Uncategorized

‘প্যানিক বাইয়িং’য়ের শিকার বাংলাদেশের মানুষ

বাজার

করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাত্রা বাড়তে থাকায় অস্থিরতা দেখা দিতে শুরু করেছে বাজার। ‘প্যানিক বাইয়িং’য়ের শিকার হয়ে ক্রেতাদের অনেককেও বাড়তি পণ্য কিনতে ছুটতে দেখা গেছে বাজারে। তবে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্বে থাকা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

আবার জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরও তাদের সারাবছরের কার্যক্রমের মতোই গতানুগতিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। অভিযান চালিয়ে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা আর বন্ধ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাদের কার্যক্রম। এ পরিস্থিতিতে সরকারি কিছু প্রচার-প্রচারণাও শান্ত করতে পারছে না ক্রেতাদের।

এর আগে, বুধবার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দেশে পর্যাপ্ত খাদ্যপণ্যের মজুত রয়েছে। চাহিদার অতিরিক্ত পণ্য না কিনতে আহ্বান জানানো হয় ক্রেতাদের। সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার জানান, দেশে চাল ও গমের মজুত প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রয়েছে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে কেউ দাম বাড়াতে চাইলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আর বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার আমদানি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি। তাই আমদানি করা পণ্যের সংকট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই মন্ত্রীর বক্তব্য তেমন প্রভাব রাখেনি বাজারে বা ক্রেতাদের ওপরে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের কার্যক্রম কিছুটা চোখে পড়ে কেবল রমজান মাসে। করোনাভাইরাস আতঙ্কে গত দু’দিন ধরে বাজারে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়লেও এই সেলকে সক্রিয় দেখা যায়নি। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কার্যক্রমও জোরালো নয়। তাই পণ্য কিনতে ক্রয়ে বাজার ও দোকানগুলোতে বৃহস্পতিবারও (১৯ মার্চ) ক্রেতাদের ভিড় দেখা গেছে। তেমনি পণ্যের দামও বেশি দেখা গেছে।

এ পরিস্থিতিতে সরকার কী করছে— জানতে বাণিজ্য সচিব জাফর উদ্দীনকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, আমরা এরই মধ্যে গুলশান-১ ও গুলশান-২ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছি। শিশু খাদ্যের দাম বেশি রাখায় গুলশান-১ এলাকায় এস এ ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছি। হ্যান্ড স্যানিটাইজারের দাম বেশি রাখায় দু’টি ফার্মেসিকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করেছি। মূল্য তালিকা না থাকায় বেশি কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। এবং কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

তবে এসব উদ্যোগ যে বাজারে প্রভাব রাখছে না, তার প্রমাণ মিললো বৃহস্পতিবার বাজারে গিয়ে। সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারে কমবেশি প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। খুচরা বাজারে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে অন্তত ৫ টাকা। আলুর দামও বেড়েছে একই পরিমাণে। সপ্তাহখানেক আগে কমতে থাকা পেঁয়াজ-রসুন-আদার দামও ফের বাড়তির দিকে। নতুন করে বেড়েছে মাছ-মাংস ও ডিমের দাম। অর্থাৎ নিত্যপ্রয়োজনীয় ও সহজে নষ্ট হয় না— এমন প্রায় সব পণ্যের দামই বাজারে বেড়েছে।

রাজধানীর মহাখালীর বউবাজারে দেখা গেছে, মিনিকেট চাল ৬৫ টাকা, আটাশ চাল ৪৫ টাকা, নাজির চাল ৬৫ টাকা ও স্বর্ণা চাল ৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারের এক দোকানি আলম বলেন, অন্য সময়ের চেয়ে বস্তায় চালের দাম বেড়েছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এখন আমাদের বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি দামে। কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত চালের দাম বেড়েছে বলে জানান এই বিক্রেতা।

কারওয়ানবাজার কিচেন মার্কেটের মায়ের দোয়া স্টোরের কর্মচারী বাবলু বলেন, কেজিতে ৩ থেকে ৫ টাকা করে বেড়েছ চালের দাম। মিনিকেট এখন ৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের জনতা রাইস মিলসহ একাধিক চালের আড়তে দেখা গেছে, মিনিকেট প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ২৬০০ টাকা, আটাই বিক্রি হচ্ছে ২১০০ টাকা ও মানভেদে নাজির ২৩০০ থেকে ৩১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মেসার্স হাজী ইসমাইল অ্যান্ড সন্সের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, বস্তায় চালের দাম বেড়েছে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। গত দুই দিন খুব বিক্রি ছিল। আজ কিছুটা কম। তবে অন্য সময়ের চেয়ে বিক্রি তুলনামূলকভাবে বেশি।

এদিকে, কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজ এখন ৩৮ থেকে ৪২ টাকা, ভারতীয় ৪৮ টাকা ও হলেন ৪৩ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। তবে কারওয়ান বাজারেই কোনো কোনো দোকানে দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে। বাজারে পেঁয়াজ কিনতেও ক্রেতাদের হুমড়ি খেয়ে পড়তে দেখা গেছে।

এই বাজারের আড়তদার শামীম বলেন, পাইকারি বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজি ৩৫ টাকায় নেমে এসেছিল। আজ তা ৪০ থেকে ৪২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। আর সকালেই দোকানের সব পেঁয়াজ শেষ। এদিকে, খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হতে দেখা গেছে। বাজারে যা গতকালও ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

পাইকারি বাজারে দেশি রসুনের দাম ৬০ টাকা কেজিতে নেমে এসেছিল। বুধবার (১৮ মার্চ) তা বিক্রি হয়েছে ৯০ টাকায়। আর বৃহস্পতিবার এর দাম ছিল প্রতি কেজি ১০০ টাকা। আর পাইকারি বাজারে চীনা রসুন ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে, যা খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকায়। একইভাবে আদা বিক্রি হচ্ছে পাইকারি বাজারে ১৮০ টাকা ও খুচরা বাজারে ২০০ টাকা কেজিতে। আদার দামও প্রতি কেজিতে বেড়েছে অন্তত ২০ টাকা।

বাজারে প্রতি হালি ডিমের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। এখন প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। মহাখলীর বউবাজারের এক বিক্রেতা বলেন, গতকালও ৩০ টাকা হালিতে ডিম বিক্রি করেছি। কিন্তু আজ বিক্রি করতে হচ্ছে ৪০ টাকায়। তবে কারওয়ান বাজারের এক বিক্রেতা জানান, এখন প্রতি হালি ডিম ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, গতকাল যা বিক্রি হয়েছে ৩২ টাকায়।

বাজারে বেড়েছে সব ধরনের মাংসের দাম। কারওয়ান বাজারে গরুর মাংস ৫৭০ ও খাশির মাংস ৯০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হতে দেখা গেছে। আর প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৩০ টাকা, সাদা কক ২২০ টাকা, পাকিস্তানি ২৫০ টাকা ও দেশি মুরগি ৪৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা জানালেন, কেজিতে মুরগির দাম বেড়েছে ১৫ থেকে ৩০ টাকা।

বিক্রেতারা বলছেন, গত দু’দিনে বাজারে অন্য সময়ের চেয়ে বিক্রি বেড়েছে কয়েকগুণ। মহাখালীর বউবাজারের দোকানি আলম বলেন, অন্য সময় প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেচাকেনা হয়। গতকাল (বুধবার) বিক্রি হয়েছে ৭০ হাজার টাকা। আজও (বৃহস্পতিবার) সকাল থেকে বিক্রি ভালোই।

কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের মায়ের দোয়া স্টোরের কর্মচারী বাবলু বলেন, একজনের চিনি লাগবে এক কেজি, তিনি কিনছেন তিন কেজি। চাল লাগবে এক বস্তা, চেয়ে বসছে চার বস্তা। এখন দোকানে না থাকলে আমরা বিক্রি করব কোথা থেকে? অথচ এসব জিনিসের যে পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, ক্রেতারা তা ভুলে যাচ্ছেন। ফলে গত দুই দিনে অন্য সময়ের চেয়ে দুই-তিন গুণ বেশি বিক্রি হয়েছে।

এদিকে, নিত্য প্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়লেও সবজির বাজার মোটামুটি স্থির রয়েছে। বিভিন্ন দোকানে দেখা গেছে, সিম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বেগুন ৫০ টাকা, বটবটি ৬০ টাকা, চিচিঙ্গা ৫০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা, কড়লা ৬০ থেকে ৮০ টাকা, শশা ৩০ টাকা, গাজর ৩০ টাকা, কাঁচামরিচ ৮০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা বলছেন, অন্য সবজির দাম প্রায় স্থির রয়েছে। তবে করোনা আতঙ্কে একদিনের ব্যবধানেই আলুর দাম কেজিতে ৫ টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।