দেশে গত ৬ মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যা ১০৮ : অধিকার

দেশে গত ছয় মাসে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন ১০৮ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত গড়ে প্রতি মাসে ১৮ জন এমন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। বুধবার মানবাধিকার সংস্থা অধিকার’র ষান্মাসিক এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানান।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে দেশে ১০৮ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ক্রসফায়ারে ৬৬ জন, ৩৯ জন পুলিশের হাতে, ১৪ জন র‌্যাবের হাতে ও যৌথ বাহিনীর হাতে আট জন। র‌্যাব-বিজিবির হাতে দুইজন ও কোস্টগার্ডের হাতে নিহত হয়েছেন তিনজন। নির্যাতনে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে পুলিশের হাতে ছয় এবং র‌্যাবের হাতে একজন। ৩০ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে পুলিশের গুলিত ২০ জন, র‌্যাবের গুলিতে চারজন, বিজিবির গুলিতে দুইজন, যৌথ বাহিনীর গুলিতে তিনজন ও সেনা সদস্যের হাতে একজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে পাঁচ জনকে।

প্রতিবেদনে নির্যাতন ও অমানবিক এবং মর্যাদাহানিকর আচরণ ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুম করার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদনে গত ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩২ জন নিহতের কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উপজেলা নির্বাচন ২০১৪, নারায়ণগঞ্জের-৫ আসনের উপনির্বাচন, মিরপুরে বিহারী ক্যাম্পে হামলা, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি সহিংসতা, সভা-সমাবেশে হামলা ও নিষেধাজ্ঞা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, সংগঠন ও মত প্রকাশের ব্যাপারে সরকারের নেতিবাচক মনোভাব, বাংলাদেশ-ভারত ও মিয়ানমার সম্পর্ক, শ্রমিক অধিকার ও নারীর প্রতি সহিংসতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গত ছয় মাসে ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছে ৬৬ জন। এদের মধ্যে জানুয়ারিতে ২০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৩, মার্চে সাত, এপ্রিলে ১৪, মে মাসে পাঁচ ও জুনে সাত জন নিহত হয়েছেন। নির্যাতনে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে দুই জন, মার্চে এক জন, মে মাসে দুই জন ও জুনে দুই জন। গুলিতে নিহত হয়েছেন ৩০ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে এক জন, মার্চে ছয় জন, এপ্রিলে চার জন এবং মে মাসে এক জন নিহত হয়েছে। এছাড়া পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে পাঁচ জনকে। এর মধ্যে এপ্রিল মাস বাদে প্রতিমাসে একজন করে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া গত ছয় মাসে ২৮ জন গুম হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক জন, ফেব্রুয়ারিতে সাত, মার্চে দুই এবং এপ্রিল মাসে ১৮ জন গুম হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে জেল হেফাজতে ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩২ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া আহত হয়েছে পাঁচ হাজার ২২৪ জন। এদের মধ্যে জানুয়ারিতে নিহত হয়েছে ৫৩ জন,  ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন, মার্চে ২২ জন, এপ্রিলে ১৭ জন, মে মাসে ১৭ জন ও জুনে ১৩ জন।

যৌতুক সহিংসতার ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছে ১১১ জন। ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৮৯ জন। যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১১৪ জন। এছাড়া গত ছয় মাসে গণপিটুনীতে ৬৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।

বিএসএফ কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ছয় মাসে বিএসএফের হাতে ১৪ বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ২৩ জন এবং অপহৃত হয়েছে ৫৯ জন।

সাংবাদিকদের ওপর আক্রমণের ব্যাপারে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ছয় মাসে একজন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছে ৫০ জন। হুমকির সম্মুখীন হয়েছে ৯ জন। ১৮ জন লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং পাঁচ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এছাড়া গত ছয় মাসে তৈরি পোশাক শিল্পে ৪৭৫ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন।

এসব ঘটনায় অধিকার তার প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- সরকারকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা- ও নির্যাতনের ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। সরকারকে অবশ্যই নির্যাতন বিরোধী জাতিসংঘ সনদের অপসোনাল প্রোটোকল অনুমোদন করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দিয়ে অবৈধভাবে আটক এবং নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের উদ্ধার করতে হবে এবং এই ব্যাপারে সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। অধিকার অবিলম্বে নিখোঁজ হওয়ার বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ডিসেম্বর ২০, ২০০৬ গৃহীত সনদ ‘ইনটারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দি প্রোটেকশন অফ অল পারসনস ফ্রম এনফোর্সড ডিসএপিয়ারেনস্’ অনুমোদন করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে।

এছাড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সব কর্মকা-ের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের দায়মুক্তি রোধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতা এবং দুর্বৃত্তায়ন বন্ধের জন্য সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং সহিংসতা ও দুর্বৃত্তায়নে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং সহিংসতা বন্ধে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে এসে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অবিলম্বে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। অবিলম্বে মিরপুরের উর্দুভাষী ক্যাম্পে বসবাসকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি নিরেপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে এবং এই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করে বিচারের সম্মুখীন করতে হবে।

You Might Also Like