`পিয়াস করিম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করতেন’

সদ্যপ্রয়াত ড. পিয়াস করিম সম্পর্কে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এমপি বলেছেন, তার বাবাকে জোর করে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়।

রোববার সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের এ সব কথা বলেন আইনমন্ত্রী।

এর আগে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার প্রতিনিধি দল নিয়ে সচিবালয়ে মন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেন।

স্মারকলিপিটি নিয়ে আলোচনাকালে সাংবাদিকদের আইনমন্ত্রী বলেন, পিয়াস করিমের বাবাকে জোর করে শান্তি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল বলে আমি বলেছি।

আইনমন্ত্রী দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় পিয়াস করিম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিফলেট বিতরণ করতেন। তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর। যুদ্ধ শেষ হওয়ার দুই মাস আগে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে আটক করে। তার বাবা এম এ করিম তাকে ছাড়ানো জন্য মুচলেকা দিতে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে যান। ওই সময় তাকে জোর করে শান্তি কমিটির সভাপতি বানানো হয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, পিয়াস করিমের বাবা আওয়ামী লীগের জেলা ফাউন্ডার ছিলেন ।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পিয়াস করিম ১৩ অক্টোবর ভোরে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মারা যান। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে পরিবারের সদস্যরা রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে খবর দেন। অ্যাম্বুলেন্সে করে ধানমন্ডির বাসা থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পর সকাল সাড়ে পাঁচটার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন দায়িত্বরত চিকিৎসক।

ওই সময় জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. মল্লিকা সরকার জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই পিয়াস করিমের মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মনে হয়েছে, তার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল।

ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিকস অ্যান্ড সোস্যাল সায়েন্সেসের অধ্যাপক পিয়াস করিমের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। বিভিন্ন চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি সমালোচিত হন।

এদিকে জানা গেছে, দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার ঢাকার শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরের আন্দোলনকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দেওয়া ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. পিয়াস করিমের বাবা ও নানা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী।

তারা ছিলেন কুমিল্লা জেলা শান্তি কমিটির নেতা। শুধু তাই-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাবা অ্যাডভোকেট এম এ করিম ও নানা জহিরুল হক লিল মিয়ার বাড়িতে গ্রেনেড চার্জ করেছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধের পর ড. পিয়াস করিমের বাবা অ্যাডভোকেট এম কে করিমকে দালালির অপরাধে দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তিনি অনেকদিন কুমিল্লা কারাগারে বন্দিও ছিলেন।

ড. পিয়াস করিমের বাবা কুমিল্লায় মুসলিম লীগের রাজনীতি করতেন। তাদের গ্রামের বাড়ি হোমনার রামপুরে। পিয়াস করিমের বাবা এম এ করিম বিয়ে করেন আরেক মুসলিম লীগ নেতা জহিরুল হক লিল মিয়ার মেয়ে বাচ্চুকে।

জহিরুল হক লিল মিয়া এর আগে আওয়ামী মুসলিম লীগের জেলা সভাপতি ছিলেন। ভাষা আন্দোলনে তিনি অংশ নেন। ছিলেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় জহিরুল হক লিল মিয়া মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এ কারণে মুক্তিযোদ্ধারা কুমিল্লার জজকোর্টের উত্তর পাশে জহিরুল হক লিল মিয়ার বাড়ি এবং জজকোর্ট রোডের এমএ করিমের বাড়িতে গ্রেনেড চার্জ করেছিলেন। আর এ গ্রেনেড চার্জে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা জামাল কবির বীরপ্রতীক, বাহার উদ্দিন রেজা বীরপ্রতীক ও মুক্তিযোদ্ধা খোকন।

বাহার উদ্দিন রেজা বীরপ্রতীকের কাছ থেকে জানা গেছে, মেলাঘর থেকে কমান্ডার হায়দারের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা জহিরুল হক লিল মিয়া এবং এমএ করিমের বাসায় গ্রেনেড হামলা করা হয়। তাদের বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনীর যাতায়াত ছিল।

তিনি জানান, কী পর্যায়ে গেলে একজন কমান্ডার তাদের বাড়িতে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন তা বুঝে নিতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হলে দালাল আইনে গ্রেফতার হন ড. পিয়াস করিমের বাবা অ্যাডভোকেট এমএ করিম। তিনি অনেকদিন কুমিল্লা কারাগারে বন্দি ছিলেন।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পর বাবাকে বাঁচাতে পিয়াস করিম কুমিল্লা জেলা ছাত্রলীগে নাম লেখান। যদিও জেলা ছাত্রলীগে তার কোনো পদবি ছিল না। সে সময়ের জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট রুস্তম আলী তার ছাত্রলীগে যোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

পিয়াস করিম কুমিল্লা মডার্ন স্কুল, কুমিল্লা জিলা স্কুল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনার পর আমেরিকায় চলে যান।

স্বাধীনবাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট রুস্তম আলীর কাছ থেকে জানা গেছে, পিয়াস করিম তার বাবাকে বাঁচাতে ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সঙ্গে থাকেননি।

তিনি জানান, পিয়াস করিম নকশালের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ড. পিয়াস করিম শুক্রবার রাতে এক টকশোতে শাহবাগের আন্দোলনকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দেন। এ খবর শাহবাগে ছড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তাকে ‘রাজাকারের দালাল’ আখ্যা দিয়ে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়।

‘পিয়াস করিমের লাশ নিয়ে রাজনীতি’ শীর্ষক এক নিবন্ধে জাহিদ নেওয়াজ খান বলেন, পিয়াস করিমের বাবা অ্যাডভোকেট এম এ করিম প্রাদেশিক পরিষদে প্রথম বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

একাত্তরের এপ্রিলে ৮৬ বছর বয়সী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়ার পর প্রথমেই যে তার দুই হাত এবং পরে হাঁটু ভেঙে দেওয়া হয়। হাত এবং হাঁটু ভাঙা অবস্থায় পরের দুই মাস পর মারা যান।

পিয়াস করিম যে শুধু মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনার জয়গানই গেয়ে গেছেন, এমন নয়; যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির এ রাষ্ট্র কাঠামোর বিরুদ্ধে যে আধাঘোষিত যুদ্ধ শুরু করেছে, সেটাকে তার প্রতিটি শব্দ এবং বাক্যে সমর্থন জানিয়েছেন। তারা যখন এমনকি শহীদ মিনারও পুড়িয়ে দিয়েছে, সেটাকেও সমর্থন করে গেছেন।

একাত্তরে কামানের গোলা দিয়ে শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দেওয়া, হত্যা-গণহত্যা-ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ আর ওই অপরাধের বিচার শুরু হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে রাস্তায় নাশকতা এবং টেলিভিশনের পর্দায় বক্তৃতা একই চেতনা থেকে উৎসারিত।

You Might Also Like