দেখা মেলেনি যে আগ্নেয়গিরির

‘আগ্নেয়গিরি আমরা অনেক দেখেছি। কিন্ত গভীর সাগরে আগ্নেয়গিরির অস্তিত্বের কথা শুনে থাকলেও চোখ দিয়ে কখনো দেখিনি। কিন্তু সম্প্রতি সমুদ্রের তলদেশে আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছি। তবে এখন এমন কয়েকটি ছবি দেখেছি, যা আগে কখনো দেখিনি।’

এমনটিই বললেন সাগর ও আগ্নেয়গিরি নিয়ে গবেষণারত একটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষক আইসোবেল ইও।

তিনি বলেন, আমরা গভীর সাগরে অগ্নুৎপাতও দেখিনি। যদিও পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মাটির উপরভাগের কঠিন স্তর গঠিত হয়েছে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফলে, নির্গত লাভার স্রোত দিয়ে।
অগ্নুৎপাতের ফলে লাভা নির্গত হয় অনেকটা ঘরঘর শব্দ করে। কিন্তু যখন আপনি বুঝতে পারবেন সমুদ্রের তলদেশে কি ঘটছে বা জানতে পারবেন, তখন বিস্মিত না হয়ে উপায় থাকবে না। আসলে গভীর সমুদ্রে অগ্নুৎপাত ঘটছে যখন তখন, আর লাভার স্রোত জমা হচ্ছে মহাসাগরের তলদেশে, সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক অনেক গভীরে ঘটে থাকে অগ্নুৎপাত।

জিওমারসের হেলমহোলজ ইনস্টিটিউট ফর ওসেন রিসার্চ কিয়েলের আইসোবেলের মতে, ‘আমরা আসলে মৌলিক কিছু ধারণার ভিত্তিতে অগ্নুৎপাতের প্রক্রিয়া সম্পর্কে খুব সামান্যই জানতে পারি।
dld
এই বিষয়টি আসলেও আমাদের অজানা রয়েছে যে, পৃথিবীর মাটির প্রায় ৭০ শতাংশ কঠিন স্তর সৃষ্টি হয়েছে মহাসাগরের অভ্যন্তরে যে অগ্নুৎপাত হয় তার ফলে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে মিড আটলান্টিক রিজের কথা উল্লেখ করা যায়। এই রিজ থেকে অগ্নুৎপাতের ফলে টেকটোনিক প্লেটগুলো সরে যাচ্ছে একে অপরের কাছ থেকে।

প্লেটগুলো যদি এভাবে একে অপরের কাছ থেকে সরে যেতে থাকে, তাহলে আগ্নেগিরির অগ্নূতপাত আবারো ঘটতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মাটির নতুন কঠিন স্তরের সৃষ্টি হবে এবং যেখান থেকে প্লেটগুলো সরে যাচ্ছে, সেই জায়গা পূরণ করবে মাটির কঠিন স্তর।
আসলে সাগরের তলদেশের রিজগুলোয় রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম আগ্নেয়গিরিগুলো। কিন্তু সেগুলো রয়েছে লোকচক্ষুর আড়ালে এবং দীর্ঘদিন ধরে আড়ালেই রয়ে গেছে সেগুলো। ইও আশা করছেন এখন অবশ্য সেগুলো আর আড়ালে থকতে পারবে না। বেরিয়ে আসবে লোকচক্ষুর আড়াল থেকে, কেননা আমরা জেনে গেছি ওগুলোর অস্তিত্বের কথা।

‘সমুদ্রের তলদেশে অগ্নুৎপাতের ধরন ও লাভা স্রোত কতটা জোরে নির্গত হয়, সে সম্পর্কে আসলেই আমাদের কোনো ধারণা নেই। লাভার কাঠামোা ও তা যা উৎপাদন করছে, সে সম্পর্কে বলতে গেলে কিছই জানি না। সুতরাং আমরা বলতে পারি না, লাভাগুলো একই রকম কি না বা তা কতোটা শক্ত।’ বলছেন ইও।
এ কারণেই ইও ও তার সহকর্মীরা সংগ্রহ করেছেন সমুদ্রের তলদেশের দারুন দারুন সব ছবি। ছবিগুলো তোলা হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের ৭০০ মিটার থেকে ২ হাজার মিটার গভীর থেকে।

সাব-সার্ফেস ভলকানিক ইতিহাস আরও নিখুঁতভাবে লেখার জন্য আজ পর্যন্ত যতো লাভা প্রবাহ ঘটেছে তা জানার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। এই লাভা প্রবাহের গতিপ্রকৃতি এবং তার ধরন নির্ধারণ করার জন্য তারা ব্যবহার করেছেন হাইড্রোএকুয়েস্টিক প্রপাটিজ। এর মধ্যে রয়েছে লাভা প্রবাহের সময় সেগুলো কতটা শব্দ করে এবং প্রতিধ্বনি করে ফিরে আসার সময় সোনারে আঘাতই করেই বা কতটা জোরে।
তার তথ্য প্রকাশ করা হয় এপ্রিলে, এতে দেখা যায় গত চার হাজার বছর ধরে চলছে এই প্রক্রিয়া। এই অগ্নৎপাত ঘটছে বৃহদাকার কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে নয়। ছোট ছোট আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ফল এগুলো।

ইও ও তার সহকর্মীরা গবেষণার জন্য নর্থ কোলবেইএনসি রিজে ফিরে আসেন ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। রিজটি আইসল্যান্ডের ৫০০ কিলোমিটার দূরে।

বিবিসি জানায়, টর্পেডোর মতো দেখতে পনির নিচে ব্যবহার উপযোগী রোবট ব্যবহার করে সমুদ্রের তলদেশে তারা উচ্চ রেজল্যুশনের ছবি তুলতে সক্ষম হন। এর আগে এতো নিখুঁত ছবি কখনোই পাওয়া যায়নি। এখানে এই ধরনের কয়েকটি ছবি দেওয়া হলো। এই ছবিগুলোর রেজল্যুশন এতো ভালো যে, তা দেখেই সমুদ্রের তলদেশে জরিপ কাজ চালানো যাবে, ঠিক যেভাবে চলানো সম্ভব হয় ভূপৃষ্ঠে।
ছবিগুলো দেখে বোঝা যায় যে, লাভা প্রবাহ খুব একটা বেশি সময় ধরে ঘটেনি, ঘটেছে অপেক্ষাকৃত স্বল্পদিন ধরে। ছবিতে আরো দেখা যায়, বেশ কিছুদিন ধরে আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত হয়নি। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর ধরে নিষ্ক্রিয় ছিল আগ্নেয়গিরি। আরও বিস্ময়ের ঘটনা হলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশ কিছু লাভার কোনো চিহ্নই নেই।

এর মানে বহুবছর অগ্নুৎপাত ঘটেনি। এখনও এই বিষয়টি পরিষ্কার নয় যে কতদিন আগে অগ্নুৎপাত ঘটেছিল। বিজ্ঞানীদের হিসেব অনুযায়ী, আনুমানিক কয়েক লাখ বছর তো হবেই।

You Might Also Like