দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে দুদক নীরব?

সানজানা চৌধুরী : বাংলাদেশে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক শুদ্ধি অভিযানে প্রভাবশালী বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও এসব ঘটনা তদন্তে নীরব ভূমিকায় দেখা গেছে দুর্নীতি দমন কমিশনকে।

অথচ সরকারি খাতে দুর্নীতির ঘটনাগুলো অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দায়িত্ব দুদকের ওপরে বর্তায়।

দুদক নিজে কতোটা স্বাধীন : দুদক শুরু থেকে নিজেদের স্বাধীন হিসেবে দাবি করে আসলেও রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবশালীদের চাপের মুখে এসব ঘটনা তদন্তে দুদকের এই স্বাধীনতা অনেকাংশেই প্রশ্নবিদ্ধ বলে জানিয়েছেন দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল।

“দুর্নীতি দমনের বিষয়গুলা তো চূড়ান্তভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনেরই দেখার কথা। কিন্তু দুদকের কাজে বিভিন্ন সময় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে।”

“দুদক যদিও নিজেদেরকে স্বাধীন দাবি করে। যদি তারা স্বাধীনভাবেই কাজ করতে পারতো তাহলে এখন যারা ধরা পড়েছে তারা এতদিন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বা দলীয় নাম ব্যবহার করে এই কাজগুলো এতদিন করতে পারলো কিভাবে?” বলেন মিসেস সুলতানা।

এখানে তিনি দুদকের অন্তর্নিহিত কিছু দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করেন। সেইসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক যে সংস্কৃতি রয়েছে সেখানে অনেক সময় দুদকের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা কঠিন বলে জানান তিনি।

দুর্নীতি বিরোধী বেসরকারি সংস্থা টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল।

দুদকের কাছে তথ্য নেই :  সুলতানা কামালের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত না হলেও দুদককে নীতিগত চাপে পড়ে মাঝে মাঝে কিছু অনুসন্ধান থেকে পিছু হটতে হয় বলে জানান দুদকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

নীতিগত চাপ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন যখন কোন অনুসন্ধান অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে তারা দেখতে পান যে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দেশ বা সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হতে পারে।

তিনি জানিয়েছেন, সম্প্রতি নিরাপত্তা বাহিনী যেসব অভিযান পরিচালনা করছে সে বিষয়ে দুদকের কাছে কোন অভিযোগ বা তথ্য না ছিল না। এ কারণে তারা অনুসন্ধান করতে পারেননি।

মি. মাহমুদ বলেন, “দুদকের অনুসন্ধান হয় নাই, কারণ এই বিষয়গুলো আগে সামনে আসে নাই। তথ্য না আসলে আমাদের নিজেদের খুঁজে খুঁজে বের করা তো খুব মুশকিল। আমরা অভিযোগ বা কোন তথ্য পেলেই ব্যবস্থা নেই। আমাদের কাছে তো অভিযোগ আসে নাই।”

তবে পুলিশ ও র‍্যাবের অভিযানের পর যেসব তথ্য উঠে এসেছে তার ভিত্তিতে দুদক অনুসন্ধান শুরু করেছে বলে জানান মি. মাহমুদ।

এ পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের ব্যাংক হিসাবসহ আরও নানা বিষয় খতিয়ে দেখছেন তারা।

এছাড়া অনুসন্ধান অভিযানগুলো দুদকের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে সে বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ঘাটতি আছে বলেও তিনি স্বীকার করেন।

দায়িত্ব শুধু দুদকের? : দুর্নীতি বিরোধী এই অনুসন্ধান অভিযান দুদকের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের বড় ধরণের দায়িত্ব বলে মনে করেন পুলিশের সাবেক উপ মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা।

দুদকের গোয়েন্দা বিভাগকে যেমন আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন সেইসঙ্গে দুর্নীতি অনুসন্ধানের দায় শুধুমাত্র দুদকের ওপর না চাপিয়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান ও নিরাপত্তাবাহিনীকে যুক্ত করা প্রয়োজন বলে জানান মি. হুদা।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “দুর্নীতি প্রতিরোধ করা এবং প্রতিকার করা প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটা কাজ। দুদক কোন হেডমাস্টার না যে তাকেই সব দেখতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং সচিবের দায়িত্ব আছে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিগুলো দেখে ব্যবস্থা নেয়া।”

“পাবলিক প্রকিউরমেন্ট পলিসি মন্ত্রণালয়ের ফাইনান্স বিভাগে দেয়া আছে। তো সেই নিয়মগুলো ফলো করা হচ্ছে কিনা সেটা মন্ত্রণালয়কে দেখতে হবে। যেগুলো তারা দেখতে পারবেনা, অনেক বড় জটিল সেগুলো দুদকে আসবে। দায়িত্ববোধের এই জায়গাটা পেছনে পড়ে যাচ্ছে বলে আমার মনে হয়,” বলেন, মি. হুদা।

চলমান শুদ্ধি অভিযানে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িকভাবে প্রভাবশালী কয়েকজনকে অনুসন্ধানের আওতায় আনাকে স্বাগত জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এক্ষেত্রে দুদক যেন বিতর্কের ঊর্ধ্বে থেকে কাজ করে সেই আহ্বান বিশ্লেষকদের।

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

You Might Also Like