প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একশ বছর অধরা বিশ্ব শান্তি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েছিল একশ’ বছর আগে, জুলাই ২৮, ১৯১৪ সালে। আর শেষ হয়েছিল নভেম্বর ১১, ১৯১৮ সালে। বর্তমান ইউরোপের বহু দেশ ওই যুদ্ধের দুই পক্ষে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের এক পর্যায়ে রাশিয়া ছাড়া ইউরোপের বাইরের দেশও জড়িয়ে পড়ে। এমনকি ব্রিটিশ-ভারতের সামরিক বাহিনীও এ যুদ্ধে ব্যাপকভাবে অংশ নিয়েছিল। একশ’ বছর পূর্তিকে উপলক্ষ করে ইউরোপে আনুষ্ঠানিকভাবে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে উদযাপন। এ যুদ্ধের প্রেক্ষাপট যে দুটি দেশকে ঘিরে তার একটি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আমি জুন ২৮, ২০১৪ সালে উপস্থিত ছিলাম। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হোতা হিসেবে ইতিহাসে যে সাম্রাজ্যের নাম লেখা রয়েছে সেটা ছিল অস্ট্রো-হাঙ্গেরি। বর্তমানে অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি পৃথক পৃথক রাষ্ট্র।

জুন ১৮, ২০১৪ সালের সকালে ভিয়েনায় আমি টেলিভিশনে দেখছিলাম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূচনায় অস্ট্রিয়ার পূর্বতন সাম্রাজ্যের ভূমিকার বিবরণ। ভাষাগত কারণে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারিনি। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম এ তারিখটির মাহাত্ম। ওই তারিখে অর্থাৎ জুন ২৮, ১৯১৪ সালে বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোর এক হাসপাতাল উদ্বোধনের জন্য আগত অস্ট্রো-হাঙ্গেরির (অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি) ভাবী রাজা আর্চডিউক ফ্র্যাঞ্জ ফারডিন্যান্ড ও তার স্ত্রী সোফিয়াকে গ্যাভরিলো প্রিনসিপ নামক এক সার্ব তরুণ রাস্তার এক কোণ থেকে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করেন। গ্যাভরিলো প্রিনসিপ ছিলেন ওই সময়কার সার্ব জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘ম্লাডা বসনা’র সদস্য।

ওই জাতীয়তাবাদীদের উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন শক্তির দখলে থাকা, বিশেষ করে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও ওসমানীয় সাম্রাজ্যের দখলে থাকা বলকান রাজ্যগুলোকে একত্র করে একটি সার্বরাষ্ট্র গঠন করা- যা আমরা ইউগোস্লাভিয়া নামে জানতাম। এখন অবশ্য একক ইউগোস্লাভিয়া নেই। প্রিনসিপের আক্রমণ ও হত্যার কারণ ছিল দখলদার সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদীদের উত্থানের সূত্রপাত ঘটানো। বসনিয়া ছিল সার্বিয়ার অন্তর্গত এক রাজ্য। ওই ঘটনার পর জুলাই মাসে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সার্বিয়াকে ১০টি শর্ত দিয়ে আলটিমেটাম প্রদান করে। সার্বিয়া আলটিমেটামের কিছু কিছু পূরণ করলেও অস্ট্রো-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করে। অপরদিকে রাজকীয় রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষ অবলম্বন করে অস্ট্রো-হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। অস্ট্রো-হাঙ্গেরির পক্ষে ক্রমেই এ যুদ্ধে যেসব অঞ্চল জড়িয়ে পড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে মুখ্য ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্য, কারণ বলকান অঞ্চলে ওসমানীয়দের অবস্থান এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরির প্রতিবেশী দেশ ছিল জার্মানি। জার্মানি এ যুদ্ধে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কারণ ১৮৮২ সালে জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি ও ইতালির প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছিল। এর শর্ত ছিল, এ তিনটি দেশের যে কোনো একটি আক্রান্ত হলে অথবা যুদ্ধে সাহায্য চাইলে অপর সদস্যরা সামরিক সহযোগিতা করবে। এ চুক্তিই ইতিহাসে ‘ট্রিপল এলায়েন্স’ নামে খ্যাত।
জার্মানি তথা প্রাশিয়ার রাজা কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়ামের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং আগ্রাসী মনোভাব ইউরোপকে আসন্ন যুদ্ধের আশংকায় শংকিত করে তুলেছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই ট্রিপল এলায়েন্সের বিপক্ষে ১৯০৭ সালে ট্রিপল এনটেন্ট (ঞৎরঢ়ষব ঊহঃবহঃব) গড়ে তোলে রাজকীয় রাশিয়া, ফরাসি তৃতীয় রিপাবলিক এবং গ্রেট ব্রিটেন- আয়ারল্যান্ডসহ। ইতিহাসের ঘটনাবলি সাক্ষ্য দেয়, জুন ২৮, ১৯১৪ সালের ঘটনার পর যুদ্ধবাজ জার্মান নেতার পরোক্ষ উস্কানিতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্য সার্বদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। আগস্ট ১, ১৯১৪ সালে জার্মানি ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে গোপন সামরিক চুক্তি করে। অপরদিকে ইতালি নিরপেক্ষ থাকার ঘোষণা দেয়। অবশেষে জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরির পক্ষে আগস্ট ২, ১৯১৪ সালে লুক্সেমবার্গ দখলের মধ্য দিয়ে ইউরোপ যুদ্ধ ঘোষণা করে। জার্মানি সেখানেই থেমে থাকেনি। আগস্ট ৩, ১৯১৪ সালে জার্মানি ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে পরদিন আগস্ট ৪ ফ্রান্সকে কোণঠাসা করতে বেলজিয়াম আক্রমণ করে। ওই দিনই গ্রেট ব্রিটেন (যুক্তরাজ্য) জার্মানির বিরুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্র এ যুদ্ধ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে নিরপেক্ষতা ঘোষণা করে। ক্রমেই সমগ্র ইউরোপ এবং পরে জাপানের সঙ্গে ট্রিপল এনটেন্টে যোগ দেয়ার সুবাদে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। দুই জোট ট্রিপল এনটেন্টে মিত্রবাহিনী এবং ট্রিপল এলায়েন্স মধ্যশক্তি হিসেবে দুই বলয়ে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ক্রমেই ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার জাপানসহ ১৮টি দেশ ও ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া মিত্র শক্তিতে বিভিন্ন সময়ে যোগ দেয়। অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে ১৯১৭ সালে মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে। অপরদিকে মধ্যশক্তি জার্মানির তৎকালীন পাঁচটি রাজ্য, নয়টি রাষ্ট্র ও রাজ্য এবং আফ্রিকার তিনটি রাষ্ট্র যুক্ত হয়। তবে জার্মানি, অস্ট্রো-হাঙ্গেরি আর ওসমানীয় সাম্রাজ্য ছিল প্রধান শক্তি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম তিন বছর কোনো পক্ষই তেমন সুবিধা করতে পারেনি, যদিও জার্মানি ইউরোপের ছোট দেশগুলোকে দখল করেছিল। তবে দু’পক্ষের কোনো শক্তিই চূড়ান্ত বিজয়ের পথে ছিল না। কারণ ট্রেনওয়ারফেয়ার বা খন্দকের যুদ্ধ কৌশলে উভয় পক্ষই যে যার অবস্থানে স্থিত থাকলে জার্মানি আগ বাড়িয়ে আক্রমণ করাতে বেলজিয়ামের মধ্য দিয়ে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চল দখল করে প্যারিসের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছিল।
এ যুদ্ধের মধ্যেই কয়েকটি ঘটনা একদিকে যেমন রণকৌশল পাল্টিয়ে দিয়েছিল, তেমনি যুদ্ধের দ্রুত পরিসমাপ্তি ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল সেপ্টেম্বর ১৯১৬ সালে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের সোম নামক জায়গায় ব্রিটিশ বাহিনীর আক্রমণে প্রথমবারের মতো ট্যাংকের ব্যবহার। তবে ওই ট্যাংকের গতি এতই মন্থর ছিল যে, যুদ্ধ শেষে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্য দিয়ে মাত্র পাঁচ মাইল অগ্রসর হতে পেরেছিল। দ্বিতীয় বড় বিষয় যেটি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল তা ছিল এপ্রিল, ১৯১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ভঙ্গ করে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।
অপরদিকে যুদ্ধ চলাকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে পরিবর্তন এসেছিল তা পরবর্তী বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এর প্রথম ঘটনা ছিল মার্চ ১৫, ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জার দ্বিতীয় নিকোলাস সিংহাসন ত্যাগ করেন। ওই সময়ে রাশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যার জের পড়েছিল রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর ওপর। এর জের ধরেই ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লব হয়। ১৯১৭ সালেই গ্রিসের রাজা প্রথম কনসটেনটাইন সিংহাসন ত্যাগ করেন। অপরদিকে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের ভাঙন ধরে। জুলাই ৬, ১৯১৭ সালে লওরেন্স অব এরেবিয়া টিই লওরেন্স, আরব বিপ্লবের হোতা বর্তমান হেজাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর আকাবা দখল করেন। ত্বরান্বিত হয় আরব বিপ্লব। এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ যে পরিবর্তনের সূচনা করেছে, তার জের আজও মধ্যপ্রাচ্য তথা মুসলিম বিশ্বের ওপর পড়ছে। যেমন নভেম্বর ২, ১৯১৭ সালের বেলফুর ঘোষণা, যার মাধ্যমে আরবের প্যালেস্টাইন ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পথ পরিষ্কার হয়। ব্রিটিশ সরকার মধ্যপ্রাচ্যে অন্যান্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় অনুঘটকের ভূমিকায় থাকলেও প্যালেস্টাইনকে ম্যান্ডেটে রেখেছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ভারতের বিশাল মানবসম্পদ ব্যবহার করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ রাজ। ওই সময়ে ভারতে স্বরাজ আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছিল। যুদ্ধে ভারতীয় জনগণের এবং ব্রিটিশ-ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণ ছিল শর্তযুক্ত। ব্রিটিশরাজ আন্দোলনরত ভারতীয় রাজনীতিকদের স্বায়ত্তশাসন বা স্বরাজ দেয়ার অঙ্গীকার দিয়েই ওই যুদ্ধে ভারতীয় সামরিক সদস্যদের অন্তর্ভুক্তিতে বাধা দেয়নি। এরই জেরে প্রায় ১০ লাখ ভারতীয় সামরিক সদস্য মধ্যপ্রাচ্য এবং ভূমধ্যসাগরীয় যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ৬২ হাজার সৈনিক মৃত্যুবরণ করেন এবং ৬৭ হাজার সৈনিক আহত হয়েছিলেন। ওসমানীয়দের বিরুদ্ধে গ্যানিপলিতে এবং তৎকালীন মেসোপটোমিয়াতে প্রায় ৭০ হাজার সদস্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। যারা ব্রিটিশ-ভারতীয়দের এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তৎকালীন রাজনীতিকদের দ্বিধাবিভক্ত করেছিল। ভারতীয় মুসলমানরা ওসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তাদের সৈনিকের অংশগ্রহণ মেনে নেয়নি। ওই সময়ে ওসমানিয়া সাম্রাজ্য রক্ষায় ভারতে জন্ম নিয়েছিল খেলাফত আন্দোলন। এ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন মহাত্মা গান্ধী। আন্দোলনটি ছিল ওসমানিয়া সাম্রাজ্য ও খেলাফতকে রক্ষার এবং যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির। কিন্তু ব্রিটিশরাজ এসব আন্দোলনে কর্ণপাত তো করেইনি, এমনকি যুদ্ধের পর স্বরাজ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপও নেইনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ণ স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়, যার ধারাবাহিকতায় অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভারত ছাড় বা ‘কুইট ইন্ডিয়া’ আন্দোলন শুরু করেছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন গান্ধী। (বাকি অংশ আগামীকাল)

এম সাখাওয়াত হোসেন : সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা

You Might Also Like