নগরপিতারা পিছু হটতে পারেন না

জসিম উদ্দিন :

রাজধানী ঢাকা পানিতে তলিয়ে গিয়ে তার সব জটিল সমস্যা যেন একসাথে সবার সামনে তুলে ধরল। এ দিন নিত্যদিনের যানজট স¤পূর্ণ এক ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ পেল। নগরবাসী ‘স্বাদ নিলো’ স¤পূর্ণ এক ভিন্ন দুর্ভোগের। সম্প্রতি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে পাওয়া নগরপিতাদের প্রতি এই দুর্ভোগে সবার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়।

একজন নগরপিতা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন ‘সমস্যা চিহ্নিত; এবার সমাধানের পালা’। ঢাকা শহর তার এই স্লেøাগান সংবলিত পোস্টারে ছেয়ে যায়। তার প্রতিযোগী ছিলেন বয়সে তরুণ, পশ্চিমের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। এই তরুণ নবাগতের ভাবভঙ্গি আকৃষ্ট করেছিল নগরবাসীকে। ষাটের কোটার সরকারদলীয় প্রার্থী এক ধাপ অগ্রসর তারুণ্যে উদ্ভাসিত প্রতিযোগীকে বিট করার জন্য নানা কসরত দেখিয়েছিলেন নির্বাচনী প্রচারণায়। স্পোর্টস কেডস ও জার্সি গায়ে দিয়ে নেমেছিলেন রাজপথে। ঝাড়– দিয়ে দেখিয়েছেন, কোনো সমস্যা হবে না, তিনি পারবেন। শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়; গায়েগতরে খেটে এর যে বাস্তব সমাধানও তিনি করতে পারবেন, সেই বিশ্বাস জন্মানোর জোর প্রচেষ্টাও তিনি নিয়েছিলেন। ভোটের দিন অবশ্য এটা স্পষ্ট বোঝা গিয়েছিল, তার এমন কঠোর প্রচেষ্টার কোনো দরকার ছিল না। আগে থেকেই মেয়র হিসেবে তিনি সিলেক্ট হয়ে আছেন। নির্বাচনের নামে ওটা ছিল একটি ‘গণতান্ত্রিক খেলা’র আয়োজন।

দক্ষিণের নবনির্বাচিত মেয়র সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফের পুত্র। তিনি অনেকটা হেভিওয়েট বাবার উত্তারাধিকার বলে ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার চেয়ে পিতার প্রভাব প্রতিপত্তির মর্যাদা দেয়া হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর এই বাছাইয়ে। এ অবস্থায় উত্তরের প্রতি আস্থা ও নির্ভরতা জন্মেছিল নগরবাসীর বেশি। সবার ধারণা ছিল, নির্বাচন যা-ই হোক ঢাকা উত্তরে পরিবর্তনের একটা ছোঁয়া লাগবে। এখন হতাশা উত্তরকেও গ্রাস করছে। কারণ দক্ষিণের সব জঞ্জালের বিস্তৃতি ঘটছে উত্তরেও।

নাগরিকদের পক্ষ থেকে জোরেশোরে সমস্যা সমাধানের দাবি ওঠার পর উভয় পিতা এখন একই সুরে বলছেন, ঢাকার নাগরিক সমস্যার সমাধান তাদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। একজন কলামিস্ট নির্বাচন-পূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা এই সময়ে তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন। দৈনিক যুগান্তরে এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এই মেয়রদ্বয়ের সাথে আমন্ত্রিত ছিলেন। উভয়ে তখন প্রতিশ্রুতি দিতে গিয়ে কোনো কিছু আর বাদ রাখেননি। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন তখন প্রতিশ্রুতি দেয়ার ব্যাপারে তাদের সতর্ক করে দেন। নির্বাচন কমিশনে কাজ করার কারণে এই সাবেক সামরিক আমলার অভিজ্ঞতা ছিল বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের কাজের সামর্থ্যরে ব্যাপারে। লিখে একটি গল্পের অবতারণা করে এ কাজ কতটা জটিল, তিনি তা তুলে ধরেছেন সহযোগী একটি দৈনিকে।

নগরপিতাদের সিলেকশনের আগে থেকে উন্নয়নের এক ‘তাণ্ডব’ চলছে ঢাকা শহরজুড়ে। নাগরিকদের জীবনযাত্রাকে সহজ করার নামেই হচ্ছে এসব আয়োজন। এর সুফল কখন নগরবাসীর নসিবে জুটবে তা ধারণা করা যাচ্ছে না। কারণ এর কাজ শুধু চলছে, শেষ হওয়ার বা স¤পূর্ণ হয়ে আসার লক্ষণ কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এই উন্নয়নকাণ্ডের তোড়ে প্রতিদিন নগরবাসীকে নাকাল হতে হচ্ছে। হাতিরঝিল থেকে বনশ্রীতে বের হওয়ার ফাইওভার কয়েক বছর ধরে হচ্ছেই। এক শ’ ফুটের একটি রাস্তার ওপর দিয়ে উড়াল সেতুটি হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। এ কাজ করতে গিয়ে রাস্তার ওপর একের পর এক কত অপারেশন দেখতে হলো। কত হাজার ঘণ্টা কোরবানি দিতে হলো যাত্রীদের তার সীমা-পরিসীমা নেই। ফাইওভারের জিনিসপত্র মুলোর মতো রাস্তার ওপরই ঝুলছে।

রাস্তায় কাজ শুরু হয় সকাল ৯টা থেকে ১০টায়। এই সময়টা ঢাকা শহরের সবচেয়ে ‘রাশ আওয়ার’। অফিসগামীরা হুড়মুড় করে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটেন সময়মতো হাজির হওয়ার জন্য। দোকানপাটের কর্মচারীরা এ সময় রাস্তায় নেমে আসেন। নাগরিকেরা গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য একই সময় বেরিয়ে আসেন। শ্রমিকেরা শাবল খুন্তি নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু করে দেন আয়েশের সাথে ঠিক এই সময়। একটা মাত্র গর্ত খোঁড়ার জন্য মহাসড়কের অর্ধেক জায়গা আটক করে দেয়া হয়। উন্নয়নকাজের এই চিত্র দেখতে দেখতে মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসার অবস্থা। এ ভোগান্তি কতটা চরম, ওই সব রাস্তায় যারা চলাচল করেন তারা বুঝতে পারেন।

রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সামনে দিয়ে ফাইওভারের কাজ চলছে ঠিক একই নিয়মে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক এখন যেন কতগুলো বড় বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তার বেশির ভাগ তলিয়ে যায়। গর্তের সাইজ এমন যে, রিকশাসহ ছোট যানবাহন তলিয়ে যায়। বড় যানবাহনও খানাখন্দে আটকা পড়ে। জলজটের সাথে যানজটের এক ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বৃষ্টি হলে। এমন পরিস্থিতি এখন ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়কগুলোর প্রায় প্রতিটিতে। ওয়াসা, ডেসা ও গ্যাসলাইনের কাজও এর মধ্যে চলছে। এ কাজ এখন বিস্তৃত হয়ে পড়েছে পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত। যে পাড়ায় আগে বাস করত পাঁচ হাজার, সেখানে এখন বাস করে ৫০ হাজার মানুষ। জনসংখ্যায় দ্রুত বেড়ে ওঠা শহরটির পাঁচ হাজার লোকের রাস্তায় যখন ৫০ হাজার মানুষ চলছে, সরু এ রাস্তায় বিভিন্ন সংস্থা খানাখন্দ করে কাজ করছে। কিন্তু তারা মোটেও চিন্তা করেন না এত মানুষ কিভাবে দৈনন্দিন কাজে রাস্তায় চলাচল করবে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাজের ধরন দেখে মনে হয়, যেন জনগণের রাস্তায় চলাচলেরই প্রয়োজন নেই। অথবা তারা যখন কাজ শেষ করবেন, কেবল তখনই নগরবাসী রাস্তায় নামবেন। বোঝা মুশকিল যে, মানুষের জন্য রাস্তা, না রাস্তার জন্য মানুষ।

গত এক বছরে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ এমনভাবে চলছে যে, পাড়া-মহল্লার বেশির ভাগ রাস্তা অচল হয়ে আছে। রিকশা, ট্যাক্সি, ভ্যানও চলতে পারে না। এমনকি হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার সুযোগ রাখা হয় না। প্রশ্ন জাগে, শুধু ঢাকা শহরেই কি উন্নয়ন কাজ হচ্ছে; পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে উন্নয়ন কাজ হয় না? এমন জনবহুল রাস্তায় একটি সংস্কার কাজ হাতে নেয়ার আগে অন্তত সাতবার ভাবা উচিত। তবে এটা বোঝা যায় যে, একবারও ভাবা হয় না; অন্তত সাধারণ জনতার কথা তো কেউ ভাবে না।

১০ বছর আগে এসব পাড়া-মহল্লায় গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি ছিল নাÑ বিষয়টা এমন নয়। রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মূল লক্ষ্য এসব সেবার মান বাড়ানো। সত্যিই এটা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। সেটা করতে গিয়ে বছর ধরে মানুষকে ‘জিম্মি’ করে রাখা হবে কোন যুক্তিতে। নগরবাসীর স্বস্তির জন্য নতুন নগরপিতারা এ নিয়ে দেনদরবার করতে পারেন। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের এ ঝড় যারা বইয়ে দিচ্ছেন, সরকারের সেসব অংশীদারের সাথে তারা এ নিয়ে বসতে পারেন। তাদের এসব প্রয়াসের উদ্দেশ্য হবে প্রতিটি কাজ করার সময় জনগণের দুর্ভোগকে সর্বনি¤œ মাত্রায় নামিয়ে আনা। এ জন্য প্রথমত, সরকারের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয় করার উদ্যোগ নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, প্রতিটি পাড়ায় যেন এমন সমন্বয়ের প্রভাব পড়ে।

জনবহুল রাস্তায় সংস্কারের কাজ এমন সময় করতে হবে যাতে নগরবাসীর চলাচলে কোনো বিঘœ না ঘটে। পাড়া-মহল্লায় অনায়াসে উন্নয়নকাজ গভীর রাতে করা যায়। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক মগবাজার, মহাখালী কিংবা কুড়িল বিশ্বরোডে যেসব কাজ চলছে, সেগুলো পুরোপুরি গভীর রাতে করা যেতে পারে। রাতের ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত সময়ে এ কাজ করা হলে মানুষের ভোগান্তি অনেক কমে যাবে। সারা বিশ্বে ব্যস্ত রাস্তায় কাজ করার এমন নিয়ম প্রচলিত রয়েছে। নগরপিতারা জনসাধারণের সুবিধার্থে এ নিয়ম চালু করতে শক্ত অবস্থান নিতে পারেন।

জলাবদ্ধ ঢাকার মানুষ যখন বহুমাত্রিক জটিল অবস্থায় পতিত, তখন উত্তরের পিতাকে দেখা গেল কাওরানবাজার উঠিয়ে দেয়ার খবর দিতে। প্রকাশ্যে তিনি যদিও বলছেন ঢাকা শহরবাসীর সমস্যা সমাধান করা তাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু অর্ধশতাব্দীর প্রাচীন বাজারটি উঠিয়ে দেয়ার কথা বলতে তিনি কোনো অস্বস্তি বোধ করেননি। তিনি একেবারে অক্টোবরের মধ্যেই কাজটি শেষ করার কথা জানিয়েছেন। ঢাকা শহরের সৌন্দর্য বিকাশের জন্য কাওরানবাজারকে সরিয়ে দেয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্ভবত ওই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীসহ সবাই বোধ করেন। সেটা এক দিনের সিটিংয়ে একটি ঘোষণা দিয়ে সম্ভব নয়।

কাজটি করার আগে নগরপিতাকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট সবাইকে একটা সময় দিতে হবে। বিশাল বাজারটি প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন জায়গা নির্ধারণ করতে হবে। সেখানে নতুন করে উপযুক্ত স্থাপনা নির্মাণের ব্যবস্থা করতে হবে। কাওরানবাজার একটি গোষ্ঠীর জন্য চাঁদাবাজির লোভনীয় উৎস। একে কেন্দ্র করে নানা ধরনের অপরাধের বিস্তারও ঘটে। সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হচ্ছে, রাজাধানীর এ গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় শত শত ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের আগমন ঘটে, যা রাস্তার স্বাভাবিক যান চলাচলে বিঘœ ঘটায়। এরপরও এটিকে সরিয়ে নেয়ার গঠনমূলক পরিকল্পনা নিয়ে কেউ অগ্রসর হয়নি। বর্তমান নগরপিতা এটিকে একটি ফুৎকার দিয়ে উড়িয়ে দিতে পারেন না। একটা সময় দিয়ে সুপরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে।

ঢাকা সিটির উত্তর-দণি ভাগের সুফল এখন পর্যন্ত নগরবাসী কিছু টের পাননি। সরকারই বা এর দ্বারা কিভাবে লাভবান হয়েছে সাধারণ মানুষের তা বোঝার উপায় নেই। তবে এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের ‘ভাগবাটোয়ারা’র বিস্তৃতি ঘটেছে কি না তা সংশ্লিষ্টরা বলতে পারবেন। গুলশান এক নাম্বারে সিটি করপোরেশনের প্রসিদ্ধ একটি মার্কেট আছে। এটি ডিসিসি মার্কেট নামে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। মার্কেটের বিশাল সাইনবোর্ডে একটি পরিবর্তন দেখা গেল। ‘ডি’এবং ‘সিসি’অক্ষরগুলোর মাঝখানে এখন বসছে ‘এন’ অক্ষরটি। ডিসিসি বলে যতটা সহজে উচ্চারণ করা যেত, এখন একটু বাড়তি চোট পেতে হয় নামটি মুখে নিতে। তবে উন্নয়নের এই সুপারফিসিয়াল দিকটি মানুষ দেখছে। এ জন্য হয়তো মার্কেট কর্তৃপক্ষকে বাড়তি কিছু টাকা খরচ করতে হয়েছে। তাদের প্রয়োজনীয় পুরনো নথিপত্র ফেলে দিয়ে তাতে ‘এন’অন্তর্ভুক্ত করে নতুন করে ছাপতে হয়েছে।

‘একার পক্ষে কিছুই সম্ভব নয়’Ñ নির্বাচনের আগে পিতাদের এমন বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারলে সবচেয়ে ভালো হতো। তবে এখন তারা এমন মন্তব্য করে কোনোভাবেই নগরবাসীকে হতাশ করতে পারেন না। এই পিতারা যদি তার সন্তানের জন্য কিছু করতেই না পারেন তাহলে অক্ষম পিতার কী দরকার? তারা অন্তত একটা লড়াইয়ে নামবেন, এমন প্রত্যাশা নগরবাসী করেন। আর যদি সমস্যার পাহাড় দেখে ঘাবড়ে গিয়ে ক্ষান্ত হন; মানুষ ভাববে পিতারা তাদের বায়োডাটায় ‘মেয়র’ পদবিটি অন্তর্ভুক্ত করে সন্তুষ্ট থাকছেন। এমনও ভাবতে পারেন, নিজেদের সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর জন্য তারা নগরের পিতা হয়েছেন।

You Might Also Like