পাহাড়ে লুকিয়ে বৃহত্তম পিরামিড !

তিনি আসেন হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে। স্থানীয় যোদ্ধাদের সঙ্গে মাসের পর মাস লড়াই, অনাহার ও অজানা রোগে কাহিল হারনান করটেজের স্প্যানিশ বাহিনী। তারপরও পিছিয়ে যাননি তিনি। নিশ্চিত করে নিয়েছেন জয়। যেদিন তারা চলুলা শহরে ঢোকেন, সেদিন বড় ধরনের প্রতিরোধ হবে- এমন আশঙ্কাই করেছিলেন করটেজ।

কিন্তু কিছুই হয়নি। স্থানীয় অধিবাসীরা মনে করেছিল, তাদের এই পবিত্র নগরীর ওপর দেবতার আশীর্বাদ আছে। এই নগরীর কোনো অনিষ্ট হবে না কিছুতেই। অস্ত্রের খরচ কমিয়ে দিয়ে নগরবাসী নির্মাণ করেছিল মন্দির, উপসনালয়। তাদের কর্মকান্ডে নিশ্চয়ই ঈশ্বর সন্তুষ্ট। তিনি তাদের রক্ষা করবেন সব বিপদ-আপদ থেকে।

কিছুক্ষণের মধ্যে তাদের ধারণা সব ধুলিস্মাৎ হয়ে যায়। করটেজের নেতৃত্বে স্প্যানিশ সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে লুটপাটে মেতে ওঠে। তাদের সাধের পিরামিডের ওপর কুণ্ডুলি পাকিয়ে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যে সৈন্যরা হত্যা করে তিন হাজার নগরবাসীকে। রীতিমতো রক্তগঙ্গা বয়ে যায়। প্রাণ হারায় শহরের দশ শতাংশ অধিবাসী। সেদিন ছিল ১৫১৯ সালের ১৫ অক্টোবর।

এরপর চলুলার (এখন মেক্সিকোর অংশ) নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে থিতু হয়ে বসেন স্প্যানিশরা। প্রয়োজন অনুসারে গড়ে তোলে নিজস্ব ভবন, বাড়িঘর। খ্রিষ্টানদের বিজয়ের নিদর্শন এঁকে দেয় তারা শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ের সুউচ্চ স্থানে। দ্য ইগলেসিয়া নুয়েস্ত্র সেনোরা ডি লস রেমেডিওসা নামে একটি গির্জা নির্মাণ করে তারা সেখানে।
oira
তবে কিছু কিছু মানুষ মনে করতেন, ছোট্ট এই গির্জার ঠিক নিচে রয়েছে প্রাচীন একটি বিশাল পিরামিড। এখন তা চাপা পড়ে গেছে গাছ, মাটি ও ঘাসের নিচে। সত্যিকার অর্থে পিরামিডটি ছিল বিশাল। চওড়ায় ৪৫০ মিটার এবং উচ্চতায় ৬৬ মিটার। অর্থাৎ এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত ৯ টি অলিম্পিক সুইমিং পুলের সমান। এই হলো গ্রেট পিরামিড অব চলুলা। সে হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পিরামিড এটি। মিশরের গিজার গ্রেট পিরামিডের চেয়ে এটির ভিত্তি অন্তত চারগুণ বড় এবং গিজার নিকটস্থ পিরামিডগুলোর চেয়ে আয়তনে প্রায় দ্বিগুন।

সভ্যতার ইতিহাসে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত যতো পিরামিড বা স্মৃতিসৌধ আছে তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। স্থানীয়রা বলে থাকে থøাচিচুয়াল্টেপেটি (মানুষের তৈরি পাহাড়)। আর ওপরের গির্জা এখনো গাইছে স্প্যানিশদের বিজয় গান।

১৯১০ সালে ওই এলাকায় স্থানীয়রা একটি পাগলা গারদ নির্মাণ শুরু করে। ততোক্ষণ পর্যন্ত কেউ জানতো না এটি একটি পিরামিড। খনন কাজের শুরুতে পাওয়া যায় ভয়াবহ সব ঘটনার ইঙ্গিত। পাওয়া যায় তার বেশ কিছু নমুনাও। এর মধ্যে শিররোশ্ছেদ করা শিশুর মাথার খুলি অন্যতম। এখন প্রশ্ন, এগুলো কোথা থেকে এলো ? কেনই বা এগুলোর কথা গোপন রাখা হলো এতোদিন?

পিরামিডগুলো আকারে বিশাল হওয়া সত্ত্বেও এগুলোর আদি ইতিহাস সম্পর্কে জানা গেছে খুবই কম। ধারণা করা হয়, যীশুখ্রিষ্টের জন্মেরও প্রায় তিন শ’ বছর আগে শুরু হয় এটির নির্মাণ কাজ। কিন্তু কে শুরু করেছিলেন তা এখনো থেকে গেছে রহস্য হয়ে।

নগরবাসী আবার চলুটেকা নামে পরিচিত। চলুটেকা মানে বহু জাতিগোষ্ঠীর সমাহার। ‘দেখে মনে হয় ব্যাপক অভিবাসনের ফলে বহুজাতিগোষ্ঠীর লোকজন একই সঙ্গে বসবাস করতেন,’ বললেন ম্যাসাচুসেটসের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ডেভিড কারকালো।

মেক্সিকোর উচ্চভূমির খুব চমৎকার জায়গায় ছিল চলুলার অবস্থান। এছাড়া ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবেও খ্যাতি লাভ করে শহরটি। আর এই খ্যাতি অটুট ছিল হাজার হাজার বছর ধরে। উত্তরে ছিল টলটেকা-ছিছিমেকা রাজ্য আর দক্ষিণে ছিল মায়ারা।

করটেজ শহরটিকে অভিহিত করেছেন, ‘স্পেনের বাইরে সবচেয়ে সুন্দর শহর হিসেবে।’ আক্ষরিক অর্থেই যখন করটেজের আগমন ঘটে সেই সময় আজটেক সাম্রজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ছিল চলুলা। যদিও সময় গড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত বদল হয়েছে শহরটির।
pira
আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো আসলে একটি মাত্র পিরামিড নয়, কমপক্ষে ছয়টি পিরামিড রয়েছে সেখানে। স্থাপন করা হয়েছে একটির ওপর আরেকটি, নির্মিত হয়েছে পর্যায়ক্রমে। যেন, একটির পর আরেকটি সভ্যতার নিদর্শন।

এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে গিয়ে কারবালো বলছেন, ‘দেখে মনে হয়, অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টার নিদর্শন।’

লোককাহিনীতে বলা হচ্ছে, বিজয়ী সৈন্যদের আগমনের কথা শুনে স্থানীয়রা মহামূল্যবান উপসনালয় নিজেরাই ঢেকে দিয়েছে মাটি দিয়ে। কার্যত এটি শুধু লোককাহিনী ছাড়া কিছুই নয়। আসলে উপাসনালয়গুলো নষ্ট হয়ে থাকলে তা ঘটেছে দুর্ঘটনাবশত। কেননা, অবিশ্বস্য হলেও একথা ঠিক যে, পৃথিবীর বৃহত্তম পিরামিড তৈরি হয়েছে কাদামাটি দিয়ে। এই পিরামিডের ইট তৈরি করা হয়েছে কাদা, বালু, খড় ও অন্যন্য উপাদান একত্রে মিশিয়ে। এরপর রোদে শুকিয়ে সেগুলোকে শক্ত করে তোলা হয়। তৈরির সময় পিরামিডের বাহিরের দিকে স্থাপন করা হয় রঙ করা ইট। এ উপসনালয় মূলত লাল, কালো ও হলুদ রঙ করা।

শুকনো আবহাওয়ায় এ ধরনের ইট খুবই টেকসই। হাজার হাজার বছর এগুলো টিকে থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

You Might Also Like