দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে কাউন্সিলে নেতাকর্মীদের প্রতি হাসিনার আহ্বান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে নেতা-কর্মীদের আত্মনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, নিজ নিজ এলাকায় কতজন দরিদ্র ও গৃহহারা মানুষ আছে, কাদের ঘর নাই, বাড়ি নাই, ঠিকানা নাই, নিঃস্ব, রিক্ত, কারা হতদরিদ্র, বয়োবৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী আপনারা তাদের তালিকা তৈরি করুন। তারা জীবনে যেন বেঁচে থাকতে পারে, তার ব্যবস্থা আমরা করে দেব। তারাও আমাদের নাগরিক, তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ২০৪১ সালের মধ্যে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠন করতে দলীয় নেতা-কর্মী, কাউন্সিলর, ডেলিগেটদেরসহ জনগণের সকল নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সংসদ সদস্য, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের সব নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের প্রতি এই আহবান জানান। তিনি গতকাল শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০ তম জাতীয় কাউন্সিলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে এ আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেন, আমরা যদি এই কাজটা ভালোমতো করতে পারি, তাহলে এই বাংলাদেশে কোনো দরিদ্র থাকবে না। দারিদ্র্যের হার ৯৭ ভাগ ছিল। আমরা ২২ দশমিক ৪ ভাগে নামিয়ে এনেছি। হতদরিদ্রের হার ১২ ভাগে নামিয়ে এনেছি। বাংলাদেশে দরিদ্র বলে কিছু থাকবে না, এটা আমাদের প্রতিজ্ঞা।
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স থাকবে। সন্ত্রাসকে কখনো আমরা প্রশ্রয় দেব না। এর বিরুদ্ধে সব রকমের ব্যবস্থা নিচ্ছি এবং নিয়ে যাব। বাংলাদেশের মাটি, ভূখ- কোনো সন্ত্রাসী কর্মকা-ের জন্য কেউ ব্যবহার করতে পারবে না। প্রতিবেশী দেশে সন্ত্রাসী কর্মকা- চালানোর জন্য ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। আমাদের ভূখ- কাউকে ব্যবহার করতে দেয়া হবে না। এটা আমার সিদ্ধান্ত। দক্ষিণ এশিয়া হবে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সেতুবন্ধন।
সম্মেলনে ২০৪১ সালের বাংলাদেশ কেমন হবে, তারও একটা চিত্র দেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি হবে ৮ থেকে ১০ ভাগ। মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলার। এই আয় আরও বৃদ্ধি করব যেন এই দেশের মানুষ আর দরিদ্র না হয়। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। দারিদ্র্যের হার হবে শূন্যের কোঠায় এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হবে। সবাই সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কোনো অন্ধকার থাকবে না। প্রতিটি ঘরে আলো জ্বালাব। অর্থাৎ এখন ১৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। ৭৮ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। ইনশাআল্লাহ তখন শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ পাবে।
২০৪১ সালের বাংলাদেশ বিমান পরিবহনের একটি ‘হাব’ (কেন্দ্রবিন্দু) হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিমানবন্দর আমরা এমনভাবে উন্নত করব যেন সারা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হয়। প্রাচ্যের মানুষ যখন পাশ্চাত্যে যাবে আবার পাশ্চাত্যের মানুষ যখন প্রাচ্যে যাবে, তখন বাংলাদেশই হবে হাব। এটাই হবে সেতুবন্ধন। সব ধরনের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ উন্নত করব।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের এই নীতির আলোকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। এই নীতিতেই আমরা বিশ্বাস করি। এই নীতির আলোকে আমাদের দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আমরা বজায় রাখতে চাই। যার প্রমাণ আজকে আপনারা পেয়েছেন যে, বন্ধু প্রতীম দেশের প্রতিনিধিরা আজকের সম্মেলনে এসেছেন। বক্তৃতা দিয়েছেন। তাদেরকে আমি আমার আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।
তিনি আরও বলেন, আমাদের সিদ্ধান্ত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের স্থান বাংলাদেশে হবে না। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশকে একটি শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব। স্বাধীনতার সুফল বাংলার প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে আমরা পৌঁছে দেব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলব। এই বাংলাদেশ হবে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ। যে স্বপ্ন জাতির পিতা দেখেছেন, তা পূরণ করব।
বেলা ১টা ২০ মিনিটে শেখ হাসিনা ভাষণ দেওয়া শুরু করেন। শুরুতেই তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানান। দলীয় নেতা-কর্মী ছাড়াও অনুষ্ঠানে আসা অন্য দলগুলোর অতিথি এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দলের প্রতিনিধিদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের হাতে নিহত সবার কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ যখন স্বনির্ভরতা অর্জনের দিকে যাচ্ছিল, তখনই সেই ভয়াবহ হামলা হয়। ওই দিন আমার পরিবারের ১৮ সদস্য নিহত হয়েছে। বিদেশে থেকে স্বজন হারানোর বেদনা তুলে ধরার সঙ্গে তার দেশে ফেরার আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগও উঠে আসে বঙ্গবন্ধুকন্যার বক্তব্যে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সে সময় যারা ক্ষমতায় ছিল, তারা আমাকে দেশে আসার অনুমতি দেয়নি। কিন্তু তারা শত চেষ্টা করেও পারেনি। আওয়ামী লীগ আমাকে সভাপতি করে দেশে নিয়ে এসেছিল।
প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণের সংগঠন এবং জনগণের কল্যাণ করাই আমাদের দায়িত্ব। আমরা যদি এই কাজ সঠিকভাবে করতে পারি ইনশাল্লাহ আমি বিশ্বাস করি এই বাংলাদেশে কোন দরিদ্র থাকবে না।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেবো না। বাংলাদেশের মাটি সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদে ব্যবহার হবে না। এ দেশের ভূখ- সন্ত্রাসী কর্মকা- এবং প্রতিবেশী দেশের কোনো ক্ষতিতে ব্যবহার করতে দেবো না। সেতুবন্ধনের আর শান্তিপূর্ণ দেশ হবে বাংলাদেশ।
উদ্বোধনী অধিবেশনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট পেশ করেন। অনুষ্ঠানে সম্মেলনের অভ্যর্থনা উপকমিটির আহ্বায়ক ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম স্বাগত বক্তৃতা করেন।
সংগঠনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দিপুমনি সম্মেলনে যোগ দেয়া দেশী-বিদেশী অতিথিদের নাম ঘোষণা করেন। ১০টি দেশের ৫৫ জন রাজনীতিবিদ এবং ১৪ দলসহ দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আব্দুল মান্নান খান শোক প্রস্তাব পাঠ করেন। পরে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
পরে ভারত, রাশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, চীন, ইতালি, নেপাল ও শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্মেলনে বক্তৃতা প্রদান করেন।
দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এবং উপপ্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বটি পরিচালনা করেন। এর আগে সকালে সংগঠনের সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে ২০ তম ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন করেন।
বিপুল করতালির মধ্যে সকাল ১০ টায় সম্মেলনস্থলে প্রবেশ করেই প্রধানমন্ত্রী মঞ্চের ডানপাশে জাতীয় পতাকার স্ট্যান্ডের সামনে দাঁড়িয়ে যান। পাশেই আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকার সামনে সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ ৭৩টি পতাকা স্ট্যান্ডের পাশে সাংগঠনিক জেলা কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেরা অবস্থান নেন। মঞ্চে লাল-সবুজে সজ্জিত শিল্পীসহ সমগ্র সম্মেলনস্থলে তখন সমবেত কন্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। আর এরমধ্যেই উত্তোলিত হয় জাতীয়, দলীয় এবং সাংগঠনিক জেলার পতাকা। পরে দলের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের পরিচালনায় ‘আলোর পথে যাত্রা’ শীর্ষক সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামাবো এবং শোষণমুক্ত এক সমাজ আমরা গঠন করব। বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হবে। প্রতিটি মানুষ বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত হবে। পুষ্টিহীনতা দেশ থেকে দূর করে আগামীতে যেই শিশুটি জন্মাবে সেই শিশুটিও একটি পুষ্টিকর জীবন পাবে।
যে নির্দেশনা পেয়েছিলাম এবং তাঁর পাশে থেকে যেটুকু দেখেছি, শিখেছি এবং সারা বাংলাদেশ ঘুরে মানুষের দুঃখ, দুর্দশা থেকে যেটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছি তাকে সম্বল করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, দেশে আর কোন দরিদ্র যেন না থাকে তাই ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পরই আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, দুস্থ নারীদের জন্য ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতাসহ বিভিন্ন ভাতার প্রবর্তন করি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্যক্রম আমরা চালু করি। বর্তমানে ১৪৫টি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কর্মসূচি আমরা চালিয়ে যাচ্ছি, যার সুফল এদেশের মানুষ পাচ্ছে। ৫৫ লাখ ৫৫ হাজার মানুষ এই ভাতা পাচ্ছে।
তাছাড়া, যারা একবারে অনগ্রসর যেমন হিজড়া, বেদে, হরিজন সম্প্রদায়-তাদেরকে আমরা ৬শ’ টাকা করে মাসিক ভাতা দিচ্ছি। চা শ্রমিকদের জন্য অনুদান দিচ্ছি। এভাবে আমরা সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের সহযোগিতা করে যাচ্ছি, যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরাই প্রথম দেশে খাদ্যোৎপাদন বাড়িয়ে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। এটা সম্ভব হয়েছিল কোন জামানত ছাড়া স্বল্প সুদে ১৯৯৮ সাল থেকে বর্গা চাষিদের আমরা কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ দিতে শুরু করি। কৃষিপণ্যের দাম কমিয়ে কৃষকদের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসি। স্বল্পমূল্যে সার ও কীটনাশক দেয়ার ব্যবস্থা করি। ১০ টাকায় একজন কৃষক যেন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে সেই ব্যবস্থা নেই এবং সেই সাথে ৯৮ লাখ ৫৪ হাজার ৬০৬ জন কৃষক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে সরাসরি ভর্তুকির টাকা গ্রহণ করতে পারছেন। ২ কোটি ৭৫ লাখের বেশী কৃষককে কৃষি উপকরণ কার্ড দিয়েছি। এভাবেই আজকে দেশে আমরা ৩ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টনের অধিক খাদ্য উৎপাদন করতে পারছি। দরিদ্রদের মধ্যে বিনা পয়সায় খাদ্য বিতরণ করে যাচ্ছি। একটি লোকও যেন বিনা খাদ্যে কষ্ট না পায় সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমরা জানি দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে শুধু ভাতা দিলে চলবে না। মানুষকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমরা মানুষকে স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প গ্রহণ করেছি। মাইক্রো ক্রেডিটের পরিবর্তে মাইক্রো সেভিংস কর্মসূচি চালু করেছি অর্থাৎ ক্ষুদ্র সঞ্চয়, এরজন্য আমরা স্বল্প সুদে ঋণ দিচ্ছি। যারা যে যেধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় তার সুযোগ আমরা করে দিচ্ছি। ফলে দারিদ্র্য মুুক্তির পথে আমরা সফলতা অর্জন করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ আজ কিন্তু আর স্বপ্ন না। সমগ্র বাংলাদেশে ইন্টারনেট সার্ভিস আছে। আমরা টেলিফোন-মোবাইল ফোন সকলের হাতে হাতে তুলে দিয়েছি। কৃষকসহ সাধারণ জনসাধারণের তথ্য প্রাপ্তির জন্য বিভিন্ন বিনামূল্যে সার্ভিস চালু করেছি। ইতোমধ্যে ৪৯৯টি কৃষি তথ্য যোগাযোগ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ৭২৭টি কৃষি পরামর্শ কেন্দ্র আমরা স্থাপন করেছি। সমগ্র বাংলাদেশে ৫ হাজার ২৭৫টি ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ই-গভর্নেন্স চালু করেছি। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছি। বেকার যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক করে দিয়েছি। সেখান থেকে যুবকরা বিনাজামানতে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিয়ে নিজস্ব কর্মক্ষেত্র গড়ে তুলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারছে। যারা ভূমিহীন তাদের বিনাপয়সায় ঘরবাড়ি করে দিচ্ছি। ইতোমধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ১ লাখ ৪০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। দরিদ্র বয়োবৃদ্ধ, দুস্থ মহিলাদের জন্য ‘শান্তি নিবাস’ তৈরী করে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
১৯৩ কোটি বিনামূল্যে বই বিতরণসহ সরকার প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা খাতে বৃত্তি, উপ-বৃত্তি প্রদানসহ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরী করে দেয়ার কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করেছি। অন্যদিকে ব্যাংক, বীমা থেকে শুরু করে মোবাইল ফোন, রেডিও, টেলিভিশন, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প কলকারখানা বেসরকারিখাতে যেন আরো ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিদেশি বিনিয়োগ যাতে আসে তার জন্য ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে আমরা ১শ’টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি। যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হবে। শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠবে এবং কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
প্রধানমন্ত্রী নারীর ক্ষমতায়ন প্রসংগে বলেন, আমরা আধুনিক নারী উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি এবং কর্মক্ষেত্রের সকল পর্যায়ে নারীদের সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তিনি এ সময় স্থানীয় সরকারের সকল পর্যায়ে শতকরা ৩০ ভাগ আসন নারীদের জন্য বরাদ্দ রাখাসহ জাতীয় সংসদে ৩০ ভাগ নারী প্রতিনিধিত্ব রয়েছে বলেও জানান।
প্রধানমন্ত্রী দেশের সংসদকে সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র পার্লামেন্ট উল্লেখ করে বলেন, যেখানে সংসদ নেত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, জাতীয় সংসদের স্পীকার এবং সংসদ উপনেতা একজন নারী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ এমন একটা অবস্থানে রয়েছে যেখান থেকে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় আমরা নিজস্ব অর্থায়নে ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছি। আমরা অর্থ দিয়েছি। পরিবেশ রক্ষার জন্য আইন সংশোধন করেছি। যাতে এই পরিবেশ রক্ষা করে বাংলাদেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে দেশের বনভূমির পরিমাণ ৭ ভাগ থেকে ১৩ ভাগে উন্নীত হয়েছে। আমরা একে ২০ ভাগে উন্নীত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী ভাষণের শুরুতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ১৫ আগষ্টের শহীদ, জাতীয় চারনেতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ সম্ভ্রমহারা মা বোনকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি গণআন্দোলন-সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ দেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আলোকবর্তিকাবাহী সংগঠন আওয়ামী লীগের শক্তি তাঁর তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বলেও প্রধানমন্ত্রী এ সময় উল্লেখ করেন।
আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কথাও প্রধানমন্ত্রী এ সময় স্মরণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ’৮১ সালে ৬ বছরের নির্বাসন জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরে আসার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘এই আওয়ামী লীগের হাজার হাজার নেতা-কর্মীরাই সেদিন আমাকে আপন করে নিয়েছিলেন। সে সময়কার সামরিক সরকার তাঁকে দেশে ফিরতে না দিয়ে রিফুজি জীবন যাপনে বাধ্য করায় ভারত মাতা ইন্দিরা তাঁকে আশ্রয় দেন বলেও তাঁর কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

You Might Also Like