হোম » দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা কাম্য নয়

দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টা কাম্য নয়

admin- Friday, April 28th, 2017

এ কে এম মাঈদুল ইসলাম :  আমাদের দেশে অন্যান্য দেশের মতো অনেক সমস্যা রয়েছে। আমরা এখন ভারতের কাছ থেকে পানি পাচ্ছি না। ভারত থেকে পানি না পাওয়ার জন্য আমরা বিরাট সঙ্কটে নিপতিত। ‘ইন্টারন্যাশনাল গ্লোবাল পলিটিক্স’-এর জন্য আমাদের গার্মেন্ট ও অন্যান্য ব্যবসায় বাণিজ্য নিয়ে যখন আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, জঙ্গি তৎপরতা প্রতিরোধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমনকি সেনাবাহিনীও যেখানে ভীষণ ব্যস্ত, সবার ওপরে দেশে গণতন্ত্র কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, আগামী সংসদ নির্বাচন কিভাবে সুষ্ঠু অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য করা যায়- সেটা নিয়ে দেশের জনগণ, সরকার এবং বিদেশী দাতা ও শুভাকাক্সক্ষীরা সবাই যখন চিন্তিত, উৎকণ্ঠিত ও সমস্যাসঙ্কুল অবস্থায় রয়েছে, তেমনি সময়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গ্রিক দেবী থেমিসের অর্ধ মূর্তি স্থাপনের ব্যাপারটি কি কোনো ষড়যন্ত্র, নাকি কারো ব্যক্তিগত কোনো ইচ্ছা-অনিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ তা বুঝতে পারছি না।

সত্যিকার অর্থে, এটি খুবই লজ্জার ব্যাপার। তবে হয়তো ভালো হয়েছে যে, যারা মূর্তিটি স্থাপন করেছেন, তারা গ্রিক দেবীর আদি পোশাক বাদ দিয়ে বাঙালিয়ানায় শাড়ি পরিয়ে এক রকম ঠাট্টা করেছেন। এতে গ্রিক দেবীর আব্রু কিছুটা রক্ষা পেয়েছে বটে! গ্রিক দেবীর মূর্তি রাখার ইচ্ছাই যদি থাকে, তাহলে দেবী রাখার অনেক জায়গা রয়েছে। জাদুঘরে রাখা যেত যেখানে আরো অনেক মূর্তি রাখা হয়েছে। মূর্তি বা ভাস্কর্য রাখার জায়গা কোনো অবস্থায়ই সুপ্রিম কোর্ট নয়। এটি স্থাপন করতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেটা কোথা থেকে এসেছে? এখানে মূর্তি স্থাপনের সিদ্ধান্ত কে দিয়েছে? বাংলাদেশের সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপন করতে হবে। এটি করার কারো কোনো ক্ষমতা নেই যদিও সুপ্রিম কোর্ট সম্পূর্ণ স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের জনগণকে উসকানি দেয়া কোনো কাজের কথা নয়। আর্ট কলেজ, হলের সামনে অথবা অন্য কোনো জায়গায় এ মূর্তিটি রাখা যেত। কিন্তু তা না করে স্পর্শকাতর স্থানে এ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এ নিয়ে দেশব্যাপী জনমনে বেদনা দেখা দিয়েছে। সরকারকেও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা হয়েছে। এর পেছনে অল্প কিছু ব্যক্তি জড়িত আছে বলে মনে হয়। তারা সরকারকে বিব্রত করতে চাচ্ছে।

গত ৭ এপ্রিল হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেছেন, ‘জাতি-ধর্মের বিভেদের কারণে দেশ প্রায় ধ্বংসের পথে। যে অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল সেটাও ধ্বংস হতে চলেছে। এটা চলতে পারে না। যেকোনো ধরনের জাতি বিভেদ আমাদের থামাতে হবে।’ আরো দেখা যাচ্ছে, অনেকেই যার যার সুবিধামতো যেখানে সেখানে বঙ্গবন্ধুকে ব্যবহার করছেন। তাকে যারা কাছে থেকে দেখেছেন, অন্তর দিয়ে চিনেছেন, জেনেছেন- তারা এক রকম করে বলছেন, আবার যারা বঙ্গবন্ধুকে দেখেননি, বঙ্গবন্ধুর ফিলোসফি জানেন না- তারা এক এক রকম করে বলছেন। আজকে বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে তিনি মনে খুব কষ্ট পেতেন যে, তাকে নিয়ে অনেকে বিভিন্ন রকম interpretation করছে।

আমি বঙ্গবন্ধুকে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকেই চিনি ও জানি। এরপর খুব কাছ থেকে তাকে বিভিন্নভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর অফুরন্ত স্নেহ পেয়েছি। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রিসভায় বঙ্গবন্ধু সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী ছিলেন। তথ্য ও বাণিজ্য মন্ত্রী হিসেবে তখন তিনি ফরেন অফিসের পাশে একটি টিনসেড ভবনে বসতেন। তার পাশেই একটি কক্ষ ছিল। বিভিন্ন দেশের ছবি সে সময় সেখানে আসত। কারণ তখন রয়টার, বাসস ছিল না। তাই সব তথ্যই সরকারের কাছে আসত। বঙ্গবন্ধুর সুন্দর ছিমছাম চেহারা ছিল। মোটা ফ্রেমের চশমা পরে তিনি সেখান থেকে মন্ত্রণালয়ের কাজ করতেন। আমি গিয়ে ছবিগুলো দেখতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, কী দেখিস? বললাম, ছবিগুলো দেখছি। তিনি হাসলেন।

আমাদের অনেকেই লেখালেখি করেন। বিশেষ করে নামকরা কয়েকজন লেখক। লক্ষণীয় বিষয় হলো, তারা অনেক জায়গায়ই মৃত ব্যক্তিকে সাক্ষী রেখে কথা বলেন। এতে সুবিধা অনেক। কারণ মৃত ব্যক্তিরা তো আর ওঠে এসে সাক্ষ্য দিতে পারবেন না যে, যা লিখেছেন সেটা ঠিক নয়। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে নিচে খানিকটা উল্লেখ করলাম এ জন্য যে, তার অতি কাছের ঘনিষ্ঠ যে কয়েকজন লোক আজো বেঁচে আছেন, তাদের মধ্যে আলহাজ গোলম মোরশেদ সাহেব অন্যতম। তার বয়স ৮৬ বছর। তিনি আসাদগেট মসজিদসংলগ্ন বাড়িতে থাকেন। আমার কথায় ভুলত্রুটি হলে নিশ্চয় তিনি সাক্ষ্য দিতে এখনো সক্ষম বলে আমার বিশ্বাস।

বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর একদিন সকালে মোরশেদ সাহেবের বাসায় গেলাম। সেখানে যাওয়ার পর কিছুক্ষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন এলো। তিনি প্রথমে মোরশেদ সাহেবের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এরপর তিনি বললেন, ‘রেডিও, টেলিভিশনে কুরআন তেলাওয়াত বন্ধ করা হয়েছে কেন? তুই খোঁজ নিয়ে দেখ, কে বন্ধ করেছে? আমি আজ থেকেই দেখতে চাই- রেডিও-টেলিভিশনে কুরআন তেলাওয়াত হচ্ছে।’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রেডিও-টেলিভিশনের রেকর্ড দেখলেও এ ঘটনার সত্যতা পাওয়া যাবে। এরপর গোলাম মোরশেদ ভাই বাংলাদেশ বেতারের তৎকালীন মহাপরিচালক সাহেবকে ফোন করে বললেন, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ, আজ থেকে যেন রেডিও-টেলিভিশনে কুরআন তেলাওয়াত হয়। উত্তরে ডিজি সাহেব বললেন, তাহলে অন্য ধর্মগ্রন্থও পড়তে হয়। উত্তর দেয়া হলো, নিশ্চয়ই অন্য ধর্মগ্রন্থও পাঠ চলবে। বঙ্গবন্ধু, মোরশেদ ভাইকে বললেন যে, ‘আমার নামাজ পড়ার জন্য একটি টুপি, জায়নামাজ ও তসবিহ কিনে নিয়ে আয়।’ তখন তিনি নিউমার্কেটের পাশে বাজার থেকে জায়নামাজ ও টুপি নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিলেন। এখন যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলা হচ্ছে, আসলে সেটা তো ধর্মহীনতা নয়। বঙ্গবন্ধুর ভাষায় স্পষ্ট বোঝা যায়, যার যার ধর্ম সে সে পালন করবে। আর জাতির পিতা বলে গেছেন- এর ওপর কারো কোনো কথা থাকতে পারে না। জাতীয় গণমাধ্যম বা মিডিয়ায় কুরআন তেলাওয়াত মানেই এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের অধিকার বেশি থাকবে।

বঙ্গবন্ধু কখনই মূর্তি রাখার পক্ষে ছিলেন না, স্বাধীনতার পরপরই শামীম শিকদার বঙ্গবন্ধুর পিতলের মূর্তি তৈরি করে জেলখানায় বঙ্গবন্ধুর সেলে রাখার জন্য দিয়েছিলেন। তৎকালীন জেলার শামসুর রহমান সাহেবকে তখন বঙ্গবন্ধু সেটা কাপড়ে ঢেকে রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই মূর্তি কখনই প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।

আমাদের প্রথম Constitutional Assembly’-এর সভায় মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে গণপরিষদের কাজ শুরু করেছিলেন।

কিছু অতি উৎসাহী, যারা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে স্তুতি-স্তাবকে মগ্ন, তারা প্রকৃত অর্থে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র মানেই বোঝেন না বলে মনে হয়। প্রতিবেশী দেশে যে কত নিরপরাধ মুসলমানকে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে- হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ কি তার হিসাবটা বলতে পারবে? তারা কি কোনো দিন এর প্রতিবাদ করেছেন? অন্য দিকে আমাদের দেশে ক’জন হিন্দু হত্যা করা হয়েছে- তারা কি সে হিসাবটাও দিতে পারবেন? আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। সারা বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অনুপাতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীরা সরকারি চাকরি, রাষ্ট্রীয় পদ-পজিশনে আধিক্য এবং সব সুযোগ-সুবিধা বেশি পান।

আমাদের দেশে যে বৌদ্ধরা আছেন, তাদের কোথায় কী সামান্য অসুবিধা হয়েছে, এ রকম বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা সাময়িক অসুবিধা নাগরিক মাত্রই হয়ে থাকে। তার জন্য একেবারে জোটবদ্ধ সাংগঠন গড়ে তুলতে হবে? জঙ্গিবাদের কথা বলা হচ্ছে। জঙ্গিবাদ সারা পৃথিবীজুড়েই রয়েছে। আমাদের এখানে একটা, দুটো বিচ্ছিন্ন ঘটনা মাত্র। তাও সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সরকারিভাবে মিয়ানমারে যেভাবে জঙ্গিবাদ উসকে দেয়া হয়েছে, পৃথিবীতে এমন নজির আর নেই। এই হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ তার প্রতিবাদ করতে পেরেছে? সে তুলনায় তো বাংলাদেশে কিছুই হয়নি। বাংলাদেশের জনগণও চায় না যে, প্রতিশোধ নেয়া হোক, সেটা বাঙালির চেতনা ও ধর্মবিরোধী।

কমলাপুরে যে বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে, সেখানে সব ধর্মের লোকই যান। আশপাশের সবার সাথে তাদের বন্ধুত্ব রয়েছে, সুসম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক সাবের হোসেন চৌধুরী, এমপি স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে প্রায়ই তাদের খোঁজখবর নিয়ে থাকেন। বাংলাদেশ বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সঙ্ঘের সভাপতি ধর্মাধিপতি শুদ্ধানন্দ মহাথেরোর সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আমাকে মাঝে মধ্যে তাদের আচার-অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে থাকেন। একবার তাদের একটি আন্তর্জাতিক ফাংশন হয়েছিল। আমাকে প্রধান অতিথি করেছিলেন। সে অনুষ্ঠানে স্বর্ণের মেডেল ও অন্য উপহার বিদেশী মেহমানদের নিজ হাতে তুলে দিয়েছিলাম। এ ছাড়া আমাদের দেশে শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপংকর বৌদ্ধ ধর্মের একজন খ্যাতনামা শিক্ষক ছিলেন। তিনি বিক্রমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বের বৌদ্ধ সম্প্রদায় তার স্মরণে আজো বাংলাদেশে আসেন এবং তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তার স্মৃতিসৌধ প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। চীন থেকে বৌদ্ধদের একটি দল সেটাকে ভালো করার জন্য এসেছিলেন। তাদেরও আমরা সাহায্য-সহযোগিতা করেছি।

আমাদের কক্সবাজার বৌদ্ধ মন্দিরে গৌতম বুদ্ধের একটুু চুল সংরক্ষিত ছিল। এ চুল নেয়ার জন্য শ্রীলঙ্কা থেকে পাঁচজন মন্ত্রী এসেছিলেন। তাদের জন্য আমাদের দেশের বৌদ্ধরা ভালোই ব্যবস্থা করেছিলেন। তখন আমি মহাথেরকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভাই, আপনি গৌতম বুদ্ধের চুলের এত দামি অংশ তাদের দিলেন, কিন্তু এ চুলের বিনিময়ে আপনি কী পেলেন? তিনি বললেন, আমরা কী চাইব? ভারতের বুদ্ধ গয়ায় যে বোধি গাছটি ছিল সেটা অনেক আগেই ভেঙে গিয়েছিল। তখন শ্রীলঙ্কা সরকার সেখানে এসে টিস্যু কালচার করে অনেক গাছ তৈরি করে বিভিন্ন দেশে পাঠায়, যাতে মূল গাছটি সব দেশেই থাকে। আমি বললাম, আমাদের দেশে মূল বোধি গাছ নেই, আপনি তাদের কাছে একটি বোধি গাছ চান। তখন মহাথের আমার নাম করে তাদের কাছে একটি বোধি গাছের চারা চেয়েছেন। কয়েকদিন পর মহাথের আমাকে ফোন করে বললেন, আপনার গাছ এসেছে। তিনি জানালেন, শ্রীলঙ্কার সাবেক রাষ্ট্রপতি শ্রীমাভো বন্দরনায়েক বোধি গাছের একটি চারা উপহার পাঠিয়েছেন। দু’জন ভদ্রলোক কাচের গ্লাসে করে চারাটি নিয়ে আমাদের অ্যাম্বাসিতে আসেন এবং পরে মহাথেরের কাছে আসেন। মহাথের বললেন, এখন আমি এটা কোথায় লাগাব? এ মূল্যবান গাছটি কোথায় লাগানো যায় তা নিয়ে আমিও চিন্তায় পড়ে গেলাম। ভাবলাম, যে গাছের নিচে ধ্যান করে বুদ্ধদেব দিব্য জ্ঞান লাভ করেছেন, সে মহামূল্যবান গাছটি একটি ভালো জায়গায় লাগাতে হবে। ঢাকায় অনেক খুঁেজ সে রকম উপযুক্ত জায়গা পেলাম না। পরে মহাথের ও অন্য বৌদ্ধের সাথে আলোচনা করে তাদের ধর্মমতে, গাছের ধোয়া পার্বণ সমাপ্ত করে, অতি যত্নের সাথে ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে ক্রিসেন্ট লেকসংলগ্ন একটি ফাঁকা জায়গায় গাছটি রোপণ করেছি। গাছটি সুন্দর ও বড় হয়েছে। বৌদ্ধরা আমাদের দেশেরই লোক। আমাদের দেশে তাদের একটা অরিজিনাল বোধি গাছ থাকল- এটা তারা সবাই এখন দেখতে পান।

গত ১৫ এপ্রিল সিরডাপ মিলনায়তনে ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামের সভাপতিত্বে ভারতীয় সংবিধানপ্রণেতা বিআর আম্বেদকারের ওপর এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভার আলোচনা শুনে আমি খুবই খুশি হয়েছি। আম্বেদকার প্রতিবেশী দেশ ভারতের কথিত ধর্মনিরপেক্ষ শাসনতন্ত্র প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। ভারত ধর্মনিরপেক্ষতার যে দাবি করছে, তারা কি আজো তাদের কাস্ট সিস্টেমের ওপরে উঠতে পেরেছে? আম্বেদকার ছোটবেলায় যখন পড়াশোনা করতেন, তখন স্কুলে তার পানি খেতে হলে বেয়ারারা এসে কল টিপে দিত। এরপর তিনি পানি হাতে নিয়ে পান করতেন। পানির কলে হাত দেয়ার অধিকার পর্যন্ত তার ছিল না শুধু তাদের কাস্ট সিস্টেমের দরুণ। তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। গরিব পরিবারের সন্তান। বৃত্তি নিয়ে বিদেশে লেখাপড়া করেছেন। অর্থনীতি, আইনশাস্ত্র ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তিনি ডক্টরেট করেছেন। তখনকার দিনে একজন খ্যাতনামা সাংবিধানিক আইনবিশেষজ্ঞ ছিলেন। তিনি যখন বিদেশে লেখাপড়া করতেন তখন তার লাইব্রেরিতে দুই হাজারেরও বেশি বই ছিল। লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফেরার সময় তিনি সেই বইগুলো জাহাজে তুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু সে জাহাজটি ডুবে যাওয়ায় তিনি বইগুলো দেশে আনতে পারেননি।

পণ্ডিত জওয়াহেরলাল নেহরু বা তদানীন্তন ভারতীয় নেতাদের ধন্যবাদ দিতে হয় যে, ভারতের সংবিধান তৈরির সময় আম্বেদকারকে তাদের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান নিয়োগ করা হয়েছিল। আম্বেদকার ভারতীয় সংবিধানপ্রণেতা। অন্যদের সাথে তার ছবি এখনো সুন্দরভাবে ভারতীয় পার্লামেন্টে লাগানো আছে। কিন্তু এদের কাস্ট সিস্টেম এতই সাম্প্রদায়িক যে, তিনি শেষ বয়সে ক্ষোভে পাঁচ হাজার লোককে সাথে নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। তখন এটা নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আম্বেদকার মারা যাওয়ার পর তাকে কোন ধর্ম মতে সৎকার করা হবে এ নিয়ে সমস্যার উদ্ভব হয়েছিল। পরে অবশ্য বৌদ্ধ ধর্মমতেই তাকে সৎকার করা হয়েছিল। তার মতো একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব। হিন্দু ধর্ম তাকে ত্যাগ করতে হয়েছে। এতে সহজেই বোঝা যায় প্রতিবেশী বন্ধুরা কতটা সাম্প্রদায়িকতায় অন্ধকারাচ্ছন্ন।

গত ১৪ এপ্রিল রাতে বিবিসি শুনে খুবই দুঃখ পেলাম। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হলো, কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর যে ম্যুরালটি লাগানো আছে সেটি কিছু লোক ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। তখন মমতা ব্যানার্জি এতে বাধা দেন। বিবিসির খবরে এ সংবাদটি বেশ কয়েকবার ফলাও করে সম্প্রচার করা হয়। বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর একটি ম্যুরাল রাখা যদি অন্যায় হয়ে থাকে, তাহলে ওখানে কি অন্ধকার দূর হয়েছে?

১৯৪৭ সালে এ দেশ থেকে ব্রিটিশরা চলে গেছে। ব্রিটিশরা এখানে ছিল, তাই খ্রিষ্টানরা এ দেশে ভালো থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এখন দেখা যায়, ঢাকার আশপাশে যেসব খ্রিষ্টানরা থাকত তারা প্রায় সবাই কানাডা, ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে চলে গেছেন। খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকেরাও তাদের অন্যান্য দেশে নিয়ে গেছেন, পুনর্বাসন করেছেন। কিন্তু এ দেশে এখন যারা আছেন তারাও এ দেশের সুবিধাভোগী নাগরিকের মধ্যে কোনো অংশে কম নন। তাদের বড় বড় স্কুল, কলেজ, হোস্টেল ও চার্চ রয়েছে। তারা নিজেরাও উপার্জন করেন এবং বিদেশ থেকেও পর্যাপ্ত ডোনেশন পান। এখন বিদেশ থেকে ডোনেশন না পেলেও তারা খুব ভালো আছেন। এ দেশের মুসলমানদের গড় অবস্থার তুলনায় এ দেশের খ্রিষ্টানরা অনেক ভালো আছেন।

আমাদের দেশে কে কচ্ছপ খাচ্ছে, কে ব্যাঙ খাচ্ছে, কে সাপ খাচ্ছে এগুলো নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। কে গরু খাচ্ছে, কে খাসি খাচ্ছে, কে শূকর খাচ্ছে তা একান্তই তাদের নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু গরু না খেলেও, মোষের গোশত খেলেও তাদের মারা হচ্ছে। প্রায় সময়ে প্রতিবেশী দেশে দুই-চারজন মুসলমানকে হত্যা করা না হচ্ছে। এ ছাড়া সেখানকার হাটবাজার, রাস্তাঘাটের সব মুসলিম নামগুলো বদলানো হচ্ছে।

বাবরি মসজিদ নিয়ে যে কত মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। ১৯৭২ সালে বাবরি মসজিদ দেখে এসেছি। আমি তাজমহল দেখতে গিয়েছিলাম। তাজমহল থেকে ৩০-৩৫ মাইল দূরে বাবরি মসজিদ অবস্থিত। বাবরি মসজিদটি আজমির শরিফ ও অন্যান্য মসজিদের আদলে নির্মিত।

এখনো ভারতের আজমির শরিফে বেশ কয়েকটি বড় বড় মসজিদ আছে যেগুলোতে নিয়মিত নামাজ হয় না। কারণ আজমির শরিফ থেকে বহু লোক পাকিস্তানে চলে গেছেন। খাজা বাবার দরগায় বিশাল দুটো মসজিদ আছে। একটি বাবর অন্যটি আকবর তৈরি করে দিয়েছিলেন। দেখা যায় শুক্রবার জুমার নামাজেও মসজিদ ভর্তি হয় না। বর্তমানে খাজা বাবার দরগায় যারা আসেন তাদের ৭০-৮০ ভাগই হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

বাবরি মসজিদ এলাকাটি মুসলমানদের একটি গ্রাম ছিল। বাবরকে আমরা যতদূর জানি, তিনি একজন ধার্মিক, দয়ালু ও মহান ব্যক্তি ছিলেন। তথাকথিত রাম মন্দির ভেঙে সেখানে মসজিদ নির্মাণের কোনো প্রয়োজন তার ছিল না। এখনো দেখা যায়, ফিরোজাবাদে হিন্দু-মুসলমান সবাই মিলেমিশে বসবাস করছেন। অথচ ‘এখানে রাম মন্দির ছিল’ মিথ্যা অজুহাত তুলে তারা বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলেছে। এটা যদি রামের জন্মস্থানই হতো তাহলে মোঘল সাম্রাজ্য পতনের পরপরই তারা অনায়াসে এখানে রাম মন্দির স্থাপন করতে পারত। কেননা, ইংরেজ ও হিন্দুরা মিলেই তো মুঘলদের পতন ঘটিয়েছে। যদিও মুঘলদের পর ইংরেজরা শাসন করেছে, তবুও সে সময় হিন্দুদের আধিপত্যও অনেক বেশি ছিল। এখনো ভারতে বাবরি মসজিদের মাত্র এক দেড় শ’ গজ দূরে ফিরোজাবাদ নামেই জায়গাটি রয়েছে। রামের জন্মস্থান হলে সে এলাকাটির নামকরণ নিশ্চয় ফিরোজাবাদ হতো না, রাম এলাকা হিসেবেই নামকরণ হতো।

ভারতবর্ষে মুঘলরা আসার আগে, শেরশাহ আসার আগে, প্রাক-মুসলিম শাসনামলে খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি ভারতে আগমন করে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি পৃথ্বীরাজের সাথে যুদ্ধ করে সেখানে ছিলেন। তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি সাধক ছিলেন। তার হাত ধরে বহু লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি তার শিষ্যদের গ্রামে গ্রামে পাঠাতেন এখানকার লোকেরা কী চায়, তাদের অভিপ্রায় কী, তা জানার জন্য। কারণ এখানে প্রায় সবাই হিন্দু। তখন দেখা যায়, তারা সবাই কাওয়ালি গায়। তখন তিনি দরবারে কাওয়ালি গাওয়ার ব্যবস্থা করেন। এরপর দেখা গেল, সেখানকার লোকেরা গরুর গোশত খায় না, খাসির গোশত খায় না, কেউ কেউ মুরগির গোশতও খায় না, ভেজিটারিয়ান অনেক। আজমির শরিফে দু’টি বড় বড় ডেক আছে। একটি ১০ মণ ও অন্যটি ৪০ মণের। মাঝে মধ্যে বিশেষ মাহফিলে সেখানে ভক্তদের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়। নানা ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সমবেত হন। চাল, ডাল, আখরোট, বাদাম, পেসতা ইত্যাদি দিয়ে খাবার রান্না করা হয়, যাতে সব ধর্মের মানুষ খেতে পারেন।

সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের ধর্মীয় স্বকীয়তা প্রাধান্য পাওয়াই স্বাভাবিক। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কোনো কাজ করা বাঞ্ছনীয় নয়। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে মূর্তি অপসারণÑ এক দিকে যেমন ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের ব্যাপার, অন্য দিকে বেশির ভাগ জনগণের হৃদয়ের ভাষা যা সংশ্লিষ্টদের বুঝতে হবে। তাই অতি দ্রুত আদালত প্রাঙ্গণের মূর্তি বা ভাস্কর্য অপসারণ করা একান্ত প্রয়োজন।

বিভিন্ন ছোট ব্যাপার নিয়ে সভা-সমিতি করে, অনভিপ্রেত বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে আমাদের দেশের সুনাম বিদেশে নষ্ট করা হচ্ছে। আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। সবাই এখন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছু লোক কার স্বার্থে এসব করছে জানি না। এগুলো তাদের নিজেদের তরফ থেকেই বন্ধ করা উচিত। কেননা দেশের ক্ষতি করে তাদের লাভ হবে না। অন্যথায় সরকারের তরফ থেকে দেশের স্বার্থে এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেয়া দরকার।

লেখক : সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী