নানামুখি বিপাকে কৃষক!

মনসুর হায়দর :

সামান্য ঋণ নিয়ে ফেরত দিতে না পেরে আসামি হয়েছে ২ লাখের বেশি কৃষক। তাদের মধ্যে ফেরারী হয়েছে সাড়ে ১০ হাজার। রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকে এ কৃষকদের কাছে পাওনা ৫৭০ কোটি টাকা। গড়ে প্রতি কৃষকের কাছে পাওনা সাড়ে ২৭ হাজার টাকা।

অব্যবস্থা অবহেলায় ফসলের ক্ষতি হওয়া এবং বাজার মন্দার কারণে অনেক সময় কৃষিঋণ নিয়ে ফেরত দিতে না পেরে ঋণখেলাপি হচ্ছে কৃষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তুত করা কৃষিঋণ সার্টিফিকেট মামলা সংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট ২ লাখ ৫ হাজার ৩৭২ জন কৃষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাদের কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ ৫৭০ কোটি টাকা।

অথচ সম্প্রতি ব্যাংকখাত থেকে সরকারের গুটিকতক প্রভাবশালী লুটপাট করেছে ১২ হাজার কোটি টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হলমার্ক কেলেঙ্কারীর হোতারা ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিনোদনে ব্যয় করেছে ৬০০ কোটি টাকা। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

অথচ গড়ে মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার জন্য কৃষকদের পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। বিধি অনুসারে ৪৯ দশমিক ডেসিমেল জমির মালিকরা ভূমিহীন। এরা সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা ঋণ পান। বলার অপেক্ষা রাখে না, কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নে তাদের ঋণ মওকুফ করা উচিত।”

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংককে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ মন্ত্রী কৃষকদের রেহাই দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দিতে বলে বাংলাদেশ ব্যাংককে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি-২০১৫ ঈসায়ী তারিখে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ৬টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই বৈঠকে মামলা না করার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেয়া হয়।

বৈঠকশেষে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি-২০১৫ তারিখে ডেপুটি গভর্নর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় যে, কৃষকদের বিরুদ্ধে প্রচুর সার্টিফিকেট মামলা হচ্ছে, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হচ্ছে, বিষয়টি উদ্বেগজনক। এজন্য রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে ডেকে আলোচনা। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ব্যাংকগুলোকে বলেছি- কৃষকদের বিরুদ্ধে নতুন আর কোনো মামলা না করে কীভাবে বকেয়া ঋণ আদায় করা যায় সেই ব্যবস্থা করতে। এমন পদ্ধতি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে, যাতে সার্টিফিকেট মামলা না করতে হয়।”

কৃষকের প্রতি শুধু মামলার হয়রানি বন্ধ করলেই কৃষকের প্রতি সরকারের দায়িত্ব পালন শেষ হবে না।

লেখার অপেক্ষা রাখে না, টানা অবরোধ-হরতালে কৃষি ও কৃষকের যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে তা অপূরণীয়। তবে হরতাল-অবরোধে তাদের যে ক্ষতি হচ্ছে তার পুরো চিত্র গণমাধ্যমে না আসাও দুঃখজনক। গণমাধ্যমে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিল্প খাতের ক্ষতি ইত্যাদির চিত্র সহজে ব্যাপক কভারেজে চলে আসে। অথচ দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো কৃষির সঙ্গে জড়িত। যেহেতু কৃষকদের সংগঠন নেই, তাই তাদের ক্ষতির খবর সেভাবে আসে না।

হরতাল-অবরোধে কৃষকের প্রায় লাখো কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। কৃষক পয়সা খরচ করে ফসল উৎপাদন করেছে; কিন্তু তা বাজারজাত করতে পারছে না। ২০১৩ সালের হরতাল-অবরোধেও একই পরিমাণে কৃষকের ক্ষতি হয়েছিল। সে ক্ষতি পুষিয়ে উঠার আগেই আবারো আঘাত এলো। ফলে কৃষক ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। এখন বোরো আবাদের মৌসুম শুরু হয়েছে। সার, জ্বালানি তেল ও বীজের মজুদ থাকলেও পরিবহন সঙ্কটে তা সময়মতো পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বোরো আবাদে এর প্রভাব পড়বে। দারিদ্র্য বাড়বে। বাড়বে সামাজিক অস্থিরতাও। এক্ষেত্রে কৃষকের কথা বিবেচনা করে বিশেষ প্রণোদনা দেয়া উচিত।

সম্প্রতি গার্মেণ্টস ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নগদ সহায়তা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ দশমিক ২৫ শতাংশ করার আশ্বাস দিয়েছে বাণিজ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি প্লাস্টিক খাতসহ দেশের সব অপ্রচলিত শিল্পে প্রণোদনা দেয়া হবে বলে জানিয়েছে বাণিজ্যমন্ত্রী।

প্রসঙ্গত আমরা মনে করি, গার্মেন্টস শিল্প যদি আর্থিক প্রণোদনা পায়, তাহলে কৃষককে আরো আগে আরো বেশি প্রণোদনা দিতে হবে।

উল্লেখ্য, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক কখনোই চায় না- বাংলাদেশ কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোক। কৃষক সমৃদ্ধশালী হোক। তাই তারা কৃষিতে ভর্তুকির বিরুদ্ধে, কৃষিঋণ মওকুফের বিরুদ্ধে। তাদের ষড়যন্ত্র, নির্দেশে এবং সরকারের অজ্ঞতায় এ আত্মঘাতী প্রবণতায় দেশের অনেক কৃষক পেশা ছেড়ে দিয়েছে এবং দিচ্ছে। কিন্তু এর কুফল ও কুপরিণতি ভোগ করতে হবে গোটা অর্থনীতি তথা দেশবাসীকেই।

অথচ ৯৮ ভাগ মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশে কৃষকদের প্রতি এরকম অবহেলা করতে পারে না। কারণ মুসলমানদের ঈমানের মূল উসওয়াতুন হাসানা, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিনি কৃষি ও কৃষক উভয়কেই বিশেষভাবে গুরুত্ব ও ফযীলত বণ্টন করেছেন। সুবহানাল্লাহ!

পবিত্র কুরআন শরীফ উনার মধ্যে কৃষি উৎপাদনকে বিশ্বমানবের প্রতি একটি বিরাট অনুগ্রহ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র দ্বীন ইসলাম কৃষি কাজকে সুপ্রেরণার দৃষ্টিতে দেখেছে।

সঙ্গতকারণেই তাই বলতে হয়, বর্তমান গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারাবাহিকতায় কৃষকদের হক্ব আদায়ে ব্যর্থতার বিপরীতে উন্নত কৃষি ও সমৃদ্ধশালী কৃষক সমাজ গড়ে তুলতে  সাইয়্যিদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, নূরে মুজাসসাম, হাবীবুল্লাহ হুযূর পাক ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনার মহিমান্বিত জীবনী মুবারক আলোচনা ও অনুসরণ করতে হবে। কৃষি ও পরিবেশ বিষয়ে উনার সম্মানিত হাদীছ শরীফ উনার শিক্ষা সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে হবে।

haidermonsur@gmail.com

You Might Also Like