দরিদ্র দেশে দুর্নীতি

মানুষকে নিয়েই মানুষের রাজনীতি। মানুষের বাঁচা-মরার প্রসঙ্গকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করতে গেলে সেই রাজনীতিকে তাই বলতে হয় ব্যক্তিস্বার্থপরতা-প্রসূত কার্যকলাপ মাত্র। যাকে কোনোভাবেই ধন্যবাদ দেয়া যায় না। মানুষের ভালোমন্দ ব্যাপকভাবে নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর। রাজনীতিরেে ত্র তাই তার অর্থনৈতিক অবস্থার কথা বিবেচনা অপরিহার্য হয়ে ওঠে; বিশেষ করে আজকের দিনে, মানুষ যখন বর্তমান বিশ্বের সব দেশেই চাচ্ছে, রাষ্ট্র তাদের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করুক। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান যুগে সব দেশে সব রাজনৈতিক দলের একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি থাকে। কেননা, অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের উপায় সম্বন্ধে জনসাধারণের মধ্যে যে মতানৈক্যের উদ্ভব হয়, তার ওপর নির্ভর করেই রাজনৈতিক দলের পার্থক্য গড়ে উঠতে চায়। অবশ্য রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার কারণ কেবলই যে অর্থনৈতিক মতপার্থক্য, তা নয়। এেে ত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বেরও প্রভাব পরিলতি হয়। অর্থনীতি মানবজীবনের একটি বিরাট বাস্তবতা। কিন্তু তা বলে, তাই আবার একমাত্র বাস্তবতা নয়। আরো বাস্তবতা আছে। এরাও রাজনৈতিক দল গঠনে প্রভাব রেখে চলেছে।
ক’দিন আগে পত্রিকায় একটি খবর পড়লাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ বেসরকারি সংস্থা অর্থনৈতিক জরিপ চালিয়ে এই সিদ্ধান্তে এসেছে যে, দরিদ্র দেশগুলো থেকে প্রতি বছর প্রায় এক লাখ কোটি ডলার ধনী দেশে পাচার হচ্ছে। আর এর ফলে দরিদ্র দেশে প্রতি বছর অনাহারে, স্বল্পাহারে, অচিকিৎসায় মারা যাচ্ছে প্রায় ৩৬ লাখ মানুষ।

সংস্থাটি বলছে, অভাবী দেশগুলোতে দুর্নীতির মাত্রা না কমে বেড়ে চলেছে। অভাবী দেশের মূল সমস্যা হলো দুর্নীতির সমস্যা। অভাবী দেশগুলোতে দুর্নীতির সমস্যা কমাতে না পারলে বিদেশে অর্থ পাচারের ফলে ওই সব দরিদ্র দেশের মানুষ আরো বেশি হারে অকালমৃত্যুর কবলেই পড়বে। তাদের বাঁচানো সম্ভব হবে না। কিন্তু র্দুর্নীতির মাত্রা কিভাবে কমানো সম্ভব সে সম্পর্কে ওই সংস্থার অভিমত আমার পে জানা সম্ভব হয়নি। কারণ, আমি ওই সংস্থার জরিপ রিপোর্ট জোগাড় করতে পারিনি। যা বলছি, তা কেবলই সংবাদপত্রে প্রকাশিত ওই সংস্থার রিপোর্ট সম্পর্কে প্রকাশিত খবর পড়ে।
আমার মনে হয়, অনগ্রসর দেশগুলোতে দুর্নীতির মাত্রা বাড়ছে। এর কারণ, এসব রাষ্ট্রে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য রাষ্ট্র ব্যয় করছে প্রচুর অর্থ। কিন্তু রাষ্ট্র বলতে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে যায় আমলাতন্ত্র। আমলারা কাঁচা পয়সা হাতে পেয়ে হয়ে উঠছেন দুর্নীতিবাজ। এরা বিদেশে অর্থ পাচার করছেন। ফলে দেশে ঘটতে পারছে অর্থাভাব। বিদেশে অর্থ পাচার করা যত সহজ, জিনিস পাচার করা তত সহজ নয়। এ জন্য অর্থনীতিতে মুদ্রার পরিমাণ কমিয়ে দ্রব্য বিনিময়ের ব্যবস্থা করে দুর্নীতি কমানো সম্ভব। এ জন্য ঊনবিংশ শতাব্দীতে বিখ্যাত ফরাসি অ্যানার্কিস্ট তথা নৈরাজ্যবাদী পিয়ের জোসেফ প্র“দঁ (১৮০৯-১৮৬৫) বলেছিলেন, সমাজ থেকে দুর্নীতি কমাতে হলে মুদ্রার মাধ্যমে বিনিময়ব্যবস্থার বিলুপ্ত করতে হবে, করতে হবে দ্রব্য বিনিময়ব্যবস্থা। এ জন্য স্থাপন করতে হবে দ্রব্য বিনিময় ব্যাংক। কিন্তু মানুষের সমাজজীবনে সব ক্ষেত্রেই বেড়েছে মুদ্রার মাধ্যমে বেচাকেনার ব্যবস্থা। অর্থনীতিতে মুদ্রার প্রাধান্য সহায়ক হতে পারছে দুর্নীতি প্রসারে। উন্নত দেশগুলোতে গণতান্ত্রিক সরকার আছে। যে দেশে গণতন্ত্র যত শক্তিশালী, সে দেশে দুর্নীতির পরিমাণ হতে দেখা যাচ্ছে তুলনামূলক কম। কেননা, এসব দেশে বিরোধী দল সমালোচনা করে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে সরকারি দলের দুর্নীতি করার সুযোগকে অনেক সীমিত করে। অনুন্নত দেশের রাজনীতি অনেক অনুন্নতপর্যায়ে রয়েছে। এখানে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেক দেশেই প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। তাই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এসব দেশে অগ্রসর দেশের মতো হতে পারছে না। দুর্নীতি কমাতে হলে একটা দেশে গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী গণতন্ত্র। তাহলে বিরোধী দলের পে অনেক সহজ হবে বিরূপ জনমত গড়ে তুলে সরকারি দলের দুর্নীতি প্রতিরোধ। এ রকমই মনে হয় আমার।
সরকারি অর্থ হলো করদাতাদের অর্থ। সরকারি ব্যয়ে দেশের উন্নয়ন ঘটাতে গেলে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তা পাওয়ার জন্য সরকারকে বাড়াতে হয় করের পরিমাণ। কিন্তু বেশি কর ধার্য করে কোনো রাজনৈতিক দলই চায় না জনপ্রিয়তা হারাতে। এখন সব সরকারই চায় উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরো করের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে।

অনুন্নত দেশের উন্নয়ন-ব্যয়ের উৎস হিসেবে সর্বাধিক সমালোচিত পন্থাটি হলো ঘাটতি-ব্যয় (উবভরপরঃ ঋরহধহপরহম)। সাধারণভাবে ঘাটতি ব্যয় বলতে বোঝায়, সরকারের মাধ্যমে কাগজি মুদ্রা ছাপিয়ে সরকারি ব্যয়ভার বহন করা। এর ফলে দ্রুত বাড়তে থাকে একটি দেশে মুদ্রার সরবরাহ। মুদ্রার সরবরাহ বাড়ার অর্থ দাঁড়ায়, জিনিসের চাহিদা বাড়া। কিন্তু মুদ্রার সরবরাহ যে হারে বাড়ে, দ্রব্য উৎপাদন সে হারে বাড়ে না। ফলে সৃষ্টি হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি। জিনিসের মূল্য বেড়ে যাওয়ার ফলে অভাবী মানুষ পারে না জিনিস কিনতে। ফলে বাড়ে তাদের কষ্ট। ঘটে তাদের অকালমৃত্যু। অনেক অর্থনীতিবিদ ঘাটতি ব্যয়বিরোধী। কিন্তু রাজনীতিকেরা ঘাটতি ব্যয়ের মাধ্যমে চাচ্ছেন দেশ চালাতে। দেশের উন্নয়ন ঘটাতে। যেটা হলো খুবই বিভ্রান্তিকর পন্থা। এর ফলে দুর্নীতি না কমে একটা দেশে দুর্নীতি বাড়তেই চায়। আমি যেখানে থাকি তার রাস্তার ওপারে রয়েছে একটি প্রাচীর। সেই প্রাচীরে একটি রাজনৈতিক দলের প থেকে লেখা হয়েছে, বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য তাদের ব্যবসায় করার প্রয়োজনীয় অর্থ সরকারকে দিতে হবে। কিন্তু সরকার এই অর্থ কোথায় পাবে সে সম্পর্কে কিছু লেখা হয়নি প্রাচীরে। সরকার থেকে অর্থ দিতে গেলে করতে হবে ঘাটতি ব্যয়। আর এই অর্থ দেয়ারেে ত্র সরকারি দলের বেকারেরাই পাবেন আর্থিক অনুদান। অন্য দলের বেকারেরা আর্থিক অনুদান পেতে পারবেন না। ফলে বাড়বে দুর্নীতির মাত্রা। আমরা জানি প্রকৃত পুঁজি একজনকে দিলে আর একজনকে দেয়া যায় না। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা চলে, একটা পাওয়ারটিলার দু’জনকে দেয়া যাবে না। তাই বাস্তবে প্রকৃত পুঁজি দেয়ারেে ত্র ঘটবে বিশেষভাবেই পপাতিত্ব। অনুন্নত দেশে এই পপাতিত্ব ঘটতে পারছে বিশেষভাবে। যাকে ফেলতে হয় দুর্নীতিরই মধ্যে।

অপচয় হলো দুর্নীতির আরেকটি বড় কারণ। অনুন্নত দেশে বাহ্য আড়ম্বরপূর্ণ ব্যয় (ঈড়হংঢ়রপঁড়ঁং ঊীঢ়বহফরঃঁৎব) বাড়াচ্ছে অনগ্রসর দেশের দারিদ্র্য। একসময় মানুষ খেলাধুলা করেছে, আনন্দ পাওয়ার জন্য। কিন্তু এখন খেলাধুলা হয়ে উঠতে চাচ্ছে বাণিজ্যিক। আর এেে ত্র হতে পারছে প্রচুর অনুৎপাদনশীল ব্যয়। কৃষ্ণআফ্রিকার দেশ ক্যামেরুন একবার আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলতে গিয়ে নাকি খরচ করে ফেলেছিল তার বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের অর্ধেকের বেশি। ফলে সে পড়েছিল অর্থনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে। বিশ্বে ফুটবল খেলে নাম কিনে বাস্তব জীবনে সে মোটেও লাভবান হতে পারেনি। বাংলাদেশেও খেলাধুলারেে ত্র হতে পারছে রাষ্ট্রিক অর্থের অপচয়। আর এই অপচয়ের পথ ধরে বাড়ছে দুর্নীতির মাত্রা। দেশে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে বিদেশে। যার বিনিময়ে বাংলাদেশে আসছে না কিছুই। এমনকি হতে পারছে না খেলাধুলাতে সুনাম। খেলাধুলাতে বাংলাদেশ হারছে অন্য সব দেশের কাছে। সাবেক পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের খেলোয়াড়েরা জিতেছেন হকিতে, ক্রিকেটে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশর খেলোয়াড়েরা এখনো এসবেে ত্র তাদের ধারেকাছেও নেই। প্রশ্ন উঠছে কেন এমন হতে পারছে।
বাংলাদেশের অনগ্রসরতার একটা কারণ, এ দেশের রাজনৈতিক চিন্তাচেতনায় রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্রের ধারণার প্রভাব। আমরা এখনো মনে করছি, রাষ্ট্রের মাধ্যমে সব অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান হতে পারবে, যা আদৌ সম্ভব নয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর এটা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, রাষ্ট্রিক সমাজতন্ত্র (ঈড়ষষবপঃরারংস)- এর ধারণা। সঠিক নয়। শেখ মুজিব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটানোর জন্য গ্রহণ করতে চেয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শ। তার মেয়ে এখনো কতকটা তার বাবার আদর্শকেই অনুসরণ করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতিরেে ত্র এই নীতিও হয়ে উঠতে চাচ্ছে বিশেষ বাধা। শেখ মুজিব বলেছিলেন, আগে গণতন্ত্র নয়, আগে হলো অর্থনৈতিক উন্নয়ন। কিন্তু গণতন্ত্র অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পরবিরোধী নয়। বরং বলতে হয়, গণতন্ত্রের অভাবে একটি দেশে বাড়ে দুর্নীতি, যা কমিয়ে দিতে চায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার। মানুষ হারায় তার আত্মনির্ভরশীলতা। বাঁধা পড়তে চায় ‘রাষ্ট্র-দাসত্বে’।
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

You Might Also Like