দেন দরবারে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

নাশরাত চৌধুরী : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ২৫ মে জাপান যাচ্ছেন। এই প্রথম তিনি তৃতীয়বারের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কোন বড় দেশে যাচ্ছেন। এটি তার রাষ্ট্রীয় সফর। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি জাপানে যাচ্ছেন। সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া হবে। ৫ জানুয়ারীর একক নির্বাচনে বিরোধিতা করা ও সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন করার জন্য শেখ হাসিনা ও তার সরকারকে চাপে রাখা দেশটি জাপান হঠাৎ করে কেন ঘুরে দাঁড়ালো এনিয়ে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
গভীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এর পেছনের কারণ। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা মূলত জাপানের সঙ্গে সমঝোতা করতেই সেখানে যাছেন। প্রধানমন্ত্রী জাপানের সঙ্গে অতীতের মতো সুসম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী, সেই সঙ্গে বেশি পরিমাণে সহায়তাও পেতে চান। সেখানে তার সঙ্গে সমঝোতা হবে এই নিয়ে যে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য জাপানকে বাংলাদেশকে ভোট দিতে হবে। এখন এই পদ পাওয়ার জন্য লড়াইয়ের পথে বাংলাদেশ এবং জাপান দুই দেশই রয়েছে। তবে দুই দেশের পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব হবে না। প্রার্থী হওয়াও সম্ভব নয়। নিরাপত্তা পরিষদেরও সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশ একমাত্র প্রার্থী। পরে জাপনও আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এশিয়া প্যাসিফিক থেকে একটি দেশ এই পদ পাবে। এই পদের জন্য বাংলাদেশ ২০০১ সালে প্রথম ফ্লোর তৈরি করে। বাংলাদেশ ২০১৬-২০১৭ সালের জন্য এই পদ চাইছে। দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এই পদের জন্য বাংলাদেশ লবিং করছে। বাংলাদেশ এই পদের জন্য অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভাগ্যে সেটা নাও জুটতে পারে। কারণ এতে বাঁধ সেধেছে জাপান।  ২০১১ সালে জাপানও একই পদে নির্বাচন করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। সেটা প্রকাশ করার পর তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবে এই ক্ষেত্রে জাপানকে ওই পদ পেতে হলে বাংলাদেশের ভোট অবশ্যই লাগবে। আর ওই ভোট না হলে জাপান ওই পদে নির্বাচিত হতে পারবে না। কারণ ওই পদে জাপানের আগে বাংলাদেশ প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। এই জন্য বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে কেবল জাপানকে দিতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাপান বাংলাদেশকে এই পদে ভোট দিতে পারছে না বলে ইতোমধ্যে দু:খ প্রকাশ করেছে। জাপান চাইছে বাংলাদেশ তাদেরকে ভোট দিক। তারা নিরাপত্তাপত্তা পরিষদে সদস্য পদ লাভ করুন। বাংরাদেশ সড়ে দাঁড়াক। এই জন্য বাংলাদেশকে সব ধরনের প্রয়োজসীয় সহেযাগিতা দিবে। সেটার জন্য তারা চেষ্টাও করে যাচ্ছে। এই কারণে প্রধানমন্ত্রীকে তারা সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করছেন। কারণ জাপানের চেয়ে এই পদে বাংলাদেশের সমস্যাবনা এটা তারাও জানে। তারপরও শেখ হাসিনাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছেন। সূত্র জানায়, জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার মার্চ মাসে ঢাকা সফর করেন। সে-সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জাপান সফরের জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনো আবের পাঠানো একটি আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। জাপান সরকারের আমন্ত্রণেই তখন তিনি সেখানে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আর এই কারণেই এখন শেখ হাসিনা সেখানে যাচ্ছেন।
এদিকে এই সফরের মূল লক্ষ ভোট দেয়া নিয়ে হলেও আলোচনা সফল হলে দুই দেশের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। সম্ভাব্য ওই সব চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য ও এই সফর নিয়ে দুদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কাজ করে যাচ্ছেন। সরকারের তরফ থেকে নিরাপত্তা পরিষদের ভোট দেয়ার বিষয়ে এড়িয়ে গেলেও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি আরো মজবুত করতেই প্রধানমন্ত্রী এ সফরে যাচ্ছেন বলে দাবী করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, বাংরাদেশ জাপানের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করলে সহজেই তা হবে না। এই জন্য জাপানকেও বড় ধরনের সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসতে হবে। তবে বাংলাদেশ জাপানের সঙ্গে কোন ধরনের বিরোধে জড়াতে রাজি নয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের ভোটের জন্য জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশ সফর করে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছেন। শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পদ পাওয়ার জন্য ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। তিনি বিভিন্ন ভাবে প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন জাপানকে ওই পদ ছেড়ে দিলে ও ভোট দিলে এতে বাংলাদেশের জন্য ভাল হবে। জাপান বাংলাদেশকে আরো বেশি সহায়তা করবে। জাপান আগা গোড়াই বাংলাদেশের ভাল বন্ধু সেই বন্ধুত্ব থাকবে এবং তা আরো বাড়বে। বাংলাদেশের বেলায় সহযোগিতাও আরো বাড়বে। এই ব্যাপারে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাপান সফরের জন্য আমন্ত্রন জানান। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জাপান প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রন জানানোর পর শেখ হাসিনা জাপান সফর করার বিষয়ে সম্মতি দেন।
সূত্র জানায়, সরকার মনে করছে জাপান বাংলাদেশ অনেক বড় ধরনের সহযোগিতা দিলে কিংবা পদ্মা সেতুর টাকা দিলে জাপানকে বাংলাদেশ ভোট দিতে পারে। ভোট দেয়ার বিনিময়ে জাপান বাংলাদেশের সহায়তা বাড়াবে। এমনও হতে পারে পদ্মা সেতুতে জাইকা আরো বড় ধরনের বাজেট নিয়ে ফিরে আসবে। মূলত এই পদ ছেড়ে দিলে জাপান বাংলাদেশকে কি দিবে সেটা নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনার ভিত্তিতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ঐক্যমতে পৌঁছানোর পরই এই ব্যাপারে সহসা অগ্রগতি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগে ২০১০ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত সর্বশেষ জাপান সফর করেন। সে সফরে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের সঙ্গে আলোচনায় পদ্মা সেতুর জন্য অতিরিক্ত ১শ মিলিয়ন ডলার ঋণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ওই সফরটি যেমন গুরুত্বপূর্ন ছিল এবারের সফরও কোন অংশে কম নয়। প্রধানমন্ত্রী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য পদ জাপানের জন্য ছাড়তে রাজি হতে পারেন যদি ওই পদ ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে জাপান আরো বড় কিছু দেয়।
এদিকে সংশ্লিস্ট সূত্রে আরো জানা গেছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ওই পদটি পাওয়া জাপানের জন্য ইমেজের ব্যাপার। এর আগে ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ একবার সিকিউরিটি কাউন্সিলের একটি পদে নির্বাচিত হয়। ওই সময়ে জাপান বাংলাদেশর কাছে হেরে গেলে এটা জাপানের ইগোতে লাগে। ওই সময়ে ওই ঘটনার পর জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রীকেও সরিয়ে দেয়া হয়। পরে জাপানের নতুন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হন বর্তমান জাপানের প্রধানমন্ত্রীর বাবা। তার বাবা যখন পররাষ্ট্র মন্ত্রী হন তখন তিনি অনেককেই চাকরি থেকে অবসরে পাঠান। ওই সময়ে ওই সব ঘটনাগুলো দেখেছেন আবে। আর তখন থেকেই তার মনে বিষয়টি গেথেঁ যায়। আর এখন তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেন যে ৩৪ বছর আগে যে বাংলাদেশের সঙ্গে নির্বাচন করে তারা পরাজিত হয়েছে। এবারও তারা নির্বাচন করতে গেলে পরাাজিত হবে। সেই পরাজয় বরণ করা ঠিক হবে না। বরং পরাজিত না হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে এই ব্যাপারে সমঝোতা করাটা ঠিক হবে। আর সমঝোতা করেই জাপানের জয় আনতে হবে। সেই জন্য তিনি তার পররাষ্ট্র মন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরে পাঠান। এবং তার প্রস্তাব দিয়ে পাঠান। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রন জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও দেখেছেন যে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে যে কটি আন্তর্জাতিক দেশ ওই নির্বাচনের বিরোধিতা করেছে ও সব দলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য তাকে চাপ দিয়েছে তার মধ্যে জাপান ছিল। ওই নির্বাচন যাতে না হয় সেই জন্য তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মান, চীন, জাতিসংঘ সবার মতোই চায় সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন। এখনও সেই অবস্থানেই রয়েছে। তবে তা হলেও তারা বর্তমান সরকারকে আগের সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। শেখ হাসিনা মনে করছেন সমঝোতা হলে তার সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ পূরন করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিরোধী একটি শক্তি কমবে। এটাও একটা বড় সুযোগ।
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহ্রিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, জাপান আমাদের পরীক্ষিত উন্নয়ন সহযোগী। প্রথম পদ্মাসেতু আমরা নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি করব বলে আগে সিদ্ধান্ত হয়ে রয়েছে। দ্বিতীয় পদ্মাসেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সফরে আলোচনা হবে বলে আশা করি।যমুনা নদীর ওপর আর একটি রেলসেতু নির্মাণের বিষয়েও জাপানের সহযোগিতা চাওয়া হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দুদেশের মধ্যে ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি) নামের সমঝোতা স্মারক সইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে এ চুক্তি সই হতে পারে।
দুদেশের মধ্যে নিয়মিত পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ে ফরেন অফিস কলসালটেশন বৈঠক, কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের ভিসামুক্ত যাতায়াতের ওপরও সমঝোতা করার চেষ্টা করা হবে।

You Might Also Like