হোম » ধূসর সাংবাদিকতা

ধূসর সাংবাদিকতা

admin- মঙ্গলবার, এপ্রিল ৪, ২০১৭

তানভীর আহমেদ

 জেফরি আর্চার ‘ফোর্থস্টেট’ গ্রন্থে মিডিয়া বা প্রেসকে বলেছেন, ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।’ ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের আহ্বান জানিয়ে জনগণের কণ্ঠকে উচ্ছ্বসিত করেছিল। সে সময় ফরাসি দার্শনিকেরা বলেছিলেন, জনগণের কণ্ঠই হলো বিধাতার কণ্ঠ। আর সেই জনগণের কণ্ঠকেই ধারণ করে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম। ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় গণতন্ত্র, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের বিপ্লব জয় লাভ করে। যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের স্বাধীনতা বা লিবার্টিকে ধারণ করে এগিয়ে গেছে সে দেশের সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম।

আমরা ষাটের দশকে শুনলাম ‘ইয়েলো জার্নালিজম’বা হলুদ সাংবাদিকতার কথা। মিথ্যা ও বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করা কিংবা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর চরিত্র হনন করাই হলুদ সাংবাদিকতা। এই কথিত সাংবাদিকতার মাধ্যমে মিথ্যা সংবাদ বা তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়। বিশেষ মহল বা গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা করাই হলুদ সাংবাদিকতার উদ্দেশ্য। প্রতিবাদ দমন ও জনগণকে বিভ্রান্ত করাই এর লক্ষ্য যাতে জনগণ আসল সংবাদ বা তথ্য জানতে না পারে, জনগণ যেন অন্ধকারে থাকে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সারির পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো এই নীতি অনুসরণ করত, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ যাতে ওই ভয়াবহ যুদ্ধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পায়; মার্কিন সৈন্যদের নিপীড়ন নির্যাতনের খবর যাতে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ জানতে না পারে। হিটলারের তথ্যমন্ত্রী গোয়েবলস বলেছিলেন, ‘একটা মিথ্যাকে বারবার প্রচার করলে তা সত্যের রূপ নেয়।’

ইরাক যুদ্ধের সময় আমরা আরেক ধরনের সাংবাদিকতার সাথে পরিচিত হলাম, যাকে পাশ্চাত্যের সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক, সিমন হার্স, পলক্রেইগ রবার্টস প্রমুখ আখ্যায়িত করেছেন এমবেডেড জার্নালিজম বা অবরুদ্ধ সাংবাদিকতা হিসেবে। মিথ্যার বেড়াজালে সংবাদ পরিবেশন এবং সত্যকে গলাটিপে হত্যা করা, এটাই হলো পাশ্চাত্যের নব উদ্ভাবিত সাংবাদিকতা।

আমাদের বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে যা চলছে তা হলুদ সাংবাদিকতা ও অবরুদ্ধ সাংবাদিকতাকে অতিক্রম করে ধূসর সাংবাদিকতা বা গ্রে জার্নালিজমের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। একশ্রেণীর সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল তথা মিডিয়াতে এমনভাবে সত্যকে বিকৃত আর মিথ্যাকে উপস্থাপন করা হয় যেটাকে গ্রে জার্নালিজম বা ধূসর সাংবাদিকতা বলে আখ্যায়িত করা যায়। সেই লগি-বৈঠার আন্দোলনে রাজধানীর রাজপথে ছয়জন কর্মীকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করার সময়ে এর নগ্ন প্রকাশ দেখা গেছে। সংবাদ ও তথ্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা থেকে সত্য বের করা কঠিন। এখন তা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।

আমাদের দেশে কিছু পত্রিকা ও মিডিয়া সচেতনভাবে সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করেছে, যাতে অযথা ঝামেলায় পড়তে না হয়। মামলা-মোকদ্দমা ও গ্রেফতার এড়ানোর জন্য পত্রিকা বা মিডিয়া কর্তৃপক্ষ এবং সংবাদকর্মীরা, এই পন্থা অবলম্বন করতে বাধ্য হয়েছেন। তারা খুবই সতর্কতার সাথে সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। সংবাদের গভীরে ও পেছনে এখন তারা যেতে চান না। কারণ ‘চাচা, আপন জান বাঁচা’ বলে একটা কথা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে।

অপর দিকে, সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ সুযোগ-সুবিধা ও পদ-পদবিসহ বিভিন্ন কারণে সরকারের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। আদর্শগত কারণে তাদের অনেকে সরকারের পক্ষে। দলীয় কারণেও একটা অংশ সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে। তারা প্রতিনিয়ত সরকারের গুণকীর্তন করছেন। সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ও সাফল্যের ফিরিস্তি দেশবাসীর কাছে তুলে ধরছেন। এভাবে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেলসহ মিডিয়ার একটা বৃহৎ অংশ সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

অনেক পাঠক এ ধরনের একতরফা প্রচারণা দেখে পত্রিকা পড়া বন্ধ করে দিয়েছেন। তারা টিভি চ্যানেলের সংবাদ, টকশো, আলোচনা দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন। এর বদলে তারা এখন ভারতীয় চ্যানেল, বিবিসি, সিএনএন এবং আলজাজিরা দেখেন। মোট কথা, জনগণের একটা বড় অংশ স্বদেশের মিডিয়ার ওপর বিরক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও মিডিয়ার বড় অংশ যে অবস্থায় পৌঁছেছে, সেটাকে আমরা ধূসর সাংবাদিকতা বলতে পারি। হলুদ সাংবাদিকতা; এমবেডেড জার্নালিজম, অতিক্রম করে আমরা এখন ধূসর সাংবাদিকতায় পৌঁছে গেছি। এই ধূসর জগতে প্রকৃত সত্য জানার উপায় নেই। সব কিছু ধূসর বা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, তাই এটাকে আমরা গ্রে সাংবাদিকতা বলতে পারি।

গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সরকারের সমালোচনা করে এমন বেশ কিছু পত্রিকা, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-২০১৬ (প্রস্তাবিত), ব্রডকাস্ট অ্যাক্ট-২০১৬ (প্রস্তাবিত), ওয়ার ক্রাইম ডিনায়েল অ্যাক্ট-২০১৬ (প্রস্তাবিত) প্রভৃতি মিডিয়াকে একটা ভীতিকর অবস্থার মধ্যে রেখেছে। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা গত দুই বছরে সংঘটিত হয়েছে ৩৬১টি। এ কারণে অনেক পত্রিকা ও মিডিয়া সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করে চলছে।

দেশে মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতার পরিবেশ অনুকূল নয়। অপর দিকে, সরকারের সমর্থকরা খুবই জোরালোভাবে সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। নিয়ন্ত্রিত ‘গণতন্ত্র’ ও কার্যত একদলীয় শাসনের প্রবণতার মধ্যে বাংলাদেশের মিডিয়া ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ১৯৭৫ সালে দেশে যখন আনুষ্ঠানিকভাবে একদলীয় শাসন কায়েম হয়, সে সময় মাত্র চারটি দৈনিক সংবাদপত্র ছাড়া বাকি পত্রিকাগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। স্মর্তব্য, বিখ্যাত লেখক জর্জ অরওয়েল বলেছিলেন, কোনো দেশে গণতন্ত্র আছে কি না তার ব্যারোমিটার হলো সে দেশের সংবাদপত্র কতটুকু স্বাধীন।’

ধূসর সাংবাদিকতার ফলে যা ঘটছে তাতে প্রথমত সত্য বিকৃত ও বিলুপ্ত হচ্ছে এবং মিথ্যাই প্রাধান্য পাচ্ছে। জনগণ সঠিক তথ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকতার মহান পেশা তার দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। সাংবাদিকদের বিবেক বিসর্জন দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তৃতীয়ত, সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। তারা নিপীড়ন ও নিষ্পেষণের শিকার হচ্ছে। জনগণ কার্যত অবরুদ্ধ পরিবেশে বাস করছে। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা ও নিপীড়নকে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সমাজ স্থবির হয়ে পড়ছে, আর অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। সামাজিক নীতি ও নৈতিকতা এবং মূল্যবোধ ভেঙে পড়েছে। ফলে খুন, গুম, হত্যা, ধর্ষণসহ নানা অপরাধ বেড়েই চলছে। প্রভাবশালী ও ক্ষমতাশালীরা সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ছে অসহায়। কালো টাকা ও মন্দ পুঁজি সব কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ধূসর সাংবাদিকতার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পুরো সমাজ ও রাষ্ট্র অজানা গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। জনগণ নির্বাক হয়ে পড়েছে। একশ্রেণীর বিবেকহীন লোক, মতান্ধ দলকানা লেখক ও বুদ্ধিজীবী উল্লাস করছেন। কিন্তু ইতিহাসের কাছে একদিন সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে। চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম হারিয়ে ফেলেছে গৌরবময় ঐতিহ্য।

লেখক : সাংবাদিক

সর্বশেষ সংবাদ