নিজামীর ফাঁসির দণ্ড আপিল বিভাগেও বহাল, বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী।

আজ (বুধবার) সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

এর আগে গত ৮ ডিসেম্বর এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ তাঁদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করলে আদালত রায়ের জন্য আজ (৬ জানুয়ারি) দিন ধার্য করে দিয়েছিল।

আজ সকাল ৯টা ৩ মিনিটে রায় পড়া শুরু করে আপিল বিভাগ। ৯টা ১০ মিনিটের মধ্যেই চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়। আপিলের রায়ে বলা হয়, যে আট অভিযোগে তিনি ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন, তার মধ্যে ১, ৩ ও ৪ নম্বর অভিযোগে তিনি খালাস পেয়েছেন। আর ২, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে তার দণ্ড বহাল রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি অভিযোগে নিজামীর ফাঁসি বহাল রেখেছেআপিল বিভাগ। দুটি অভিযোগে তাঁর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। ফাঁসির সাজার একটি অভিযোগসহ তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাবনায় হত্যা, ধর্ষণ ও বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মাওলানা নিজামীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন জামায়াত নেতা। এ মামলায় গত ৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ তাঁদের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেছিল।

নিজামীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং হত্যা-গণহত্যাসহ সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়) মোট ১৬টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে আটটি, অর্থাৎ ১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

প্রমাণিত চারটি, অর্থাৎ সাঁথিয়া উপজেলার বাউশগাড়িসহ দুটি গ্রামে প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা ও প্রায় ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ (২ নম্বর অভিযোগ), করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ (৪ নম্বর অভিযোগ), ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে গণহত্যা (৬ নম্বর অভিযোগ) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটির (১৬ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

এর মধ্যে আপিল বিভাগ আজ করমজা গ্রামে ১০ জনকে গণহত্যা, একজনকে ধর্ষণসহ বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের (৪ নম্বর অভিযোগ) দায় থেকে খালাস দেয়। বাকি তিনটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল রাখে।

পাশাপাশি পাবনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মাওলানা কছিমুদ্দিন হত্যা (১ নম্বর অভিযোগ), মোহাম্মদপুরের ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে পাকিস্তানি সেনা, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়মিত যাতায়াত ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্রের (৩ নম্বর অভিযোগ) দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিজামীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছিল। কিন্তু আপিল বিভাগ এ দুটি অভিযোগ থেকেও তাঁকে খালাস দিয়েছে।

তবে আপিল বিভাগ বৃশালিখা গ্রামের সোহরাব আলী হত্যা (৭ নম্বর অভিযোগ) এবং রুমী, বদি, জালালসহ সাত গেরিলা যোদ্ধা হত্যার প্ররোচনার (৮ নম্বর অভিযোগ) দায়ে নিজামীকে দেয়া ট্রাইব্যুনালের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল রেখেছে।

বৃহস্পতিবার সারাদেশে জামায়াতের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল
জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার প্রতিবাদে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে দলটি। বুধবার সকালে জামায়াতে ইসলামীর ওয়েব সাইটের মাধ্যমে দলটির ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান এক যুক্ত বিবৃতির মাধ্যমে এ হরতালের ডাক দেন। বিবৃতিতে বলা হয়, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ঠাণ্ডা মাথায় সরকারের নির্ধারিত ছকে হত্যা করে সরকার পরিকল্পিতভাবে দেশকে এক ভয়াবহ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চায়। সরকারের জুলুম, নির্যাতন ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আমরা আগামীকাল ৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা শানিত্মপুর্ণ হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করছি। বিবৃতিতে ঘোষিত কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সফল করার জন্য জামায়াতে ইসলামীর সকল শাখা এবং কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সুশীলসমাজ ও পেশাজীবীসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ তথা দেশের আপামর জনতার প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তবে বিবৃতিতে জানানো হয়, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, ফায়ার সার্ভিস ও সংবাদপত্রের গাড়ি হরতালের আওতামুক্ত থাকবে।
মাওলানা নিজামীর মামলাটির মাধ্যমে সর্বোচ্চ আদালতে ষষ্ঠ আপিল মামলার চূড়ান্ত রায় হলো। ট্রাইব্যুনাল থেকে আপিল বিভাগে আসা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর মধ্যে এর আগে পাঁচজনের মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে।

এর মধ্যে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আর গত বছরের ১১ এপ্রিল জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং ২১ নভেম্বর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। তবে জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া ফাঁসির দণ্ডাদেশ কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছে আপিল বিভাগ। সম্প্রতি এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ করবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

You Might Also Like