পদদলিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ

ড. মোঃ নূরুল আমিন :

রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা খুবই কম। কিন্তু রাজনৈতিক অঙ্গনের একজন পর্যবেক্ষক ও ছাত্র হিসেবে আমি অর্ধশতাব্দী ইতোমধ্যে পার করে এসেছি। এই দীর্ঘ সময়ে গত ৬ বছরের ন্যায় ক্ষমতালিপ্সা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, সরকার ও সরকারি দলের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কর্মী পর্যন্ত মিথ্যাচার ও অশালীন কথাবার্তার সীমাহীন মহড়া আর কখনও দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না। ক্ষমতার মোহ, ঐশ্বর্যের লোভ মানুষকে বিবেকহীন নির্যাতনকারীর নিকৃষ্টতম পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে একথাটি আজ থেকে বিশ বছর আগেও আমরা কখনও চিন্তা করিনি। যা ভাবিনি যা চাইনি তাই এখন হচ্ছে।

গত শনিবার একটি বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে গিয়েছিলাম। বিকেল ৩টায় ওসমানী মিলনায়তনে একটি আলোচনা সভায় অংশ গ্রহণের দাওয়াত পেয়েছিলাম। এতে প্রধান বক্তা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সমাজসেবা সপ্তাহ পালন উপলক্ষে সারা দেশের সমাজসেবী এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তা এবং বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তাদের এই মিলনায়তনে হাজির হবার দাওয়াত দেয়া হয়েছিল। আমি জানি না কেন, এবার দাওয়াপত্রটি বিশেষ বাহক মারফত আমাকে পৌঁছে দেয়া হয়েছিল। মনে মনে খুশি হলাম, ভাবলাম আমার সাবেক জুনিয়র সহযোগীদের অনেকের সাথে হয়তো দেখা পাবো। অনেকের সাথেই মুঠোফোনে যোগাযোগ হয়, সশরীরে দেখা সাক্ষাৎ হয় না। বেলা ১২টায় পল্টনে চলে গেলাম কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজে। তাতে দেড়টা পর্যন্ত সময় লেগে গেলো। ২টার দিকে ওসমানী অডিটরিয়ামের দিকে রওনা হলাম। কিন্তু পুরানা পল্টন মহিলা কলেজের কাছাকাছি এসে আটকা পড়ে গেলাম। মূল সড়কে মিছিলের পর মিছিল। সামনে পেছনের সব গাড়ি স্থবির হয়ে আছে। দু’ধরনের মিছিল ছাত্রলীগের ৬৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সারা দেশ থেকে আনা কর্মী বাহিনীর আওয়ামী লীগ অফিস অভিমুখী মিছিল, সেখান থেকে ওসমানী মিলনায়তন। এরপর স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে আনা সকল জেলা-উপজেলা প্রতিনিধি, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ নেতাকর্মীরা তো আছেই। প্রধানমন্ত্রীর ৩টার মিটিংয়ে যোগ দেয়ার জন্য যাত্রা করে পৌনে ৩টার মধ্যেও গাড়ি নিয়ে সচিবালয়ের কাছাকাছি যখন যেতে পারলাম না তখন হাল ছেড়ে দিলাম। মোবাইলে অভ্যাগত কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের সাথে যোগাযোগ করে জানতে পেলাম যে, তাদের প্রায় প্রত্যেকের অবস্থা একই রকম। প্রধানমন্ত্রীর মিটিংয়ের কাছেও কেউ যেতে পারেননি। পরে শুনলাম ৫ জানুয়ারিকে সামনে রেখে এটি ছিল ক্ষমতাসীন দলের একটি শোডাউনের অংশ। তারা সারা দেশ থেকে ছাত্রলীগ-যুবলীগকে যেমনি মোবিলাইজ করেছে, তেমনি সমাজকল্যাণ সংস্থাগুলোকেও ডেকে এনেছে। ওসমানী মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রীর সভা আহ্বান করে তাদের আসল ফিকিরকে জোরদার করেছে। পরে আরও শুনলাম, ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্রের বিজয়’ দিবস পালন উপলক্ষে জনসমাগম বৃদ্ধির লক্ষ্যে ও বিরোধী দলের কর্মসূচি পন্ড করার জন্য ঢাকার বস্তিগুলো থেকে ছেলেমেয়ে সরবরাহ করার জন্য চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের তারা ঠিকাদারিও দিয়েছে। উদ্দেশ্য সুস্পষ্ট।

৪ জানুয়ারি বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে। এই দিন সরকারি দলের নেতৃবৃন্দ, মন্ত্রী-উপমন্ত্রী ও অঙ্গ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পরিষ্কার ঘোষণা দেন যে, তারা ২০ দল বা বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেবেন না, তাদের প্রতিহত করবেন; ঢাকার রাজপথ তাদের দখলে থাকবে। রাজপথ দখলের ব্যবস্থাও তারা করেছেন। তিন দিন আগে থেকে নিজেদের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং ভাড়াটিয়া লোকজনের উপস্থিতি নিশ্চিতের ব্যবস্থা করে বিএনপি ও ২০ দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকরা যাতে ঢাকা আসতে না পারে তার জন্য সকল জেলা-উপজেলা ও বিভাগীয় শহরগুলো থেকে যাতে ঢাকা অভিমুখী কোনও যানবাহন আসতে না পারে তার জন্য এই দিন সকল গাড়ি-ঘোড়া বন্ধ করে দেয়া হয়। লঞ্চ, স্টিমারগুলোও একইভাবে ঢাকা ট্রিপ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখা হয়। এই নোংরা কাজটি আওয়ামী লীগ সরকার এর আগেও করেছে। এবারও তার পুনরাবৃত্তি করলো। সাথে সাথে ২০ দলীয় নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গুলশানে তার অফিস গৃহে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। তার সাথে লোকজন যাতে দেখা করতে না পারেন তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও দলীয় ক্যাডাররা দায়িত্ব পালন করছে। তার অফিসেই তিনি অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন এবং সেখান থেকে যাতে বের হতে না পারেন তার জন্য বালু ও ইটবাহী ১৩টি ট্রাক ধরে এনে বাড়িমুখী গমন ও নির্গমন পথে ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়েছে। রুহুল কবির রিজভীসহ বিএনপির বহু নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অনেক নেতানেত্রীর সন্ধানে বাড়িঘর তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। বেগম জিয়ার সাক্ষাৎপ্রার্থী মহিলা নেত্রীদের সাথে পুলিশ যে আচরণ করেছে তা নিতান্ত অসভ্যতা। ৪ তারিখ বিকেল থেকে ঢাকা শহরে সকল প্রকার মিছিল-মিটিং সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং একই সাথে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ঘোষণা করেছেন যে, তারা রাজধানীর ২০০ স্পটে ২০ দলকে প্রতিরোধ করার জন্য সমাবেশ করবেন। সরকারের এই আচরণকে কেন্দ্র করে শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। বিনা নোটিশে ঢাকামুখী সব গাড়ি বন্ধ করে দেয়ায় সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ এবং অসুস্থ রোগীদের দুর্দশা চরমে উঠেছে। সবার মধ্যে আতঙ্ক, কখন কি ঘটে। আবার ৫ তারিখ ভোর থেকে ঢাকা মহানগরীতে চলাচলকারী বাস মিনিবাসসহ গণপরিবহনগুলো বন্ধ করে দেয়ায় মানুষ যে অসহনীয় কষ্টে পড়েছেন তা বর্ণনাতীত। বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগ-পুলিশলীগ বিরোধীদলীয় কর্মীদের ওপর নানামুখী হামলা করে তাদের গ্রেফতার করার ঘটনাও ঘটেছে প্রচুর। আর এর সবই হচ্ছে বিরোধী দল যাতে সমাবেশ করতে না পারে, বিদ্যমান শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সম্পর্কে তাদের জানাতে না পারে। তাদের সমাবেশ ও মত প্রকাশ এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের জন্য। লাখ লাখ লোকের প্রাণের বিনিময়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক শোষণের অবসান, মানবাধিকার পুনরুদ্ধারের নামে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন দেশের সরকারের এই আচরণ অকল্পনীয় এবং অসহনীয়। আমি আগেই বলেছি, আমার প্রায় অর্ধশতাব্দী কালের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতায় এই ভূখন্ডে এ ধরনের অবস্থা আর দেখিনি। যে পাকিস্তানের শাসন-শোষণ ও অত্যাচার থেকে আমরা স্বাধীন হতে বাধ্য হয়েছি সেই পাকিস্তান আমল, এমন কি বৃটিশ আমলেও আমরা বিরোধী দলের প্রতি সরকারের এমন বর্বর আচরণ দেখিনি। জনগণের সরকার জনগণকে ভয় পায় এ ধরনের নজির বিরল। আমি এখনো মনে করি, সরকারের আচরণ পরিবর্তনের সুযোগ এখনো রয়েছে। ক্ষমতার আস্ফালন, বৈধ অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও মহড়া দিয়ে মুক্তিকামী মানুষকে দমিয়ে রাখা যায় না। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ তথা লীগ পরিবার ইতোমধ্যে তাদের সন্ত্রাস-নৈরাজ্য, লুটপাট, হত্যা-ধর্ষণসহ অপকর্মের যে দৃষ্টান্ত দেশবাসীকে দেখিয়েছে তা নিয়ে বেশি দিন তারা দম্ভ করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। অন্যায় সব সময় ভীরু থাকে। নির্যাতিত মানুষ যখন রুখে দাঁড়ায় সর্বশক্তি দিয়ে হয়ত তারা কিছু দিন প্রতিরোধের চেষ্টা করে। কিন্তু অবৈধ সম্পদ রক্ষায় তারা এতই পলায়নপর থাকে যে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ ইতঃপূর্বে এর অনেক নজির দেখিয়েছে। এ প্রেক্ষিতে বিরোধী দলের হতাশ হবার কিছু আছে বলে মনে হয় না।

(দুই)

আদালত অবমাননার প্রশ্নটি আমাদের দেশে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে পড়েছে বলে হয়। দেশ বিদেশের বেশ কিছু সাংবাদিক ইতোমধ্যে এর জন্য দন্ডিত হয়েছেন। কেউ কেউ ওয়ার্নিং পেয়েছেন। কোনো কোনো রাজনীতিবিদেরও শাস্তি হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা এবং আন্তর্জাতিক (অপরাধ) ট্রাইব্যুনালে তাদের আইনজীবী জনাব তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ উঠেছে। জামায়াতের সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জনাব এটিএম আজহারুল ইসলামকে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ফাঁসির দন্ডাদেশ প্রদানের পর জনাব তাজুল ইসলামের কথিত মন্তব্য এবং জামায়াত কর্তৃক হরতাল আহ্বানের প্রেক্ষাপটে এই অভিযোগ সরকারিভাবে উঠেছে। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে কিছু বলা অথবা কোনও কর্মসূচি পালন করা অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কিনা এ সম্পর্কে আমার ধারণা কম। তবে ভারতীয় হাইকোর্টের একজন বিচারপতি এবং কয়েক বছর আগে বাংলাদেশ হাইকোর্টের একজন বিচারপতির অভিমত আমি পড়েছি। তারা তাতে পরিষ্কার বলেছেন যে, রায়ের সমালোচনা করা যায়। কোনও আদালত প্রদত্ত রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা মানে বিচারকের রায়ের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রদান। এটা নাগরিকদের শাসনতান্ত্রিক একটি অধিকার এবং তা লঙ্ঘন করা যায় না। এখানে আরেকটি প্রশ্ন অনেকে তুলে থাকেন। ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় তাকে যাবজ্জীবন দন্ডের রায় দিয়েছিল। এই রায়কে ফাঁসির রায়ে পরিণত করার জন্য শাহবাগ চত্বরে সরকারি উদ্যোগে গণজাগরণ মঞ্চ স্থাপিত হয়েছিল এবং ঐ মঞ্চ মাসাধিককাল ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। তারা প্রধানমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী এবং স্পিকারের কাছে রায়ের বিরুদ্ধে representation দিয়েছিল। ট্রাইব্যুনাল আইনে সরকার পক্ষের আপিলের বিধান ছিল না। তাদের দাবি আইন সংশোধন করে মঞ্চের দাবি পূরণ করা হয়েছে। মঞ্চের আন্দোলন যদি আদালত অবমাননা না হয়ে থাকে তাহলে রায়ে বিক্ষুব্ধ ক্ষতিগ্রস্ত দল বা গ্রুপের হরতাল বা অন্য কোনভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ কিভাবে বিবেচনা করা হবে। বিষয়টি গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে বলে আমি মনে করি।

You Might Also Like