দর্শক পদ্মাবতীকে চাইবে, খিলজিকে ভুলবে না

সঞ্জয় লীলা বানসালি পরিচালিত বহুল আলোচিত সিনেমা ‘পদ্মাবত’। বিতর্ক, ভাঙচুর, মৃত্যু, আইন-আদালত; সব পেরিয়ে অবশেষে গত ২৫ জানুয়ারি মুক্তি পেয়েছে এটি। সিনেমাটির কেন্দ্রীয় তিন চরিত্র রাওয়াল রতন সিং, আলাউদ্দিন খিলজি এবং রানি পদ্মীনি। এতে অভিনয় করেছেন যথাক্রমে শহিদ কাপুর, রণবীর সিং ও দীপিকা পাড়ুকোন।

মেবারের রানা রাওয়াল রতন সিং (শাহিদ কাপুর) তার স্ত্রী নাগমতির (অনুপ্রিয়া গোয়েঙ্কা) জন্য মুক্তা আনতে যাবেন। পথে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর সময় রাজকুমারি পদ্মাবতীর (দীপিকা পাড়ুকোন) তীরে আহত হন। তারপর তাদের প্রেম। পরবর্তী সময়ে মেবারের রানি হন পদ্মাবতী। রূপে গুণে, বুদ্ধিমত্তায় মুগ্ধ করেন সকলকে। রানির ওপর নজর পড়ে রাজ পুরোহিতের। একদিন পদ্মাবতীর সঙ্গে রাজা রাওয়াল রতন সিংয়ের একান্তে সময় কাটানোর সময় গোপনে তাদের দেখতে গিয়ে ধরা পড়েন রাজপুরোহিত। শাস্তিস্বরূপ দেশছাড়া করা হয় তাকে।

মেবার থেকে বিতাড়িত হয়ে তিনি গিয়ে আশ্রয় নেন দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির (রণবীর সিং) দরবারে। খিলজির কাছে রানি পদ্মাবতীর রূপ-গুণের প্রশংসা করেন। এরপর পদ্মাবতীকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠেন খিলজি। রানি পদ্মাবতীকে পেতে মেবার আক্রমণ করেন। এভাবেই এগিয়ে গেছে সিনেমার গল্প।
মালিক মোহাম্মদ জায়সির লেখা প্রাচীন সাহিত্য ‘পদ্মাবত’ অবলম্বনে ১৩ শতকের রাজস্থানের রাজপুতদের ইতিহাস সিনেমাটির প্রেক্ষাপট হলেও বানসালি তার স্বভাবসুলভ কল্পনাকেও কাজে লাগিয়েছেন সিনেমাটি তৈরিতে, যেমনটা তিনি করেছিলেন দেবদাস সিনেমায় পার্বতী-দেবদাস আর চন্দ্রমুখীর ত্রিভুজ প্রেম রূপায়ণে।

২ ঘণ্টা ৪৩ মিনিটের এই সিনেমাটিকে সৃষ্টিশীল কল্পনা বা কাব্যিক বর্ণনা যেভাবেই অখ্যায়িত করা হোক না কেন, বানসালি পর্দায় যে পদ্মাবত ফুটিয়ে তুলেছেন তা এককথায় অনবদ্য। যে রুপালি পর্দার ক্যানভাসে তিনি এই রাজপুত শৌর্যের ঔজ্জ্বল্য, খিলজির অন্ধ দম্ভ, আর পদ্মাবতীর রূপ-যৌবনের চাকচিক্য এঁকেছেন তা তাক লাগানোর মতো।

সিনেমায় পরিচালক একই সঙ্গে দুটি দিক তুলে ধরেছেন। একদিকে রানি পদ্মিনি আর রাজা রতন সিং এর প্রেম, অন্যদিকে অত্যাচারী খিলজি ও তার হিংস্র কামনা আর দম্ভ। বানসালির প্রিয় দুই তারকা দীপিকা ও রণবীরের সঙ্গে শাহিদ কাপুর-এই ত্রয়ীর অসাধারণ অভিনয়, নিঃসন্দেহে প্রত্যেক দর্শকের মনে দাগ ফেলবে। বিশেষ করে রণবীরের অভিনয় দর্শক অনেক দিন মনে রাখবেন। তারা প্রেমে মজবেন পর্দার পদ্মাবতীকে দেখে। তবে সে তুলনায় শাহিদ কাপুর কিছুটা ম্রিয়মাণ। যদিও এখানে তার করার কিছু ছিল না। চিত্রনাট্য এমনই দাবি করে।
তারপরও রতন সিংয়ের ভূমিকায় অনবদ্য শাহিদ কাপুর। সাহসী ও বুদ্ধিমতী রানির ভূমিকায় দীপিকা পাড়ুকোন প্রমাণ করলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি শুধু সুন্দরী নায়িকাই নন, খাঁটি অভিনেত্রীও বটে। আর সুরমা পরা হিংস্র চোখের চাহনি থেকে শুরু হয়ে পাশবিক শারীরিক ভাষায় অত্যাচারী সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজির ভূমিকায় রণবীর যথাযথ। খিলজির স্ত্রীর ভূমিকায় অদিতি রাও হায়দারিও যথেষ্ট যত্ন নিয়েই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছেন।

ত্রিমাত্রিক প্রযুক্তি, সিনেমাটোগ্রাফার সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের ক্যামেরার কাজের মুন্সিয়ানা আর বানসালির কল্পনায় প্রতিটি ঐতিহাসিক চরিত্র যেন রুপালি পর্দায় আরো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বানসালি এবং সঞ্জিত বালহারার কথায় অসম্ভব সুন্দর গানের দৃশ্যগুলো চিত্রনাট্যে তৈরি করেছে বাড়তি মাত্রা। ছোটখাটো কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও সিনেমাটি নিঃসন্দেহে সকল শ্রেণীর দর্শকের মনোরঞ্জন করবে।

You Might Also Like