কবিতা– “ ধূপ আপনারে মিলাইতে চাহে গন্ধে,

গন্ধ সে চাহে ধূপের রহিতে জুড়ে।

সুর আপনারে ধরা দিতে চাহে ছন্দে,

ছন্দ ফিরিয়া ছুটে যেতে চায় সুরে।

ভাব পেতে চায় রূপের মাঝারে অঙ্গ,

রূপ পেতে চায় ভাবের মাঝারে ছাড়া।

 

অসীম সে চাহে সীমার নিবিড় সঙ্গ,

সীমা চায় হতে অসীমের মাঝে হারা।

প্রলয়ে সৃজনে না জানি এ কার যুক্তি,

ভাব হতে রূপে অবিরাম যাওয়া-আসা—

বন্ধ ফিরিছে খুঁজিয়া আপন মুক্তি,

মুক্তি মাগিছে বাঁধনের মাঝে বাসা।।” এভাবেই ব্যাপ্তির মাঝে অতি সূক্ষ্ণকে অনুভব করা, সূক্ষ্ণের মধ্যেও ব্যাপ্তি বা স্থূল প্রসারিত খুঁজে দেখা, সীমার মাঝে অসীমের টান, অসীম কল্পনার মধ্যে সীমা স্থাপন, রূপের মধ্যে অরূপের অনুভূতি, অরূপের মধ্যে রূপ কল্পনা বা আবিস্কার, পাওয়ার ভেতর না-পাওয়ার বেদনা জাগিয়ে তোলা, না-পাওয়াতেই পাওয়ার স্বাদ সন্ধান, মুক্তি ও বন্ধনের পারস্পরিক স্থান বদল বা উপরিপতন। এই অদ্ভুত মায়া আর কায়ার খেলায় মজায় বিষাদের মধ্যেও এক আনন্দানুভব জেগে থাকতে পারে। ভাল লাগে। মনে হয় আরো কয়েকটি যুগ এ আনন্দে মেতে থাকা যেতে পারে।

 

পরের কাব্যগ্রন্থ ‘খেয়া’। উৎসর্গ বিজ্ঞানাচার্য শ্রী জগদীশ চন্দ্র বসুকে। খুব সম্ভবত ‘শেষ খেয়া’ কবিতাটির জন্য কাব্যগ্রন্থের নাম ‘খেয়া’। কবিতাটির একটি স্তবক—

দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোমটা পরা ওই ছায়া ভুলালো রে ভুলালো মোর প্রাণ। ও পারেতে সোনার কূলে আঁধারমূলে কোন্‌ মায়া গেয়ে গেল কাজ-ভাঙানো গান। নামিয়ে মুখ চুকিয়ে সুখ যাবার মুখে যায় যারা ফেরার পথে ফিরেও নাহি চায়, তাদের পানে ভাঁটার টানে যাব রে আজ ঘরছাড়া— সন্ধ্যা আসে দিন যে চলে যায়। ওরে আয় আমায় নিয়ে যাবি কে রে দিনশেষের শেষ খেয়ায়।। (এটি গান হিসেবেও গাওয়া হয়)

কবিতাটিতে অদ্ভুত এক মায়া ও বিষাদ কাজ করে। একই ভাবে ‘শুভক্ষণ’ ( ওগো মা, রাজার দুলাল যাবে আজি মোর ঘরের সমুখপথে–) কবিতাতেও এই বিষাদ ছড়িয়ে আছে। আর ‘আগমন’ (তখন রাত্রি আঁধার হল, সাঙ্গ হল কাজ–/ আমরা মনে ভেবে ছিলেম আসবে না কেউ আজ।) কবিতায় শেষ পঙক্তিতে দেখি ‘ঝড়ের সাথে হঠাৎ এল দুঃখরাতের রাজা।।’ ‘প্রচ্ছন্ন’ কবিতায় ( কোথা ছায়ার কোণে দাঁড়িয়ে তুমি কিসের প্রতীক্ষায়/ কেন আছ সবার পিছে?) বিষাদ প্রচ্ছন্ন। ‘অনাবশ্যক’ কবিতা ( কাশের বনে শূন্য নদীর তীরে…) সম্বন্ধে চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে একটি চিঠি তে কবি লেখেন—“ ‘খেয়ার’ ‘অনাবশ্যক’ কবিতার মধ্যে কোনো প্রচ্ছন্ন অর্থ আছে বলে মনে করি নে। আমাদের ক্ষুধার জন্যে যা অত্যাবশ্যক, তার কতই অপ্রয়োজনে ফেলা-ছড়া যায় জীবনের ভোজে, যে ভোজ উদাসীনের উদ্দেশ্যে। আমাদের অনেক দান উৎসর্গ করি তার কাছে যার তাতে দৃষ্টি নেই—সেই অনাবশ্যক নিবেদনে আনন্দও পেয়ে থাকি; অথচ বঞ্চিত হয় সে, যে একান্ত আগ্রহ নিয়ে হাত পেতে মুখ চেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চারিদিকে প্রতিদিন দেখতে পাচ্ছি সংসারে যেখানে অভাব সত্য সেখান থেকে নৈবেদ্য প্রচুর পরিমানেই বিক্ষিপ্ত হয় সেই দিকে যেখানে তার জন্য প্রত্যাশা নেই, ক্ষুধা নেই।” ‘খেয়া’র আরেকটি কবিতার (পথের শেষ) প্রথম ও শেষ স্তবক তুলে ধরতে চাই–

“পথের নেশা আমায় লেগেছিল

পথ আমারে দিয়েছিল ডাক—

সূর্য তখন পূর্ব গগনমূলে,

নৌকা তখন বাঁধা নদীর কূলে

শিশির তখন শুকায় নিকো ফুলে,

শিবালয়ে উঠল বেজে শাঁখ।

পথের নেশা তখন লেগেছিল,

পথ আমারে দিয়েছিল ডাক।”

 

“ অনেক দেখে ক্লান্ত এখন প্রাণ,

ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশ

এখন কেবল একটি পেলেই বাঁচি,

এসেছি তাই ঘাটের কাছাকাছি—

এখন শুধু আকুল মনে যাচি

তোমার পারে খেয়ার তরী ভাসা।

জেনেছি আজ চলেছি কার লাগি

ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশা।”

এভাবে ‘খেয়া’র কবিতাগুলো মায়া জড়ানো বিষাদ মাখা। বিষাদ নিয়ে পরবর্তী কালে কবিতায় প্রায় মিথ হয়েছেন এক কবি, কবি জীবনানন্দ দাশ।

 

‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থটি ৪৫ সংখ্যক শিরোনামহীন কবিতার সমাহার। অন্ততঃ ১০টি কবিতা আমি চিহ্নিত করতে পারি যা সমকালকে সহজেই ছাপিয়ে যাওয়ার গুনে সমৃদ্ধ। প্রত্যেকটি কবিতাই প্রকাশিত হয়েছিল তৎকালীন সাময়িক পত্রে। যেমন—সবুজ পত্র, প্রবাসী, মানসী, ভারতী ইত্যাদি। দু-একটি বাদে সেখানে সবগুলিই ছিল শিরোনাম যুক্ত। তবে এখানে আমরা উল্লেখকালে কবিতার সংখ্যাটিকে বিবেচনা করব। ১ নং কবিতা—“ ওরে নবীন, ওরে আমার কাঁচা,/ ওরে সবুজ, ওরে অবুঝ,/ আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা।/ রক্ত আলোর মদে মাতাল ভোরে/ আজকে যে যা বলে বলুক তোরে,/ সকল তর্ক হেলায় তুচ্ছ ক’রে/ পুচ্ছটি তোর উচ্চে তুলে নাচা।/ আয় দুরন্ত, আয় রে আমার কাঁচা।” ৬০ বছর বয়সে কচি-কাঁচাদের উদ্দেশ্যে এমন একটি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে গ্রন্থটি শুরু। একটু বানী-ঘেঁষা কবিতা হলেও এর একটা আবেদন আছে। ‘জীর্ণ ও জরা ঝরিয়ে দিয়ে’ অফুরান প্রাণ ছড়িয়ে দেওয়ার ডাক আছে চিরযুবা তথা চিরজীবীর জন্য। ফলে সহজেই এই ডাক সমকালকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছে। কেননা কালে কালে সব কালেই এই আহ্বান অমোঘ। ৩ নং কবিতায় ( আমরা চলি সমুখপানে,/ কে আমদের বাঁধবে।) একইভাবে এসেছে চরৈবেতির গান। পথের ভয় জয় করে, ঘর ছেড়ে প্রশস্ত আঙিনায় ছুটে যাওয়ায়, আলোর নেশায় খেপে ওঠায় মন চঞ্চল। সব বন্ধ পুড়বে, সব দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবসান হবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রশ্নে। স্বাভাবিকভাবেই এই চল-জীবনের গান সমকালীনতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। ৪ নং কবিতায় শঙ্খ এক প্রতীক। নাদের প্রতীক আহ্বানের প্রতীক। রণ আহ্বানের প্রতীক। শেষ স্তবকটি এইরকম—

“ তোমার কাছে আরাম চেয়ে

পেলেম শুধু লজ্জা।

এবার সকল অঙ্গ ছেয়ে

পরাও রণসজ্জা।

ব্যাঘাত আসুক নব নব,

আঘাত খেয়ে অটল রব,

বক্ষে আমার দুঃখ তব

বাজবে জয়ডঙ্ক।

দেব সকল শক্তি, লব

অভয় তব শঙ্খ।”

এই অভয় শঙ্খকে উদাসীনভাবে অবহেলাভরে মাটিতে ফেলে রাখলে যুদ্ধ-আহ্বান, যুদ্ধ-সাজ বৃথা, যেখানে যুদ্ধটা প্রতীক থেকে প্রচলে আসে, আর যেখানে যুদ্ধটা অন্ধকার অন্যায় সুপ্তির বিরুদ্ধে। সেই অর্থে নিজের সঙ্গে নিজেরও।

৬ নং কবিতা ( তুমি কি কেবল ছবি শুধু পটে লিখা।) অসাধারন কবিতা। দেখা যাচ্ছে কবি এই পর্বে এসে তাঁর রচনা-শৈলীর, ভাষার অনেক পরিবর্তন করেছেন। অন্তমিল, এবং জোড় এ জোড় বিজোড়ে বিজোড় শব্দ গাঁথা হলেও পঙক্তিতে পরিসর ব্যবহার করে চলতি শব্দ ও ভাষা ব্যবহারে তাকে যথেষ্ট গতিময় করেছেন। ভাবনারও বিস্তর প্রসারে কবিতায় গল্প বা কাহিনী বিদায় নিয়েছে প্রায়।

৭ নং এক দীর্ঘ কবিতা, শাজাহান নাম ভূমিকায়। অথচ এর নির্মাণ কৌশল এমন যে নাম ভূমিকায় যে কেউই মানিয়ে যেতে পারে। ভাব এবং ভাবনায় কীর্তি আর কীর্তিমানের সম্বন্ধ, প্রেমের অন্তহীন যাত্রা সম্ভোগ আর প্রাচুর্যে শেষ হয়না, এমনকি কোনো এক ক্ষনকালীন অস্তিত্বেও তাকে বাঁধা যায় না এই অনুভবই এখানে মুখ্য। আমরা বরং দেখে নিই এই কবিতা নিয়ে চিঠিপত্রে কবির কিছু কথাবার্তা। ( কবিতাটির কোনো অংশ তুলে ধরা প্রায় অসম্ভব, তুললে গোটাটাই তুলে ধরতে হয়। তাই সেই লোভ সম্বরণ করতেই হল।) ৭ নং কবিতা নিয়ে অধ্যাপক চারুচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন—“শাজাহানকে যদি মানবাত্মার বৃহৎ ভূমিকার মধ্যে দেখা যায় তাহলে দেখতে পাই, সম্রাটের সিংহাসনটুকুতে তাঁর আত্মপ্রকাশের পরিধি নিঃশেষ হয় না—ওর মধ্যে তাঁকে কুলোয় না বলেই এত বড়ো সীমাকেও ভেঙে তাঁর চলে যেতে হয়— পৃথিবীতে এমন বিরাট কিছুই নেই যার মধ্যে চিরকালের মতো তাঁকে ধরে রাখলে তাঁকে খর্ব করা হয় না। আত্মাকে মৃত্যু নিয়ে চলে কেবলই সীমা ভেঙে ভেঙে। তাজমহলের সঙ্গে শাজাহানের যে-সম্বন্ধ সে কখনোই চিরকালের নয়— তাঁর সঙ্গে তাঁর সাম্রাজ্যের সম্বন্ধও সেই রকম। সে-সম্বন্ধ জীর্ণ পত্রের মতো খসে পড়েছে, তাতে চিরসত্যরূপী শাজাহানের লেশমাত্র ক্ষতি হয় নি।

তাজমহলের শেষ দুটি লাইনের সর্বনাম ‘আমি’ ও ‘সে’—যে চলে যায় সে-ই হচ্ছে ‘সে’, তার স্মৃতি বন্ধন নেই—আর যে অহং কাঁদছে, সে-ই তো ভার-বওয়া পদার্থ। এখানে ‘আমি’ বলতে কবি নয়, ‘আমি-আমার করে যেটা কান্নাকাটি করে সেই সাধারণ পদার্থটা। আমার বিরহ, আমার স্মৃতি, আমার তাজমহল, যে-মানুষটা বলে তারই প্রতীক ঐ গোরস্থানে; আর মুক্ত হয়েছে যে, সে লোকলোকান্তরের যাত্রী—তাকে কোনো একখানে ধরে না, না তাজমহলে, না ভারতসাম্রাজ্যে, না শাজাহান-নামরূপধারী বিশেষ ইতিহাসের ক্ষণকালীন অস্তিত্বে।” (প্রবাসী, কার্তিক ১৩৪৮)

আবার এই কবিতার শেষাংশ নিয়ে প্রমথনাথ বিশীকে কবি একটি চিঠিতে (২১ শ্রাবণ ১৩৪৪) লেখেন—“ কবিতা লিখেছি বলেই যে তার মানে সম্পূর্ণ বুঝেছি এমন মনে করবার কোনো হেতু নেই। মন থেকে কথাগুলো যখন সদ্য উৎসারিত হচ্ছিল, তখন নিশ্চয়ই এর মধ্যে একটা মানের ইঙ্গিত প্রচ্ছন্ন ছিল। সেই অন্তর্যামীর কাজ সারা হতেই সে দৌড় দিয়েছে– । এখন বাইরে থেকে আমাকে মানে ভেবে বের করতে হবে—সেই বাইরের দেউড়িতে যেমন আমি আছি, তেমনি তুমিও আছ এবং আরো দশজন আছে, তাদের মধ্যে মতান্তর নিয়ে সর্বদাই হট্টগোল বেধে যায়। সেই গোলমালের মধ্যে আমার ব্যাখ্যাটি যোগ করে দিচ্ছি, যদি সন্তোষজনক না মনে কর, তোমার বুদ্ধি খাটাও, আমার আপত্তি করবার অধিকার নেই।

……… যে বেদনাকে সেই স্মৃতি ঘোষণা করছে, তারই সঙ্গে সঙ্গে তার আরেকটি ঘোষণা আছে, তার বানী হচ্ছে এই যে, সেই শাজাহানও নেই নেই সেই মমতাজও, কেবল তাদের যাত্রাপথের এক অংশের ধুলির উপরে জীবনের ক্রন্দনধ্বনি বহন করে রয়ে গেছে তাজমহল। ………।

আমি জানি শাজাহানের এই অংশটি দুর্বোধ। তাই এক সময় এটাকে বর্জন করেছিলুম। তার পরে ভাবলুম, কে বোঝে কে না-বোঝে সে-কথার বিচার আমি করতে যাব কেন—তোমাদের মতো অধ্যাপকদের আক্কেলদাঁতের চর্ব্য পদার্থ না রেখে গেলে ছাত্রমন্ডলীদের ধাঁধা লাগবে কী উপায়ে।”

এই চিঠি থেকে শুধু কবিতার ওপর আলোকপাতের কথা নয়, কবির কবিতা ভাবনারও হদিশ মেলে। বিশেষত কবিতা নির্মাণ ও প্রকাশের পর কবির কবিতাটির বিষয়ে অবস্থান, আর ‘দুর্বোধ’ নিয়ে কবির ভাবনা।

৮ নং দীর্ঘ কবিতার ( হে বিরাট নদী,/ অদৃশ্য নিঃশব্দ তব জল/ অবিচ্ছিন্ন অবিরল/ চলে নিরবধি।) ছোট্ট একটি অংশ—

“ উচ্ছ্রিয়া উঠিবে বিশ্ব পুঞ্জ পুঞ্জ বস্তুর পর্বতে;

পঙ্গু মূক কবন্ধ বধির আঁধা

স্থূলতনু ভয়ংকরী বাধা

সবারে ঠেকায়ে দিয়ে দাঁড়াইবে পথে;

অনুতম পরমানু আপনার ভারে

সঞ্চয়ের অচল বিকারে

বিদ্ধ হবে আকাশের মর্মমূলে

কলুষের বেদনার শূলে।”

১৮ নং কবিতা ( যতক্ষণ স্থির হয়ে থাকি/ ততক্ষণ জমাইয়া রাখি/ যত-কিছু বস্তুভার।) , ১৯ নং কবিতা ( আমি যে বেসেছি ভালো এই জগতেরে), ২৯ নং কবিতা (যেদিন তুমি আপনি ছিলে একা/ আপনাকে তো হয় নি তোমার দেখা) পেরিয়ে চলে আসি ৩৬ নং কবিতায় এবং প্রথম ও শেষ স্তবক উদ্ধৃত করি এই অসাধারন কবিতাটির, কোনো অতিরিক্ত বাক্য ব্যয় না করেই।

“ সন্ধ্যারাগে ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা

আঁধারে মলিন হল—যেন খাপে ঢাকা

বাঁকা তলোয়ার;

দিনের ভাঁটার শেষে রাত্রির জোয়ার

এল তার ভেসে-আসা তারাফুল নিয়ে কালো জলে;

অন্ধকার গিরিতটতলে

দেওদার তরু সারে সারে;

মনে হল সৃষ্টি যেন স্বপ্নে চায় কথা কহিবারে,

বলিতে না পারে স্পষ্ট করি,

অব্যক্ত ধ্বনির পুঞ্জ অন্ধকারে উঠিছে গুমরি।”

 

“শুনিলাম মানবের কত বানী দলে দলে

অলক্ষিত পথে উড়ে চলে

অস্পষ্ট অতীত হতে অস্ফুট সুদূর যুগান্তরে।

শুনিলাম আপন অন্তরে

অসংখ্য পাখির সাথে

দিনেরাতে

এই বাসাছাড়া পাখি ধায় আলো-অন্ধকারে

কোন পার হতে কোন্‌ পারে।

ধ্বনিয়া উঠিছে শূন্য নিখিলের পাখার এ গানে—

“হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোন্‌খানে।””

৩৭ নং কবিতা ( দূর হতে কী শুনিস মৃত্যুর গর্জন,ওরে দীন/ ওরে উদাসীন–) একটি বড় কবিতা। বহুশ্রুত এই কবিতাটি আজও তার আবেদন বজায় রেখেছে। জনপ্রিয় হলে সেই কবিতা সাধারণত তার কবিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে পড়ে। এ কবিতা তার ব্যাতিক্রম। “নুতন উষার স্বর্ণদ্বার/ খুলিতে বিলম্ব কত আর।” এ প্রশ্ন সব কালের সব অবস্থানের। “ যাত্রা করো, যাত্রা করো যাত্রীদল”/ “উঠেছে আদেশ,/ বন্দরের কাল হল শেষ”। এই আহ্বান যাত্রী সাধারনের জন্য চিরকালীন। এই গতির দ্যোতনা সহসা শেষ হয়ে যাওয়ার নয়। “ বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা/ এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা।/ স্বর্গ কি হবে না কেনা।” এই শাশ্বত ভাবনার কোনো বিকল্প নেই। এই অধরা স্বর্গ এক প্রতীক, যেখানে মানব সমাজের অবস্থান এক চিরকালীন স্বপ্ন, যে স্বপ্ন দেখেন কবি, এবং যে স্বপ্নের কোনো শেষ নেই।

৪১ নং কবিতা ( যে কথা বলিতে চাই,/ বলা হয় নাই,) এবং ৪৫ নং কবিতাও (পুরাতন বৎসরের জীর্ণ ক্লান্ত রাত্রি/ ওই কেটে গেল, ওরে যাত্রী।) উল্লেখযোগ্য।

 

‘পলাতকা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৩২৫ সালে ( ১৯১৮)। ‘মুক্তি’, ‘ফাঁকি’ মূলত গল্প, কাব্যি করে লেখা। চলতি ভাষায় কথকতার মত বলা। অন্তমিল সমৃদ্ধ। স্পেসের ব্যবহারে পঙক্তিতে ভিন্ন সংখ্যার বর্ণ। ‘ মায়ের সম্মান’, ‘ নিষ্কৃতি’, ‘মালা’, ‘কালোমেয়ে’ ‘আসল’ সবই গল্প। সামাজিক বিভিন্ন বার্তা নিয়ে কথাবার্তা। এগুলি কবিতা নয়। সাময়িক ভাল-লাগা না-লাগার বিষয়।

 

পরবর্তী আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ ‘পূরবী’। প্রকাশ ১৩৩২। রচনাকাল—১৩২৯ আষাঢ়—১৩৩১ অগ্রহায়ণ। উৎসর্গ “ বিজয়ার করকমলে”। বিজয়া—ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। নাম কবিতার প্রথম ছ লাইন এইরকম—

“যারা আমার সাঁঝ-সকালের গানের দীপে জ্বালিয়ে দিলে আলো আপন হিয়ার পরশ দিয়ে; এই জীবনের সকল সাদা কালো যাদের আলো-ছায়ার লীলা; সেই যে আমার আপন মানুষগুলি নিজের প্রাণের স্রোতের পরে আমার প্রাণের ঝর্ণা নিল তুলি; তাদের সাথে একটি ধারায় মিলিয়ে চলে, সেই তো আমার আয়ু নাই সে কেবল দিন-গননার পাঁজির পাতায়, নয় সে নিশ্বাস-বায়ু।”

 

নিজেকে ঘুরেফিরে নানাভাবে দেখা। ভালোবাসা হল যোগসূত্র যার স্পর্শে বেঁচে থাকা। ভালোবাসা সেই সেতু যা প্রাণ ছাড়িয়ে জীবনের যাপনে আলো জ্বালিয়ে রাখে। ‘ পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাতেও এরই অনুরণন। জন্মদিনের আহ্বান নতুনকে আহ্বান। নতুনের মাধ্যমে পুরোনো জীর্ণর সব অবসান হয়ে অনন্তের বিস্ময় প্রকাশিত। এই অনন্য সাধারণ কবিতাটির তিনটি অংশ উদ্ধৃত করা যাক।

“ রাত্রি হল ভোর।

আজি মোর

জন্মের স্মরণপূর্ণ বানী,

প্রভাতের রৌদ্রে-লিখা লিপিখানি

হাতে করে আনি

দ্বারে আসি দিল ডাক

পঁচিশে বৈশাখ।

…………………………………………………… …………………………

‘হে নূতন

দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।

আচ্ছন্ন করেছে তারে আজি

শীর্ণ নিমেষের যত ধূলিকীর্ণ জীর্ণ পত্ররাজী।

মনে রেখ , হে নবীন,

তোমার প্রথম জন্মদিন

ক্ষয়হীন—

যেমন প্রথম জন্ম নির্ঝরের প্রতি পলে পলে;

তরঙ্গে তরঙ্গে সিন্ধু যেমন উছলে

প্রতি ক্ষণে

প্রথম জীবনে।

হে নূতন,

হোক তব জাগরণ

ভস্ম হতে দীপ্ত হুতাশন।

 

হে নূতন

তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্‌ঘাটন

সূর্যের মতন।

বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি

শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি—

সেই মতো, হে নূতন,

রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।

ব্যক্ত হোক জীবনের জয়

ব্যক্ত হোক তোমা মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।

 

উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।

মোর চিত্ত-মাঝে

চির-নূতনেরে দিল ডাক

পঁচিশে বৈশাখ।”

 

‘লিপি’ কবিতায় আমরা দেখি তুলনার মাধ্যমে সরাসরি উপমায় না গিয়ে কবি পৃথিবীকেই চরিত্র করে নিয়েছেন। ফলে কবিতাটি একটি বিশেষ মাত্রা পেয়েছে।

“ হে ধরণী, কেন প্রতিদিন

তৃপ্তিহীন

একই লিপি পড় ফিরে ফিরে?

প্রত্যুষে গোপনে ধীরে ধীরে

আঁধারের খুলিয়া পেটিকা

স্বর্ণবর্ণে লিখা

প্রভাতের মর্মবানী

বক্ষে টেনে আনি

গুঞ্জরিয়া কত সুরে আবৃত্তি কর যে মুগ্ধমনে। ”

 

 

‘ঝড়’ কবিতায় দেখি ইংরেজী শব্দ ইংরেজী বর্ণে ব্যবহৃত। আজ ভাবা সহজ, কিন্তু সেই সময়ের প্রেক্ষিতে যুগান্তকারী।

“ অন্ধ কেবিন আলোয় আঁধার গোলা,

বন্ধ বাতাস কিসের গন্ধে খোলা।

মুখ ধোবার ওই ব্যাপারখানা দাঁড়িয়ে আছে সোজা,

ক্লান্ত চোখের বোঝা।

দুলছে কাপড় pegএ

বিজলি-পাখার হাওয়ার ঝাপট লেগে।”

এছাড়াও ‘ভাঙা মন্দির’ (পূণ্যলোভীর নাই হল ভিড়/ শূন্য তোমার অঙ্গনে,/ জীর্ণ হে তুমি দীর্ণ দেবালয়।), ‘বেঠিক পথের পথিক’ ( বেঠিক পথের পথিক আমার/ অচিন সে জন রে), ‘আহ্বান’ ( আমারে যে ডাক দেবে এ জীবনে তারে বারংবার/ ফিরেছি ডাকিয়া।), ‘ক্ষণিকা’ (খোলো খোলো হে আকাশ, স্তব্ধ তব নীল যবনিকা–/ খুঁজে নিতে দাও সেই আনন্দের হারানো কণিকা।), ‘আশা’ ( মস্ত যে সব কান্ড করি, শক্ত তেমন নয়;/ জগৎ-হিতের তরে ফিরি বিশ্বজগৎময়।), ‘পদধ্বনি’ ( আঁধারে প্রচ্ছন্ন ঘন বনে/ আশঙ্কার পরশনে/ হরিনের হৃৎপিন্ড যেমন–), ‘শীত’ ( শীতের হাওয়া হঠাৎ ছুটে এল/ গানের বেলা শেষ না হতে হতে?), ‘মধু’ (মৌমাছির মতো আমি চাহি না ভান্ডার ভরিবারে/ বসন্তেরে ব্যর্থ করিবারে।), ‘বনস্পতি’ ( পূর্ণতার সাধনায় বনস্পতি চাহে উর্ধ্বপানে;/ পুঞ্জ পুঞ্জ পল্লবে পল্লবে) ইত্যাদি কবিতাগুলি আমাদের অভিনিবেশ দাবী করে।

 

১৩৩৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয় ‘মহুয়া” কাব্যগ্রন্থ। অধিকাংশ কবিতাই তার আগে প্রকাশ পায় প্রবাসী, মাসিক বসুমতী, বঙ্গলক্ষী, মানসী, বিচিত্রা, সবুজপত্র ইত্যাদি সাময়িক পত্রে। সেখানে প্রকাশ পায় ১৩৩৩ থেকে ১৩৩৫ মধ্যে। মূলত প্রেমের কবিতা। রোমান্টিসিজম এর অন্তরে বাইরে। কবির বয়সকাল তখন ৫৫-৫৬। স্বাভাবিকভাবেই প্রেমের উচ্ছাস আবেগ অন্তরমুখীন। আনন্দ, যা রবীন্দ্র-কবিতার প্রাণ, তা এখানেও প্রেমের আনন্দে মাতোয়ারা। শান্ত ভাবখানাও অনুভবযোগ্য, যদিও তাতে প্রেমের মূর্ততায় কোনো অন্তরায় সৃষ্টি করেনি। ‘সদা থাক আনন্দে’র কবি সদা প্রেমে থাকা যাপন। কবিতায় তার রেশ আবেশ অবধারিত। আমরা কিছু কবিতায় মনোনিবেশ করে এসমস্ত কথার সত্যাসত্য দেখে নিই। কবিতা ‘দ্বৈত’। প্রথম স্তবক এইরকম—

“ আমি যেন গোধূলিলগন

ধেয়ানে মগন,

স্তব্ধ হয়ে ধরা-পানে চাই;

কোথা কিছু নাই,

শুধু শূন্য বিরাট প্রান্তরভূমি।

তারি প্রান্তে নিরালা পিয়ালতরু তুমি

বক্ষে মোর বাহু প্রসারিয়া।

স্তব্ধ হিয়া

শ্যামল স্পর্শনে আত্মহারা,

বিস্মরিল আপনার সূর্যচন্দ্রতারা।”

পিয়ালতরু বললেই এক শান্ত ভাবের উদয় হয়। বিরাট প্রান্তরভূমি ছায়াহীন। সেখানে পিয়ালের ছায়া এক গভীর পাওয়া। তার সবুজ স্পর্শে আত্মহারা হতে সময় লাগে না। স্পর্শনে ক্রিয়াপদের ব্যবহার লক্ষনীয়। সাধু না বলে পারা যায় না। ‘মায়া’ কবিতার প্রথম স্তবক তুলে ধরি।

“ চিত্তকোণে ছন্দে তব

বানীরূপে

সংগোপনে আসন লব

চুপে চুপে।

সেইখানেতেই আমার অভিসার,

যেথায় অন্ধকার

ঘনিয়ে আছে চেতন-বনের

ছায়াতলে,

যেথায় শুধু ক্ষীণ জোনাকির

আলো জ্বলে।”

খুব দেখনদারি কিছু নয়। বরং চুপচাপ জায়গা নেওয়া, অন্ধকারে অভিসারে যাওয়া, ক্ষীণ জোনাকির আলোয়। উচ্চকিত নয় এ প্রেম, বরং খুবই নরম, এবং চেতনাপ্রবন। ‘অপরাজিত’ কবিতার প্রথম স্তবক—

“ফিরাবে তুমি মুখ

ভেবেছ মনে আমারে দিবে দুখ?

আমি কি করি ভয়।

জীবন দিয়ে তোমারে প্রিয়ে করিব আমি জয়।

বিঘ্নভাঙা যৌবনের ভাষা,

অসীম তার আশা

বিপুল তার বল

তোমার আঁখি-বিজুলি-ঘাতে হবে না নিস্ফল।”

এখানে আবার জোর প্রতিষ্ঠার প্রেম। জীবন দিয়েও প্রিয়তমার প্রেমাকাঙ্খী। ‘আঁখি-বিজুলি-ঘাতে’ শব্দ-বন্ধটি উল্লেখযোগ্য। অগ্রসর হলে আমরা পাই ‘অসমাপ্ত’ ( বোলো তারে, বোলো,/ এতদিনে তারে দেখা হল), ‘নির্ভয়’ ( আমারা দুজনা স্বর্গ-খেলনা/ গড়িব না ধরণীতে/ মুগ্ধ ললিত অশ্রুগলিত গীতে।), ‘পথের বাঁধন’ ( পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি/ আমরা দুজন চলতি হাওয়ার পন্থী।), ‘লগ্ন’ ( প্রথম মিলনদিন, সে কি হবে নিবিড় আষাঢ়ে/ যেদিন গৈরিকবস্ত্র ছাড়ে/ আসন্নের আশ্বাসে সুন্দরা/ বসুন্ধরা?) ‘সাগরিকা’ ( সাগরজলে সিনান করি সজল এলোচুলে/ বসিয়াছিলে উপল-উপকূলে।), ‘মহুয়া’ ( বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব দেখি।/ নাহি ঘুচিবে কি/ অশোকের অতিখ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান।), ‘একাকী’ ( চন্দ্রমা আকাশতলে পরম একাকী–/ আপন নিঃশব্দ গানে আপনারই শূন্য দিল ঢাকি।), ‘মিলন’ ( সৃষ্টির প্রাঙ্গনে দেখি বসন্তে অরণ্যে ফুলে ফুলে/ দুটিরে মিলানো নিয়ে খেলা।), ‘অন্তর্ধান’ ( তব অন্তর্ধানপটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।/ অন্তরে অলক্ষ্যলোকে তোমার পরম আগমন।) ইত্যাদি কবিতার মাধ্যমে কবির প্রেম ভাবনাটির স্বরূপ। এই কাব্যগ্রন্থে ‘নাম্নী’ নামে কবিতায় ১৫ টি কবিতা বিভিন্ন নারী কল্প-চরিত্রের নামে। আর ‘বিদায়’ কবিতাটির প্রথম দুটি স্তবক এখানে উল্লেখ করতে চাই।

“ কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।

তারি রথ নিত্যই উধাও

জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়স্পন্দন,

চক্রে-পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন।

 

ওগো বন্ধু, সেই ধাবমান কাল

জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি তার জাল—

তুলে নিল দ্রুতরথে

দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে

তোমা হতে বহু দূরে

মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে

পার হয়ে আসিলাম

আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,

রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়

আমার পুরানো নাম।

ফিরিবার পথ নাহি;

দূর হতে যদি দেখ চাহি

পারিবে না চিনিতে আমায়।

হে বিন্দু, বিদায়।”

নিঃসন্দেহে এটি একটি অসাধারন কবিতা যা প্রেমের অনন্য দূরত্বের কথা এক নতুন মাত্রা ও লেখন-ভঙ্গীতে উপস্থাপিত হয়েছে।

 

চতুর্থ বা শেষ পর্বের কাব্য-পরিচয়ের শুরু এখান থেকে।

‘বনবাণী’ কাব্যগ্রন্থের (১৩৩৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত) প্রায় প্রতিটি কবিতার আগে গদ্যে প্রস্তাবনা, পরে পদ্যে কবিতা। মূলত বৃক্ষ-প্রেম। নামকরন ( দেবদারু, আম্রবন, নীলমনিলতা, কুরচি, শাল, মধুমঞ্জরী, চামেলিবিতান ) নানা বৃক্ষ লতার নামে। শান্তিনিকেতনে ‘বৃক্ষ রোপন’ উৎসবের শুরু হয় ৩০ আষাঢ় ১৩৩৫ (ইং ১৪জুলাই ১৯২৮)। স্বাভাবিকভাবেই সম্ভবত সেই উৎসবের সঙ্গে সংগতি রেখে কবিতাগুলি রচিত। উদ্দেশ্য নিয়ে রচিত কবিতাগুলোর মধ্যে কাব্যগুন কতটুকু আছে তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। আমরা একটা উদাহরন তুলে ধরি। কবিতার নাম ‘শাল’।

“ প্রায় ত্রিশ বছর হল শান্তিনিকেতনের শালবীথিকায় আমার সেদিনকার এক কিশোর কবিবন্ধুকে পাশে নিয়ে অনেকদিন অনেক সায়াহ্নে পায়চারি করেছি। তাকে অন্তরের গভীর কথা বলা সহজ ছিল। সেই আমাদের যত আলাপগুঞ্জরিত রাত্রি, আশ্রমবাসের ইতিহাসে আমার চিরন্তন স্মৃতিগুলির সঙ্গেই গ্রথিত হয়ে আছে। সে কবি আজ ইহলোকে নেই। পৃথিবীতে মানুষের প্রিয়সঙ্গের কত ধারা কত নিভৃত পথ দিয়ে চলেছে। এই স্তব্ধ তরুশ্রেণীর প্রাচীন ছায়ায় সেই ধারা তেমন করে আরো অনেক বয়ে গেছে, আরো অনেক বইবে। আমরা চলে যাব কিন্তু কালে কালে বারে বারে বন্ধুসংগমের জন্য এই ছায়াতল রয়ে গেল। যেমন অতীতের কথা ভাবছি—তেমনি ঐ শালশ্রেণীর দিকে চেয়ে বহুদূর ভবিষ্যতের ছবিও মনে আসছে।

“বাহিরে যখন ক্ষুব্ধ দক্ষিণের মদির পবন অরণ্যে বিস্তারে অধীরতা; যবে কিংশুকের বন উচ্ছৃঙ্খল রক্তরাগে স্পর্ধায় উদ্যত; দিশিদিশি শিমুল ছড়ায় ফাগ; কোকিলের গান অহর্নিশি জানে না সংযম, যবে বকুল অজস্র সর্বনাশে স্খলিত দলিত বনপথে, তখন তোমার পাশে আসি আমি হে তপস্বী শাল, যেথায় মহিমারাশি পুঞ্জিত করেছ অভ্রভেদী, যেথা রয়েছে বিকাশি দিগন্তে গম্ভীর শান্তি। অন্তরের নিগূঢ় গভীরে ফুল ফুটাবার ধ্যানে নিবিষ্ট রয়েছে ঊর্ধ্বশিরে; চৌদিকের চঞ্চলতা পশে না সেথায়। অন্ধকারে নিঃশব্দ সৃষ্টির মন্ত্র নাড়ি বেয়ে শাখায় সঞ্চারে;”।

উদ্দেশ্য নিয়ে লেখা ‘বনবানী’র কবিতাগুলো কিছুটা স্টিফ। বেশ কিছু ভারি শব্দের ব্যবহার কাব্যরসকে ব্যহত করেছে। কিন্তু আঙ্গিকটা নতুন। এভাবে আগে গদ্যে প্রস্তাবনা সহ কবিতা লেখা আগে আমরা দেখি নি।

 

‘পরিশেষ’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয় ১৩৩৯, ভাদ্র মাসে। উৎসর্গ পত্রে লেখা হয়—আশীর্বাদ, শ্রী মান অতুলপ্রসাদ সেন করকমলে। অনুজ এক কবিকে অগ্রজ কবির স্নেহাশীর্বাদ। এই কাব্যগ্রন্থে কিছু ভাল কবিতা যেমন আছে, তেমনি আছে হয়ত তাগিদে লেখা কিছু পদ্য। কারো বিবাহ উপলক্ষে, কারো জন্মদিনে, কারো সংবর্ধনা উপলক্ষে, কাউকে মনে রেখে, বা কাউকে আশীর্বাদ জানিয়ে কবির অভিব্যাক্তি সূচক পদ্য। আমরা এখানে কবিতাগুলোকেই প্রাধান্য দেব। ‘পান্থ’ একটি কবিতা যেখানে কবি নিজের অবস্থানকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কোনো কবি সাধক নন, গুরু নন, তিনি এক মহাপথিক। ভ্রমনেই তার আনন্দ। তার মন্দির নাই, স্বর্গকামনা থাকতে পারে না। তার মোক্ষ মুক্তি সব চলায়। আমরা কবিতাটির প্রথম ও শেষ দিকের কিছু পঙক্তি উদ্ধৃত করি।

“ শুধায়ো না মোরে তুমি মুক্তি কোথা, মুক্তি কারে কই,

আমি তো সাধক নই, আমি গুরু নই।

আমি কবি, আছি

ধরণীর অতি কাছাকাছি,

এ পারের খেয়ার ঘাটায়।

সম্মুখে প্রাণের নদী জোয়ার-ভাঁটায়

নিত্য বহে নিয়ে ছায়া আলো,

মন্দ ভালো,

ভেসে-যাওয়া কত কী যে, ভুলে-যাওয়া কত রাশি রাশি

লাভক্ষতি কান্নাহাসি—”

 

“ হে মহাপথিক,

অবারিত তব দশ দিক।

তোমার মন্দির নাই, নাই স্বর্গধাম।

নাইকো চরম পরিনাম;

তীর্থ তব পদে পদে;

চলিয়া তোমার সাথে মুক্তি পাই চলার সম্পদে,

চঞ্চলের নৃত্যে আর চঞ্চলের গানে,

চঞ্চলের সর্বভোলা দানে—

আঁধারে আলোকে,

সৃজনের পর্বে পর্বে, প্রলয়ের পলকে পলকে।”

কয়েকটি কবিতাকে উল্লেখনীয় বলে মনে করি। যেমন—‘অপূর্ণ’ (যে ক্ষুধা চক্ষের মাঝে, যেই ক্ষুধা কানে), ‘বর্ষশেষ’ ( যাত্রা হয়ে আসে সারা, আয়ুর পশ্চিমপথশেষে/ ঘনায় মৃত্যুর ছায়া এসে।), ‘লেখা’ (সব লেখা লুপ্ত হয়, বারংবার লিখিবার তরে/ নূতন কালের বর্ণে), ‘ধাবমান’ (“ ‘যেয়ো না, যেয়ো না’ বলি কারে ডাকে ব্যর্থ এ ক্রন্দন,/ কোথা সে বন্ধন/ অসীম যা করিবে সীমারে।”), ‘ অবাধ’ ( সরে যা, ছেড়ে দে পথ,/ দুর্ভর সংশয়ে ভারী তোর মন পাথরের পারা।), ‘আলেখ্য’ ( তোরে আমি রচিয়াছি রেখায় রেখায়/ লেখনীর নতুনলেখায়।) ‘ধর্মমোহ’ ( ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/ অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে)। গদ্যে কবিতা লেখার শুরু এই কাব্যগ্রন্থে। এক বিশাল বাঁক। কেমন তার রূপ আর রস দেখা যাক। কবিতা ‘আগন্তুক’—

“ এসেছি সুদূর কাল থেকে

তোমাদের কালে

পৌঁছলেম যে সময়ে

তখন আমার সঙ্গী নেই।

ঘাটে ঘাটে কে কোথায় নেবে গেছে।

ছোটো ছোটো চেনা সুখ যত,

প্রাণের উপকরণ,

দিনের রাতের মুষ্টিদান

এসেছি নিঃশেষ করে বহুদূর পারে।”

বা কবিতা ‘বোবার বানী’—

“ আমার ঘরের সম্মুখেই

পাকে পাকে জড়িয়ে শিমুলগাছে

উঠেছে মালতীলতা।

আষাঢ়ের রসস্পর্শ

লেগেছে অন্তরে তার।

সবুজ তরঙ্গগুলি হয়েছে উচ্ছল

পল্লবের চিক্কণ হিল্লোলে।

বাদলের ফাঁকে ফাঁকে মেঘচ্যুত রৌদ্র এসে

ছোঁয়ায় সোনার কাঠি অঙ্গে তার,

মজ্জায় কাঁপন লাগে,

শিকড়ে শিকড়ে বাজে আগমনী।

যেন কত-কী-যে কথা নীরবে উৎসুক হয়ে থাকে

শাখাপ্রশাখায়।”

এরকম আরও আছে। যেমন, ‘জরতী’ ( হে জরতী,/ অন্তরে আমার/ দেখেছি তোমার ছবি।), ‘প্রাণ’ (বহু লক্ষ বর্ষ ধরে জ্বলে তারা,), ‘আঘাত’ ( সোঁদালের ডালের ডগায়/ মাঝে মাঝে পোকাধরা পাতাগুলি/ কুঁকড়ে গিয়েছে), ‘ আতঙ্ক’ ( বটের জটায় বাঁধা ছায়াতলে/ গোধূলিবেলায়) ইত্যাদি। আর আছে দুটি বহু পঠিত বহু শ্রুত আলোচিত প্রায় মিথ হয়ে যাওয়া কবিতা। ‘প্রশ্ন’ (ভগবান তুমি যুগে যুগে দূত পাঠায়েছ বারে বারে/ দয়াহীন সংসারে) পড়তে পড়তে সত্যি কন্ঠরুদ্ধ হয়ে আসে, আর শেষ দুই পঙক্তিতে তুলে ধরা প্রশ্নে সহমত হয়ে মনে হয় এতো আমারও প্রশ্ন। ‘মৃত্যুঞ্জয়’ মৃত্যুর বিরুদ্ধে জীবনের জয়গান। কবিতাটিই বরং উদ্ধৃত করি।

“ দূর হতে ভেবেছিনু মনে

দুর্জয় নির্দয় তুমি, কাঁপে পৃথ্বী তোমার শাসনে।

তুমি বিভীষিকা,

দুঃখীর বিদীর্ণ বক্ষে জ্বলে তব লেলিহান শিখা।

দক্ষিণ হাতের শেল উঠেছে ঝড়ের মেঘ-পানে,

সেথা হতে বজ্র টেনে আনে।

ভয়ে ভয়ে এসেছিনু দুরুদুরু বুকে

তোমার সম্মুখে

তোমার ভ্রুকুটিভঙ্গে তরঙ্গিল আসন্ন উৎপাত—

নামিল আঘাত।”

 

“ যখন উদ্যত ছিল তোমার অশনি

তোমারে আমার চেয়ে বড়ো বলে নিয়েছিনু গনি।

তোমার আঘাত-সাথে নেমে এলে তুমি

যেথা মোর আপনার ভূমি।

ছোটো হয়ে গেছ আজ।

আমার টুটিল সব লাজ।

যত বড়ো হও,

তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও।

আমি মৃত্যু-চেয়ে বড়ো এই শেষ কথা বলে

যাব আমি চলে।”

এ কবিতার আবেদন ও প্রাসঙ্গিকতা যুগান্তব্যাপী।

 

পরের কাব্যগ্রন্থ ‘পুনশ্চ’ যার প্রথম প্রকাশ ১৩৩৯ আশ্বিন, আর ২য় সংস্করণ ১৩৪০ ফাল্গুন। ২য় সংস্করণে কিছু কবিতা নতুন করে সংযোজিত হয়। এই কাব্যগ্রন্থটির অধিকাংশ কবিতা এতদিনকার রচনা-শৈলীতে লেখা নয়। কবিতা গদ্য ছন্দে লেখা। কিছু কবিতা অন্তমিলহীন কিন্তু ছন্দ ছুট নয়। দলমাত্রিক ছড়ার ছন্দে লেখা। আবার কিছু কবিতা কলামাত্রিক সাধু রীতিতে লেখা। ছন্দের এই নানা খেলায় কবি নিজেকেই ভেঙেছেন আবার গড়েছেন। নানান পরীক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। কবিতায় ঢোকার আগে আমরা দেখে নিই এই রচনাশৈলী নিয়ে কবি নিজে কী বলছেন। ‘পুনশ্চ’র ভূমিকায় তিনি লিখছেন—“ গীতাঞ্জলীর গানগুলি ইংরেজি গদ্যে অনুবাদ করেছিলাম। এই অনুবাদ কাব্যশ্রেণীতে গন্য হয়েছে। সেই অবধি আমার মনে এই প্রশ্ন ছিল যে, পদ্যছন্দের সুস্পষ্ট ঝংকার না রেখে ইংরেজির মতো বাংলা গদ্যে কবিতার রস দেওয়া যায় কি না। মনে আছে সত্যেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেম, তিনি স্বীকার করেছিলেন। কিন্তু, চেষ্টা করেন নি। তখন আমি নিজেই পরীক্ষা করেছি, ‘লিপিকা’র অল্প কয়েকটি লেখায় সেগুলি আছে। ……।

তারপরে আমার অনুরোধক্রমে একবার অবনীন্দ্রনাথ এই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছিলেন। আমার মত এই যে, তাঁর লেখগুলি কাব্যের সীমার মধ্যে এসেছিল, কেবল ভাষাবাহুল্যের জন্যে তাতে পরিমাণ রক্ষা হয় নি। আর-একবার আমি সেই চেষ্টায় প্রবৃত্ত হয়েছি।

এই উপলক্ষে একটা কথা বলার আছে। গদ্যকাব্যে অতিনিরূপিত ছন্দের বন্ধন ভাঙাই যথেষ্ট নয়, পদ্যকাব্যে ভাষায় ও প্রকাশরীতিতে যে একটি সসজ্জ সলজ্জ অবগুন্ঠনপ্রথা আছে তাও দূর করলে তবেই গদ্যের স্বাধীনক্ষেত্রে তার সঞ্চরণ স্বাভাবিক হতে পারে। অসংকুচিত গদ্যরীতিতে কাব্যের অধিকারকে অনেক দূর বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব এই আমার বিশ্বাস এবং সেই দিকে লক্ষ রেখে এই গ্রন্থে প্রকাশিত কবিতাগুলি লিখেছি। এর মধ্যে কয়েকটি কবিতা আছে তাতে মিল নেই, পদ্যছন্দ আছে, কিন্তু পদ্যের বিশেষ ভাষারীতি ত্যাগ করবার চেষ্টা করেছি।”

আবার বছর খানেক পর কবি এই গ্রন্থের রচনারীতি নিয়ে এক দীর্ঘ চিঠি লেখেন। সরস সেই চিঠির নির্বাচিত কিছু অংশ এখানে তুলে ধরা জরুরি মনে করছি।

“ গানের আলাপের সঙ্গে পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের গদ্যিকারীতির যে তুলনা করেছ সেটা মন্দ হয় নি। কেননা আলাপের মধ্যে তালটা বাঁধনছাড়া হয়েও আত্মবিস্মৃত হয় না। অর্থাৎ, বাইরে থাকে না মৃদঙ্গের বোল, কিন্তু নিজের অঙ্গের মধ্যেই থাকে চলবার একটা ওজন।

কিন্তু সংগীতের সঙ্গে কাব্যের একটা জায়গায় মিল নেই। সংগীতের সমস্তটাই অনির্বচনীয়। কাব্যে বচনীয়তা আছে সে কথা বলা বাহুল্য। অনির্বচনীয়তা সেইটিকেই বেষ্টন করে হিল্লোলিত হতে থাকে, পৃথিবীর চার দিকে বায়ুমন্ডলের মতো। এ পর্যন্ত বচনের সঙ্গে অনির্বচনের, বিষয়ের সঙ্গে রসের গাঁঠ বেঁধে দিয়েছে ছন্দ। পরস্পরকে বলিয়ে নিয়েছে ‘যদেতৎ হৃদয়ং মম তদস্তু হৃদয়ং তব’। বাক্‌ এবং অবাক্‌ বাঁধা পড়েছে ছন্দের মাল্যবন্ধনে। এই বাক্‌ এবং অবাকের একান্ত মিলনেই কাব্য। বিবাহিত জীবনে যেমন কাব্যেও তেমনি মাঝে মাঝে বিরোধ বাধে, উভয়ের মাঝখানে ফাঁক পড়ে যায়, ছন্দও তখন জোড় মেলাতে পারে না। সেটাকেই বলি আক্ষেপের বিষয়। বাসরঘরে এক শয্যায় দুই পক্ষ দুই দিকে মুখ ফিরিয়ে থাকার মতোই সেটা শোচনীয়। তার চেয়ে আরও শোচনীয় যখন ‘ এক কন্যে না খেয়ে বাপের বাড়ি যান’। যথাপরিমিত খাদ্যবস্তুর প্রয়োজন আছে এ কথা অজীর্ণরোগীকেও স্বীকার করতে হয়। কোনো কোনো কাব্যে বাগ্‌দেবী স্থূলখাদ্যাভাবে ছায়ার মতো হয়ে পড়েন। সেটাকে আধ্যাত্মিকতার লক্ষণ বলে উল্লাস না করে আধিভৌতিকতার অভাব বলে বিমর্ষ হওয়াই উচিত।

পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থে আধিভৌতিককে সমাদর করে ভোজে বসানো হয়েছে। যেন জামাইষষ্ঠী। এ মানুষটা পুরুষ। একে সোনার ঘড়ির চেন পরালেও অলংকৃত করা হয় না। তা হোক, পাশেই আছেন কাঁকন-পরা অর্ধাবগুন্ঠিতা মাধুরী, তিনি তাঁর শিল্পসমৃদ্ধ ব্যজনিকার আন্দোলনে এই ভোজের মধ্যে অমরাবতীর মৃদুমন্দ হাওয়ার আভাস এনে দিচ্ছেন।” ……

“ আমার বক্তব্য ছিল এই, কাব্যকে বেড়াভাঙা গদ্যের ক্ষেত্রে স্ত্রীস্বাধীনতা দেওয়া যায় যদি তা হলে সাহিত্যসংসারের আলংকারিক অংশটা হাল্কা হয়ে তার বৈচিত্রের দিক, তার চরিত্রের দিক, অনেকটা খোলা জায়গা পায়—কাব্য জোরে পা ফেলে চলতে পারে। সেটা সযত্নে নেচে চলার চেয়ে সব সময়ে যে নিন্দনীয় তা নয়। নাচের আসরের বাইরে আছে এই উঁচু-নিচু বিচিত্র বৃহৎ জগৎ, রূঢ় অথচ মনোহর; সেখানে জোরে চলাটাই মানায় ভালো, কখনো ঘাসের উপর, কখনো কাঁকরের উপর দিয়ে” ………

“কেবলমাত্র কাব্যের অধিকারকে বাড়াব মনে করেই একটা দিকের বেড়ায় গেট বসিয়েছি। এবারকার মতো আমার কাজ ঐ পর্যন্ত। সময় তো বেশি নেই। এর পরে আবার কোন্‌ খেয়াল আসবে বলতে পারি নে। যাঁরা দৈবদুর্যোগে মনে করবেন গদ্যে কাব্যরচনা সহজ তাঁরা এই খোলা দরজাটার কাছে ভিড় করবেন সন্দেহ নেই। তা নিয়ে ফৌজদারি বাধলে আমাকে স্বদলের লোক বলে স্বপক্ষে সাক্ষী মেনে বসবেন। সেই দুর্দিনের পূর্বেই নিরুদ্দেশ হওয়া ভালো।” ……।

আমরা দেখলাম খেয়াল তাঁর আসত এবং তাঁর ওপর ভর করত। কাব্যযাত্রার বাঁকগুলো এই খেয়ালের বশবর্তী হয়েই। চিঠির বেশ কিছুটা অংশ তুলে ধরার আরেকটা কারণ, এখানে আমরা কবির কবিতা-ভাবনারও হাল-হদিস পেলাম বেশ। এবার কবিতা উল্লেখের পালা। উদাহরন তুলে ধরতে হলে প্রায় গোটা কাব্যগ্রন্থটাই তুলে ধরতে হয়। সেটা অস্বাভাবিক, এবং তা না করে এখানে কিছু কবিতার নাম তুলে ধরি আর কয়েকটা কবিতার কিছু বিশেষ অংশ।

কবিতা ‘সুন্দর’ (প্লাটিনামের আঙটির মাঝখানে যেন হীরে।) ‘কোমল গান্ধার’ (নাম রেখেছি কোমল গান্ধার,/ মনে মনে।) ‘বিচ্ছেদ’ (আজ এই বাদলার দিন,/ এ মেঘদূতের দিন নয়।) ‘বিশ্বশোক’ ( দুঃখের দিনে লেখনীকে বলি–/ লজ্জা দিও না।) ‘কীটের সংসার’(এক দিকে কামিনীর ডালে/মাকড়সা শিশিরের ঝালর দুলিয়েছে)

‘সাধারণ মেয়ে’ ( আমি অন্তঃপুরের মেয়ে,/ চিনবে না আমাকে।) ‘পত্রলেখা’ (দিলে তুমি সোনা-মোড়া ফাউন্টেন পেন,/ কতমতো লেখার আসবাব) ‘চিররূপের বাণী’ (প্রাঙ্গনে নামল অকালসন্ধ্যার ছায়া/ সূর্যগ্রহনের কালিমার মতো ‘শুচি’ ( রামানন্দ পেলেন গুরুর পদ–/ সারাদিন তার কাটে জপে তপে,) ‘অস্থানে’ ( একই লতাবিতানে বেয়ে চামেলি আর মধুমঞ্জরী/ দশটি বছর) ‘গানের বাসা’ (তোমরা দুটি পাখি,/ মিলন-বেলায় গান কেন আজ) ইত্যাদি।

‘কোপাই’ কবিতার শেষ স্তবক—

“ কোপাই আজ কবির ছন্দকে আপন সাথি করে নিলে,

সেই ছন্দের আপস হয়ে গেল ভাষার স্থলে জলে,

যেখানে ভাষার গান আর যেখানে ভাষার গৃহস্থালি।

তার ভাঙা তালে হেঁটে চলে যাবে ধনুক হাতে সাঁওতাল ছেলে;

পার হয়ে যাবে গোরুর গাড়ি

আঁটি আঁটি খড় বোঝাই করে;

হাটে যাবে কুমোর

বাঁকে করে হাঁড়ি নিয়ে;

পিছন পিছন যাবে গাঁয়ের কুকুরটা;

আর, মাসিক তিন টাকা মাইনের গুরু

ছেঁড়া ছাতি মাথায়।”

‘নূতন কাল’ কবিতার প্রথম স্তবক—

“ আমাদের কালে গোষ্ঠে যখন সাঙ্গ হল

সকাল্বেলার প্রথম দোহন,

ভোরবেলাকার ব্যাপারীরা

চুকিয়ে দিয়ে গেল প্রথম কেনাবেচা,

তখন কাঁচা রৌদ্রে বেরিয়েছি রাস্তায়,

ঝুড়ি হাতে হেঁকেছি আমার কাঁচা ফল নিয়ে—

তাতে কিছু হয়তো ধরেছিল রঙ, পাক ধরে নি।

তার পর প্রহরে প্রহরে ফিরেছি পথে পথে;

কত লোক কত বললে, কত নিলে, কত ফিরিয়ে দিলে,

ভোগ করলে দাম দিলে না সেও কত লোক—

সে কালের দিন হল সারা।”

‘ফাঁক’ কবিতার ৩য় স্তবক—

“ বেলা দুপুর

আকাশ ঝাঁ ঝাঁ করছে,

ধূ ধূ করছে মাঠ,

তপ্ত বালু উড়ে যায় হূহু করে—

খেয়াল হয় না।

বনমালী ভাবে দরজা বন্ধ করাটা

ভদ্রঘরের কায়দা—

দিই তাকে এক ধমক।

পশ্চিমের সার্শির ভিতর দিয়ে

রোদ ছড়িয়ে পড়ে পায়ের কাছে।

বেলা যখন চারটে

বেহারা এসে খবর নেয়, চিট্‌ঠি?

হাত উলটিয়ে বলি, নাঃ।

ক্ষণকালের জন্য খটকা লাগে

চিঠি লেখা উচিৎ ছিল—

ক্ষণকালটা যায় পেরিয়ে,

ডাকের সময় যায় তার পিছন পিছন।

এ দিকে বাগানে পথের ধারে

টগর গন্ধরাজের পুঁজি ফুরোয় না,

এরা ঘাটে-জটলা-করা বউদের মতো

পরস্পর হাসাহাসি ঠেলাঠেলিতে

মাতিয়ে তুলছে কুঞ্জ আমার।”

‘বাঁশি’ কবিতার একটি অংশ—

“ হঠাৎ সন্ধ্যায়

সিন্ধু-বারোয়াঁয় লাগে তান,

সমস্ত আকাশে বাজে

অনাদি কালের বিরহবেদনা।

তখনি মুহূর্তে ধরা পড়ে

এ গলিটা ঘোর মিছে,

দুর্বিষহ, মাতালের প্রলাপের মতো।

হঠাৎ খবর পাই মনে

আকবর বাদশার সঙ্গে

হরিপদ কেরানির কোনো ভেদ নেই।

বাঁশির করুণ ডাক বেয়ে

ছেঁড়াছাতা রাজছত্র মিলে চলে গেছে

এক বৈকুন্ঠের দিকে।”

এবারে ‘শিশুতীর্থ’ কবিতাটি নিয়ে কিছু অনুভব অনুভুতির কথা বলে সেটির বিভিন্ন অংশ তুলে ধরি। এই দীর্ঘ কবিতাটি বাংলা কাব্যজগতে একটা আলোড়ন, একটা লাফ বলে আমার মনে হয়। শুধু মাত্র এই কবিতার জন্যই আমি রবীন্দ্রনাথকে কবি বলতে রাজি। এই একটি কবিতা বাংলা কবিতার পুরোনো ভাবধারা থেকে এক প্রচন্ড লাফ। হয়ত আমার সঙ্গে একমত হতে অনেকেই পারবেন না। তবু আমি বিশ্বাসের সঙ্গে মনে করি রবীন্দ্রনাথ এই কবিতায় তাঁর নিজের রচিত চর্চিত বেড়াজাল ভেঙে নিজেকেই অতিক্রম করে গেছেন। কেন আমার এমনটা মনে হল? বলি– ক) এই দীর্ঘ কবিতাটি কোনো গল্প নয়। ‘গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে’র মত কোনো গল্প এখানে নেই। খ) বিষয় আছে কিন্তু তার প্রতিপাদ্যতা প্রাধান্য পায়নি। একটা ভাবনাকেই পল্লবিত করে চলেছে। সঙ্গে আছে বিস্তর অনুভাবনা, যা চলেছে কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে। গ) এ এক দীর্ঘ ভ্রমণ যাত্রা। ভ্রমণই যার মূল সুর। ইতিহাস নেই বললেই চলে, যতটুকু যা আছে তা আগামীর বাতাবরণের প্রেক্ষিতে। আর আছে আলোকিত ভবিষ্যতের অনির্ণেয় স্বপ্ন কথা। ঘ) দীর্ঘ যাত্রা-পথের একমুখীনতা কবিতাকে একমুখগামী করেনি। পলে পলে এই পথের যাবতীয় দৃশ্যাবলীর বর্ণনার চেয়ে প্রাধান্য লাভ করেছে অনুভব, যা অভিজ্ঞতা জাত। কিন্তু অভিজ্ঞতার ভার সেভাবে কবিতাকে খর্ব করেনি। ঙ) যথার্থ গদ্যছন্দে লেখা কবিতা এটি।

 

“ রাত কত হল?

উত্তর মেলে না।

কেননা অন্ধ কাল যুগ-যুগান্তরের গোলকধাঁধায় ঘোরে, পথ অজানা,

পথের শেষ কোথায় খেয়াল নেই।

পাহাড়তলিতে অন্ধকার মৃত রাক্ষসের চক্ষুকোটরের মতো;

স্তূপে স্তূপে মেঘ আকাশের বুক চেপে ধরেছে;

পুঞ্জ পুঞ্জ কালিমা গুহায় গর্তে সংলগ্ন,

মনে হয় নিশীথরাত্রের ছিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ;

দিগন্তে একটা আগ্নেয় উগ্রতা

ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে আর নেভে—

ও কি কোনো অজানা দুষ্টগ্রহের চোখ-রাঙানি।

ও কি কোনো অনাদি ক্ষুধার লেলিহ লোল জিহ্বা।”

এমনই আবহে ‘মানুষগুলো সব ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মতো/ ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে—’। পারস্পরিক হানাহানি বিবাদ নারীর আর্ত বিলাপ কামিনীর নগ্ন দেহে অট্টহাস্য আর ‘কিছুতেই কিছু আসে যায় না’ ভাবের বিপরীতে…

“উর্ধ্বে গিরিচূড়ায় বসে আছে ভক্ত, তুষারশুভ্র নীরবতার মধ্যে;

আকাশে তার নিদ্রাহীন চক্ষু খোঁজে আলোকের ইঙ্গিত।

মেঘ যখন ঘনীভূত, নিশাচর পাখি চীৎকার শব্দে উড়ে যায়,

সে বলে, ভয় নেই ভাই, মানবকে মহান্‌ বলে জেনো।

ওরা শোনে না, বলে পশুশক্তিই আদ্যাশক্তি, বলে পশুই শাশ্বত;

বলে সাধুতা তলে তলে আত্মপ্রবঞ্চক।

যখন ওরা আঘাত পায় বিলাপ ক’রে বলে, ভাই, তুমি কোথায়।

উত্তরে শুনতে পায়, আমি তোমার পাশেই।”

একসময় মেঘ সরে যায়, শুকতারা দেখা দেয় পূব দিকে, পৃথিবী ‘আরামের দীর্ঘ নিশ্বাস’ ছাড়ে। ভক্ত বলে—‘সময় এসেছে।/ কিসের সময়?/ যাত্রার।’ ‘চলো সার্থকতার তীর্থে’। অর্থ না বুঝলেও সবাই নিজের নিজের মত করে অর্থ বানিয়ে নিয়ে একসময় যাত্রা শুরু করে।

“যাত্রীরা চারি দিক থেকে বেরিয়ে পড়ল—

সমুদ্র পেরিয়ে, পর্বত ডিঙিয়ে পথহীন প্রান্তর উত্তীর্ণ হয়ে—

এল নীলনদীর দেশ থেকে, গঙ্গার তীর থেকে,

তিব্বতের হিমমজ্জিত অধিত্যকা থেকে,

প্রাকাররক্ষিত নগরের সিংহদ্বার দিয়ে,

লতাজালজটিল অরণ্যে পথ কেটে।

কেউ আসে পায়ে হেঁটে, কেউ উটে, কেউ ঘোড়ায়, কেউ হাতিতে,

কেউ রথে চীনাংশুকের পতাকা উড়িয়ে।

নানা ধর্মের পূজারী চলল ধূপ জ্বালিয়ে, মন্ত্র প’ড়ে।

রাজা চলল, অনুচরদের বর্শাফলক রৌদ্রে দীপ্যমান,

ভেরী বাজে গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে।

ভিক্ষু আসে ছিন্ন কন্থা প’রে

আর রাজ-অমাত্যের দল স্বর্ণলাঞ্ছনখচিত উজ্জ্বল বেশে।”

চলার গতিতে অধ্যাপককে ঠেলে দিয়ে চলে যায় বিদ্যার্থী যুবক। কলহাস্যে মায়েরা, বধূরা, কুমারীরা চলেছে। চলেছে বেশ্যা,পঙ্গু, খঞ্জ, অন্ধ, আতুর। ‘আর সাধুবেশী ধর্মব্যবসায়ী–/ দেবতাকে হাটে হাটে বিক্রয় করা যাদের জীবিকা।’

“দয়াহীন দুর্গম পথ উপলখন্ডে আকীর্ণ।

ভক্ত চলেছে, তার পশ্চাতে বলিষ্ঠ এবং শীর্ণ,

তরুন এবং জরাজর্জর, পৃথিবী শাসন করে যারা

আর যারা অর্ধাশনের মূল্যে মাটি চাষ করে।

কেউ বা ক্লান্ত বিক্ষতচরণ, কারো মনে ক্রোধ, কারো মনে সন্দেহ।

তারা প্রতি পদক্ষেপ গণনা করে আর শুধায়, কত পথ বাকি।

তার উত্তরে ভক্ত শুধু গান গায়।

শুনে তাদের ভ্রূ কুটিল হয়, কিন্তু ফিরতে পারে না,

চলমান জনপিন্ডের বেগ এবং অনতিব্যক্ত আশার তাড়না

তাদের ঠেলে নিয়ে যায়।”

তাদের ঘুম কমে এল। বিশ্রাম নিল কম। প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে চলল। ‘ভয়—পাছে বিলম্ব করে বঞ্চিত হয়।’ দিনের পরে দিন যায়। দিগন্তের পর দিগন্ত। ওদের মুখ-চোখের ভাব কঠিন হতে থাকে।

“ রাত হয়েছে।

পথিকেরা বটতলায় আসন বিছিয়ে বসল।

একটা দমকা হাওয়ায় প্রদীপ গেল নিবে, অন্ধকার নিবিড়—

যেন নিদ্রা ঘনিয়ে উঠল মুর্ছায়।

জনতার মধ্য থেকে কে-একজন হঠাৎ দাঁড়িয়ে উঠে

অধিনেতার দিকে আঙুল তুলে বললে,

মিথ্যেবাদী, আমাদের প্রবঞ্চনা করেছ।

ভর্ৎসনা এক কন্ঠ থেকে আরেক কন্ঠে উদগ্র হতে থাকল।

তীব্র হল মেয়েদের বিদ্বেষ, প্রবল হল পুরুষদের তর্জন।

অবশেষে একজন সাহসিক উঠে দাঁড়িয়ে হঠাৎ তাকে মারলে প্রচন্ড বেগে।

অন্ধকারে তার মুখ দেখা গেল না।

একজনের পর একজন উঠল, আঘাতের পর আঘাত করলে,

তার প্রানহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।”

যাত্রীরা শঙ্কিত। মেয়েরা কাঁদছে। কুকুর ডাকে। রাত পোহাতে চায় না। মেয়ে-পুরুষে তর্ক তীব্রতর হয়। শেষে খাপ থেকে ছুরি বার হওয়ার উপক্রম। এমন সময় অন্ধকার ক্ষীণ হয়। প্রভাতের আলো গিরিশৃঙ্গ ছাপিয়ে এসে পড়ে রক্তাক্ত মৃত মানুষের শান্ত ললাটে।

“মেয়েরা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল, পুরুষেরা মুখ ঢাকল দুই হাতে।

কেউ বা অলক্ষিতে পালিয়ে যেতে চায়, পারে না;

অপরাধের শৃঙ্খলে আপন বলির কাছে তারা বাঁধা।

পরস্পরকে তারা শুধায়, কে আমাদের পথ দেখাবে।

পূর্বদেশের বৃদ্ধ বললে,

আমরা যাকে মেরেছি সেই দেখাবে।

সবাই নিরুত্তর ও নতশির।

বৃদ্ধ আবার বললে, সংশয়ে তাকে আমরা অস্বীকার করেছি,

ক্রোধে তাকে আমরা হনন করেছি,

প্রেমে এখন আমরা তাকে গ্রহণ করব,

কেননা, মৃত্যুর দ্বারা সে আমাদের সকলের জীবনের মধ্যে সঞ্জীবিত

সেই মহামৃত্যুঞ্জয়।”

তরুনরা ডাক দিল যাত্রার উদ্দেশ্যে। প্রেমের তীর্থে, শক্তির তীর্থে। উদ্দেশ্য সবার কাছে স্পষ্ট নয়, কিন্তু আগ্রহে এক। মৃত্যু বিপদকে অগ্রাহ্য করে সব চলল।

“তারা আর পথ শুধায় না, তাদের মনে নেই সংশয়।

চরণে নেই ক্লান্তি।

মৃত অধিনেতার আত্মা তাদের অন্তরে বাহিরে—

সে যে মৃত্যুকে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং জীবনের সীমাকে করেছে অতিক্রম।

তারা সেই ক্ষেত্র দিয়ে চলেছে যেখানে বীজ বোনা হল,

সেই ভান্ডারের পাশ দিয়ে যেখানে শস্য হয়েছে সঞ্চিত,

সেই অনুর্বর ভূমির উপর দিয়ে

যেখানে কঙ্কালসার দেহ বসে আছে প্রাণের কাঙাল;

তারা চলেছে প্রজাবহুল নগরের পথ দিয়ে,

চলেছে জনশূন্যতার মধ্যে দিয়ে

যেখানে বোবা অতীত তার ভাঙা কীর্তি কোলে নিয়ে নিস্তব্ধ;

চলেছে লক্ষ্মীছাড়াদের জীর্ণ বসতি বেয়ে

আশ্রয় যেখানে আশ্রিতকে বিদ্রুপ করে।”

এক সময় কালজ্ঞকে তারা শুধায় ওই কি দেখা যায় আমাদের ‘আশার তোরণচূড়া’? কালজ্ঞ বলে না। তরুন বলে ‘থেমো না বন্ধু, অন্ধতমিস্র রাত্রির মধ্য দিয়ে/ আমাদের পৌঁছতে হবে মৃত্যুহীন জ্যোতির্লোকে’। সকালের প্রথম আভায় তারা এসে পৌঁছয়। সেখানে ‘প্রতিদিনের লোকযাত্রা শান্ত গতিতে প্রবহমান—’। কিন্তু কোথায় রাজার দুর্গ, সোনার খনি? এক উৎস থেকে জলস্রোত উঠছে তরল আলোর মত। এক পর্ণকুটির স্তব্ধতায় পরিবেষ্টিত। সিন্ধুতীরের কবি গান গেয়ে বলছে—‘মাতা, দ্বার খোলো’।

“প্রভাতের একটি রবিরশ্মি রুদ্ধদ্বারের নিম্নপ্রান্তে তির্যক হয়ে পড়েছে।

সম্মিলিত জনসংঘ আপন নাড়ীতে নাড়ীতে যেন শুনতে পেলে

সৃষ্টির সেই প্রথম পরমবানী— মাতা, দ্বার খোলো।

দ্বার খুলে গেল।

মা বসে আছেন তৃণশয্যায়, কোলে তাঁর শিশু,

উষার কোলে যেন শুকতারা।

দ্বারপ্রান্তে প্রতীক্ষাপরায়ণ সূর্যরশ্মি শিশুর মাথায় এসে পড়ল।

কবি দিলে আপন বীণার তারে ঝংকার, গান উঠল আকাশে—

জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের।

সকলে জানু পেতে বসল, রাজা এবং ভিক্ষু, সাধু এবং পাপী,জ্ঞানী এবং

মূঢ়;

উচ্চস্বরে ঘোষণা করলে—জয় হোক মানুষের,

ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের।

এই হল ‘শিশুতীর্থ’ কবিতা। এই কবিতা এখনো অনেকদিন অন্ধকার থেকে আলো দেখাবে বলেই আমার বিশ্বাস।

 

‘বিচিত্রিতা’ প্রকাশ পায় ১৩৪০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে। এখানে ৩১টি ছবি আছে বিভিন্ন শিল্পীর। সেই ছবি অবলম্বনে ৩১টি কবিতা। সুতরাং এই গ্রন্থটি মূলতঃ ছবির ইলাস্ট্রেশন। একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে লেখা। ফলে এই পর্যায়ে এসে রবীন্দ্র কবিতাকে এরা রিপ্রেজেন্ট করে না। আমরাও আলোচনার বাইরে রাখলাম।

 

‘শেষ সপ্তক’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পায় ১৩৪২ বঙ্গাব্দ ২৫ বৈশাখ। এই কাব্যগ্রন্থে কবি রবীন্দ্রনাথ আবার দীপ্যমান। গদ্যে লেখা কবিতার শুরু হয়েছিল আগেই। এখানে এসে তা যেন কবির নিজস্ব একটা শৈলী তৈরী করেছে। সহজ সরল ভাষা অথচ চটুল একটা গতি এতে রয়েছে। ছন্দের বোঝা ও ভার কমে যাওয়ায় সেই আরোপিত ব্যাপারটি আর নেই ভাষায়। কিন্তু এমন একটা মাধুর্য এবং এমন অনেক চিহ্ন আছে যাতে সহজেই একে রবীন্দ্রনাথের কাব্যভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। শিরোনামহীন কবিতাগুলোর ‘তিন’ সংখ্যক কবিতাটি শুরু হয় এইভাবে—

“ ফুরিয়ে গেল পৌষের দিন;

কৌতূহলী ভোরের আলো

কুয়াশার আবরণ দিলে সরিয়ে।

হঠাৎ দেখি শিশিরে ভেজা বাতাবি গাছে

ধরেছে কচি পাতা;

সে যেন আপনি বিস্মিত।

একদিন তমসার কূলে বাল্মীকি

আপনার প্রথম নিশ্বসিত ছন্দে

চকিত হয়েছিলেন নিজে,

তেমনি দেখলেম ওকে।

অনেকদিনকার নিঃশব্দ অবহেলা থেকে

অরুণ-আলোতে অকুন্ঠিত বানী এনেছে

এই কয়টি কিশলয়;

সে যেন সেই একটুখানি কথা

যা তুমিই বলতে পারতে

কিন্তু না ব’লে গিয়েছ চলে।”

‘চার’ সংখ্যক কবিতায় শেষ কয়েক পঙক্তি এই রকম—

“চঞ্চল বসন্তের অবসানে

আজ আমি অলস মনে

আকন্ঠ ডুব দেব এই ধারার গভীরে;

এর কলধ্বনি বাজবে আমার বুকের কাছে

আমার রক্তের মৃদুতালের ছন্দে।

এর আলো-ছায়ার উপর দিয়ে

ভাসতে ভাসতে চলে যাক আমার চেতনা

চিন্তাহীন তর্কহীন শাস্ত্রহীন

মৃত্যু – মহাসাগরসংগমে। ”

একদিকে চলতি কথার ক্রিয়াপদের ব্যবহার অন্যদিকে প্রচুর তৎসম শব্দের ব্যবহার পাশাপাশি, কিন্তু যথেষ্টই মানানসই। নতুন শব্দের উপস্থাপনাও আছে। যেমন ‘ছয়’ সংখ্যক কবিতায় কয়েকটি পঙক্তি এমন—

“ যে পথিক অস্তসূর্যের

ম্লায়মান আলোর পথ নিয়েছে

সে তো ধুলোর হাতে উজাড় করে দিলে

সমস্ত আপনার দাবী;”

‘ম্লায়মান’ শব্দের ব্যবহার। ‘সাত’ সংখ্যক কবিতায় ব্যবহৃত ভাবনা আর তার ভাষার চমৎকারিত্ব এইরকম—

“ অনেক হাজার বছরের

মরু-যবনিকার আচ্ছাদন

যখন উৎক্ষিপ্ত হল,

দেখা দিল তারিখ-হারানো লোকালয়ের

বিরাট কঙ্কাল—

ইতিহাসের অলক্ষ্য অন্তরালে

ছিল তার জীবনক্ষেত্র।

তার মুখরিত শতাব্দী

আপনার সমস্ত কবিগান

বানীহীন অতলে দিয়েছে বিসর্জন।

আর যে-সব গান তখনো ছিল অঙ্কুরে, ছিল মুকুলে,

যে বিপুল সম্ভাব্য

সেদিন অনালোকে ছিল প্রচ্ছন্ন,

অপ্রকাশ থেকে অপ্রকাশেই গেল মগ্ন হয়ে—

যা ছিল অপ্রজ্বল ধোঁওয়ার গোপন আচ্ছাদনে

তাও নিবল।

যা বিকোলো, আর যা বিকোলো না—

দুইই সংসারের হাট থেকে গেল চলে

একই মূল্যের ছাপ নিয়ে।

কোথাও রইল না তার ক্ষত,

কোথাও বাজল না তার ক্ষতি।”

‘এগারো’ সংখ্যক কবিতার তিনটে পঙক্তি—

“ছটা বাজল ইস্কুলের ঘড়িতে।

ওই ঘন্টার শব্দ আর সকাল বেলাকার কাঁচা রোদ্দুরের রঙ

মিলে গেছে আমার মনে।”

কী অনবদ্য না!

‘বারো’ সংখ্যক কবিতাংশ

“ কেউ চেনা নয়

সব মানুষই অজানা।

চলেছে আপনার রহস্যে

আপনি একাকী।

সেখানে তার দোসর নেই।

সংসারের ছাপমারা কাঠামোয়

মানুষের সীমা দিই বানিয়ে।

সংজ্ঞার বেড়া-দেওয়া বসতির মধ্যে

বাঁধা মাইনের কাজ করে সে।

থাকে সাধারণের চিহ্ন নিয়ে ললাটে।

এমন সময় কোথা থেকে

ভালোবাসার বসন্ত-হাওয়া লাগে,

সীমার আড়ালটা যায় উড়ে,

বেরিয়ে পড়ে চির-অচেনা।”

এই কাব্যগ্রন্থের আরেকটি বিশেষত্ব এই, বেশ কিছু কবিতা তরুন কবি সাহিত্যিকের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। যেমন ‘পনের’ সংখ্যক কবিতা শ্রীমতি রানী দেবী কল্যানীয়াসু; ‘ষোল’ সংখ্যক কবিতা শ্রীযুক্ত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কল্যানীয়েষু; ‘সতের’ সংখ্যক কবিতা শ্রীমান ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায় কল্যানীয়েষু; ‘আঠারো’ সংখ্যক কবিতা শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য সুহৃদ্‌বরেষু; ‘বিয়াল্লিশ’ সংখ্যক কবিতা শ্রীযুক্ত চারুচন্দ্র দত্ত প্রিয়বরেষু; ‘তেতাল্লিশ’ সংখ্যক কবিতা শ্রীমান অমিয়চন্দ্র চক্রবর্তী কল্যানীয়েষু; ‘পয়তাল্লিশ’ সংখ্যক কবিতা স্রীযুক্ত প্রমথনাথ চৌধুরী কল্যানীয়েষু। এখান থেকে তাঁর নবীন নতুন তরুনের প্রতি ভালোবাসা ও প্রশ্রয়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন নবীন কে প্রত্যক্ষ করা, বারবার আহ্বান জানানো, নবীনের মাধ্যমে বেঁচে থাকার রসদ খোঁজা অগ্রজ কবিকে দেখতে পাই। উদ্ধৃত কবিতাগুলো ছাড়াও আরো যে সব উল্লেখযোগ্য কবিতা আছে তা হল—‘তেইশ’ (আজ শরতের আলোয় এই যে চেয়ে দেখি), ‘পঁয়ত্রিশ’ (অঙ্গের বাঁধনে বাঁধাপড়া আমার প্রাণ), ‘উনচল্লিশ’ (ওরা এসে আমাকে বলে), ‘চুয়াল্লিশ’ (আমার শেষবেলাকার ঘরখানি) ইত্যাদি সংখ্যক কবিতা। এই সমস্ত কবিতার আবেদন আজও শেষ হয়ে যায় নি।

 

১৩৪২ সালের ভাদ্র মাসে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায় ‘বীথিকা’। এখানে আবার কবির অন্তমিলে ফেরা। তবে পঙক্তিতে অক্ষর সমস্টির ভিন্নতা আছে। সে আমরা আগেও দেখেছি। গদ্যছন্দে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশের পর এই কবিতা আর তেমন টানছে না। শুধু মনে হচ্ছে মন্দন বা পেছনের দিকে ত্বরণ। তবু এরই মধ্যে যে কবিতাগুলো কিয়দংশেও রবীন্দ্রনাথকে প্রতিনিধিত্ব করে তাদের নাম উল্লেখ করছি মাত্র। ‘আদিতম’ (কে আমার অন্তরে/ চিত্তের মেঘলোকে সন্তরে), ‘ছায়াছবি’ ( একটি দিন পড়িছে মনে মোর।/ উষার নিল মুকুট কাড়ি/ শ্রাবণ ঘনঘোর), ‘ব্যর্থ মিলন’ ( বুঝিলাম এ মিলন ঝড়ের মিলন/ কাছে এনে দূরে দিল ঠেলি), ‘অপরাধিনী’ ( অপরাধ যদি করে থাকো/ কেন ঢাকো/ মিথ্যে মোর কাছে), ‘উদাসীন’ ( তোমারে ডাকিনু যবে কুঞ্জবনে/ তখনো আমের বনে গন্ধ ছিল), ‘মেঘমালা’ ( আসে অবগুন্ঠিতা প্রভাতের অরুন দুকূলে/ শৈলতটমূলে), ‘সাঁওতাল মেয়ে’ ( যায় আসে সাঁওতাল মেয়ে/ শিমুলগাছের তলে কাঁকরবিছানো পথ বেয়ে), ‘পথিক’ (তুমি আছ বসি তোমার ঘরের দ্বারে/ ছোট তব সংসারে), ‘দুঃখী’ (দুঃখী তুমি একা,/ যেতে যেতে কটাক্ষেতে পেলে দেখা) ইত্যাদি।

 

‘পত্রপুট’ কাব্যগ্রন্থে ( ১৩৪৩ সালের ২৫ বৈশাখ প্রথম প্রকাশ) শিরোনামহীন ছোট বড় মাঝারি মিলিয়ে মোট ১৮টি কবিতা আছে। যদিও গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাওয়ার আগে অধিকাংশ কবিতা শিরোনাম সহ বিভিন্ন সাময়িক পত্রে প্রকাশ পায়। এই কাব্যগ্রন্থটির প্রায় সব কবিতাই প্রতিনিধিমূলক এবং উদ্ধৃত করার যোগ্য। আমরা কয়েকটি কবিতা বেছে উদ্ধৃত করব। ‘এক’ সংখ্যক কবিতা, যার নাম ‘বিস্ময়’, তার প্রথম স্তবকটি—

“ জীবনে নানা সুখদুঃখের

এলোমেলো ভিড়ের মধ্যে

হঠাৎ কখনো কাছে এসেছে

সুসম্পূর্ণ সময়ের ছোটো একটু টুকরো।

গিরিপথের নানা পাথর-নুড়ির মধ্যে

যেন আচমকা কুড়িয়ে-পাওয়া একটি হীরে।

কতবার ভেবেছি গেঁথে রাখব

ভারতীর গলার হারে;

সাহস করি নি,

ভয় হয়েছে কুলোবে না ভাষায়।

ভয় হয়েছে প্রকাশের ব্যগ্রতায়

পাছে সহজের সীমা যায় ছাড়িয়ে।”

এর পরে যে কবিতাটির কথা তুলব তা যে জীবনে কতবার পড়েছি, কতবার আবৃত্তি করেছি বা মনে মনে গুনগুন করেছি, তার ইয়ত্তা নাই। পুরোনো হয়নি কবিতাটি আমার কাছে। যতবার পড়ি ততবারই আমার কাছে নতুন মনে হয়। বেশ বড় কবিতাটি, কিন্তু মনে গেঁথে গেছে। ‘তিন’ সংখ্যক এই কবিতাটির নাম ‘পৃথিবী’। এর প্রথম মাঝে আর শেষের তিনটি অংশ এখানে তুলে ধরি।

“আজ আমার প্রনতি গ্রহন করো, পৃথিবী,

শেষ নমস্কারে অবনত দিনাবসানের বেদীতলে।

 

মহাবীর্যবতী, তুমি বীরভোগ্যা,

বিপরীত তুমি ললিতে কঠোরে,

মিশ্রিত তোমার প্রকৃতি পুরুষে নারীতে;

মানুষের জীবন দোলায়িত কর তুমি দুঃসহ দ্বন্দ্বে।

ডান হাতে পূর্ণ কর সুধা

বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র,

তোমার লীলাক্ষেত্র মুখরিত কর অট্টবিদ্রুপে;

দুঃসাধ্য কর বীরের জীবনকে মহৎ জীবনে যার অধিকার।

শ্রেয়কে কর দুর্মূল্য,

কৃপা কর না কৃপাপাত্রকে।”

 

“ বৈশাখে দেখেছি বিদ্যুৎচঞ্চুবিদ্ধ দিগন্তকে ছিনিয়ে নিতে এল

কালো শ্যেনপাখির মতো তোমার ঝড়,

সমস্ত আকাশটা ডেকে উঠল যেন কেশর-ফোলা সিংহ,

তার লেজের ঝাপটে ডালপালা আলুথালু ক’রে

হতাশ বনস্পতি ধুলায় পড়ল উবুড় হয়ে।

হাওয়ার মুখে ছুটল ভাঙা কুঁড়ের চাল

শিকল-ছেঁড়া কয়েদি-ডাকাতের মতো।

আবার ফাল্গুনে দেখেছি তোমার আতপ্ত দক্ষিনে হাওয়া

ছড়িয়ে দিয়েছে বিরহমিলনের স্বগতপ্রলাপ

আম্রমুকুলের গন্ধে।

চাঁদের পেয়ালা ছাপিয়ে দিয়ে উপচিয়ে পড়েছে

স্বর্গীয় মদের ফেনা।

বনের মর্মরধ্বনি বাতাসের স্পর্ধায় ধৈর্য হারিয়েছে

অকস্মাৎ কল্লোলোচ্ছ্বাসে।”

 

“ আজ আমি কোনো মোহ নিয়ে আসি নি তোমার সম্মুখে,

এতদিন যে দিনরাত্রির মালা গেঁথেছি বসে বসে

তার জন্য অমরতার দাবি করব না তোমার দ্বারে।

তোমার অযুত নিযুত বৎসর সূর্যপ্রদক্ষিনের পথে

যে বিপুল নিমেষগুলি উন্মীলিত নিমীলিত হতে থাকে

তারই এক ক্ষুদ্র অংশে কোনো একটি আসনের

সত্যমূল্য যদি দিয়ে থাকি,

জীবনের কোনো একটি ফলবান খন্ডকে

যদি জয় করে থাকি পরম দুঃখে

তবে দিয়ো তোমার মাটির ফোঁটার একটি তিলক আমার কপালে;

সে চিহ্ন যাবে মিলিয়ে

যে রাত্রে সকল চিহ্ন পরম অচিনের মধ্যে যায় মিশে।”

অসাধারন এই কবিতাটি বহুপঠিত। তবু এর আবেদন কমে যায় না। প্রত্যেকবার পাঠকালে নতুন নতুন ব্যাঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হয়। আর এখানেই এর সার্থকতা।

‘পাঁচ’ সংখ্যক কবিতাটি ‘হাটে’। এর শুরুতেই কবিতা ঝমঝমিয়ে ওঠে। সময়কাল কে কর্তা বানিয়ে নতুন একটা মাত্রা যুক্ত করা হয়েছে এখানে। উপমা প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো ‘মতো’, ‘যেমন’, ‘যেন’ প্রয়োগের দরকার পড়েনি। বর্ণনা এখানে নতুনবেশে এসেছে এবং গৌন হয়ে। একবার দেখে নিই—

“সন্ধ্যা এল চুল এলিয়ে

অস্তসমুদ্রে সদ্য স্নান করে।

মনে হল স্বপ্নের ধূপ উঠছে

নক্ষত্রলোকের দিকে।

মায়াবিষ্ট নিবিড় সেই স্তব্ধ ক্ষণে—

তার নাম করব না—

সবে সে চুল বেঁধেছে, পরেছে আসমানি রঙের শাড়ি,

খোলা ছাদে গান গাইছে একা।

আমি দাঁড়িয়ে ছিলেম পিছনে

ও হয়তো জানে না, কিংবা হয়তো জানে।

ওর গানে বলছে সিন্ধু কাফির সুরে—

চলে যাবি এই যদি তোর মনে থাকে

ডাকব না ফিরে ডাকব না,

ডাকি নে তো সকালবেলার শুকতারাকে।”

তুচ্ছাতিতুচ্ছও কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছে ‘আট’ সংখ্যক কবিতায়, নাম যার ‘পেয়ালী’। নামেই আছে আধুনিকতার অসাধারন চিহ্ন। ভাবনায় আছে বিষয়কে এলিয়ে দিয়ে কবিতার রঙ-রসকে অগ্রাধিকার দেওয়ার তোড়জোর। এখানে শুধু প্রথম স্তবকটি তুলে ধরতে চাই।

“আমাকে এনে দিল এই বুনো চারাগাছটি।

পাতার রঙ হলদে-সবুজ,

ফুলগুলি যেন আলো পান করবার

শিল্প-কলা পেয়ালা, বেগুনি রঙের।

প্রশ্ন করি ‘নাম কী’,

জবাব নেই কোনোখানে।

ও আছে বিশ্বের অসীম অপরিচিতের মহলে

যেখানে আছে আকাশের নামহারা তারা।

আমি ওকে ধরে এনেছি একটি ডাক নামে

আমার একলা জানার নিভৃতে।

ওর নাম পেয়ালী।

বাগানের নিমন্ত্রনে এসেছে ডালিয়া, এসেছে ফুশিয়া,

এসেছে ম্যারিগোল্ড,

ও আছে অনাদরের অচিহ্নিত স্বাধীনতায়,

জাতে বাঁধা পড়ে নি

ও বাউল, ও অসামাজিক।”

এভাবেই চলছিল ‘পত্রপুট’। কিন্তু ‘পনের’ সংখ্যক কবিতা থেকে এল অন্যরূপ। আমরা পেলাম জেদী, বিদ্রোহী, আত্মদগ্ধ রবীন্দ্রনাথ কে। অন্ত্যজ, মন্ত্রবর্জিত দলের কবি তিনি। ‘আমি ব্রাত্য,আমি মন্ত্রহীন’। স্বাভাবিক ভাবেই এই পৃথিবীর যা কিছু অশুভ অন্যায় অসাম্য তা তাঁকে শুধু পীড়িতই করে না, তার বিরুদ্ধে কলম শানাতে তিনি কবিতাকেই বেছে নেন মাধ্যম হিসেবে। লেখা হয় ‘ষোলো’ সংখ্যক কবিতা ‘আফ্রিকা’, ‘সতের’ সংখ্যক কবিতা ‘বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি’। ‘আফ্রিকা’ কবিতার একটি অংশ—

“ হায় ছায়াবৃতা,

কালো ঘোমটার নীচে

অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ

উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।

এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে

নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে

এল মানুষ-ধরার দল

গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।

সভ্যের বর্বর লোভ

নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।

তোমার ভাষাহীন ক্রন্দনে বাস্পাকুল অরণ্যপথে

পঙ্কিল হল ধূলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে;

দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায়

বীভৎস কাদার পিন্ড

চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।”

তীব্র শ্লেষ মাখানো কবিতা ‘সতের’, নাম ‘বুদ্ধং শরনং গচ্ছামি’। যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টিকারী দলের শান্তির প্রতিভূ বুদ্ধের আশীর্বাদ মাঙার নষ্টামি ও লজ্জা। প্রথম স্তবকটি এইরকম—

“যুদ্ধের দামামা উঠল বেজে।

ওদের ঘাড় হল বাঁকা, চোখ হল রাঙা,

কিড়মিড় করতে লাগল দাঁত।

মানুষের কাঁচা মাংসে যমের ভোজ ভর্তি করতে

বেরল দলে দলে।

সবার আগে চলল দয়াময় বুদ্ধের মন্দিরে

তাঁর পবিত্র আশীর্বাদের আশায়।

বেজে উঠল তুরী ভেরি গরগর শব্দে,

কেঁপে উঠল পৃথিবী।”

 

‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৩৪৩ সালের ভাদ্রমাসে। এই কাব্যগ্রন্থটিও রবীন্দ্র কাব্য প্রবাহে এক অনন্য ঢেউ। প্রথমেই আমি এর থেকে বেছে নেব তিনটি কবিতা, ‘আমি’, যা চেতনা তত্ত্ব সুন্দর ও ভালোবাসার ভাবনাকে একটি মালায় গেঁথেছে; ‘বাঁশিওয়ালা’, যা অতি সাধারন এক নারী আর বাঁশিওয়ালার দূরত্ব আর ভালোবাসার গাঁথা; ‘হঠাৎ দেখা’ যা হাল্কা চালে প্রেম ভালোবাসার গভীর গভীরতম অন্তরাত্মাটির উন্মোচন, যা অবলুপ্ত হয় না। প্রত্যেকটি কবিতার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরলে হয়ত কিছুটা অনুভবে আসতে পারে—। ‘আমি’ থেকে—

“আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,

চুনি উঠল রাঙা হয়ে।

আমি চোখ মেললুম আকাশে,

জ্বলে উঠল আলো

পুবে পশ্চিমে।

গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম ‘সুন্দর’,

সুন্দর হল সে।”

“ একে বোলো না তত্ত্ব

আমার মন হয়েছে পুলকিত

বিশ্ব-আমির রচনার আসরে

হাতে নিয়ে তুলি পাত্রে নিয়ে রঙ।

 

পন্ডিত বলছেন—

বুড়ো চন্দ্রটা, নিষ্ঠুর চতুর হাসি তার,

মৃত্যুদূতের মতো গুঁড়ি মেরে আসছে সে

পৃথিবীর পাঁজরের কাছে।

একদিন দেবে চরম টান তার সাগরে পর্বতে;

মর্তলোকে মহাকালের নতুন খাতায়

পাতা জুড়ে নামবে একটা শূন্য,

গিলে ফেলবে দিনরাতের জমাখরচ;

মানুষের কীর্তি হারাবে অমরতার ভান

তার ইতিহাসে লেপে দেবে

অনন্ত রাত্রির কালি।”

‘বাঁশিওয়ালা’ থেকে টুকরো কয়েকটি অংশ।

“আমি তোমার বাংলাদেশের মেয়ে

সৃষ্টিকর্তা পুরো সময় দেন নি

আমাকে মানুষ করে গড়তে—

রেখেছেন আধাআধি করে।

অন্তরে বাহিরে মিল হয় নি

সেকালে আর আজকের কালে

মিল হয় নি ব্যথায় আর বুদ্ধিতে,

মিল হয় নি শক্তিতে আর ইচ্ছায়।

আমাকে তুলে দেন নি এ যুগের পারানি নৌকায়,

চলা আটক করে ফেলে রেখেছেন

কালস্রোতের ও পারে বালুডাঙায়।”

 

“আমার রক্তে নিয়ে আসে তোমার সুর—

ঝড়ের ডাক, বন্যার ডাক, আগুনের ডাক,

পাঁজরের উপরে আছাড়-খাওয়া

মরণ-সাগরের ডাক,

ঘরের শিকল-নাড়া উদাসী হাওয়ার ডাক।

যেন হাঁক দিয়ে আসে

অপূর্ণের সংকীর্ণ খাদে

পূর্ণ স্রোতের ডাকাতি,

ছিনিয়ে নেবে, ভাসিয়ে দেবে বুঝি।”

 

“দুরন্ত ঠেলায় নিষেধের পাহারা কাত করে ফেলি

নেই এমন বুকের পাটা;

কঠিন করে জানি নে ভালোবাসতে

কাঁদতে শুধু জানি

জানি এলিয়ে পড়তে পায়ে।”

 

“তোমার ডাক শুনে একদিন

ঘরপোষা নির্জীব মেয়ে

অন্ধকার কোণ থেকে

বেরিয়ে এল ঘোমটা-খসা নারী।

যেন সে হঠাৎ-গাওয়া নতুন ছন্দ বাল্মিকীর,

চমক লাগালো তোমাকেই।

সে নামবে না গানের আসন থেকে;

সে লিখবে তোমাকে চিঠি

রাগিনীর আবছায়ায় বসে।

তুমি জানবে না তার ঠিকানা।”

 

‘হঠাৎ-দেখা’ থেকে দুটো অংশ—

“আগে ওকে বার বার দেখেছি

লালরঙের শাড়িতে

দালিম ফুলের মতো রাঙা;

আজ পরেছে কালো রেশমের কাপড়,

আঁচল তুলেছে মাথায়

দোলনচাঁপার মতো চিকন গৌর মুখখানি ঘিরে।

মনে হল, কালো রঙে একটা গভীর দূরত্ব

ঘনিয়ে নিয়েছে নিজের চার দিকে,

যে দূরত্ব সর্ষেখেতের শেষ সীমানায়

শালবনের নীলাঞ্জনে।”

 

“বাইরের আকাশের দিকে তাকিয়েই শুধোল,

‘আমাদের গেছে যে দিন

একেবারেই কি গেছে,

কিছুই কি নেই বাকি।’

একটুকু রইলেম চুপ করে;

তার পর বললেম,

‘রাতের সব তারাই আছে

দিনের আলোর গভীরে।’”

এই তিনটি কবিতা ছাড়াও আমি এই গ্রন্থের আরো তিনটি কবিতার উল্লেখ করব যারা সমমানের। কবিতাগুলোর নাম—‘দ্বৈত’ ( সেদিন ছিলে তুমি আলো আঁধারের মাঝখানটিতে।), ‘প্রাণের রস’ ( আমাকে শুনতে দাও,/ আমি কান পেতে আছি।), ‘শ্যামলী’ ( ওগো শ্যামলী/ আজ শ্রাবণে তোমার কালো কাজল চাহনি) ইত্যাদি। এইসব কবিতা মনের মধ্যে এক স্থায়ী আসন করে নিয়েছে যা খুব সহজে খালি হয়ে যেতে পারে না।

 

‘প্রান্তিক’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৩৪৪এর পৌষে। এর প্রায় সব কবিতাই রচিত হয় ১৯৩৭ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে, কবির সংকটাপন্ন রোগ থেকে মুক্তিলাভের পর। শিরোনামহীন ১৮ টি কবিতা রয়েছে এতে। ৯নং কবিতাটির প্রথম কিছু পঙক্তি এইরকম—

“ দেখিলাম—অবসন্ন চেতনার গোধূলিবেলায়

দেহ মোর ভেসে যায় কালো কালিন্দীর স্রোত বাহি

নিয়ে অনুভূতিপুঞ্জ, নিয়ে তার বিচিত্র বেদনা,

চিত্র-করা আচ্ছাদনে আজন্মের স্মৃতির সঞ্চয়,

নিয়ে তার বাঁশিখানি। দূর হতে দূরে যেতে যেতে

ম্লান হয়ে আসে তার রূপ; পরিচিত তীরে তীরে

তরুচ্ছায়া-আলিঙ্গিত লোকালয়ে ক্ষীণ হয়ে আসে

সন্ধ্যা-আরতির ধ্বনি, ঘরে ঘরে রুদ্ধ হয় দ্বার,

ঢাকা পড়ে দীপশিখা, খেয়ানৌকা বাঁধা পড়ে ঘাটে।”

১৪ নং কবিতা—

“ যাবার সময় হল বিহঙ্গের। এখনি কুলায়

রিক্ত হবে; স্তব্ধগীতি ভ্রষ্টনীড় পড়িবে ধুলায়

অরণ্যের আন্দোলনে। শুষ্কপত্র জীর্ণপুস্প-সাথে

পথচিহ্নহীন শূন্যে যাব উড়ে রজনীপ্রভাতে

অস্তসিন্ধু-পরপারে। কতকাল এই বসুন্ধরা

আতিথ্য দিয়েছে; কভু আম্রমুকুলের – গন্ধে – ভরা

পেয়েছি আহ্বানবাণী ফাল্গুনের দাক্ষিণ্যে মধুর;

অশোকের মঞ্জরী সে ইঙ্গিতে চেয়েছে মোর সুর,

দিয়েছি তা প্রীতিরসে ভরি; কখনো বা ঝঞ্ঝাঘাতে

বৈশাখের, কন্ঠ মোর রুধিয়াছে উত্তপ্ত ধুলাতে,

পক্ষ মোর করেছে অক্ষম; সব নিয়ে ধন্য আমি

প্রাণের সম্মানে। এ পারের ক্লান্ত যাত্রা গেলে থামি

ক্ষণতরে পশ্চাতে ফিরিয়া মোর নম্র নমস্কারে

বন্দনা করিয়া যাব এ জন্মের অধিদেবতারে।।”

১৮ নং কবিতা—

“ নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস

শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস—

বিদায় নেবার আগে তাই

ডাক দিয়ে যাই

দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে

প্রস্তুত হতেছে, ঘরে ঘরে।”

কবিতাটির নীচে স্থান ও তারিখ লেখা আছে এইভাবে—শান্তিনিকেতন/ খ্রীষ্ট- জন্মদিন/ ২৫-১২-৩৭, যা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলির ক্ষেত্রেও এরকমভাবেই শুধুমাত্র নির্বাচিত কবিতার অংশবিশেষ বা কবিতা তুলে ধরব আর কাব্যগ্রন্থের বিশেষতার দু-একটি দিক।

 

‘সেঁজুতি’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায় ১৩৪৫ এর ভাদ্র মাসে। এটি উৎসর্গ করা হয়–ডাঃ সার্‌ নীলরতন সরকার বন্ধুবরেষু। ‘পরিচয়’ কবিতার প্রথম ও শেষ কয়েকটি পঙক্তি যথাক্রমে নিম্নরূপ—

“ একদিন তরীখানা থেমেছিল এই ঘাটে লেগে

বসন্তের নূতন হাওয়ার বেগে।

তোমরা শুধায়েছিলে মোরে ডাকি,

‘পরিচয় কোনো আছে নাকি,

যাবে কোন্‌খানে?’

আমি শুধু বলেছি, ‘কে জানে!’

 

“নদীতে লাগিল দোলা, বাঁধনে পড়িল টান—

একা বসে গাহিলাম যৌবনের বেদনার গান।

সেই গান শুনি

কুসুমিত তরুতলে তরুণতরুণী

তুলিল অশোক—

মোর হতে দিয়ে তারা কহিল, ‘এ আমাদেরই লোক।’

আর কিছু নয়,

সে মোর প্রথম পরিচয়।।”

 

“ নূতন কালের নব যাত্রী ছেলেমেয়ে

শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,

‘সন্ধ্যার তারার দিকে

বহিয়া চলেছে তরণী কে?’

সেতারেতে বাঁধিলাম তার,

গাহিলাম আরবার,

‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,

আমি তোমাদেরই লোক,

আর কিছু নয়—

এই হোক শেষ পরিচয়।’”

আর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা। ‘জন্মদিন’ (আজ মম জন্মদিন। সদ্যই প্রাণের প্রান্তপথে/ ডুব দিয়ে উঠেছে সে বিলুপ্তির অন্ধকার হতে/ মরণের ছাড়পত্র নিয়ে।)। কবিতাটি ১৩৪৫ সালের ২৫ শে বৈশাখ কবি রেডিও তে পাঠ করেন। ‘চলতি ছবি’ ( রোদ্‌দুরেতে ঝাপসা দেখায় ওই যে দূরের গ্রাম)। ‘নিঃশেষ’ ( শরৎ বেলায় বিত্তবিহীন মেঘ/ হারায়েছে তার ধারাবর্ষণ বেগ)।

 

‘আকাশ প্রদীপ’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৩৪৬ সালের বৈশাখ মাসে। এর অধিকাংশ কবিতা ১৩৪৫ সালের আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত সাত মাসে লেখা হয় শান্তিনিকেতনে। কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয় শ্রীযুক্ত সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, কল্যানীয়েষু কে। উৎসর্গ পত্রের লেখাটি তাৎপর্যপূর্ণ এবং এইরকম—“ বয়সে তোমাকে অনেক দূর পেরিয়ে এসেছি, তবু তোমাদের কালের সঙ্গে আমার যোগ লুপ্তপ্রায় হয়ে এসেছে, এমনতরো অস্বীকৃতির সংশয়বাক্য তোমার কাছ থেকে শুনি নি! তাই আমার তোমাদের কালকে স্পর্শ করবে আশা করে এই বই তোমার হাতের কাছে এগিয়ে দিলুম। তুমি আধুনিক সাহিত্যের সাধনক্ষেত্র থেকে একে গ্রহণ করো। তোমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।”

‘সময়হারা’ কবিতার প্রথম কয়েক পঙক্তি—

“ খবর এল, সময় আমার গেছে,

আমার গড়া পুতুল যারা বেচে

বর্তমানে এমনতরো পসারী নেই;

সাবেক কালের দালানঘরের পিছন কোণেই

ক্রমে ক্রমে

উঠছে জমে জমে

আমার হাতের খেলনাগুলো,

টানছে ধুলো।”

আর এই কবিতারই শেষ চার পঙক্তি এইরকম—

“ এতক্ষন যা বকা গেল এটা প্রলাপমাত্র—

নবীন বিচারপতি ওগো, আমি ক্ষমার পাত্র;

পেরিয়ে মেয়াদ বাঁচে তবু যে সব সময়হারা

স্বপ্নে ছাড়া সান্ত্বনা আর কোথায় পাবে তারা।”

 

‘কাঁচা আম’ কবিতার ২য় স্তবক

“ গোড়াকার কথাটা বলি।

আমার বয়সে এ বাড়িতে যেদিন প্রথম আসছে বউ

পরের ঘর থেকে,

সেদিন যে-মনটা ছিল নোঙর ফেলা নৌকো

বান ডেকে তাকে দিলে তোলপাড় ক’রে।

জীবনের বাঁধা বরাদ্দ ছাপিয়ে দিয়ে

এল অদৃষ্টের বদান্যতা।

পুরোনো ছেঁড়া আটপৌরে দিনরাত্রিগুলো

খসে পড়ল সমস্ত বাড়িটা থেকে।

কদিন তিনবেলা রোশনচৌকিতে

চারদিকের প্রাত্যহিক ভাষা দিল বদলিয়ে;

ঘরে ঘরে চলল আলোর গোলমাল

ঝাড়ে লন্ঠনে।

অত্যন্ত পরিচিতের মাঝখানে

ফুটে উঠল অত্যন্ত আশ্চর্য।”

 

‘নবজাতক’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৩৪৭ সালের বৈশাখ মাসে। এই গ্রন্থের কাব্যগ্রন্থনের ভার ছিল অমিয়চন্দ্রের ওপর। এ বিষয়ে কাব্যগ্রন্থের সূচনায় কবি যে কথাগুলো লেখেন তার অংশবিশেষ এইরকম—সূচনাঃ ‘ আমার কাব্যের ঋতুপরিবর্তন ঘটেছে বারে বারে। প্রায়ই সেটা ঘটে নিজের অলক্ষ্যে। …………। কাব্যে এই যে হাওয়াবদল থেকে সৃষ্টিবদল এ তো স্বাভাবিক, এমনি স্বাভাবিক যে এর কাজ হতে থাকে অন্যমনে। কবির এ সম্বন্ধে খেয়াল থাকে না। বাইরে থেকে সমজদারের কাছে এর প্রবণতা ধরা পড়ে। সম্প্রতি সেই সমজদারের সাড়া পেয়েছিলুম। আমার একশ্রেনীর কবিতার এই বিশিষ্টতা আমার স্নেহভাজন বন্ধু অমিয় চন্দ্রের দৃষ্টিতে পড়েছিল। …………। আমি তাই নবজাতক গ্রন্থের কাব্যগ্রন্থনের ভার অমিয়চন্দ্রের উপরেই দিয়েছিলুম।’ বার বার বিভিন্ন ভাবে নতুনদের তরুনদের কাছে যাওয়া, তাদের সঙ্গে একটা যোগসূত্র স্থাপনের ইচ্ছা।

 

‘নবজাতক’ কবিতাটি থেকে অংশ বিশেষ—

“ নবীন আগন্তুক

নব যুগ তব যাত্রার পথে

চেয়ে আছে উৎসুক।

কী বার্তা নিয়ে মর্তে এসেছ তুমি;

জীবনরঙ্গভূমি

তোমার লাগিয়া পাতিয়াছে কী আসন।

নরদেবতার পূজায় এনেছ

কী নব সম্ভাষণ।

………………………………

…………………………………

মানবের শিশু বারে বারে আনে

চির আশ্বাসবানী—

নূতন প্রভাতে মুক্তির আলো

বুঝি-বা দিতেছে আনি।”

 

‘উদ্‌বোধন’ কবিতাটি—

“ প্রথম যুগের উদয়দিগঙ্গনে

প্রথম দিনের উষা নেমে এল যবে

প্রকাশপিয়াসি ধরিত্রী বনে বনে

শুধায়ে ফিরিল, সুর খুঁজে পাবে কবে।

এসো এসো সেই নব সৃষ্টির কবি

নবজাগরণ-যুগপ্রভাতের রবি।

গান এনেছিলে নব ছন্দের তালে

তরুনী উষার শিশিরস্নানের কালে,

আলো-আঁধারের আনন্দ বিপ্লবে।”

 

‘রাতের গাড়ি’ কবিতাটি উল্লেখযোগ্য। এখানে তার প্রথম চারটে পঙক্তি—

“ এ প্রাণ রাতের রেলগাড়ি

দিল পাড়ি—

কামরায় গাড়ি-ভরা ঘুম,

রজনী নিঝুম।”

 

‘সানাই’ কাব্যগ্রন্থটির প্রকাশ ১৩৪৭ সালের শ্রাবণ মাসে। এই গ্রন্থের অনেকগুলি ছোট ছোট কবিতার স্বতন্ত্র সংগীতরূপ প্রচলিত আছে। কোথাও বা গান আগে রচিত হয়েছে, কোথাও বা কবিতা। গ্রন্থে এমন কবিতার সংখ্যা ২২-২৩টি। সুতরাং গানই এর প্রধান উপজীব্য। তবু এরই মধ্যে ‘বাসাবদল’ কবিতাটি ( যেতেই হবে।/ দিনটা যেন খোঁড়া পায়ের মতো/ ব্যান্ডেজেতে বাঁধা।) কবিতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য।

 

‘রোগশয্যায়’ কাব্যগ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৩৪৭ সালের পৌষ মাসে। এখানে ৩৯টি শিরোনামহীন কবিতা সংকলিত হয়ছে। তিনটি কবিতার উল্লেখ ও উদ্ধৃতি দিতে চাই। ১৩ নং কবিতা—

“ দীর্ঘ দুঃখরাত্রি যদি

এক-অতীতের প্রান্ততটে

খেয়া তার শেষ করে থাকে,

তবে নব বিস্ময়ের মাঝে

বিশ্বজগতের শিশুলোকে

জেগে ওঠে যেন সেই নূতন প্রভাতে

জীবনের নূতন জিজ্ঞাসা।

পুরাতন প্রশ্নগুলি উত্তর না পেয়ে

অবাক্‌ বুদ্ধিরে যারা সদা ব্যঙ্গ করে,

বালকের চিন্তাহীন লীলাচ্ছলে

সহজ উত্তর তার পাই যেন মনে

সহজ বিশ্বাসে—

যে বিশ্বাস আপনার মাঝে তৃপ্ত থাকে,

করেনা বিরোধ,

আনন্দের স্পর্শ দিয়ে সত্যের প্রত্যয় দেয় এনে।”

 

২৬ নং কবিতা থেকে—

“ আমার কীর্তিরে আমি করি না বিশ্বাস

জানি, কালসিন্ধু তারে

নিয়ত তরঙ্গঘাতে

দিনে দিনে দিবে লুপ্ত করি।

আমার বিশ্বাস আপনারে।

দুই বেলা সেই পাত্র ভরি

এ বিশ্বের নিত্যসুধা

করিয়াছি পান।

প্রতি মুহূর্তের ভালোবাসা

তার মাঝে হয়েছে সঞ্চিত।

দুঃখভারে দীর্ণ করে নাই,

কালো করে নাই ধূলি

শিল্পেরে তাহার।

আমি জানি, যার যার

সংসারের রঙ্গভূমি ছাড়ি,

সাক্ষ্য দেবে পুষ্পবন ঋতুতে ঋতুতে

এ বিশ্বরে ভালোবাসিয়াছি

এ ভালোবাসাই সত্য, এ জন্মের দান।

বিদায় নেবার কালে

এ সত্য অম্লান হয়ে

মৃত্যুরে করিবে অস্বীকার।”

২৭ নং কবিতা—

 

“খুলে দাও দ্বার,

নীলাকাশ করো অবারিত;

কৌতূহলী পষ্পগন্ধ কক্ষে মোর করুক প্রবেশ;

প্রথম রৌদ্রের আলো

সর্বদেহে হোক সঞ্চারিত শিরায় শিরায়;

আমি বেঁচে আছি, তারি অভিনন্দনের বাণী

মর্মরিত পল্লবে পল্লবে আমারে শুনিতে দাও;

এ প্রভাত

আপনার উত্তরীয়ে ঢেকে দিক মোর মন

যেমন সে ঢেকে দেয় নবশস্প শ্যামল প্রান্তর।

ভালোবাসা যা পেয়েছি আমার জীবনে

তাহারি নিঃশব্দ ভাষা

শুনি এই আকাশে বাতাসে,

তারি পুণ্য-অভিষেকে করি আজ স্নান।

সমস্ত জন্মের সত্য একখানি রত্নহাররূপে

দেখি ওই নীলিমার বুকে।।”

 

‘আরোগ্য’ কাব্যগ্রন্থটি ১৩৪৭ সালের ফাল্গুন মাসে প্রকাশিত হয়। শিরোনামহীন ৩৩ টি কবিতার সংকলন এটি। কবির মুখে মুখে বলা কবিতা। উৎসর্গ করা হয়েছে কল্যানীয় শ্রী সুরেন্দ্রনাথ কর কে। ১ নং কবিতার অংশ বিশেষ–

“ এ দ্যুলোক মধুময়, মধুময় পৃথিবীর ধূলি—

অন্তরে নিয়েছি আমি তুলি,

এই মহামন্ত্রখানি

চরিতার্থ জীবনের বাণী।

দিনে দিনে পেয়েছিনু সত্যের যা-কিছু উপহার

মধুরসে ক্ষয় নাই তার।

তাই এই মন্ত্রবাণী মৃত্যুর শেষের প্রান্তে বাজে—

সব ক্ষতি মিথ্যা করি অনন্তের আনন্দ বিরাজে।”

 

১১ নং কবিতার দুটি অংশ—

“ অলসসময়ধারা বেয়ে

মন চলে শূন্য-পানে চেয়ে।

সে মহাশূন্যের পথে ছায়া-আঁকা ছবি পড়ে চোখে।

কত কাল দলে দলে গেছে কত লোকে

সুদীর্ঘ অতীতে

জয়োদ্ধত প্রবল গতিতে।

এসেছে সাম্রাজ্যলোভি পাঠানের দল,

এসেছে মোগল;

বিজয়রথের চাকা

উড়ায়েছে ধূলিজাল, উড়িয়াছে বিজয়পতাকা।

শূন্যপথে চাই,

আজ তার কোনো চিহ্ন নাই।”

 

“ মাটির পৃথিবী-পানে আঁখি মেলি

দেখি সেথা কলকলরবে

বিপুল জনতা চলে

নানা পথে নানা দলে দলে

যুগ যুগান্তর হতে মানুষের নিত্য-প্রয়োজনে

জীবনে মরণে।

ওরা চিরকাল

টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল;

ওরা মাঠে মাঠে

বীজ বোনে, পাকা ধান কাটে—

ওরা কাজ করে

নগরে প্রান্তরে।”

২৮ নং কবিতা—

“ মিলের চুমকি গাঁথি ছন্দের পাড়ের মাঝে মাঝে

অকেজো অলস বেলা ভরে ওঠে সেলাইয়ের কাজে।

অর্থভরা কিছুই-না চোখে করে ওঠে ঝিল্‌মিল্‌

ছড়াটার ফাঁকে ফাঁকে মিল।

গাছে গাছে জোনাকির দল

করে ঝলমল;

সে নহে দীপের শিখা, রাত্রি খেলা করে আঁধারেতে

টুকরো আলোক গেঁথে গেঁথে।

মেঠো গাছে ছোট ছোট ফুলগুলি জাগে;

বাগান হয় না তাহে, রঙের ফুটকি ঘাসে লাগে।

মনে থাকে, কাজে লাগে, সৃষ্টিতে সে আছে শত শত,

মনে থাকবার নয়, সেও ছড়াছড়ি যায় কত।

ঝরনায় জল ঝ’রে উর্বরা করিতে চলে মাটি;

ফেনাগুলো ফুটে ওঠে, পরক্ষণে যায় ফাটি ফাটি।

কাজের সঙ্গেই খেলা গাঁথা—

ভার তাহে লঘু রয়, খুশি হন সৃষ্টির বিধাতা।”

 

‘জন্মদিনে’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম প্রকাশ ১৩৪৮ সালের পয়লা বৈশাখ। এতে শিরোনামহীন ২৯টি কবিতা আছে। ১০ নং কবিতা থেকে দুটি অংশ—

 

“ বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি!

দেশে দেশে কত-না নগর রাজধানী—

মানুষের কত কীর্তি, কত নদী গিরি সিন্ধু মরু,

কত-না অজানা জীব, কত-না অপরিচিত তরু

রয়ে গেল অগোচরে। বিশাল বিশ্বের আয়োজন;

মন মোর জুড়ে থাকে অতিক্ষুদ্র তারি এক কোণ।

সেই ক্ষোভে পড়ি গ্রন্থ ভ্রমণবৃত্তান্ত আছে যাহে

অক্ষয় উৎসাহে—

যেথা পাই চিত্রময়ী বর্ণনার বাণী

কুড়াইয়া আনি।

জ্ঞানের দীনতা এই আপনার মনে

পুরণ করিয়া লই যত পারি ভিক্ষালব্ধ ধনে।।”

 

“ মাঝে মাঝে গেছি আমি ও পাড়ার প্রাঙ্গনের ধারে;

ভিতরে প্রবেশ করি সে শক্তি ছিল না একেবারে।

জীবনে জীবন যোগ করা

না হলে, কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানের পসরা।

তাই আমি মেনে নিই সে নিন্দার কথা—

আমার সুরের অপূর্ণতা।

আমার কবিতা, জানি আমি,

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী।।

 

কৃষাণের জীবনের শরিক যে জন,

কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা করেছে অর্জন,

যে আছে মাটির কাছাকাছি,

সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি।

সাহিত্যের আনন্দের ভোজে

নিজে যা পারি না দিতে, নিত্য আমি থাকি তারি খোঁজে।”

২৪ নং কবিতা থেকে—

“ পোড়ো বাড়ি, শূন্য দালান—

বোবা স্মৃতির চাপা কাঁদন হুহু করে,

মরা-দিনের-কবর-দেওয়া ভিতের অন্ধকার

গুমরে ওঠে প্রেতের কন্ঠে সারা দুপুরবেলা।

মাঠে মাঠে শুকনো পাতার ঘূর্ণিপাকে

হাওয়ার হাঁপানি।

হঠাৎ হানে বৈশাখী তার বর্বরতা

ফাগুনদিনের যাবার পথে।

………………………

……………………………

 

মনের মধ্যে খোলা স্রোতের জোয়ার ফুলে ওঠে,

ভেসে চলে ফেনিয়ে-ওঠা অসংলগ্নতা।

রূপের বোঝাই ডিঙি নিয়ে চলল রূপকার

রাতের উজান স্রোত পেরিয়ে

হঠাৎ-মেলা ঘাটে।

ডাইনে বাঁয়ে সুর-বেসুরের দাঁড়ের ঝাপট চলে,

তাল দিয়ে যায় ভাসান-খেলা শিল্প সাধনার।”

 

কাব্যগ্রন্থ ‘শেষলেখা’ প্রকাশ পায় রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ১৩৪৮ সালের ভাদ্রমাসে। এর নামকরন রবীন্দ্রনাথের করা নয়। শিরোনামহীন ১৫ টি কবিতার সঙ্কলন এটি। মূলত শেষ সময়ের লেখা। তিন টি কবিতা তুলে ধরতে চাই।

১১নং কবিতা—

“ রূপ-নারানের কূলে

জেগে উঠিলাম;

জানিলাম এ জগৎ

স্বপ্ন নয়।

রক্তের অক্ষরে দেখিলাম

আপনার রূপ—

চিনিলাম আপনারে

আঘাতে আঘাতে

বেদনায় বেদনায়;

সত্য যে কঠিন,

কঠিনেরে ভালোবাসিলাম—

সে কখনো করে না বঞ্চনা।

আমৃত্যুর দুঃখের তপস্যা এ জীবন—

সত্যের দারুন মূল্য লাভ করিবারে,

মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ ক’রে দিতে।”

১৩ নং কবিতা—

“প্রথম দিনের সূর্য

প্রশ্ন করেছিল

সত্তার নূতন আবির্ভাবে—

কে তুমি?

মেলে নি উত্তর।

 

বৎসর বৎসর চলে গেল।

দিবসের শেষ সূর্য

শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল

পশ্চিমসাগরতীরে

নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়—

কে তুমি?

পেল না উত্তর।”

১৫ নং কবিতা—

“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি

বিচিত্র ছলনাজালে

হে ছলনাময়ী!

মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুন হাতে

সরল জীবনে।

এই প্রবঞ্চনা দিয়ে মহত্ত্বেরে করেছ চিহ্নিত;

তার তরে রাখ নি গোপন রাত্রি।

তোমার জ্যোতিষ্ক তারে

যে পথ দেখায়

সে যে তার অন্তরের পথ,

সে যে চিরস্বচ্ছ,

সহজ বিশ্বাসে সে যে

করে তারে চিরসমুজ্জ্বল।

বাহিরে কুটিল হোক, অন্তরে সে ঋজু

এই নিয়ে তাহার গৌরব।

লোকে তারে বলে বিড়ম্বিত।

সত্যেরে সে পায়

আপন আলোক-ধৌত অন্তরে অন্তরে।

কিছুতে পারে না তারে প্রবঞ্চিতে,

শেষ পুরস্কার নিয়ে যায় সে যে

আপন ভান্ডারে।

অনায়াসে যে পেরছে ছলনা সহিতে

সে পায় তোমার হাতে

শান্তির অক্ষয় অধিকার।”

দীর্ঘ এই আলোচনা আর কবিতার উদ্ধৃতির মাধ্যমে বিশাল রবীন্দ্র-কাব্য-জগৎ থেকে আমরা বেছে নিলাম সামান্য কিছু কবিতা এবং দাবী করলাম এ সমস্ত কবিতার প্রাসঙ্গিকতা আরও কিছুদিন থাকবে। বলার বিষয় এটাও রবীন্দ্রনাথের সুবিশাল কাব্য-সম্ভারের তুলনায় বাছাই করা কবিতার সংখ্যা খুবই কম। হয়ত আরও কিছু পড়ে থাকতে পারে। কিন্তু আমরা এগুলিকেই বিবেচ্য মনে করেছি। ভিন্ন মত থাকতেই পারে। এখন এই কবিতাগুলি সঠিক আরও কতদিন প্রাসঙ্গিক থাকবে বা নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রহনযোগ্য হবে তা সুনির্দিষ্ট করে বলা কঠিন। তবে এটুকু আশা করা যায় এসব কবিতার আলোড়ন আরও কিছুদিন চলবে। যদিও কবি রবীন্দ্রনাথ এরই মধ্যে অনেকটা ফিঁকে হয়ে এসেছেন। তবু আমরা আশাবাদী। যে গতিতে বাংলা কবিতার পট পরিবর্তন হয়ে চলেছে, যে প্রকৃতিতে তার ভাষা চিন্তন আঙ্গিকের পরিবর্তন ঘটে চলেছে, তার মধ্যে এসব কবিতা আর খুব বেশি দিন বেঁচে থাকবে তা বলা চলে না বলেই মনে করি। তবু যেহেতু কবি নিজেই বাংলা কবিতার ধার ভার ভাষা ভাব আঙ্গিকের ব্যাপক পরিবর্তন করেছেন সমসাময়িক কালে তাই তার ঢেউ স্তিমিত হইয়ে এলেও একদম নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নি। কিন্তু ঢেউ স্তিমিত থেকে স্তিমিততর হয়ে আসবে তা বলাই বাহুল্য।

You Might Also Like