হোম » নতুন নেতৃত্বের সামনে গুরুদায়িত্ব

নতুন নেতৃত্বের সামনে গুরুদায়িত্ব

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী- বুধবার, নভেম্বর ২, ২০১৬

সাম্প্রতিক জাতীয় সম্মেলনের সাফল্য থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কেউ যদি ভেবে থাকে, তাদের সব মুশকিলের আসান হয়ে গেছে, তাহলে তারা ভুল করবে। আসলে এ সম্মেলনের পরই তাদের সামনে আরো গুরুদায়িত্ব পালনের তাগিদ এসে গেছে। এই দায়িত্ব পালনের জন্য দলের নেতৃত্বের কাঠামোতেও একটা পরিবর্তন আনা হয়েছে। একজন কর্মনিষ্ঠ ও কর্মীঘনিষ্ঠ তরুণ নেতাকে সাধারণ সম্পাদক পদে আনা হয়েছে। প্রেসিডিয়ামেও পুরনো ও নতুন মুখের সমন্বয় করা হয়েছে। শেখ হাসিনা অবশ্য দলের সভানেত্রী পদে আছেন। সেটা সময়ের তাগিদ। কিন্তু এবারের সম্মেলনে আওয়ামী লীগকে আবার চাঙ্গা করে তোলার উদ্যোগ লক্ষ করা গেছে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে এবং শেখ হাসিনার শক্তিশালী নেতৃত্ব দলে বর্তমান। সাধারণ সম্পাদক পদেও একজন কর্মদক্ষ ব্যক্তি এসেছেন, এটা আওয়ামী লীগের জন্য পুনর্গঠিত হওয়ার একটা মহাসুযোগ এনে দিয়েছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা হলে ভারতের কংগ্রেসের মতো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের ভাগ্যেও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে, এটা দলের সব নেতাকর্মীকে স্মরণ রাখতে হবে।
একটি নতুন দল গঠনের চেয়ে একটি বড় এবং পুরনো দল পুনর্গঠন অনেক বেশি কষ্টকর। কারণ একটি পুরনো এবং বড় দলে অনেক জঞ্জাল জমে, সেই জঞ্জাল দূর করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। যে দলে এই জঞ্জাল দূর করা সম্ভব হয় না এবং তাতে নতুন রক্তের সঞ্চালন হয় না, সেই দলের অবস্থা হয় মরা গাঙের মতো। তাতে আর জোয়ার-ভাটা হয় না। নদী মরে যায়।
আওয়ামী লীগের সৌভাগ্য, তার দীর্ঘ ৬৭ বছরের জীবনে অনেক জোয়ার-ভাটা এসেছে। পতন-উত্থান ঘটেছে, দল থেকে আগাছা দূর করা হয়েছে। তাই দলটি মরে যায়নি। এই দলে এখন আবার আগাছা জন্মেছে, তা অবিলম্বে দূর করতে হবে। তাহলে দলটি মরবে না। নতুনভাবে জেগে উঠবে, নীতি ও নেতত্বের শক্তি দলটিতে এখনো আছে। আওয়ামী লীগের জন্য এটা একটা বড় প্লাস পয়েন্ট।
দলের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যে সম্যক সচেতন, তার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন গত রবিবার ৩০ অক্টোবর ঢাকায় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময়। তিনি বলেছেন, একটা বড় দলে সব সময় আগাছা জন্মে। আওয়ামী লীগেও জন্মেছে। তা দূর করতে হবে। এটা যে তাঁর মুখের কথা নয়, বরং মনের কথা, এটা তাঁকে অল্পদিনের মধ্যে প্রমাণ করতে হবে। দলকে জঞ্জালমুক্ত করা, নতুনভাবে গোছানো তাঁর কাছে প্রায়রিটি পাবে, এটা সবাই আশা করে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ও সাধারণ নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা বিরাট দূরত্ব তৈরি হয়ে রয়েছে, এই দূরত্বটা ওবায়দুল কাদেরকে অবিলম্বে দূর করতে হবে। তাঁর সৌভাগ্য, তাঁর মাথার ওপর শেখ হাসিনার মতো দক্ষ ও অভিজ্ঞ নেতৃত্ব রয়েছে। এই নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি এখন আরো শক্তিশালী হয়েছেন। এই শক্তিকে তাঁর কাজে লাগাতে হবে।
পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধুর ব›ি“শার সুযোগে (আইয়ুবের শাসনামলে) দলের সালাম খান, জহিরুদ্দীন প্রমুখ প্রবীণ নেতার দ্বারা যখন আওয়ামী লীগ ভাঙার চেষ্টা হয় এবং পিডিএমপন্থী আওয়ামী লীগ নামে একটি পাল্টা দল খাড়া করা হয় তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের নেতৃত্ব শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু জেলে বন্দি শেখ মুজিবকে সভাপতি করে দল পুনর্গঠিত হয় এবং তাজউদ্দীন আহমদ হন সাধারণ সম্পাদক। তিনি সাধারণ সম্পাদক হয়েই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘আমার মাথার ওপরে শেখ মুজিবের মতো নেতৃত্ব রয়েছে। দল পুনর্গঠনে আমি ব্যর্থ হব কেন?’
আওয়ামী লীগের এককালের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদের কথাটি সুদীর্ঘকাল পর আজ দলের নতুন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। তাঁর মাথার ওপরেও শেখ হাসিনার মতো শক্তিশালী নেতৃত্ব রয়েছে। দলকে আগাছামুক্ত করার ব্যাপারে তাঁর এগিয়ে যেতে দ্বিধা করার কিছু নেই। আমি ওবায়দুল কাদেরকে তাঁর সাংবাদিকতার জীবন থেকেই জানি। ছাত্ররাজনীতিতেও তাঁর অবদান আমি লক্ষ করেছি। গত সাধারণ নির্বাচনের আগের নির্বাচনে তিনি যখন বিএনপির সামনের কাতারের নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে পরাজিত করেন তখন তাঁকে আমি ‘মওদুদ-বিজয়ী বীর সেনানী’ আখ্যা দিয়েছিলাম। যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবেও তিনি তাঁর কর্মদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। এ জন্যই আওয়ামী লীগের নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও তিনি সফল হবেন, এ আশা আমি রাখি।
আওয়ামী লীগের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পুনর্গঠিত হওয়া এবং জনগণের কাছাকাছি যাওয়া। আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকারের সাফল্য অনেক। কিন্তু সেই সাফল্যগুলোকে দেশের মানুষ দলের সাফল্য হিসেবে দেখছে না। দেখছে সরকার ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সাফল্য হিসেবে। দলের সম্পর্কে তাদের অভিযোগ, দলের এক শ্রেণির নেতাকর্মী, এমপি ও মন্ত্রী ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন, দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিভাবক সেজেছেন। তাঁরা সরকারের অনেক উন্নয়ন কর্মসূচির ফসল জনগণের দুয়ারে পৌঁছতে দিচ্ছেন না। বড় অভিযোগ, দলে সুযোগসন্ধানী নব্য ধনীরা এসে জাঁকিয়ে বসেছে; পুরনো ও পরীক্ষিত কর্মীরা দলে উপেক্ষিত।
এই অভিযোগগুলো একেবারে অসত্য নয়। আওয়ামী লীগ এখন অভ্যন্তরীণভাবে কয়েকটি বিপদের সম্মুখীন। এক. দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে দলের ভেতরে আত্মসন্তোষ ও শৈথিল্য দেখা দিয়েছে; ক্ষমতার অপব্যবহারও চলছে। সরকার ও সংগঠনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে এবং সরকার জনসমর্থন ধরে রাখার জন্য সক্রিয় থাকলেও সংগঠনের জনসমর্থন কমছে। এ অবস্থা আগামী নির্বাচনে দলের জন্য ভালো নয়।
দুই. নব্য ধনী ও সুযোগসন্ধানীরা ভিড় জমানোর ফলে দলের সুনাম ও জনপ্রিয়তা কমছে; জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। তিন. সবচেয়ে বড় সমস্যা আওয়ামী লীগে ব্যাপকভাবে জামায়াতিদের অনুপ্রবেশ। এই অনুপ্রবেশের নীতিটা জামায়াতিরা কৌশল হিসেবে গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে তারা বিএনপিকে প্রভাবিত করার এই কৌশলটা গ্রহণ করে কার্যত কিছুকাল দেশটাকে হাতের মুঠোয় রেখেছিল। এখন আওয়ামী লীগের আমলেও তারা একই কৌশল একটু সূক্ষ্মভাবে অনুসরণ করতে চাইছে।
বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধার নামে জামায়াত ধীরে ধীরে অল্প বুদ্ধির তারেক রহমানকে বশ করে এবং তাঁর মাধ্যমে বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক প্রবীণ নেতাদের কোণঠাসা করে ফেলে দলটিকে নিজেদের মুঠোয় নিয়ে নেয়। খালেদা জিয়া সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েন জামায়াতের ওপর। জামায়াতের কর্মসূচি হয়ে দাঁড়ায় বিএনপির কর্মসূচি। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা, সন্ত্রাসের সাহায্যে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটানোর ষড়যন্ত্র করা, জামায়াতের এসব কর্মকাণ্ডে বিএনপি ছিল সহযোগী। ফলে বিএনপি আজ পতিত রাজনৈতিক সংগঠন।
যে কৌশলে জামায়াত বিএনপিকে গ্রাস করেছিল, সেই কৌশল আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে খাটানোর সুযোগ নেই। অর্থাৎ আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে জামায়াতের কৌশল তাই আপাতত দলে দলে কর্মী ও ছোট ও মাঝারি গোছের নেতাকে আওয়ামী লীগে ঢুকিয়ে দেওয়া। অনেকে আশঙ্কা করেন, জামায়াতের ছাত্রশিবিরের বহু সন্ত্রাসী ক্যাডার এখন নাম ভাড়িয়ে ছাত্রলীগে ঢুকে পড়েছে। সে জন্যই ছাত্রলীগের মতো সংগ্রামী প্রতিষ্ঠানের আজ এ অবস্থা।
ওবায়দুল কাদের কি পারবেন এই বিষাক্ত জামায়াতি সংক্রমণ থেকে দলকে মুক্ত করতে এবং মুক্ত রাখতে? পারবেন দলে নব্য ধনী ও সুযোগসন্ধানীদের প্রভাব খর্ব করে তাতে ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে? দলের যে নেতাকর্মী, মন্ত্রী ও এমপিরা দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত, তাঁদের বিরুদ্ধে সংগঠনকে চাবুক হিসেবে ব্যবহার করতে? মনে হতে পারে এটা অসম্ভব কাজ। এক দিনে হওয়ার কাজও এটা নয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব যদি সংকল্পবদ্ধ হয় এ কাজটি তারা করবে এবং সে জন্য সাহসের সঙ্গে এগোবে, তাহলে পঙ্গুর গিরি লঙ্ঘনের প্রবাদটি একদিন সত্য হয়ে উঠতে পারে।
আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্বের শাসনে যে গুরুদায়িত্বটি এখন সমুপস্থিত, তা হলো জীর্ণতা ও জরার কবল থেকে দলটিকে মুক্ত করে তাকে আবার পুনরুজ্জীবিত করা। আওয়ামী লীগ বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও গণ-অধিকার রক্ষা পাবে—এই মহাসত্য যেন আওয়ামী লীগের নতুন নেতৃত্ব স্মরণ রাখে।