বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতন বেড়েই চলছে

জাতীয় হিন্দু মহাজোট

২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের সংখ্যা বহুগুণে বেড়েছে। হিন্দু সংখ্যালঘুদের খুন, ধর্ষণ, অপহরণ জমি জবরদখলসহ নানা ধরনের নির্যাতন আগের তুলনায় ক্রমে বেড়েই চলছে বলে সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করেছেন জাতীয় হিন্দু মহাজোট নেতৃবৃন্দ। গতবছরে অর্থাৎ ২০১৯ সালে বাংলাদেশে কত প্রকারে হিন্দু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করা হয়েছে তার একটি বিশাল প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।

 

বৃহস্পতিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে যে প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে ১শ’ ৮ সংখ্যালঘু হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া হত্যার হুমকি, হত্যা চেষ্টা, জখম, আহত করা, নিখোঁজ, অপহরণসহ ৩১ হাজার ৫শ’ ৫ জন হিন্দু নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। হিন্দুদের ৯ হাজার ৫শ’ ৭ একর জমি জবর দখল করা হয়েছে। হিন্দু নির্যাতন প্রতিরোধ করা না গেলে আগামী ২০ বছরে দেশ হিন্দু শূন্য হয়ে পড়বে বলেও তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক সাংবাদিক সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে বলেন, এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মঠ মন্দির, প্রতিমা ভাংচুর, হিন্দু বাড়ী ঘরে অগ্নি-সংযোগ, লুঠ-পাট, খুন, নারী অপহরণ, দেশ ত্যাগে বাধ্যকরণসহ নানা অত্যাচারের কথা দেশবাসীসহ বিশ্ববাসী জানতে পেরেছে। গত বছরের জানুয়ারী থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খুন, হত্যা প্রচেষ্টা, জোড় পূর্বক জমি দখল, প্রতিমা ভাংচুর, ধর্ষণ, ধর্মান্তর, অগ্নিসংযোগ, ডাকাতি, দেশত্যাগে বাধ্যকরণ, দেশত্যাগের হুমকীর মত শত শত ঘটনা ঘটেছে।

 

অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র বলেন, এক বছরে ৭৬ জন হিন্দুকে অপহরণ করা হয়েছে। গণধর্ষণ ও ধর্ষণ করা হয়েছে ৬২ জন নারী। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৬ জনকে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ৩৪টি। এরকম ৬শ’ ৮৩টি ঘটনা ঘটেছে হিন্দুদের ওপর। এমনকি ৩৬জন হিন্দু মুক্তিযোদ্ধাদের রাজাকার হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

তিনি জানান, এই প্রতিবেদনের উপাত্ত ২০১৯ সালের জানুয়ারী থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জারে প্রকাশিত এবং হিন্দু মহাজোটের জেলা, থানা নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে প্রাপ্ত। প্রকাশিত ঐ পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিনিয়ত হিন্দু নির্যাতন বাড়ছে। এর সাথে সরকারি দল এবং বিভিন্ন দলের মদদপুষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

 

হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব বলেন, গত বছরের তুলনায় সর্বক্ষেত্রেই হিন্দু নির্যাতন বেড়েছে। গত ২০১৮ সালে হত্যা হয়েছিল ৮৮জন আর গত বছর ২০১৯ সালে বেড়ে হয়েছে ১শ’ ৮ জন। গত ২০১৮ সালে আহত হয়েছে ৩শ’ ৪৭ যা গত বছর বেড়ে হয়েছে ৪শ’ ৮৪ জন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ২০১৮ সালে হামলা হয়েছিল ৩৫টি গত বছর বেড়ে হয়েছে ৭৯টি। ২০১৮ সালে বসতবাড়ী থেকে উচ্ছেদ হয়েছিল ২শ’ ১৭টি পরিবার যা গত বছর বেড়ে হয়েছে ৪শ’ ৩৪টি পরিবার। ২০১৮ সালে দেশ ত্যাগের হুমকী ছিল ২শ’ ২৩টি পরিবার আর গত বছর বেড়ে গিয়ে ৬শ’ ৪১টি পরিবার এবং দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে ৩শ’ ৭৮টি পরিবার। ২০১৮ সালে নিরাপত্তাহীনতায় ছিল ১ হাজার ৫শ’ ১০ পরিবার যা গত বছর বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ২শ’ ৬১টি পরিবার। ২০১৮ সালে মন্দিরে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিল ১শ’ ৩১টি যা গত বছর বেড়ে হয়েছে ১শ’ ৫৩টি। ২০১৮ সালে বাড়ীতে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছিলো ১শ’ ৮টি গত বছর বেড়ে গিয়ে হয়েছে ৪শ’ ৪৮টি। ২০১৮ সালে ভূমি দখল ছিল ২৭৩৪ দশমিক ৮১ একর যা গত বছর বেড়ে গিয়ে হয়েছে ৯,৫০৭ দশমিক ২২ একর। গত বছর নুতন করে ৩৬ জন হিন্দু মুক্তিযোদ্ধার গায়ে রাজকার তকমা যুক্ত হয়েছে।

 

হিন্দু সমাজ আশা করেছিলো বর্তমান সরকার ২০০১ সালের ঘটনাসহ সকল হিন্দু নির্যাতনের বিচার করবে; অপরাধীরা শাস্তি পাবে। কিন্তু বর্তমান সরকার ১১ বছর দেশ পরিচালনা করলেও ২০০১ সালের ঘটনাসহ কোনো অপরাধের বিচার করে নি। ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য একজনেরও শাস্তি হয় নি। তাই হিন্দু সম্প্রদায় আজ হতাশ। এই বিচারহীনতার কারণেই অপরাধীরা বার বার হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের স্ট্রীম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন নেতৃবৃন্দ। যার ফলে প্রতিদিনই নিরবে আতঙ্কিত হিন্দু সম্প্রদায় দেশ ত্যাগ করছে।

 

পরিসংখ্যান উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ২০ বছরের মধ্যে এদেশ হিন্দু শূন্য হবে। যদিও সরকার সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধে অতীতের তুলনায় যথেষ্ঠ তৎপর। তবুও দেশের বিভিন্নস্থানে যে হারে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ চলছে, তাতে হিন্দু সম্প্রদায় উদ্বিগ্ন বলেও উল্লেখ করেন নেতৃবৃন্দ।

 

সাংবাদিক সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, হিন্দু মহাজোটের সিনিয়র সহ সভাপতি প্রদীপ কুমার পাল, প্রধান সমন্বয়কারী বিজয় কৃষ্ণ ভট্টাচার্য, যুগ্ম মহাসচিব মনিশঙ্কর মন্ডল, আইন সম্পাদক সুব্রত হালদার, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অমিও বাউল, মহিলা মহাজোটের সাধারণ সম্পাদক সাগরিকা মন্ডল, উত্তরবঙ্গ সমন্বয়ক দুলাল কর্মকার, ঢাকা মহানগর দক্ষিনের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল ঘোষ, ঢাকা উত্তরের সভাপতি প্রবীর হালদার, সাধারণ সম্পাদক শুকদেব মন্ডল, সাংগঠনিক সম্পাদক নিপুন পাল, হিন্দু যুব মহাজোটের সভাপতি কিশোর কুমার বর্মন, সহ সভাপতি সুমন হালদার, মৃনাল কান্তি মধু, ছাত্র মহাজেটের সভাপতি সাজেন কৃষ্ণ বল, দপ্তর সম্পাদক তপু কুন্ডু, ডা. মনোরঞ্জন হালদার প্রমুখ।

You Might Also Like