নুহাশপল্লীর অজানা এক হুমায়ূন

হক ফারুক আহমেদ

হক ফারুক আহমেদ

হক ফারুক আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদের আমন্ত্রণে বাংলাদেশে এসেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। নুহাশপল্লীতে সময় কাটাচ্ছিলেন তারা। হুমায়ূন আহমেদ জানতেন একদিন পরই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্মদিন। কিন্তু এ বিষয়ে হুমায়ূন আহমেদ কিছুই জানেন না- এমন একটা ভাব।

রাতে খাবার খেয়ে বিশ্রামের প্রস্তুতি চলছে। রাত তখন প্রায় সাড়ে ১১টা। আধা ঘণ্টা পর হুমায়ূন আহমেদ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে বললেন, চলুন একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি। বাইরে বের হয়েই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘ওয়াও’ বলে একটা চিৎকার দিলেন। নুহাশপল্লীর চারিদিকে মোমবাতির আলোয় এক অন্য ভুবনের আবেশ।

প্রবেশপথ থেকে শুরু করে রাস্তাগুলো হয়ে দীঘি পর্যন্ত আলোর এক অন্যরকম খেলা। জন্মদিনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে এভাবেই ‘সারপ্রাইজ’ দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। আর একটু আগে বিদ্যুত চলে যাওয়ার ঘটনাটা ইচ্ছাকৃত।

তারপরই শুরু হয়েছিল নুহাশপল্লীর গেটের মূল প্রবেশ দেয়ালের ছোট ছোট মাটির গর্ত থেকে মোমবাতি প্রজ্বালন। সবই আসলে হুমায়ূন আহমেদের পূর্বপরিকল্পনার অংশ। প্রিয় মানুষদের তিনি এভবেই চমকে দিয়েছেন বহুবার।

উপরের কথাগুলো বলছিলেন নুহাশপল্লীর ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বুলবুল। কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের ৭০তম জন্মদিন তিনি এ কথা বলেছিলেন। অগণিত মানুষের প্রিয় এ লেখকের জীবদ্দশায় কিভাবে পালিত হতো তার জন্মদিনটি?

এ বিষয়ে অনেকেরই কিছু কিছু জানা থাকলেও খুব কাছ থেকে যারা বিভিন্ন সময় দেখেছেন তাদের মধ্যে নুহাশপল্লীর কর্মকর্তারা অন্যতম। সেখানে তাদের কেউ কেউ কাজ করছেন ২০ বছরেরও অধিক সময় ধরে। তাদের কাছ থেকেই জানা গেল হুমায়ূন আহমেদের নুহাশপল্লীর না জানা কিছু গল্প।

জীবদ্দশায় হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনগুলোতে কেমন আয়োজন হতো? নুহাশপল্লীর কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন সামনে এগিয়ে এলেন। জানালেন, তিনি ২১ বছর ধরে নুহাশপল্লীতে আছেন। পুরনো কাজ গাছ পরিচর্যার পাশাপাশি হুমায়ূন আহমেদের কবরটি প্রতিদিন ধুয়ে-মুছে রাখেন তিনি।

বললেন, স্যার খুব একটা পছন্দ না করলেও ঠিকই জন্মদিনে কেট কাটা হতো। শাওন আপা (মেহের আফরোজ শাওন), নূর স্যার (আসাদুজ্জামান নূর), চ্যালেঞ্জার স্যার, রিয়াজ, ডা. এজাজুল ইসলাম, ফারুক আহমেদ, স্বাধীন খসরুসহ আরও অনেকেই আসতেন।

একটা স্টেজ বানানো হতো। ফায়ার ক্যাম্প হতো। আমরা স্যারের প্রিয় সব গান গাইতাম। সেলিম চৌধুরী, এসআই টুটুল, কুদ্দুছ বয়াতিসহ আরও অনেকে গাইতেন। আমিও স্যারকে গান শোনাতাম।

আমি গান গাই জেনে স্যারই আমাকে হারমোনিয়াম আর তবলা কিনে দিয়েছিলেন। এভাবে চলত অনেক রাত পর্যন্ত। এ কথার মধ্যে হঠাৎ দেখা গেল মোশাররফের চোখে পানি। আড়ালে চোখ মুছে বললেন, কোনো মানুষকে স্যার না খাইয়ে যেতে দিতেন না।

কেউ যেন না খেয়ে যায় তার জন্য কড়া নির্দেশ ছিল আমাদের। স্যার মারা যাওয়ার পর ৪০ রাত আমি ঘুমাইনি। কাঁচা কবরটা রাতের পর রাত পাহারা দিয়েছি। পরে স্যারের দেয়া ডিজাইনে বাঁধাই করেছেন শাওন আপা।

তিনি আমাকে বলেছেন, এ কবর দেখে রাখার দায়িত্ব তোমার। আমি প্রতিদিন ধুয়ে-মুছে রাখি। বিশ্বাস করুন, আমি এমনও দেখেছি স্যারকে ভালোবাসা জানাতে এসে অনেকে মাটিতে কাঁদতে কাঁদতে গড়াগড়ি খেয়েছেন। বরিশাল থেকে একবার চারজন হুজুর এসে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে স্যারের কবর জিয়ারত করেছেন।

মোশাররফ নুহাশপল্লীর নানা গল্প করতে করতে হুমায়ূন আহমেদের মৃত কন্যা লীলাবতীর নামাঙ্কিত শান বাঁধানো ঘাটে এসে বসলেন। লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তার নিজের লেখা ও সুর করা একটা গান খালি গলায় শোনালেন।

গান শেষ করে বললেন, এ দীঘি আমাদের চোখের সামনে কাটা হয়েছে। স্যার নিজে পুকুরে রুই, কাতলা, কাল বাউশ, চিতলের পোনা ছেড়েছেন। এখনও এখানে কয়েকশ’ চিতল আছে। স্যার নুহাশল্লীতে এলে জাল ফেলতে বলতেন। বড় বড় মাছ রেখে দিয়ে বলতেন সবাইকে খেতে দিবা। ছোট কোনো মাছ রাখতেন না, সব দীঘিতে ছেড়ে দিতেন।

শুটিংয়ের প্রসঙ্গ টানতেই বললেন, স্যার নিজের হাতে স্ক্রিপ্ট লিখে দিতেন। শুটিংয়ের মধ্যে অনেক আনন্দ হতো। কিন্তু কাজটা সুন্দরভাবেই হতো। কারণ, সবাই জানে স্যার আছেন। এমনও দেখেছি স্যার রাত ৪টা পর্যন্ত শুটিং করেছেন।

আবার ভোরে উঠে দেখি তিনি হাঁটছেন। বহুদিন গেছে এমন। হোয়াইট হাউসে (নুহাশপল্লীতে হুমায়ূন আহমেদের বাসস্থানের নাম) উনার ঘরের কার্পেট বিছানো মেঝেতে খুব ছোট্ট একটা টেবিলে তিনি লিখতেন। এত কাজের মধ্যে তিনি কখন এত উপন্যাস-গল্প লিখেছেন এটা এখনও এখানকার অনেকের মতো আমার কাছেও বিস্ময়!

কাউকে শাস্তি দেয়ার ধরনটাও একটু ভিন্ন ছিল জানিয়ে বলেন, স্যার সহজে রাগ করতেন না। তবে কেউ গুরুতর কোনো অপরাধ করলে এমন একটা ধমক দিতেন যে নুহাশপল্লীর মাটি পর্যন্ত কাঁপত।

তারপর বলতেন কানে ধরে ওকে সারা নুহাশপল্লী ঘোরাও। তার পেছনে পাঠানো হতো একজনকে। তার পেছনে আবার পাঠানো হতো আরেকজনকে। আসলেই করছে কিনা সেটা দেখার জন্য। তারপর স্যারই ডেকে এনে বলতেন, যাও তোমাকে মাফ করে দিলাম।

নুহাশপল্লীতে এত বছর থাকার সুবাদে হুমায়ূন আহমেদেকে নানাভাবে দেখেছেন মোশাররফ। তিনি বলেন, অনেক পড়াশোনা জানা মানুষ বলেছেন, স্যার নাকি নাস্তিক মানুষ। আমি বলব তারা মূর্খ। কারও ব্যাপারে না যেনে কোনো মন্তব্য করাটা পাপ।

আমি এমনও দেখেছি, হুমায়ূন স্যার নুহাশপল্লীতে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এসেই আমাকে বললেন, অজুর পানি দাও। অজু শেষে তিনি আমাদের সঙ্গেই নামাজ আদায় করেছেন। স্যারের কণ্ঠস্বর আমার কানে এখনও বাজে- ‘কেউ মাগরিবের নামাজ মিস করিও না।’ ফজরের সময় কখনোই স্যারকে ঘুমাতে দেখিনি।

নুহাশপল্লীর শুরুর দিকের কর্মকর্তা কাজী নুরুল হক। তিনি খুব বিস্ময় নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ২০১১ সালের শেষ দিকের কথা। নিষাদকে নিয়ে স্যার তখন ঘরে। হঠাৎ আমাকে ডাকা হল।

আমি যেতেই বললেন, আমার কবর দেয়ার ব্যবস্থাটা করে রাখতে চাই। কাফনের কাপড় কিনে রাখতে হবে। আমি খুবই অবাক হলাম। এখনও প্রশ্ন আসে, স্যার কি আসলে আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি আর খুব বেশিদিন বাঁচবেন না।

ফজলুল হক সরকার নুহাশপল্লীতে আছেন ১৯৯৭ সাল থেকে। তিনি হুমায়ূন আহমেদের পোশা প্রাণীগুলোর দেখাশোনা করতেন। এখনও নানা ধরনের কাজ করেন। বললেন, এক সময় স্যার অনেকগুলো হরিণ পুষতেন।

পরে সেগুলো তিনি চিড়িয়াখানায় দিয়ে দেন। তিনি যখনই আসতেন তার পোষা প্রাণীগুলোর খবর নিতেন। এমনকি শেষবার যখন আমেরিকা থেকে এসেছিলেন তখনও কবুতর, হাঁস, গরুগুলো দেখে রাখতে বলেছিলেন। সেগুলোর পরিচর্যা এখনও খুব ভালোভাবেই চলছে।

আরেক কর্মকর্তা জানান, লীলাবতী দীঘির সীমানার পরে একটা খাল ছিল। হুমায়ূন আহমেদ তখন একটা বজরা নৌকা ব্যবহার করতেন। নানা জায়গায় নৌকায় আসা-যাওয়াও করতেন।

নুহাশ, শীলা, নোভা, বিপাশা ওদের নিয়েও ঘুরতেন। আবার তিনি নিনিত, নিষাদকেও কোলে নিতেন, ঘুরতেন। সন্তানদের বিষয়ে তার ভালোবাসা অকৃত্রিম। এমনকি তার দুই সন্তানের মৃত্যুর পরেও।

পুরো নুহাশপল্লীতে প্রায় তিনশ’ প্রজাতির ফলদ, বনজ গাছ আছে। আছে বিরল ঔষধি বাগান। এ বাগানটি উৎসর্গ করেছেন মৃত ছেলে রাশেদ হুমায়ূন স্মরণে। সেখানে লেখা আছে, ‘আমরা ছোট বাবাকে মনে করছি।’ তার মৃত্যুর পর নতুন করে আর কিছু করা হয়নি সেখানে।

লীলাবতীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দীঘিটির অন্য নাম ছিল। কিন্তু পরে তিনি এটির নাম রাখেন দীঘি লীলাবতী। ফলকটিতে স্পষ্ট করে আরও লেখা রয়েছে ‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে’। এখানেই শেষ নয়, হুমায়ূন আহমেদের কারণেই গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের রাস্তার উন্নয়ন, বিদ্যুৎ এসেছে বলেও জানান সেখানকার স্থানীয়রা।

লেখক: কবি, লেখক ও প্রাবন্ধিক।