পারিবারিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ সমূহ

মিজানুর ভূঁইয়া :

একটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বে একজন পুরুষ  বা নারী যেই থাকুক না কেন; সে বিষয়ে আমার কোনো মতভেধ  নেই, সে যে কেউই হতে পারে যদি তার সেই মেধা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য্ দূরদর্শিতা, আন্তরিকতা, সহমর্মীতা,দায়ীত্ববোধ, সৃজনশীলতা থাকে। কারণ মানুষ যখন প্রথম জন্ম নেয়, তার লিঙ্গ প্রকৃতি ভিন্ন হতে পারে কিন্তু তার মেধা, সৃজনশীলতা, পারগ্যম ক্ষমতা একই থাকে; শুধু দৈহিক আকৃতি ও গঠনগত ভিন্নতা ছাড়া। তাই সেই বিষয়ে আমার কোনই দ্বীমত নেই, তবে শারীরিক ভিন্ন গঠন প্রকৃতির কারণে, নারী এবং পুরুষের আচরণগত ভিন্নতা পরিলক্ষিত ।  আর সে কারণেই সৃষ্টির আদিকাল থেকেই সেই স্বাভাবিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যকে অনুধাবন করেই একটি চিরাচরিত প্রথার মধ্যে দিয়ে মানুষের জীবন যাত্রা শুরু হয়।

মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম ও কৃষ্টির আলোকে জীবন বিধানকে যেভাবে সাজিয়ে জীবন যাপন পদ্বতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, সে জীবন ব্যবস্থা প্রকৃতভাবে মানুষের জীবনে প্রচুর প্রাচুর্য আনয়ন না করে থাকলেও, জীবন পারস্পরিক শ্রব্ধাবোধ এবং শান্তিতে পরিপূর্ণ ছিল। প্রতিটি মানুষের জীবনের একমাত্র কামনার বিষয়টি ততোটুকু পর্যন্তই হয়তো; কিন্তু মানুষ ক্রমাগত যতই সীমাহীন প্রাচুর্য ও আধুনিকতার দিকে ধাবিত হতে থাকলো, মানুষ ততোই হারাতে শুরু করলো তার নিজ নিজ মূল্যবোধ, পরিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক, স্থিতি এবং জীবনের সকল মৌলিক আনন্দ সম্ভার।

ধর্মবিদ ও সমাজবিদ্গন বিভিন্ন সময়ে বিধান বা নীতিমালা প্রনয়ন করেন, যা মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে একটি সুনিয়নন্ত্রিত এবং পদ্বতিগত জীবন যাপনে সহযোগিতা প্রদান করেছিলো। সেই প্রেক্ষিতেই প্রতিটি পরিবারে, সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় জগতে নেতৃত্বের প্রশ্নটি একটি অত্যাবশকীয় বিষয় হিসাবে এসে পড়ে। ধর্মযাজকদের মতানুসারে মানুষের একজন বিধাতা বা সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন, যিনি সারা পৃথিবীর মানুষ, প্রকৃতি এবং সকল কিছুর স্রষ্টা এবং আমরা তার নির্দেশনাকে মান্য করি এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিপালন করে থাকি। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়, এখানে একটি শৃঙ্খলতার কথা বলা হয়েছে।মানুষের জীবন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রনাধীন রাখার জন্যই পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে শান্তিকামী সমাজ গভেষক এসেছেন।

অন্যদিকে সকল ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে প্রিতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের একজন ধর্ম যাজক বা নির্দেশক থাকে, আমরা আমাদের নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি নীতি অনুযায়ী  সেই নির্দেশকের সকল নির্দেশনাকে অনুসরণ করে আমরা আমাদের প্রার্থনা কার্য সম্পূর্ণ করে থাকি। রাষ্ট্রীয় অনুশাসন ব্যবস্থাও ঠিক একই রকম, একজন শীর্ষ নেতা বা প্রশাসক থাকেন যার বিধান এবং শাসন কার্যক্রমকে আমরা অনুসরণ করার মাধমে রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি, স্থিতি, শৃঙ্খলতা এবং সমৃদ্বি প্রতিষ্ঠিত হয়।  তেমনিভাবে একটি সমাজ এবং একটি পরিবারেও ঠিক একক  নেতৃত্বের প্রচলন মানব সৃষ্টির সেই প্রারম্ভিক কাল থেকেই প্রচলিত হয়ে আসছে এবং ইহা নিঃসন্দেহে জীবন ব্যবস্হা হিসাবে প্রচলিত হয়ে আসছে এবং সেই জীবন ব্যবস্হায়ই অত্যান্ত সাবলীল ও সুশৃঙ্খল জীবন যাপনে মানুষকে দিনাতিপাত করতে সহযোগিতা করেছিল। আমরা যদি তাকিয়ে দেখি, আকাশ এবং জ্যেঁতিরমন্ডলেও লক্ষ্য লক্ষ্য তাঁরা বা অন্যান্য গ্রহ মন্ডলের উপস্থিথি থাকা সত্বেও সেখানে রাতের আকাশের নেতৃত্বে রয়েছে চাঁদ আর দিনের আকাশের নেতৃত্বে রয়েছে সুর্য্য । পৃথিবী সৃষ্টির সেই প্রারম্ভনা থেকেই সৃষ্টির সকল ক্ষেত্রেগুলোতেই একটি সুনিয়নন্ত্রিত ব্যবস্থা বহাল রাখার জন্যই সেগুলোকে এইভাবে সাজানো হয়েছিল।

কিন্তু আজ আমরা কি দেখছি, পরিবার, সমাজ, ধর্মীয় এবং  রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে একটি অসম-প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিটি মানুষই দিন দিন মৌলিক চিন্তা থেকে দুরে সরে গিয়ে নিজ নিজ স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে সমগ্র জীবন ব্যবস্থায় একটি বেসামাল অবস্থার সৃষ্টি করে ফেলেছে। একটি মানুষ সামগ্রিক গোষ্ঠি স্বার্থ চিন্তাকে পিছে ফেলে ব্যক্তি চিন্তাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে একটি পরোক্ষ্য অথবা প্রত্যক্ষ্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ, যার ফলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি অস্থির ভাব চলে এসেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই বেসামাল অবস্থা হওয়ার মূল কারণ, হয়তো যে ব্যক্তিটি নেতৃত্বের আসনে আসীন তিনি সেই যোগ্যতা রাখেন না অথবা যিনি সেই পদে আসীন হতে চাচ্ছেন তিনার সেই পরিমাপের যোগ্যতা না থাকা স্বত্বেও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে অথবা ক্রোধ অথবা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার নিমিত্তে নিয়োজিত হতে চাছ্ছেন বলেই একটি অশান্ত এবং অস্থিতিশীল অবস্থার অবতারণা হচ্ছে।

মূল বিষয়টি হলো একটি অঙ্গনে দ্বী-নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা অসম প্রতিযোগিতা করার যে প্রয়াস, আর এর ফলশ্রুতিতেই আজ  জীবনের সর্ব ক্ষেত্রেই ভাঙ্গন এবং অশান্তি বিরাজমান ।  আমরা নিজ স্বার্থের কথাকে প্রাধান্যতা দিতে গিয়ে জীবনের আদি ও প্রকৃত সত্যকে পিছনে ফেলে দিচ্ছি বলেই আজ প্রেম-প্রীতি, সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রধাবোধ,  শৃঙ্খলতা ও উন্নয়ন আমাদের জীবন থেকে অনেক দুরে চলে যাচ্ছে। শুধু মিথ্যে অহংকার আর নেতৃত্বের মত্বলোভে আমরা আমাদের সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম, পরিবারকে ভেঙ্গে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিচ্ছি। শান্তি আর সম্পর্ক আমাদের জীবন থেকে  অনেক দুরে চলে যাচ্ছে কারণ দ্বী-নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার অশুভ ইচ্ছা আমাদিগকে অবধমিত করতে পারছেনা, আর সেটাই আজ আমাদের জীবনের মূল অশান্তির কারণ।

ভার্জিনিয়া, ইউ এস এ

জানুয়ারী ১৭ ২০১৫

You Might Also Like