হোম » নির্মম বাস্তবতার সেই সাক্ষী

নির্মম বাস্তবতার সেই সাক্ষী

ঢাকা অফিস- Tuesday, December 12th, 2017

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ১৯৬০-এর দশকে উত্তর কোরিয়ায় পালিয়ে যাওয়া সেই চার মার্কিন মধ্যে সবশেষ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি ছিলেন নির্মম বাস্তবতার প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন সার্জেন্ট চার্লস জেনকিনস ২০০৪ সালে উত্তর কোরিয়ার কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং জাপানে গিয়ে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। প্রায় ৪০ বছর কারাবন্দি ছিলেন তিনি। কঠোর বামঘেঁষা দেশটির বর্বরতা সচক্ষে দেখে গেছেন এবং তিনি নানাভাবে তার শিকার হয়েছিলেন।

পালিয়ে উত্তর কোরিয়ার যাওয়ার পর সেই সময় জেনকিনসসহ চার মার্কিনি দেশটির চলচ্চিত্র তারকা হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। কিন্তু তারা কখনো মুক্ত ছিলেন না। কারাগারে থেকেই তারা অভিনয় করতেন। অবশ্য চার জনের মধ্যে শুধু জেনকিনসকে মুক্তি দেয় পিয়ংইয়ং। অন্য তিন জন উত্তর কোরিয়াতেই মারা গেছেন, যার মধ্যে জেমস ড্রেসনক ২০১৬ সালে স্ট্রোকে মারা যান।

সোমবার জাপানের সাদো দ্বীপে নিজ বাড়িতে মারা যান জেনকিনস। সেখানে স্ত্রী হিতোমি সোগার সঙ্গে থাকতেন তিনি। সোগাও উত্তর কোরিয়ায় কারাবন্দি ছিলেন।

জাপানের গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, বাড়ির বাইরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন জেনকিনস। হৃদযন্ত্রে সমস্যার কারণে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান বলে খবরে বলা হয়েছে। তার স্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন, জেনকিনসের মৃত্যুতে তিনি খুবই বিস্মিত এবং কিছু ভাবতে পারছেন না।

যে পরিকল্পনা ভুল ছিল

উত্তর কোরিয়ায় অসাধারণ কিন্তু কঠিন জীবন পার করেছেন জেনকিনস। স্মৃতিকথা ও কিছু সাক্ষাৎকারে এমন কথা বলে গেছেন তিনি।

১৯৬৫ সালে দুই কোরিয়ার অমীমাংসিত সীমান্ত অঞ্চলে (অসামরিক অঞ্চল) দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ইউনিট ত্যাগ করে উত্তর কোরিয়ায় পালিয়ে যান জেনকিনস। তার আশঙ্কা ছিল, সীমান্ত অঞ্চলে টহলের সময় তিনি মারা যেতে পারেন অথবা তাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে পাঠানো হতে পারে। তিনি চিন্তা করেছিলেন, উত্তর কোরিয়ায় গিয়ে রাশিয়ার দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইবেন এবং তিনি আরো ভেবেছিলেন, বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে হয়তো যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যেতে পারবেন।

সেই বছর জানুয়ারির এক রাতে অসামরিক অঞ্চল হেঁটে পার হয়ে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন জেনকিনস। তখন তার বয়স ছিল ২৪ বছর। কিন্তু রাশিয়ার দূতাবাস তাকে আশ্রয় দেয়নি এবং অন্যকোনোভাবেও তিনি আশ্রয় পাননি। উপরন্ত উত্তর কোরিয়া তাদের কারাগারে ঢোকায়।

২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রচারমাধ্যম সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেনকিনস বলেছিলেন, ‘পেছন ফিরে তাকালে এখন মনে হয়, আমি বোকা ছিলাম। স্বর্গে যদি কোনো ঈশ্বর থেকে থাকেন, তাহলে তিনিই আমাকে এর মধ্য দিয়ে টেনে এনেছেন।’

জেনকিনসসহ চার মার্কিনিকে সেই সময়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল-সাংয়ের সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল সম্পর্কে পড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তাদের দিয়ে অনুবাদের কাজ করানো হয়েছিল এবং কোরীয়দের ইংরেজি শেখাতে বাধ্য করা হয়েছিল। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার প্রোপাগান্ডা সিনেমায় অভিনয় করানো হয়েছিল, যেখানে তারা পশ্চিমা খলনায়কের ভূমিকায় কাজ করেছিলেন। এর মাধ্যমে কোরীয়দের মধ্যে জনপ্রিয়তাও পেয়েছিলেন তারা।
উত্তর কোরিয়ায় কারাজীবনে সেখানকার কারা কর্মকর্তারা তার ওপর নির্মম অত্যাচার করতেন। প্রায়ই মারধর করতেন। অপ্রয়োজনে ও বর্বর উপায়ে তার ওপর মেডিক্যাল পরীক্ষা চালাতেন। অজ্ঞান করা ছাড়াই তার শরীর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর চিহ্নযুক্ত একটি ট্যাটু কেটে ফেলেছিলেন কারারক্ষীরা। জেনকিনসের ভাষায়, তার কারাজীবন ছিল নরকের নামান্তর।

কিন্তু তার জীবনে হঠাৎ আশার স্ফূলিঙ্গের মতো আসেন সোগা। উত্তর কোরিয়ার গোয়েন্দাদের জাপানি ভাষা শেখানোর জন্য জাপান থেকে তাকে অপহরণ করে আনা হয়েছিল।

ওয়াসুমি ও গুডনাইট

১৯৮০ সালে উত্তর কোরীয় কর্মকর্তারা সোগাকে জেনকিনসের সঙ্গে একই কারাকক্ষে থাকতে বাধ্য করেন। ‍দুই সপ্তাহের মধ্যে তাদের বিয়ে দেওয়া হয়। জেনকিনসের ভাষ্যমতে, কারা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুজনের ঘৃণার সাধারণ অবস্থান থেকে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং প্রণয়ে আবদ্ধ হন।

সিবিসিকে জেনকিনস বলেছিলেন, ‘আমি একবার তার দিকে তাকিয়েছিলাম। আর তাকে যেতে দেইনি।’ স্মৃতিকথায় জেনকিনস বলেছেন, ‘প্রতিরাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে তিনি তারা স্ত্রীকে ওয়াসুমি (জাপানি ভাষায় শুভরাত্রি) ও তাকে তার স্ত্রী ইংলিশে গুডনাইট বলতেন।’ তিনি লিখেছেন, ‘এমন করতাম, কারণ আমরা কখনোই ভুলে যেতে চাইনি, সত্যিকার অর্থে আমাদের অবস্থান কী এবং কোথা থেকে আসেছি।’

এই দম্পতির মিকা ও ব্রিন্ডা নামে দুই সন্তান রয়েছে। তবে জেনকিনস বলেছেন, বিদেশি করাবন্দি হিসেবে সাধারণ কোরীয়দের চেয়ে তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা হতো। ১৯৯০-এর দশকে দুর্ভিক্ষের মুখেও তাদের রেশন দেওয়া হতো।

জাপান সরকারের সমঝোতায় ২০০২ সালে সোগা মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। দুই বছর পর ২০০৪ সালে মেয়েসহ জেনকিনসকে মুক্তি দেয় পিয়ংইয়ং এবং তারাও জাপানে চলে যান। গণমাধ্যমের তীক্ষ্ণ নজরদারির পরও তাদের পারিবারিক পুনর্মিলনীর ঘটনা জাপানিদের কাছ থেকে সহানুভূতি লাভ করে।

জাপানে ফিরে জেনকিনস যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সামরিক আদালতে তার বিচার হয় এবং ৩০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাহিনী থেকে অসম্মানজনক বিদায় দেওয়া হয় তাকে।

‘উত্তর কোরিয়া আমাকে মারতে চেয়েছিল’

জাপানের সাদো দ্বীপে তার স্ত্রীর নিজ শহরে এসে বসবাস শুরু করেন জেনকিনস। একটি পর্যটন পার্কে চাকরি পান তিনি। কিন্তু জীবনের ৪০টি বছর বিচ্ছিন্ন দেশের কারাগারে কাটানোয় আধুনিক জীবন যাপনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি।

সিবিএসকে তিনি বলেছিলেন, জীবনে কখনোই তিনি কম্পিউটার স্পর্শ করেননি, ইন্টারনেট ব্যবহার করেননি। কারাগার থেকে বেরিয়ে সেনাবাহিনীতে নারী ও কৃষ্ণাঙ্গদের কাজ করতে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন।

চলতি বছরের আগস্ট মাসে প্রকাশিত লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ায় তিনি যে ধরনের চিকিৎসা প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তার কারণে আজো তিনি মানসিক সমস্যায় ভোগেন। কারামুক্ত হওয়ার পর তিনি উন্নত চিকিৎসা নিয়েছেন। উল্লেখ্য, এটিই ছিল তার দেওয়া শেষ সাক্ষাৎকার।

স্বাধীনভাবে বাঁচার সময়েও উত্তর কোরিয়ার কারাকর্মর্তাদের নির্মম অত্যাচারের কথা মনে করে আতঙ্কে ভুগতেন তিনি। তার সব সময় মনে হতো, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করতে পারে উত্তর কোরিয়া। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসকে তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়া আমাকে হত্যা করতে চায়।’

তথ্যসূত্র : বিবিসি অনলাইন