প্রধানমন্ত্রীর বেহেশতে যাওয়া নিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রীর বক্তব্যে সমালোচনার ঝড়

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেহেশতে যাওয়ার হক আছে বলে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সম্প্রতি দেয়া এক বক্তব্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়। অনেকেই বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে খুশি করার জন্যই এমন বক্তব্য দিয়েছেন। তবে জনগন এভাবে প্রতিক্রয়া দেখাবে তা হয়তো পরিকল্পনামন্ত্রী আব্দুল মান্নান ভাবেন নি। কেউবা বলছেন, এই যদি হয় দেশের পরিকল্পনামন্ত্রীর জ্ঞানের পরিধি তবে, দেশ রসাতলে যেতে বেশি সময় লাগবে না।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হওয়ার পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন বিদায়ী সরকারের অর্থ প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান। সরকারের সাবেক এই আমলা ১৯৪৬ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

গ্রামের স্কুলে তার প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে সারগোদায় অবস্থিত পাকিস্তান এয়ারফোর্স স্কুল থেকে ও লেভেলে উত্তীর্ণ হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রির পর ১৯৭৪ সালে তদানীন্তন সিএসপি ক্যাডারে যোগ দেন এবং জেলা প্রশাসক কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।

আব্দুল মান্নান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক এবং এনজিও ব্যুরোতে মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি জেনেভায় বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের ইকোনমিক মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সর্বশেষ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ২০০৩ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেন নতুন এই পরিকল্পনামন্ত্রী। আব্দুল মান্নান ২০০৫ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দিলে তিন বছর পর দলটি থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

নবম জাতীয় সংসদে তিনি পাবলিক অ্যাকাউন্টস সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন। পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে ছিলেন তিনি। ২০১০ এবং ২০১৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। তার স্ত্রী জুলেখা মান্নান ঢাকা উইমেন্স কলেজের শিক্ষিকা ছিলেন। এ দম্পতির চিকিৎসক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাস জীবন যাপন করছেন। আর ছেলে সাদাত যুক্তরাজ্যের বার্কলেইস ক্যাপিটাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং লন্ডনে বসবাস করছেন।

ডেভেলপমেন্ট লিটারেচার নিয়ে আগ্রহ রয়েছে আব্দুল মান্নানের। এজন্যই গ্রামীণ জনগণের কল্যাণে কাজ করছেন তিনি। দ্বিতীয়বারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

জানা গেছে, সোমবার (১৮ নভেম্বর) বিকেলে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘উন্নয়ন মেলা-২০১৯’ এর সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, দেশের মানুষ পেট ভরে তিনবেলা ভাত খাচ্ছে। প্রায় ৯৫-৯৬ ভাগ ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। এ কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এত পুণ্য অর্জন করেছেন যে, তার বেহেস্তে যাওয়ার অধিকার আছে, হক আছে।

তিনি বলেন, ‘এখন আমরা ভালো খাই, ভালো পরি। আমরা তিনবেলা ভাত খাই। তিনবেলা পেট ভরে ভাত খাচ্ছে, এই বুভুক্ষু জাতির ইতিহাসে তেমন কোনো উদাহরণ ছিল না। সেই জাতির প্রায় প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলছে। এ দেশের ৯৫-৯৬ ভাগ ঘরে বিদ্যুৎ নিয়ে গেছি। এর চেয়ে বড় উন্নয়ন মেলা আর কি হতে পারে। এই একটি কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন পরিমাণ পুণ্য অর্জন করেছেন যে, তার বেহেস্তে যাওয়ার অধিকার আছে। হক আছে।’

প্রধানমন্ত্রী গত ১০ বছরে একনেক সভায় (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) এক মিনিট দেরি করে আসেননি বলেও জানান পরিকল্পনামন্ত্রী। কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্য নয় বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘আমরা হস্তক্ষেপে বিশ্বাস করি না। প্রধানমন্ত্রী চান, সব সংস্থা যেন তাদের নিজস্ব আইন-কানুন দ্বারা পরিচালিত হয়। যদিও ব্যাংকগুলো নিয়ে আমরা শঙ্কিত। নানা ধরনের বকাঝকার মধ্যে বাস করি। তারপরও চাই ব্যাংকগুলো যেন তাদের নিজস্ব বোর্ড, নিজস্ব চেয়ার, নিজস্ব বিধি-বিধান অনুযায়ী চালুক। সকাল, বিকাল হস্তক্ষেপ করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। প্রধানমন্ত্রীর মোটেও উদ্দেশ্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেদিন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রী একনেকে আসতে পারবেন না, তার আগের দিন জানিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু দেরি করেননি। এটা বলার দরকার আছে এ দেশে। কারণ প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথি, উচ্চ অতিথি সভায় দেরি করে আসেন। এ থেকে আমাদের শেখার আছে।’

এই জাতিকে হীনমন্যতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বানও জানান পরিকল্পনামন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘অনেক অনুষ্ঠানে যাই, যেখানে ঘরভর্তি বাঙালি। একটি লোকও নেই যে, অন্য কোনো ভাষা জানেন। কিন্তু সেখানে সব কিছু ইংরেজিতে উপস্থাপন করা হয়। আবার মুখে বলা হয় বাংলা, কিন্তু কাগজ করা হয় ইংরেজিতে। পুরো সেশনটাই ইংরেজিতে হয়, এতে যিনি বলছেন তারও কষ্ট হয়, আবার যিনি শুনছেন, তারও কষ্ট হয়। তারপরও এ কাজটা আমরা করে যাচ্ছি। এর কারণ আমরা নিজেরা নিজেদের সম্মান দিচ্ছি না।’

এম এ মান্নান আরো বলেন, ‘আমি ১০ বছর ধরে দেখে আসছি, প্রধানমন্ত্রী কখনোই কোনো সভায় এক মিনিটও দেরি করে আসনেনি। তিনি নির্ধারিত সময়ের এক মিনিট আগে হলেও উপস্থিত হন। বরং আমরাই অনেক সময় দুই-এক মিনিট দেরি করে উপস্থিত হই। প্রতিটি কাজকে প্রধানমন্ত্রী এভাবেই গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।’

এ সময় পরিকল্পনামন্ত্রী দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, এক সময় বাংলাদেশকে বলা হতো তলাবিহীন ঝুঁড়ি। অথচ এখন বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল হিসেবে পরিচিত।

অনুষ্ঠানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক,পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার, পিকেএসএফের চেয়ারম্যান ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।

পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এ উন্নয়ন মেলার আয়োজন করে।

 

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের পুরো বক্তব্য শুনতে ক্লিক করুন

 

You Might Also Like