দলীয় প্রধানও ঠিক করে দেবেন আদালত?

তিন-তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তিনি। নিজের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের একটি পরিচালনা করেছেন দীর্ঘদিন। তবে শেষবার আদালতের রায়ে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর তাঁকে দলীয় প্রধানের পদও ছাড়তে হয়েছে।

তিনি পাকিস্তান মুসলিম লিগের (পিএমএল-এন) সদ্য সাবেক প্রধান নওয়াজ শরিফ। দলীয় প্রধানের পদ ছাড়ার পর দলীয় সিদ্ধান্তেই তিনি ‘দলটির আজীবন নেতা’ মনোনীত হয়েছেন।

আদালতের যে রায়ে নওয়াজকে দলীয় প্রধানের পদ ছাড়তে হয়। তাতে বলা হয়, সংবিধানের ৬২ ও ৬৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য কোনো ব্যক্তি পার্লামেন্ট সদস্য হতে পারেন না, প্রয়োজনীয় দলিলপত্রে সই ও জাতীয় পরিষদে বা সিনেটে কাউকে মনোনয়ন দিতে পারেন না। এই দুই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি অযোগ্য ঘোষিত হলে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলেরও প্রধান থাকতে পারবেন না। কারণ, পার্লামেন্টে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকলে সেই দলের প্রধানের নানা সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টের কাজে ভূমিকা রাখে।

গত বছর পানামা পেপারস কেলেঙ্কারিতে নওয়াজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে সম্পদের উৎস জানাতে ব্যর্থ হওয়ায় আদালতের রায়ে প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষিত হন নওয়াজ। এরপর গত জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

এরপরও পাকিস্তানের ‘নির্বাচনী আইন ২০১৭’ অনুযায়ী নিজের দলের প্রধানের পদে থাকার সুযোগ ছিল নওয়াজের। কিন্তু এই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা নিয়ে আদালতে রিট করে দেশটি কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের রায়ে নিজ দলের প্রধান হিসেবে থাকারও যোগ্যতা হারান নওয়াজ।

আদালতের রায়ের পর একটি পক্ষ উল্লাস করেছে। নওয়াজের দলসহ অনেকেই এই রায় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সেই প্রশ্ন হলো, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান কে হবেন—তা কি আদালতের রায়ে নির্ধারিত হবে? নওয়াজ অভিযোগ তুলেছেন, তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে আদালতকে দিয়ে এসব করানো হচ্ছে। যদিও কারা এগুলো করছে, তা উল্লেখ করেননি সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। আর নওয়াজকে ‘দলটির আজীবন নেতা’ মনোনীত করার পর দলটির নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসি বলেন, ‘এটা জনগণের’ সিদ্ধান্ত। এটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত—আদালতের কোনো অধিকার নেই এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’

নওয়াজ দলীয় প্রধানের পদেও থাকার অযোগ্য—আদালতের এই রায়ের পর পাকিস্তানের ডন পত্রিকা সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। তার যার শিরোনাম—‘দুঃখজনক রায়’। যেখানে বলা হয়েছে, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান দেখাতে হবে। বিচার বিভাগ ছাড়া আইনের শাসন অসম্ভব। কিন্তু আদালতকে আইনের শাসন ও সাংবিধানিক গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখতে হবে। কোনো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা উচিত হবে না। আদালতের এই অস্বাভাবিক রায়ে নাগরিকের মৌলিক অধিকারে ধাক্কা দিয়েছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

পাকিস্তানের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিককে সংগঠন করার স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার সঙ্গে সংগঠন করার স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই। পার্লামেন্ট সদস্য হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিষয়টিও সংবিধানে রয়েছে।
এখন এই প্রশ্ন তোলাই যায়, পাকিস্তানের একজন নাগরিক হিসেবে নওয়াজ কি মৌলিক অধিকার পেলেন? তিনি কি সংগঠন করার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলেন না? কোনো দল বা সংগঠনের প্রধান নির্বাচন করবে সেই দল বা সংগঠনটির সদস্যরা। এটা তো আদালতের ঠিক কের দিতে পারেন না। নওয়াজ শরিফ দুর্নীতি দায়ে অভিযুক্ত হলে তাঁর সাজা হবে। সেই সাজায় তাঁর কারাদণ্ড বা জরিমানা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হবে। এটাই তো হওয়ার কথা।
পাকিস্তানে গণতন্ত্র কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কিন্তু তাদের সংবিধান অনুযায়ী গণতান্ত্রিকভাবেই নির্বাচিত সরকারের দেশ শাসন করার কথা। যদিও দেশটির প্রায় ৭০ বছরের বেশির ভাগ সময় কেটেছে সামরিক উর্দি পরা এক নায়কদের হাতে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত কোনো প্রধানমন্ত্রীই নিজের পাঁচ বছরের মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ প্রথমবার ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তার পরেরবার ক্ষমতায় ছিলেন ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত। এবার ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। প্রথমবার ও শেষবার তিনি ক্ষমতা হারান দুর্নীতির অভিযোগে। দ্বিতীয়বার ১৯৯৯ সালে রক্তপাতহীন সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন নওয়াজ।

You Might Also Like