হোম » নিজের সিন্দুকে টাকা রেখে কঠিন শর্তে ঋণ কেন?

নিজের সিন্দুকে টাকা রেখে কঠিন শর্তে ঋণ কেন?

admin- Wednesday, October 11th, 2017

আনিস আলমগীর : আনিস আলমগীরভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এসেছিলেন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি করেছে। ১৭টি প্রকল্পের জন্য এ ঋণ। সব মিলিয়ে দেড় শতাংশ সুদ, সহজ শর্তে এই ঋণ পেতে যাচ্ছি আমরা। ঋণ পরিশোধের সময় ২০ বছর। গ্রেস পিরিয়ড ৫ বছর। অন্যান্য শর্তের মধ্যে কয়েকটি হচ্ছে – প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ পণ্য ভারত থেকে আমদানি করতে হবে। পাশাপাশি প্রকল্পের কনসালটেন্সিও ভারত প্রদান করবে।

এছাড়া ভৌত অবকাঠামো প্রকল্পে ৬৫ ভাগ পণ্য কিনতে হবে ভারত থেকে। প্রকল্পের অবশিষ্ট পণ্য ভারতের বাইরে বিশ্বের অন্য যে কোনও দেশ থেকে আমদানি করা যাবে। এ ছাড়াও যে সমস্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ আরম্ভ হবে সেসব প্রকল্পে ভারতীয় ঠিকাদার নিযুক্ত করতে হবে। আর প্রকল্পগুলোর জন্য জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রণয়ন, প্রকল্পের নকশা তৈরি এবং দরপত্র চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয় করে নিতে হবে।

সুদের হার কম হলেও ৭৫% মালামাল ভারত থেকে ভারতের নির্ধারিত দরে কিনতে হবে। যেহেতু দরপত্রে মালামাল কেনা হবে না সেহেতু মালামালের মূল্য নির্ধারণের যে কিছু হেরফের হবে না তা নয়। সুতরাং সুদের হার কম হলেও পণ্যের দাম বেশি চার্জ করে কম সুদের হিসাব আসলে ঠিক থাকবে না। নিজের সিন্দুকে টাকা রেখে সরকার এ ঋণ চুক্তি করলেন কেন বোধগম্য নয়।

ভারত বাংলাদেশকে প্রথম ঋণ প্রদান করেন ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়। প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর সঙ্গে স্বাক্ষরিত যৌথ ইশতেহারে লাইন অব ক্রেডিট এর আওতায় ১০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত সরকার। এ ঋণের ব্যাপারে একই বছর ৭ আগস্ট ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের চুক্তি স্বাক্ষর হয়।

পরে ১০০ কোটি ডলারের মধ্য ২০ কোটি ডলার পদ্মা সেতুর জন্য অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন তৎকালীন ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জী। এই ঋণের অর্থ দিয়ে ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। বড় তিন প্রকল্প এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এ সব প্রকল্পে ঋণের অর্থ ছাড় হয়েছে ৩৭ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার। এখনও ৬২ কোটি ৪০ লক্ষ ডলার ছাড় করার বাকি রয়েছে।

২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় ২০০ কোটি ডলার ঋণের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। প্রদত্ত ঋণ নিয়ে ২০১৬ সালের ৯ মার্চ উভয় দেশের মাঝে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এলওসির এ ঋণের আওতায় ১৪টি প্রকল্পের ১২টিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে ভারত। তবে প্রকল্পগুলোর মাঠ পর্যায়ের কাজ এখনও শুরু হয়নি।

এবারের তৃতীয় ঋণে অনেক শর্ত আছে। উভয় দেশ কোনও প্রকল্পে সব শর্তে এক মত হওয়া দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বিষয় এবং এ বিষয়টা বেশ কঠিনও বটে। পূর্বের দুই চুক্তিতে যা হয়েছে তৃতীয় চুক্তিতে একই অবস্থা হবে এটা প্রায় নিশ্চিত। চুক্তি যেহেতু স্বাক্ষরিত হয়ে গেছে তার শর্ত পুনর্বিন্যাস সম্ভব নয়। সুতরাং চুক্তির শর্ত বেশি হলেও শর্ত মোতাবেক সব অবলিগেশন পালন করতে হবে তা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।

প্রথম ঋণ নিয়ে গত ৭ বছরে তার প্রকল্পগুলো শেষ করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় ঋণের কোনও প্রকল্পই আরম্ভ হয়নি তাও দু’ বছর অতীত হতে যাচ্ছে। সুতরাং তৃতীয় ঋণের চুক্তি করার কী প্রয়োজন ছিল?

বর্তমান স্বাক্ষরিত ঋণ চুক্তির টাকা দিয়ে ১৭টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পগুলোর মাঝে কিছু প্রকল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়া রূপপুরে যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেছে তার বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন আর কাটিহার পার্বতীপুর বরনগর দিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ বিতরণ লাইন তৈরি।

বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর সঞ্চালন লাইনের জন্য বিদ্যুৎ বিতরণ দীর্ঘদিন স্থগিত হয়ে থাকে। সুতরাং এ দুই প্রকল্পের বিষয়ে খুব দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে কারণ শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সে সব আলাপ আলোচনার প্রয়োজন হয়, তা দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ করে সুতরাং প্রকল্পকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে আনতে বিশেষ করে এ দু প্রকল্পের বিষয়ে খুব দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এ ঋণের মধ্যে আরও একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। মোল্লার হাটে ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বহুদেশে সৌর বিদ্যুৎ, জলবিদ্যুৎ, আনবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। মোল্লার হাটে সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার বিষয়টি নিষ্পত্তি করা জরুরি। যেন কেন্দ্রটি জরুরি ভিত্তিতে স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা যায়। সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে প্রচুর জায়গার প্রয়োজন। বৃহত্তম ফরিদপুর জেলায় বহু চর রয়েছে সে সব চরে সৌর বিদ্যুতের প্রকল্প গ্রহণ করে বাংলাদেশ নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ বিনিয়োগ করে আরও সৌর বিদ্যুতের প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

তাপ-বিদ্যুৎ কেন্দ্র জলবায়ুর জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত তাপ-বিদ্যুতের প্রকল্পই বেশি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। তাপের কারণে উত্তাপ সৃষ্টি হওয়াতে বরফ গলছে বেশি। তাতে সমুদ্রের পানি বেড়ে বহুদেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছে, বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ উপকূলবর্তী এলাকা পানিতে ডুবে যাবে। তখন হয়ত বাংলাদেশিরাও কোনও দেশের নোম্যান্সল্যান্ডে শরণার্থী হয়ে আশ্রয়ের আশায় রোহিঙ্গাদের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। সুতরাং তাপ বিদ্যুতের প্রকল্পের বিষয় চিন্তা থেকে বের করে দিতে হবে। ধীরে ধীরে সৌর বিদ্যুৎ-জলবিদ্যুৎ, আনবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কথা চিন্তা করতে হবে।

ভারতীয় ঋণে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প রয়েছে। চট্টগ্রামে ড্রাইডক স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। গত শতকের ছয় দশকে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় একটা ড্রাইডক স্থাপন করা হয়েছিলো। আগে স্থাপিত এই ডকের সংস্কার ও সম্প্রসারণ কিনা জানি না। নাকি নতুন ডক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যাই সিদ্ধান্ত হোক না কেন, আমাদের জন্য অত্যন্ত আধুনিক একটা ড্রাইডক প্রয়োজন। ড্রাইডক সুবিধা না থাকলে বন্দরে জাহাজ আসতে চায় না। কারণ বাংলাদেশের বন্দরে ডক ফ্যাসিলিটি না থাকলে কোনও জাহাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিলে কলকাতা বন্দরে বা কলম্বো বন্দরে যেতে হয়।

অথচ চট্টগ্রাম বন্দর একটা বড় বন্দর ১৭টি জাহাজ এক সঙ্গে বার্থ নিতে পারে। বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে গড়ে তুলতে হলে ড্রাইডক ফ্যাসিলিটি থাকতে হয়। বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ। মংলা ও পায়রা বন্দরের পরিপূর্ণ কাঠামো দাঁড়িয়ে গেলে বহু বিদেশি জাহাজ আসবে। সুতরাং তিনটা বন্দরে আসা বিদেশি জাহাজের জন্য একটা আধুনিক ড্রাইডক খুবই জরুরি।

ওপরে বর্ণিত চারটি প্রকল্পের জরুরি প্রয়োজনীয়তার কথা বললাম। প্রকল্পের বিষয় দ্রুত নিষ্পত্তি করলে দ্রুত কাজও আরম্ভ করা যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এর সময়ে প্রদত্ত ঋণের সম্পূর্ণ টাকাই এখনও পাওয়া যায়নি। প্রকল্পের কাজ আরম্ভ করতে এতো দেরি হলে প্রকল্পের খরচ তো বেড়ে যাবেই।

এমন বিলম্বের কারণ কোন পক্ষের কারণে ঘটছে জানি না তবে ঋণদাতা সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টি হলে তার থেকে ঋণ নিতে অন্য সব দেশ আগ্রহ হারাবে। ঋণ দ্বারা ঋণ গ্রহীতা লাভবান হচ্ছে তা নয় ঋণদাতাও সুদ পেয়ে মালামাল বিক্রি করে, ঠিকাদারী করেও লাভবান হচ্ছে।

আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্প্রতি চীন, ভারত, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পাদিত ঋণ চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখেছি শর্তের ছড়াছড়িতে চুক্তিগুলো আড়স্থ। এত শর্তের বেড়াজাল থেকে বাংলাদেশের পরিত্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com